somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অলস দুপুর আর কিছু শৈশব...

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




ছুটি আজকেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কালকে থেকে আবার ....সেই ক্লাস, কুইজ, এসাইনমেন্ট... কাল সকালের প্রথম ক্লাসেই কুইজ আছে। ইইইই..... :( । এই পরীক্ষা বস্তুটা যে কার মাথা থেকে বের হইছিল। পাইলে ....কইষা মাইনাস দিতাম।

বহু দুঃখ্যে পড়া বাদ দিয়ে সাইন এর পোস্ট দেখছিলাম। রাজামশাই এর পোস্ট এ শিউলি ফুলের লিংক এ গিয়ে সৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। আমার শহর রাজবাড়ী। কলেজ পর্যন্ত ওখানেই কেটেছে। আমাদের বাড়ীটা যে মহল্লায় সেখানে আমার সমবয়সি (এবং কাছাকাছি উপরে ও নিচে বয়সি) এর সংখ্যা ছিল অনেক... প্রায় ১৫-২০ জন এর মত। প্রাইমারি স্কুল থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সব একসাথে। স্কুলে যেতাম একসাথে, বসতাম একজোট হয়ে, খেলা, মারামারি, সম্ভাব্য সকল প্রকার শয়তানি একসাথে। প্রাইমারিতে থাকার সময় বা তার আগে মনে হয় সোমালিয়ায় যুদ্ধ চলছিল। কেমন করে যেন আমাদের গ্রুপের নাম হয়ে গেল "সোমালিয়ান উদবাস্তু" ... সংক্ষেপে "সোমালিয়ানরা"। একটা সম্ভাব্য কারণ ছিল মনে হয় সবার স্বাস্থ আর কারো কারো কৃষ্ন (যুক্তাক্ষর) কালো গাএ বরণ।
শিউলি ফুলের ইতিহাস হচ্ছে ... প্রাথমিক বিদ্যাকালে সবার জন্য বাধ্যতামুলক রহিমুন্নেছা মসজিদে প্রাতকালিন আমপারা (ও পরে কোরআন শরীফ) শিখতে হত। তো সূর্য়্য ওঠার পরেই সব সোমালিয়ান এক কাফেলায় কেউ মাথায় টুপি কেউ স্কার্ফ আর হাতে আমপারা নিয়ে মসজিদের দিকে রওয়ানা দিতাম। মসজিদ খুব দূরে ছিল না... পথে এক বাড়ীর বাইরের হালকা ঘাসের উঠোনে মাঝারি কিন্তু বেশ ঝাকড়া শিউলি গাছ ছিল। ভোরের প্রথম আলোয় ওই নিলজ্র্জ শিউলি গাছটা সবুজ ঘাসের ক্যনভাসে ...নিস্পাপ সাদা শিউলি আর তার জাফরান রং এর বোটা দিয়ে ভোরের সবথেকে সুন্দর ছবিটা একে রাখত। অত ভোরে ফজর ফেরত নামাজী ছাড়া আমরাই মনেহয় পথের নির্জনতা ভাঙতাম (ফজর অনেক ভোরে হলেও কোন কোন মুরুব্বি নামাজ শেষে আরো এবাদত করে আলো ফোটার পড়ে ফিরত) । তো পথে ওই বাড়িটার সামনে এসে আমরা লটারি করে (উবু উনিশ বিশ... এই টাইপের কোন রাইম দিয়ে লটারি, এখন ভুলে গেছি) একজনকে ঠিক করে সবাই তার হাতে নিজেদের আমপারা বইটা জমা রেখে... ফুলগুলো কুড়ানো শুরু করতাম। কেউ টুপিতে কেউ জামার কোচড়ে। এখনও মনে পড়লে নিজে নিজেই হাসি... আহা একগাদা বিচ্ছু একজন আরেকজনকে ঠেলাঠেলি করতে করতে ফুল কুড়োচ্ছে আর কাছেই নিজের ভাগ্যের নিদারুন বিশ্বাসঘাতকতায় অভিমানে ঠোট ফুলিয়ে একজন আমাদের বোঝা হাতে দাড়িয়ে "এই পচা ফুল আমি সুজোগ পেলেও নিতাম না.." এই ধরনের কথা বলছে। হা হা হা....
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিউলি গাছের ক্যানভাসটিকে ফাকা করে নিজেদের পথে হাটা ধরতাম। অবশ্য বাদপড়া সোমালিয়ানকে আমরা সবার ভাগ থেকে কিছু কিছু করে দিতাম। তবে সেই বয়সে মনে হয় ফুল কুড়ানোর আনন্দটাই আসল ছিল। তাই ভাগে পাওয়া ফুল মনের ভার কমাতে পারত না।
মেয়েগু্লা নিজেদের মালা গাথার জন্য ফুল রাখত আর আমরা বাকিরা নিজেদের ফুল কেউ বাড়িতে আনতাম কেউ রেল হুজুর এর বউ এর জন্য দিতাম। ওহ... আমাদের আরবী পড়াত যে হুজুর উনি আগে রেলওয়ে তে চাকরি করতেন তাই ওনাকে আমরা ডাকতাম রেল হুজুর। উনি আর ওনার বউ বাচ্চাদের অসম্ভব আদর করত। আরবী পড়ানোর হুজুর নিয়ে অনেকের অনেক বেতযুক্ত ইতিহাস আছে। কিন্তু আমাদের ছিল শুধুই মজার গল্প। হুজুর প্রতিদিন পড়ানোর শেষে একটা করে গল্প করত। ওনার এত গল্পের ভান্ডার কোথা থেকে আসত ...এখনও চিন্তা করে পাই না। এই গল্পের লোভেই ভোরের ঘুমকে পরাস্ত করতাম। তো ক্রমাগত প্রতিদিন একগাদা ফুল পেতে পেতে হুজুর এর থেকে নিস্তার পেতে আমাদের দেখালেন অন্য পথ। মসজিদের পাশের পুকুরে শশিদার দিদিমা ভোরের গোসল সেরে ভেজা কাপড়ে পুজোয় যেতেন। আমরা সকালে পথে ফজর ফেরত নমাজীদের যেমন এক সাথে কোরাসে সালাম দিতাম .. তেমনি মাঝে মাঝে পথে ওনার সাথে দেখা হলেও কোরাসে আদাব দিতাম,আর উনিও ফোকলা দাতে হেসে প্রতিউত্তর দিতেন । তো উনি ভোরের পুজোর জন্য পুকুরের জবার ঝোপ থেকে রক্ত জবা তুলে নিয়ে যেতেন। রেল হুজুর আমাদের প্রতিদিন ফুল নষ্ট না করে ওনাকে ফুলগুলো দেয়ার উপদেশ দিলেন। এখন চিন্তা করেও অবাক হই আর ওনার ওপর শ্রদ্ধা বাড়ে... সাচ্চা মুসলমান হয়েও ওনার মনের বিশালতা খুব কমই দেখেছি।
নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমরা সবাই একমত হলাম ... হুজুরের কথাই ঠিক... আমাদের বুদ্ধিজীবি সুমন সাথে যোগ করল ইহাতে শশিদার দিদিমার দোয়ায় আমাদের কিরুপ পূণ্য অর্জন হইবে আর তা পরীক্ষার বৈতরণি অতিক্রমে কেমন সাহায্য করবে। হা হা হা.... এই ধরনের প্রেরণাদায়ক মোক্ষম যুক্তির পর আর কারো দ্বিধা রইল না।
ফলাফল ... পরদিন ভোর থেকে সবাই পুকুরঘাটের সিমেন্টের বেন্চ আর সিড়িতে অপেক্ষা করতাম। প্রথমদিকে দিম্মা (শশিদার দেখাদেখি আমরাও পরে এই নামেই ডাকতাম) আমাদের খেলা ভাবলেও পরে বেশ আগ্রহের সাথেই ফুল নিত। আমাদের কখনো দেরি হলে উনি আমাদের জন্য ঘাটলায় অপেক্ষায় থাকতেন। আর লক্ষিপুজোয় নারকোল ও তিলের নাড়ু আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়ে গিয়েছিল।

এখর ভাবলেও অবাক লাগে... সময়গুলো কেমন সুন্দর ছিল। রুপকথার রাজ্য কি এর থেকেও সুন্দর?

হাই স্কুলের শেষের দিকে দিম্মা তার গ্রামের বাড়ীতে দেহ রাখেন। ক্লাস সেভেন থেকে ভোর বেলায় ব্যাচে অংক করা আরম্ভ হওয়ায় উনার সাথে আর ভোরে দেখা হত না। রেল হুজুরও আমাদের ইন্টার পরীক্ষার সময় ইন্তেকাল করেন। মনে আছে প্রথম পরীক্ষার আগের দিন আমাদের সবার জন্য মসজিদে মিলাদ দিয়েছিলেন।

...
অনেক পেচিয়ে ফেললাম। অনেকদিন রাজবাড়ী যাওয়া হয়নি ... ছোটবেলার অনেক.. অনেক কথা মাথায় খোচা খুচি করছে। তার ফলাফল এই নিম্ন মানের সাহিত্য।
আর দুপুর এখন প্রায় সন্ধা... :) ... বাইরে চমৎকার কন্যা সুন্দর আলো... আপচুচ... পোলা সুন্দর কোনো আলো নাই ... আলোরে ..মাইনাচ... (চিকন মিয়া, বিবেচনায় রাইখো)।
...আহারে ...ক্যান যে বড় হইলাম।

___
ছবি কৃতগ্গতা (যুক্তাক্ষর) : তপু কিবরিয়া (ফ্লিকার), আর কিছু শৈশব নামটা হুমায়ুন আহমেদ থেকে ধার করা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৩:০৬
১১টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×