ছুটি আজকেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কালকে থেকে আবার ....সেই ক্লাস, কুইজ, এসাইনমেন্ট... কাল সকালের প্রথম ক্লাসেই কুইজ আছে। ইইইই.....
বহু দুঃখ্যে পড়া বাদ দিয়ে সাইন এর পোস্ট দেখছিলাম। রাজামশাই এর পোস্ট এ শিউলি ফুলের লিংক এ গিয়ে সৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। আমার শহর রাজবাড়ী। কলেজ পর্যন্ত ওখানেই কেটেছে। আমাদের বাড়ীটা যে মহল্লায় সেখানে আমার সমবয়সি (এবং কাছাকাছি উপরে ও নিচে বয়সি) এর সংখ্যা ছিল অনেক... প্রায় ১৫-২০ জন এর মত। প্রাইমারি স্কুল থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সব একসাথে। স্কুলে যেতাম একসাথে, বসতাম একজোট হয়ে, খেলা, মারামারি, সম্ভাব্য সকল প্রকার শয়তানি একসাথে। প্রাইমারিতে থাকার সময় বা তার আগে মনে হয় সোমালিয়ায় যুদ্ধ চলছিল। কেমন করে যেন আমাদের গ্রুপের নাম হয়ে গেল "সোমালিয়ান উদবাস্তু" ... সংক্ষেপে "সোমালিয়ানরা"। একটা সম্ভাব্য কারণ ছিল মনে হয় সবার স্বাস্থ আর কারো কারো কৃষ্ন (যুক্তাক্ষর) কালো গাএ বরণ।
শিউলি ফুলের ইতিহাস হচ্ছে ... প্রাথমিক বিদ্যাকালে সবার জন্য বাধ্যতামুলক রহিমুন্নেছা মসজিদে প্রাতকালিন আমপারা (ও পরে কোরআন শরীফ) শিখতে হত। তো সূর্য়্য ওঠার পরেই সব সোমালিয়ান এক কাফেলায় কেউ মাথায় টুপি কেউ স্কার্ফ আর হাতে আমপারা নিয়ে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিতাম। মসজিদ খুব দূরে ছিল না... পথে এক বাড়ীর বাইরের হালকা ঘাসের উঠোনে মাঝারি কিন্তু বেশ ঝাকড়া শিউলি গাছ ছিল। ভোরের প্রথম আলোয় ওই নিলজ্র্জ শিউলি গাছটা সবুজ ঘাসের ক্যনভাসে ...নিস্পাপ সাদা শিউলি আর তার জাফরান রং এর বোটা দিয়ে ভোরের সবথেকে সুন্দর ছবিটা একে রাখত। অত ভোরে ফজর ফেরত নামাজী ছাড়া আমরাই মনেহয় পথের নির্জনতা ভাঙতাম (ফজর অনেক ভোরে হলেও কোন কোন মুরুব্বি নামাজ শেষে আরো এবাদত করে আলো ফোটার পড়ে ফিরত) । তো পথে ওই বাড়িটার সামনে এসে আমরা লটারি করে (উবু উনিশ বিশ... এই টাইপের কোন রাইম দিয়ে লটারি, এখন ভুলে গেছি) একজনকে ঠিক করে সবাই তার হাতে নিজেদের আমপারা বইটা জমা রেখে... ফুলগুলো কুড়ানো শুরু করতাম। কেউ টুপিতে কেউ জামার কোচড়ে। এখনও মনে পড়লে নিজে নিজেই হাসি... আহা একগাদা বিচ্ছু একজন আরেকজনকে ঠেলাঠেলি করতে করতে ফুল কুড়োচ্ছে আর কাছেই নিজের ভাগ্যের নিদারুন বিশ্বাসঘাতকতায় অভিমানে ঠোট ফুলিয়ে একজন আমাদের বোঝা হাতে দাড়িয়ে "এই পচা ফুল আমি সুজোগ পেলেও নিতাম না.." এই ধরনের কথা বলছে। হা হা হা....
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলি গাছের ক্যানভাসটিকে ফাকা করে নিজেদের পথে হাটা ধরতাম। অবশ্য বাদপড়া সোমালিয়ানকে আমরা সবার ভাগ থেকে কিছু কিছু করে দিতাম। তবে সেই বয়সে মনে হয় ফুল কুড়ানোর আনন্দটাই আসল ছিল। তাই ভাগে পাওয়া ফুল মনের ভার কমাতে পারত না।
মেয়েগু্লা নিজেদের মালা গাথার জন্য ফুল রাখত আর আমরা বাকিরা নিজেদের ফুল কেউ বাড়িতে আনতাম কেউ রেল হুজুর এর বউ এর জন্য দিতাম। ওহ... আমাদের আরবী পড়াত যে হুজুর উনি আগে রেলওয়ে তে চাকরি করতেন তাই ওনাকে আমরা ডাকতাম রেল হুজুর। উনি আর ওনার বউ বাচ্চাদের অসম্ভব আদর করত। আরবী পড়ানোর হুজুর নিয়ে অনেকের অনেক বেতযুক্ত ইতিহাস আছে। কিন্তু আমাদের ছিল শুধুই মজার গল্প। হুজুর প্রতিদিন পড়ানোর শেষে একটা করে গল্প করত। ওনার এত গল্পের ভান্ডার কোথা থেকে আসত ...এখনও চিন্তা করে পাই না। এই গল্পের লোভেই ভোরের ঘুমকে পরাস্ত করতাম। তো ক্রমাগত প্রতিদিন একগাদা ফুল পেতে পেতে হুজুর এর থেকে নিস্তার পেতে আমাদের দেখালেন অন্য পথ। মসজিদের পাশের পুকুরে শশিদার দিদিমা ভোরের গোসল সেরে ভেজা কাপড়ে পুজোয় যেতেন। আমরা সকালে পথে ফজর ফেরত নমাজীদের যেমন এক সাথে কোরাসে সালাম দিতাম .. তেমনি মাঝে মাঝে পথে ওনার সাথে দেখা হলেও কোরাসে আদাব দিতাম,আর উনিও ফোকলা দাতে হেসে প্রতিউত্তর দিতেন । তো উনি ভোরের পুজোর জন্য পুকুরের জবার ঝোপ থেকে রক্ত জবা তুলে নিয়ে যেতেন। রেল হুজুর আমাদের প্রতিদিন ফুল নষ্ট না করে ওনাকে ফুলগুলো দেয়ার উপদেশ দিলেন। এখন চিন্তা করেও অবাক হই আর ওনার ওপর শ্রদ্ধা বাড়ে... সাচ্চা মুসলমান হয়েও ওনার মনের বিশালতা খুব কমই দেখেছি।
নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমরা সবাই একমত হলাম ... হুজুরের কথাই ঠিক... আমাদের বুদ্ধিজীবি সুমন সাথে যোগ করল ইহাতে শশিদার দিদিমার দোয়ায় আমাদের কিরুপ পূণ্য অর্জন হইবে আর তা পরীক্ষার বৈতরণি অতিক্রমে কেমন সাহায্য করবে। হা হা হা.... এই ধরনের প্রেরণাদায়ক মোক্ষম যুক্তির পর আর কারো দ্বিধা রইল না।
ফলাফল ... পরদিন ভোর থেকে সবাই পুকুরঘাটের সিমেন্টের বেন্চ আর সিড়িতে অপেক্ষা করতাম। প্রথমদিকে দিম্মা (শশিদার দেখাদেখি আমরাও পরে এই নামেই ডাকতাম) আমাদের খেলা ভাবলেও পরে বেশ আগ্রহের সাথেই ফুল নিত। আমাদের কখনো দেরি হলে উনি আমাদের জন্য ঘাটলায় অপেক্ষায় থাকতেন। আর লক্ষিপুজোয় নারকোল ও তিলের নাড়ু আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল।
এখর ভাবলেও অবাক লাগে... সময়গুলো কেমন সুন্দর ছিল। রুপকথার রাজ্য কি এর থেকেও সুন্দর?
হাই স্কুলের শেষের দিকে দিম্মা তার গ্রামের বাড়ীতে দেহ রাখেন। ক্লাস সেভেন থেকে ভোর বেলায় ব্যাচে অংক করা আরম্ভ হওয়ায় উনার সাথে আর ভোরে দেখা হত না। রেল হুজুরও আমাদের ইন্টার পরীক্ষার সময় ইন্তেকাল করেন। মনে আছে প্রথম পরীক্ষার আগের দিন আমাদের সবার জন্য মসজিদে মিলাদ দিয়েছিলেন।
...
অনেক পেচিয়ে ফেললাম। অনেকদিন রাজবাড়ী যাওয়া হয়নি ... ছোটবেলার অনেক.. অনেক কথা মাথায় খোচা খুচি করছে। তার ফলাফল এই নিম্ন মানের সাহিত্য।
আর দুপুর এখন প্রায় সন্ধা...
...আহারে ...ক্যান যে বড় হইলাম।
___
ছবি কৃতগ্গতা (যুক্তাক্ষর) : তপু কিবরিয়া (ফ্লিকার), আর কিছু শৈশব নামটা হুমায়ুন আহমেদ থেকে ধার করা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৩:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



