কোন এক অজানা কারণে মাঝে মাঝে দিনগুলো কেমন যেন কোন নোটিশ ছাড়াই অন্যরকম হয়ে যায়। ভাল লাগার দিন, খারাপ লাগার দিন, হেরে যাবার দিন, জয়ের আনন্দের দিন, হারিয়ে যাবার দিন... আরো কত নাম যে দেওয়া যায়। আমার দিনগুলো অবশ্য খুব সাধারণ দিন হয়েই আসে আবার চলে যায়।
বিভিন্ন কারণে কেন যেন কয়েকদিন খুব খারাপ যাচ্ছিল। যা করছিলাম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সব থেকে ভালটা কেমন করে যেন সম্ভাব্য চুড়ান্ত খারাপে রূপ নিচ্ছিল। চেষ্টা করছিলাম বের করতে ...কোথায় সুর কেটে যাচ্ছে। পারিনি। "...ঠিকাছে তবে এভাবেই চলুক দিনগুলো" এই মন্ত্রে গা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
আজকের সকালটাই কেমন যেন ছিল। এলার্ম টা ইচ্ছে করেই বন্ধ করে ঘুমিয়েছিলাম গত রাতে। আজকে ঘুম ভেঙ্গেছে মুখে সূর্য্যের আলো পড়ে। রোদের স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গাটা আম্মুর হাতের ছোয়ার মত লাগল। রাতে জানালার পর্দা কিছুটা খোলা ছিল। সেই ফাক দিয়ে এই দলছুট সূর্য্যকিরণগুলো ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। ঘুম থেকে ভোরে ওঠার পরেই প্রতিদিনের মত ঘুমের ক্লান্তি মাখা চোখে সকালটা না দেখে আজকে পুরো অন্যরকম লাগল। মনটাও দেখি বেশ হালকা হালকা লাগছে। ... বুঝলাম আজকের সূর্য্য মামা আমার মন খারাপের বরফে আঁচ লাগাতে আরম্ভ করেছেন।
গত রাতে করা কাজগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে জানা দোয়া গুলো আওরাতে আরম্ভ করেছিলাম। আজকে এক কোর্সের প্রজেক্ট পেপার জমা দেব। টেনশন একটু হচ্ছিল ঠিকই ...কিন্তু দিনের শুরুটাই এমন যে যখন তৈরি হয়ে বাইরে বেরুবো তখন টেনশন ভুলে গুন-গুন করা আরম্ভ করেছি। আমি আর এক কাজিন আপাতত এক সাথে থাকি। আমার সব গুন-গুনই ওনার কাছে হরিসংকীর্তন মনে হয়।
সাড়ে এগারোটার টার দিকে বোচকা-বুচকি নিয়ে বের হয়েই ...মনে মনে বল্লাম ...ইয়াল্লা ...What a DAY !! ...আজকের আকাশটা দেখেছিলেন। ...সেই রকম একটা রং নিয়েছিল। আর মেঘের আব্রু ছাড়া আকাশটার দিকে নিল্লর্জভাবে তাকিয়ে বুঝলাম, আজকের দিনটা আর যাই হোক ...খারাপ হতে পারে না। আর যাই হোক ..কোন কিছুই আজকে আমার মন খারাপ করাতে পারবে না।
মুখে নিশ্চই একটা কার্টুন হাসি এসেছিল ...কারণ এক প্রতিবেশীর মন্তব্যে লজ্জা পেলাম, " কি মিয়া লেডিস হোস্টেলের দিকে তাকায় থাকার অবস্থায় চলে গেছ
যাই হোক ...বিব্রত হই নি।
তারপর বাসে ইউনিভার্সিটি যাবার পথে অনেক দিন পর আজকে এই সময়ে ফাকা সিট পেলাম। ...এইটা দেখি ঈদের দিন -টাইপের ভাব নিয়ে দুই সিট দখল করে ব্যাক-প্যাক রেখে আরাম করে বসলাম। ...আহ.. আজকে দেখি সহযাত্রি গুলোও হাস্যমুখী। তার উপর সুন্দর সুন্দর সব বান্দরে ভরা। মানে স্কুল ছুটি হওয়া বাচ্চারা সাথে তাদের অভিভাবক ...বাসে হাসি-হাসি মুখ ওয়ালা মানুষ কমই দেখি। আমি সিটে বসে সশব্দে আটকে রাখা বাতাস ছাড়তেই শুনি পিচ্চি কন্ঠের খিল খিল হাসি। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার অপর পাশে এক সুন্দরী তার বাবার কোলে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই বেমক্কা প্রশ্ন ..."তুমি কোন স্কুলে পড়?" পিচ্চির বাবা বিব্রত হাসি দিয়ে থামাতেই তার ২য় প্রশ্ন.. "স্কুলের ব্যাগ না এইটা?" বুঝলাম ...আমার ব্যাক-প্যাক আর তার ছোট্র গোলাপি বারবি ব্যাক-প্যাক এ সে ধরে নিয়েছে আমি স্কুলে পড়া বুড়ো।
...মহাখালি পার হয়ে সেই পিচ্চি হাই তুলতে তুলতে বাবার কোলে ঘুমিয়ে গেল। আহা... সেই দৃশ্য যদি দেখতেন...। বুঝলাম ...এত যন্ত্রনার পরও কেন মানুষ এই বাচ্চা ভয়ংকর-কাচ্চা ভয়ংকরগুলোকে সেধে আনে।
আজকে রাস্তার মানুষগুলোও কেমন যেন সুখী মানুষ টাইপ হাটা হাটছে। কাকলী মোড়ের রিকশাওয়ালাগুলো পর্যন্ত আজকে দেখি আদর করে ডাক দিচ্ছে লোকজনকে।
বড় ধরাটা খেলাম পেপার সাবমিট এর সময়।
....টোকা দিয়ে ভাবছিলাম ঝাড়ি খাব "কোর্সের নিদ্র্দিষ্ট অফিস আওয়ার এর বাইরে কেন এসেছি" টাইপ। যদিও ওই স্যার আমার খুব প্রিয় মানুষগুলোর মধ্যে একজন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উনি আর আমি কাটা-কাটি খেলা খেলছি। আমি যাই করি উনি তাই কাটেন। আমি যাই করি উনি তাতেই বিরক্ত হন ....
আজকে দেখি স্যার আমাকে দেখে "কি খবর টাইপ" একটা বিরাট হাসি দিয়ে ফেললেন। আমিতো পুরা নার্ভাস... কারন হাসিটা আমার কাছে প্রথমে ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন বাছুর দেখলে হাসি দেয় (আমি অবশ্য দেখি নাই, পই-পত্রে পড়েছি আর কি) ...সেই রকম লেগেছিল। কোন মতে ফোল্ডার আর সিডিগুলো এগিয়ে দিয়ে মিনমিন করে বললাম "স্যার তাহলে লান্চের পর আসি?" ...স্যার আবার সেই কলিজা ঠান্ডা করা হাসি দিয়ে বললেন আড়াইটার পর গ্রুপের আরেকজনকে সাথে নিয়ে আসতে।
আড়াইটার পর যখন গেলাম তখন দেখি বাঘমামা গোফে তা দেওয়ার মত করে দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে স্যার পাতা উল্টোচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে অবশেষে একটা গুয়ামুরি হাসি দিয়ে "কি অনেক খাটিয়ে ফেললাম নাকি? আরে এই বয়সে এতটুকুতেই ক্লান্ত হয়ে যাও সামনে তো আরো কাজ পড়েই আছে।" ... মনে মনে বলি ...স্যার খাটাননি.. যা করেছেন তার ফল অন্য সাবজেক্টেগুলোর গ্রেডশিটে শক দিয়ে দেবে আর কি। বুঝলাম ...অবশেষে বাঘমামার মনমত আবর্জনা নামাতে পেরেছি।
বাইরে বের হয়ে ...আন্দালিব এর দিকে তাকাতেই দেখি ..মরা মানুষের মত করে তাকিয়ে আছে। ..."কিরে ব্যাটা বউ মরছে নাকি?" ফাজলামি করতেই আন্দালিব গরম চোখ করে তাকিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
বিকালে এই সেমিস্টারের শেষ ল্যাব ক্লাসে দেখি আমাদের ওভার স্মার্ট ইন্সট্রাক্টর পর্যন্ত রসিকতা করার চেষ্টা করছে। ...
সান ল্যাবে এক মজার ঘটনা শুনলাম। গান গায়... আনিলা চৌধুরি বা এই নামের একজন সিএসই এর ফ্যাকাল্টি হয়ে জয়েন করেছে এই সেমিস্টারে। তো তিনি একটা কোর্স করান সফটওয়ার মিস্তিরিগিরির উপর। আমাদের সিএসই এর এক কঠিন হুজুর টাইপ সিনিয়র বড় ভাই আছেন। যার কাছে আমরা সবাই নসিহত প্রাপ্ত হই, প্রেয়ার ফ্লোরে নামাযের পর জ্বালাময়ি ভাষন শুনি।
আমরা এই রকম "ঈমান হালকা করে" টাইপের গ্যাটিস ফ্যাকাল্টি নিয়োগের জন্য বিওজির কঠোর নিন্দা জানাই।
আহ... আজকে অনেকদিন পর ...বেশ একটা ফুরফুরে দিন গেল।
বিকালে যখন সূর্য্যটা ডুবছিল ... তখন ল্যাবের পেছনের উইন্ডো ব্লাইন্ডগুলো সরিয়ে দিতই শেষ বিকেলের হালকা রঙিন আলোর আভায় আরেকবার আম্মুর স্পর্শ পেলাম। মন খারাপ হয়নি। বরং ডুবতে থাকা সূর্যটাকে দেখে রাখছিলাম। কারন আবার যখন মন খারাপ করা দিনগুলো আসবে ...তখন চেষ্টা করব প্রতিদিনের সূর্য্যটাকে মেলাতে। মন খারাপ করা দিনের সূর্য্যটা নিশ্চই আজকের মত হবে না?
এই বয়েসে এসেও আমার ভাবতে ইচ্ছে করছে... গত রাতে ঘুমের সময় আমার জানালায় নিশ্চই কোন পরী এসেছিল। যে পরী আমার ঘরে ছড়িয়ে থাকা দুঃখ্যের ধুলোগুলো তার জাদুর সোনালী কাঠিটা দিয়ে বদলে ছোট ছোট আনন্দের কণা করে দিয়েছিল। আর সূর্য্যটাকে বলে গিয়েছিল আমার মায়ের আদরের উষ্নতার সমান উষ্নতায় যেন সারাদিন আমাকে ঘিরে রাখে।
এমন চমৎকার দিনেও ...মাকে খুব মিস করছি।
অনেকদিন পরে একটা গান শুনছি। শেয়ার করলাম।
Click This Link
আবর্জনাটা পুরোপুরি আমার খোলা-ডায়েরির একটি পাতা। এর মাঝে কোন সাহিত্য খোজার চেষ্টা ব্যানিয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
পোস্টে ব্যবহার করা ছবিটি ফ্লিকার এর sytoha's এর পাতা থেকে নেওয়া।
যার লিংক ... http://www.flickr.com/photos/sytoha/2949538051/
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



