(প্রথম পর্বের শেষ প্যারা থেকে শুরু করছি)
এবার আসি বিজ্ঞানের কথায়। “ বিশ্বাসই যেখানে ইসলাম/ খৃষ্টান/ ইহুদি এ জাতীয় ধর্মগুলোর মূল খুটি, সেখানে গত প্রায় এক শতক ধরে এই ধর্মগুলোকে বিজ্ঞানময় বলে যাহির করতে যুদ্ধে নামার কারণ কি? কারণ আর কিছু না, ধর্ম একটা নানান রুপের নানান ধারার ক্রম পরিবর্তনশীল বিষয় হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক যুগে এসে আমরা “ধর্ম” শব্দটাকে যেমন একটা বিশেষ বিমূর্ত ব্যাঞ্জনা দিয়েছি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপিয়রা এই শব্দটাকে একটা আগ্রাসি হেজিমোনিক রুপ দিয়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর একটা শ্রেনী এই “বিজ্ঞান” নামক জিনিসটাকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করে এর সিড়ি বেয়ে ক্ষমতার উচ্চ শিরে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে “বিজ্ঞান” নামক কোন একটা কিছুর কাছে নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যাওয়ার পর শুরুতে “একটা শ্রেনী” চেষ্টা করেছে এই “বিজ্ঞান” নামক অচেনা অজানা বস্তুটার বিরোধীতা করতে, তা সম্ভব হইনি, ক্ষমতা হাড়ানোও তাদের বন্ধ হয়নি, এখন তারা শুরু করেছেন এই বস্তুটাকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করা। কিভাবে তা দাবি করা যায়, একমাত্র উপায় নিজেদের ধর্ম গ্রন্থে এই বিশেষ বস্তুটাকে খুজে বের করা। কাজটা প্রথমে করেছে ইহুদিরা, তারপর খৃষ্টানরা, তারপর মুসলমানরা, এখন হিন্দুরাও শুরু করেছে। কিন্তু এই বিজ্ঞান জিনিসটা কি? এটাতো বোঝা গেলো না। এটা কি কোন আদর্শ, কোন ধর্ম না কি কোন পদ্ধতি? এটা না জেনে যখন আমরা তর্কে নামি বিজ্ঞান বড় না কি ধর্ম তখন তা আসলে একটা অর্থহীন বিতর্ক ছাড়া আর কিছুই হয় না।
আমি ছোট্র একটা গল্প বলি, এই গল্পের ঘটনাটা অহরহ ঘটে। তাই গল্পটা মনযোগ দিয়ে পড়তে হবে -
“রহিম কহিলো করিমকে, ওহে রহিম, তোমাদের এইসব বিজ্ঞান আমি মানি না। করিম রাগিয়া উঠিলো, সে রহিমকে বলিলো, নালায়েক, তুমি বিজ্ঞানের সকল সুযোগ সুবিধা নিবা, বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারের আসির্বাদে ধন্য হবা অথচ বিজ্ঞান মানিবা না তা তো হয় না। রহিম থতমত খাইয়া গেলো, কিছু বলিতে পারিলো না। এইবার তাকে উদ্ধার করতে আগাইয়া আসিলো তাহার বউ মালেকা বানু, মালেকা করিম কে কহিলো, ওহে নরাধম, বিজ্ঞান লইয়া গর্ব করিয় না, বিজ্ঞানিগন কোরআন হইতে এইসব বিজ্ঞান আরহন করিয়াছেন, বিজ্ঞান বড় নয় রে, ধর্মই বড়। করিম দমিলো না, সে বলিয়া উঠিলো, আজকের যুগ বিজ্ঞানের যুগ, তোমরা তোমাদের আদীম ধর্ম লইয়া পরিয়া থাকো, আমরা বিজ্ঞানের পতাকা উড়াইয়া সামনে আগাইয়া যাই ”।
এইবার, ভাইসব উপরের গল্প থেকে বিজ্ঞানের অর্থ উদঘাটন করেন দেখি। রহিমের বক্তব্যে আমরা জানলাম বিজ্ঞান কোন একটা তত্ত বা বিজ্ঞান এমন একটা জ্ঞান খন্ড যা এমন কিছু বলে যা রহিম মানতে পারে নাই। আবার করিমের বক্তব্য অনুযায়ি, বিজ্ঞান জিনিসটা আবিস্কারক/উদ্ভাবক বা এর ব্যবহার করে আবিস্কার/উদ্ভাবন করা যায় যার উপর আমরা নির্ভরশীল। আবার মালেকা বানুর বক্তব্য থেকে জানা গেলো বিজ্ঞান আসলে ধর্মের একটা প্রতিদ্বন্দী, এইটাও অনেকটা আরেকটা ধর্মের মতোই। আবার করিমের সর্বশেষ বক্তব্যে পাওয়া গেলো তাতে বোঝা গেলো বিজ্ঞান জিনিসটা একটা নবিন জিনিস, আদীকালে মানুষ বেঁচে থাকতো ধর্মের উপর নির্ভর করে, তখন বিজ্ঞান বস্তুটা ছিলোনা, আর বর্তমান যুগের মানুষ ভবিষ্যতের যুগে পারি জমাবে বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে, বিজ্ঞান আধুনিক আর ধর্ম প্রাচীন। সব মিলিয়ে আমরা যা পেলাম তা হচ্ছে “বিজ্ঞান হচ্ছে এমন একটা জিনিস যা সদ্য এই আধুনিক যুগে এসে সৃষ্টি হয়েছে, ধর্মের পিছে লেগেছে, ধর্মকে সরিয়ে ধর্মের যায়গা নিতে চাচ্ছে, নতুন নতুন আবিস্কার/উদ্ভাবন করছে এবং এবং এটি নিজেই একটি তত্ত্ব ”। ঘটনা হচ্ছে, এর কোন অর্থ হয় না, বিজ্ঞান শব্দটা এইখানে একটা রহিমের জন্য একটা আগ্রাসি হেজিমনি আর করিমের জন্য নিজেকে রহিমের চেয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার।
কিন্তু, এই আলাদা আলাদা স্বার্থগত যায়গার কথা বাদ দিয়েই তো বিজ্ঞানের একটা অর্থ থাকার কথা। সেই অর্থটা কি? আধুনিক যুগের আগে কি বিজ্ঞান বলতে কিছু ছিলনা? ছিলো। একজন বিজ্ঞানী যেভাবে চিন্তা করে প্রাচীন কালে কি কোন মানুষ সেই ভাবে চিন্তা করতো না? করতো। প্রাচীন যুগে কি বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কার নেই। আছে। এবার বিজ্ঞান শব্দটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এখন আমরা বিজ্ঞান শব্দটাকে যেই মর্যাদা দেই, এই সেদিনও, এমনকি রেনেসার শুরুর দিকেও সেই মর্যাদাটা দেয়া হতো ফিলসফি বা দর্শন শব্দটাকে। গ্যালিলিও গ্যালিলি যাকে আধুনিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রথম কয়েকজনের একজন হিসাবে মর্জাদা দেয়া হয়, সেই গ্যালিলিওকে কিন্তু তার সময়ের লোকজন ফিলসফার হিসেবেই অভিহিত করতো, সাইন্টিস্ট হিসাবে নয়। এনলাইটনমেন্ট বা যোতির্ময়কালের সময়টায় ধর্মতত্ত্ব আর ভাববাদী দর্শন থেকে অভিজ্ঞতাবাদী পরীক্ষানিরীক্ষা মূলক দর্শনকে পুরোপুরি আলাদা করতে গিয়েই বিজ্ঞান শব্দটার ব্যবহার শুরু করে ইউরোপিয়রা। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই এই কাজ করতে বাধ্য হয় ইউরোপিয় অভিজ্ঞতাবাদীরা। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকদের বহু অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে এক কালে। দর্শনের ভাববাদী অংশটা থেকে বেরিয়ে এসে, অধিবিদ্যাকে পুরোপুরি আলোচনার বাইরে রেখে অভিজ্ঞতাবাদি দার্শনিকরা হয়ে গেলেন বিজ্ঞানী। এর একটা ঐতিহাসিক কাহিনি আছে। সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থা যখন ভেঙে পরছে, চার্চ যখন ক্ষমতা হারাচ্ছে, রাজার যায়গায় তখন উঠে আসছিলো শিক্ষিত, ব্যবসায়ি, মধ্যবিত্তের গণতন্ত্র। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনীরা রাজার বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে গিয়ে রাজার শাসনের সাহায্যকারি আধ্যাত্মিক পুরোহিত শ্রেনীর বিপক্ষেও লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হলো। পুরোহিতের সাপোর্ট না পেয়ে এরা সাপোর্ট করেছে বুদ্ধিজিবী/বিজ্ঞানীদের আর বুদ্ধিজিবী/বিজ্ঞানিরা সাপোর্ট করেছে এই নয়া শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনীর, আর এদের মিলঝুলেই গড়ে ওঠে আধুনিক সভ্যতা। ব্যবসায়ি শ্রনীর সহায়তায় বিজ্ঞানীরা চালিয়ে যেতে পেরেছে গবেষনা, করতে পেরেছে নব নব আবিস্কার, আর সেই আবিস্কার/উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ি শ্রেনী করেছে শিল্প বিপ্লব। বিজ্ঞান ছিলো একটা পদ্ধতি, জ্ঞান অর্জনের, সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতাবাদী, পরীক্ষা নিরিক্ষা সমৃদ্ধ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, সেই উপাত্তের পরীক্ষা নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে বিশ্লেষন এবং সবশেষে পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এই হচ্ছে বিজ্ঞান। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর বিজ্ঞান একই জিনিস। কিন্তু একটা পদ্ধতি কিভাবে একটা মতবাদী চেহারা পেলো? কেনো ইসলাম/খৃষ্টান ইত্যাদি ধর্মের অনুসারিরা “বিজ্ঞান” জিনিসটাকে ধর্মের প্রতিদ্বন্দী বলে ভাবা শুরু করলো।
[ উল্লেখ্যঃ বিজ্ঞান শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ বিশেষ জ্ঞান বা বিশেষায়িত জ্ঞান। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Science শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ scientia থেকে, scientia শব্দের অর্থ জ্ঞান। Science একটা ভালো বিস্তৃত অর্থ পেলাম উইকিপিডিয়ায় “any systematic knowledge-base or prescriptive practice that is capable of resulting in a prediction or predictable type of outcome. In this sense, science may refer to a highly skilled technique or practice.” মানে হলো, বিজ্ঞান জিনিসটা পদ্ধতিগত জ্ঞান অথবা পর্যবেক্ষন গত চর্চা যে পদ্ধতিগত চর্চার মাধ্যমে আগে থেকে ভবিষ্যতবানী যোগ্য ফলাফল লাভ করা সম্ভব, অর্থাৎ বিজ্ঞান শব্দটা দিয়ে উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন পদ্ধতি বা চর্চা বোঝায়।]
এইখানে কিছু প্রশ্ন করা যাক। প্রশ্ন গুলো নিন্মরুপ-
১। কেনো বেশিরভাগ মুসলমান আর খৃষ্টান, ইহুদিদের ঘৃণা করে অথচ ইহুদিদের নবীদের ভালোবাসে?
২। কেনো বেশিরভাগ মুসলমান পশ্চিমা সভ্যতাকে ঘৃনা করে, অথচ এই সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে ভালোবাসে?
৩। কেনো বেশিরভাগ মুসলমান আর খৃষ্টান (ইহুদি/হিন্দু এরাও) আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সৃষ্ট কিছু বৈপ্লবিক তত্ত্ব (উদাহরনঃ বিবর্তনবাদ) কে অন্ধের মতো বিরোধিতা করে, আবার নিজেই গলদঘর্ম হয়ে সেই বিজ্ঞানের কোন কোন তত্ত্বের সাথে নিজের ধর্মগ্রন্থের কোন লাইনের সামান্যতম মিল আছে তা হন্যে হয়ে খোজে?
অডিপাস কমপ্লেক্সএর আবিষ্কার করেছেন ফ্রয়েড সে একশ বছরেরও বেশি আগে। ছেলে শিশু বড় হতে হতে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে, তার পরম ভালোবাসার অবলম্বন, তার মা, যাকে সে শুধুমাত্র নিজের ভালোবাসার বস্তু বলে মনে করে, সেই মা শুধু তাকেই ভালোবাসেনা, তার মায়ের ওপর শুধু তার একার অধিকারই নেই, অধিকারে ভাগ বসিয়েছে পিতা, ভালোবাসায়ও। মায়ের প্রতি চরম ভালোবাসা আর পিতার প্রতি একধরণের শ্রদ্ধা মিশ্রিত ঘৃণা নিয়ে বড় হয় এ শিশু। পরিবারের alpha male পিতার সাথে একধরণের Love-Hate সম্পর্ক গড়ে তোলে সে, এরই নাম অডিপাস কমপ্লেক্স। আমাদের দেশে এমন ছেলের অভাব নেই, যে বাবাকে ভয় পায়, বাবার অনেক স্বভাব অপছন্দ করে আবার বড় হয়ে ঠিক নিজের বাবার মতোই হয়ে ওঠে, নিজের অজান্তে সে নিজেই নিজের বাবা হতে চায়। মনবিজ্ঞানীরা অবশ্য এখন আর অডিপাস কমপ্লেক্স’কে কোন সার্বজনিন সত্য বলে মানে না। পরিবার আর সমাজভেদে এই কমপ্লেক্স এর অস্তিত্য কম বেশি হতে পারে, একেবারে নাও থাকতে পারে। তবে অডিপাস কমপ্লেক্স এর একটা মজার বিষয় হচ্ছে এই জিনিসটার অস্তিত্ব আরো ব্যাপক, শুধু মা-শিশু-বাবা এই ত্রিভুজেই এর অস্তিত্ব সিমাবদ্ধ না, মানুষের সমাজে এর অস্তিত্ব আছে আরো নানা প্রকারে।
এবার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে আলোচনা করা যাক-
১। প্রথম প্রশ্নের ক্ষেত্রে মুসলমানদের খুব সহজ এবং প্রচলিত উত্তর আছে। উত্তরটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সম্পর্কিত। কিন্তু এই ঘৃনার বীজ মাত্র ৫০ বছর আগে বোপিত হয় নাই। এই ঘৃণার ইতিহাস আরো পুরোন, সেই ইসলামের বাল্য বেলাতেই এই ঘৃণার জন্ম, প্রথম যে একত্তবাদী ধর্মের বিরুদ্ধে মুসলমানরা লড়াই করেছে সেই ধর্মের নাম ইহুদি ধর্ম। ইউরোপে খৃষ্টানরা কি শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ইহুদিদের ঘৃণা করেছে, অত্যাচার চালিয়েছে, তার আগে কি চালায়নি? ইতিহাস সাক্ষি, খৃষ্টানরা যে অন্যায় অত্যাচার ইহুদিদের সাথে করেছে, মুসলমানরা তার ধারে কাছেও কোনদিন যেতে পারবেনা। মধ্যযুগে ইউরোপে যত দোষ নন্দ ঘোষের মতোই সব দোষ ছিলো ইহুদিদের। ইহুদি ব্যবসায়িরা ইউরোপের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যংকের কাজ করতো তারা। অথচ যুদ্ধ, মহামারি, প্লেগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় সবকিছুর জন্যই দোষ ধরা হতো ইহুদিদের। বিনা কারণে ইহুদি নিধন ইউরোপে কতবার হয়েছে তার কোন ইয়াত্তা নাই। টাকা ধার নেয়ার দরকার পরলে ইহুদিরা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা অথচ ফেরত দেয়ার সময় আসলেই ইহুদিরা হয়ে যেতো রক্তললুপ ঘৃণিত সুদখোর। যদিও সুদের ব্যবসায়ি খৃষ্টানের অভাব ছিলোনা। এমন বহু বাঙালিকে চিনি, যারা ইহুদি জিনিসটা কি তাই ঠিক মতো জানে না, কিন্তু সামাজিক ভাবেই ইহুদি শব্দটা তাদের কাছে একটা ঘৃণিত শব্দ। এবার আমরা যদি কারন অনুসন্ধান করি তাহলে অডিপাস কমপ্লেক্স এর একটা সামাজিক প্রকারভেদ ছাড়া আর কিছু খুজে পাই নি। খৃষ্টান ধর্মের জন্ম একেবারে ইহুদি ধর্মের ভেতরেই, ইহুদি ধর্মেরই একটা মাজহাব হিসেবে। ইসা তো জিবদ্দসায় কোনদিন খৃষ্টান শব্দটাই ব্যবহার করেন নাই, নিজেকে তিনি ইহুদিই মনে করতেন। কিন্তু ইহুদিরা তাকে মসিহ স্বিকৃতী দেয় নাই, স্বিকৃতী দেয় নাই তার অনুসারীদেরও। ইহুদিদের আল্লাহই খৃষ্টানদের আল্লাহ, ইহুদিদের মহান নবীরাই খৃষ্টানদের মহান নবী। অথচ ইহুদিরা তো তাদের ধর্মের ভাগ দিতে রাজি না। ইহুদিদের জেহোভা/ইলোহিম/আল্লাহ তাদের নিজেদের সম্পত্তি, তারা সরাসরি নবীদের বংসধর বলে দাব করে নিজেদের। যুদিও/খৃষ্টান/ইসলাম এই ধারার একত্তবাদী ধর্মের প্রবক্তাই তারা। খৃষ্টান আর ইসলাম এই দুইটা ধর্মই শুরুতে এই আদী ধর্ম ইহুদি ধর্মের স্বিকৃতী চেয়েছে। স্বিকৃতী না পেয়ে সম্পর্কটা হয়েছে প্রবল ঘৃণার।
বিষয়টা এভাবে দেখানো যেতে পারে-
• ইহুদি = পিতা (যেহেতু সে আমার পরিচয়ের সাথে সম্পর্কিত একত্তবাদী ধর্মের আদী ধারক)
• আল্লাহ = মা (আমার ভালোবাসা আর আকাঙ্খার বস্তু, যাকে কেন্দ্র করে আমার জীবন বোধ)
মুসলমানরা শুরুর দিকে ইহুদিদের অপছন্দ করতোনা। একটা সময় পর্যন্ত মুসলমানরা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তো। মুসলমানরা শুরুতে ইহুদিদের স্বিকৃতী চেয়ছে। ইহুদিরা যখন আর স্বিকৃতী দেয়নি তখন থেকেই এই ঘৃণার সূত্রপাত।
২ এবং ৩। দুই আর তিন নম্বর প্রশ্নের উত্তর একসাথে দেয়া সমিচিন মনে করছি। আগেই উল্লেখ করছি এনলাইটেনমেন্টের সময়টায় প্রচলিত রাজতন্ত্র আর পুরোহিত তন্ত্রের বিপরীতে লড়াই করে বেড়ে ওঠা আধুনিক পুজিবাদী গণতন্ত্রের ধারক ইউরোপিয় মধ্যবিত্ত নিজেদের সুবিদার্থে আর ধর্মিয় পুরোহিততন্ত্রকে পরাজিত করতে ‘বিজ্ঞান নামক পদ্ধতি’কে ব্যবহারিক ভাষায় ব্যবহার করতে শুরু করলো ‘বিজ্ঞান নামক তত্ত্ব” বা “বিজ্ঞান নামক ধর্ম” এই ভাবে। রহিম-করিম-মালেকা বানুর কাহিনি শুরু এইখান থেকে। যেহেতু এই “বিজ্ঞান নামক ধর্ম”ই হয়ে উঠলো তাদের জ্ঞান গরিমা, উন্নতি, সভ্যতার মূল চাবিকাঠি, এই বিজ্ঞান বস্তুটা সাধারণ খৃষ্টান আর ভিনদেশী উপনিবেশের দাস মুসলমানের কাছে হয়ে উঠলো একই সাথে ভালোবাসা আর ঘৃণার বস্তু। এই বিজ্ঞান বস্তুটা আয়ত্ত্ব করে বাপ/প্রভু সমতুল্ল সাদা চামরার ইউরোপিয় মানুষের সমান বা তার চেয়েও বেশি ক্ষমতাও সে চায়, যেহেতু এই সাদা ইউরোপিয়র তৈরি সভ্যতার পৃথিবীতে তার জন্ম, এই সভ্যতা তার মা, তাকে পালন করে লালন করে, অথচ এই সভ্যতা সে তৈরি করেনি, এই সভ্যতার নিয়ন্ত্রনও তার হাতে নাই। এই নিয়ন্ত্রন নিতে সেই ব্রিটিশ আমলেই ইসলামি ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়ার উলটো দৌড় লাগিয়েছিলো ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমান। আর এখন সে এই বিজ্ঞান কে খুজে ফেরে কোরআনের পাতায়। কিন্তু সে নিজেই জানে না, বিজ্ঞান কোন বস্তু নয়, তত্ত নয়, বিজ্ঞান একটা পদ্ধতি, সেই পদ্ধতিই তার আয়ত্তে নাই।
মুসলমানদের দুঃখ করা উচিত এই কারণে যে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তাদের মধ্যে সবার আগে যার নাম আসে তিনি কোন ইহুদি/খৃষ্টান/ইউরোপিও নন। তিনি একজন আরব দার্শনিক/বিজ্ঞানি। নাম তার ইবন-আল-হাইথাম। অন্য যেকোন কিছুর চেয়ে সত্যানুসন্ধানই ছিলো তার কাছে মূখ্য বিষয়। তিনি মনে করতেন, সত্যের জন্যই সত্যের অনুসন্ধান করতে হবে, কোন বিশ্বাসের সাথে মেলানোর জন্য নয়। ৯৬৫ সালে জন্ম নেয়া এ মহান ব্যক্তি বলেছিলেন, “সত্য কে সত্যের খাতিরেই খুজতে হবে। আর যখন কেউ সত্য জানার জন্যই সত্যের খোজ করে তখন অন্য কিছু তার এই খোঁজায় প্রভাব ফেলেনা। তবে সত্য কে খুঁজে পাওয়া কঠিন, সত্যের পথ বন্ধুর”।
জাকির নায়েকের বই, বক্তব্য কঠিন কিছু না, সস্তা-সহজ-পিচ্ছিল। ডারউইন সারা জীবনের পরিশ্রমে প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। ঐরকম পরিশ্রম ছাড়া ঐ তত্ত্বকে সরিয়ে আরেকটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কেউ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেনা। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


