somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো

০৯ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রবাস জীবনে একবার বড় অর্থ কষ্টে পরেছিলাম,
একবেলা শুধু পেঁয়াজ দিয়ে ভাত খেলেও খুশি থাকতাম।
ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে ‘ক্যারিসিক ডোনার’ কলা রুটির চেয়ে ভালো খাবার মনে হয়নি কখনো,
তখন মনে হত।
হঠাৎ করেই বাজীকর হয়ে উঠেছিলাম।
বন্ধুদের সাথে বাজী ধরে তিরিশ পিরিচ পানি এক নিঃশ্বাসে পান করা,
তেলে ভেজানো এক বয়ম তুর্কিশ মরিচ খাওয়া,
এই সব বাজী জেতা টাকা দিয়ে টিকে ছিলাম মাস খানেক।
বাজী জেতা টাকায় ‘ক্যারিসিক ডোনার’ খেতে খেতে একদিন
হঠাৎ করেই মনে পরল তোমার কথা।
মনে পরল, তখনো আমি একটা সাদামাটা কিশোর ছিলাম,
পৃথিবীটাকে খুব বেশি কঠিন জায়গা মনে হতোনা।
ইবনে বতুতার মতো পৃথিবী দাবড়ানোর স্বপ্ন দেখতাম।
ম্যাগাডেথের একটা কনসার্টে না থাকতে পারলে, মেম্ফিসের পিরামিডের সামনে মরুভূমির ধুলিতে পা না ডোবালে জীবনটাই যে বৃথা, এমনটাই ভাবতাম।
তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো।

পিরামিডের ধুলিতে পা না ডোবালেও ম্যাগাডেথের একটা কনসার্টে ছিলাম বটে,
পকেটের সব টাকা সম্বল করে উড়াল দিয়েছিলাম ইস্তাম্বুল।
চোখের সামনে ডেভ মুস্টেইন আর মার্টি ফ্রিডম্যানকে দেখে ছাগল হয়েছিলাম।
নতুন বড় করা গর্বিত চুল নিয়ে মাথাটা এমনি ঝাঁকিয়ে ছিলাম, ঘাড় ব্যাথা ছিল তিন দিন।
এক হাতে এফেস বিয়ার, আরেক হাতে তুর্কিশ বান্ধবীর কোমর জরিয়ে ধরে,
মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে, ফ্রিডম্যানের একটা কিলার লিড শুনতে শুনতে,
হঠাৎ করেই মনে পরল তোমার কথা।
মনে পরল, তখন আমি একটা সাদামাটা কিশোর ছিলাম।
ডেথ মেটাল আর হার্ড রকের পার্থক্য খুব একটা বুঝতাম না,
রিচি ব্লাকমোর রেইনবো ছেড়ে দেয়ার পর, কোন এক অজানা দ্বিপে
বছরের পর বছর গিটারে ঝি ঝি পোকার ডাক তোলার স্বাধনায় মগ্ন,
এসব কথায় বিশ্বাস করতাম তখন।
তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো।

তারপর বহুদিন মনে পরেনি তোমার কথা,
এমন না যে আগে প্রায়ই মনে পরত।
অমন হঠাৎ হঠাৎ অসময়ে অকারানেই মনে পরত তোমার কথা।
বহুদিন মনে না পরার পর,
একদিন এক বন্ধুর বাসার ছাদে বসে ‘অপরের’ কাছাকাছি যেতে যেতে,
হঠাৎ করেই মনে পরে গেলো তোমার কথা।
এখন আমি অনেক বড় হয়েছি, তোমাকে মনে পরার কোন যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাই নি।
কোন কারণ ছাড়াই মনে পরার কারণ খুঁজতে গিয়ে, মনে হলো,
অবচেতন মনের কোন গহীন কোন থেকে উঠে এসেছো।
তখন অবশ্য ফ্রয়েড পরেছি আমি, খুব বেশি না বুঝলেও ভাবতাম ভালোই বুঝি।
মনে পরে, তখন আমি একটা সাদামাটা কিশোর ছিলাম।
দ্বান্দিক বস্তুবাদ না বুঝেও নিজেকে বলতাম কম্যুনিস্ট।
জ্যাক লাকা পড়িনি, আমাদের সলিমুল্লাহ খান তখন জিজ্ঞেস করেননি-
‘আরশী নগর কেমন শহর’।
ঐ শহরটাতো তখন ছিল আমার শহর,
‘অপর’ আর ‘আমি’তো তখন একজনই ছিলাম।
তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো।

এইতো আজ সকালে, অফিসে যাবার সময়, বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে
পেট পুরে মানুষ খাওয়া বাসগুলোর আসা যাওয়া
আর সেই বাসের পেটে ঢোকার জন্য লাইন ধরে দাঁড়ানো উদ্‌গ্রীব মানুষগুলোর দিকে
তাকিয়ে থেকে ভাবছিলাম, কদিন আগেও কদাচিৎ সকালে রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময়,
এদের দিকে তাকিয়ে আমি খ্যাক খ্যাক করে হেসেছি, এইসব
নরক যন্ত্রণা ভোগ করে নাকি মানুষে।
আজকাল অবশ্য আমার এই লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়, হতে হয় বাসের খাবার,
এই রকম কত কিছুর খাবারইতো হয়েছি আজকাল।
সেই লাইনে দাঁড়াতে গিয়েই বহু বছর পর আজ দেখা হয়ে গেলো
সেই বান্ধবীর সাথে, যার জন্মদিনে তোমার সাথে দেখা হয়েছিল।
আমার এক বন্ধুর ষড়যন্ত্রে পরেই যেতে হয়েছিলো সেই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে,
এতোগুলো মেয়ের দঙ্গলে আমাকে একা ফেলে দিয়ে,
আমার সেই বন্ধু, শেয়ালের মত হেসেছিলো প্রায় এক সপ্তাহ।
আজ কালকার টিনএজারদের মতো অতো স্মার্ট ছিলামনা আমি,
শরমে পরেছিলাম বহুত।
তুমি নিশ্চয় খুব স্মার্ট আর বুদ্ধিমতী ছিলে,
তা না হলে বান্ধবিদের ফেলে ঘন্টার পর ঘন্টা আমাকে সময় দিতেনা।
বান্ধবিদের সাথে মেয়েলি আনন্দে না মেতে বোকার মত এক ঘরে বসে
থাকা ফাপরে পরা একটা ছেলেকে অনেক সময় দিয়েছিলে তুমি,
বুদ্ধিমতী আর কিছুটা ত্যাগী অবশ্যই ছিলে
আমি তো তখন এতো মেয়ে পটানো কথা শিখিনি।
মেয়েদের তখন এমন খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারতাম না,
মনে হতো দশ ইঞ্চি শক্ত ইটার মতো, যার অন্তরের খবর স্রষ্টাও জানেন না।
কি কথা হয়েছিলো তোমার সাথে, এখন আর মনে নেই,
শুধু মনে আছে তোমাকে আমি আমার ‘বার্ধক্য বন্দনা’ কবিতাটা শুনিয়ে ছিলাম।
তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো।
তখন অবশ্য প্রায়ই ভাবতাম তোমার কথা।
মুঠো ফোনের যুগ ছিলনা তখন, বিদায় নেয়ার সময় ফোন নাম্বারের আদান প্রদান হয়নি তাই।
থাকলেও সাহস করে চাইতাম কিনা জানিনা।
ঠিক যেমন সাহস করে কখন সেই বান্ধবীর কাছে যানতে চাইনি তোমার খবর।
তারপরতো হঠাৎ করেই আমি সাধু পারভেজ হয়ে গেলাম,
তার আগে অবশ্য তোমার কথা প্রায়ই মনে পরত।
তখন আমি সাধু হইনি, হইনি প্রভু শয়তানের গোলাম,
তার বহু পরে আমি নিহিলিস্ট হয়েছি, আরো পরে হিউমিনিস্ট।
লিবারাল বা পোস্ট মর্ডার্ন, নিও বা এন্টি মার্ক্সিস্ট এসব কিছুই ছিলাম না আমি,
নিজেকে বলতাম না আরজ আলীর সৈনিক, উত্তর উপনিবেশী তাত্মিক।
তখন আমি শুধুই কবি ছিলাম।
তখন আমার পকেটে সবসময় কবিতা থাকতো।

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ রাত ১২:৩৯
১৯টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×