somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন নম্রতার গল্প

২৫ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম যেদিন দেখেছিলাম মেয়েটাকে,ওর চেহারার টান টান সৌন্দর্য্য চোখে পড়েছিলো।
ওর নাম নম্রতা।
সুন্দর চেহারার আড়ালে কতটা দুঃখ লুকানো থাকতে পারে ওর কথা শুনবার আগে বুঝিনি।ওর স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে।ও ওর পাঁচ বছরের মেয়েটাকে নিয়ে একা থাকে।ভুল ভালবাসার মাশুল দিতে হয়েছে ওকে।স্বামীর অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করছিলো ও।কেমন অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল।ভালোবাসার মত এই অত্যাচারিত হবার ই একটা নেশা হয়ে গিয়েছিলো।ও শুধু দেখতে চাইতো একটা মানুষ কি করে এমন নির্মম হতে পারে।তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারনে গায়ে হাত তোলা।
ও ভাবতো হয়তো সবার জীবনটাই এমন।
কি্ন্তু আর পারেনি।
যেদিন ওর মার খাওয়া দেখে ফেলে ওর মেয়েটা আর একটা ব্যাট এনে হাতে দিয়ে বলে মা তুমি ও মারো।বাবাকে মারো।মারতে মারতে মেরে ফেলো।
সেইদিন ও চোখ মেললো।
ওর মেয়ে এ কোন জীবনের মধ্যে দিয়ে বড় হতে যাচ্ছে!
মেয়ের হাত ধরে বেড়িয়ে পড়ে ও।

পুলিশ কে জানিয়ে রাখাতে ওর স্বামী আর কোন অসুবিধা করতে পারেনি।ও মেয়েকে নিয়ে ভালোই ছিলো।
কিন্তু ইমিগ্রেশন থেকে গত সপ্তাহে চিঠি এসেছে।ওদেরকে দেশে চলে যেতে হবে।ওদের রাজনৈতিক আশ্রয় এর আবেদনটা পারিবারিক জটিলতার কারনে গ্রহন করা হয়নি।আমার কাছে এসেছে একটা পরামর্শের জন্য।ওকে পরের দিন আসতে বললাম।
সারাটা বিকাল ওর কথা মনে হচ্ছিল।
কি সুন্দর একটা মেয়ে।ভালবেসে যার হাত ধরে ঘর বেঁধেছিলো কে জানতো সে এমন নিষ্ঠুর একটা মানুষ।অনেকভাবে চেষ্টা করেছে।বাইরে চলে এসেছে একবার বেড়াতে আসবার ভিসা নিয়ে।এবং এখানেই থেকে গেছে।ভেবেছিলো দুরে চলে আসলে ওর স্বামীর হিনমন্যতা দুর হবে।
কিন্তু কিছুই হলোনা।মেয়েটা জন্মালো যখন ভেবেছিলো ঠিক হয়ে যাবে।ঠিকহলোনা।দেশে ফিরে থাকবার মত কেউ নেই।
অনেক ভাবলাম ।কি সমাধান দেবো।
কি করে মেয়েটাকে নিয়ে ওকে এখানে থাকতে বলা যায়।
যদি বিয়ে করতে পারে পেপার থাকা কাউকে।
এটাই বলতে হবে।পরের দিন সকালেই এসে পড়লো ও।ঘুমহীন চোখ।একটু আশার কথা শুনতে চায়।
বললাম,"বিয়ে "।
বিয়ে করলে থাকা সম্ভব।ওর মুখটা আরো মলিন হয়ে গেলো।বললাম কাগজের বিয়েও হতে পারে।কেউ যদি সাহায্য করে।ওর মুখে একটু স্বস্তি জেনো।সংসার করবার জন্য বিয়ে করবার কত মানসিক অবস্হা ওর নেই বোঝা গেলো।কিন্তু কাগজের বিয়ে কি করে সম্ভব?বললাম পরিচিত কেউ যদি বিয়ে করে।পেপারটা হয়ে গেলে আলাদা হয়ে যেয়ো।
ও বিস্মিত হয়ে তাকালো।
বললাম একটাই উপায়।
ও জানালো ওর ছেলেবেলার একটা বন্ধু আছে।অন্য শহরে থাকে।অনেক বছর ওদের দেখা নাই।ও পড়তে এসে থেকে গেছে।ওর জীবনের সব কথা জানে।বলেছে যে কোন প্রয়োজনে জানাতে।তবে সে কখনো বিয়ে করবেনা।আমি বললাম বলে দেখো।ও মাথা নেড়ে চলে গেলো।জানি বলতে পারবেনা।এতকালের এক বন্ধুকে কি করে বলবে আমাকে বাঁচাও। আমাকে উদ্ধার করো।
পরেরদিন ই ফোন এলো।
মানস ফোন করেছে।নম্রতার সেই বন্ধু।আমার কাছে নম্রতার সব ব্যপার জানতে চাইলো।সব খুলে বললাম।কি করে থাকা সম্ভব তাও বললাম।
মানস আমাকে বললো ও আসছে সাত দিনের মাথায়।ওদের বিয়ে হলো।
কাগজের বিয়েতে আমি ও থাকলাম।
মনে ভাবলাম এই কাগজের বিয়েটা না হয় সত্য হোক।কত সত্যি ভালোবাসার বিয়ে তো মিথ্যা হয়ে যায়।আসবার আগে মানসকে শুধু বলেছিলাম বন্ধুত্বকে সন্মান করতে শিখলাম নতুন করে।
প্রয়োজনে এভাবে যে কাছে আসে সেই তো বন্ধু।

অনেকদিন ওদের সাথে আর দেখা হয়নি।
কাল বিকালে মন্ট্রিয়েলের পার্ক মেট্রোতে ওর সাথে আবার দেখা।মেয়েটা বেশ বড় হয়েছে।নম্রতা আগের মতই।আর একটু রোগা হ্ওয়াতে বয়স আরো কম ই লাগছে।
দাঁড়িয়ে অনেক কথা বললো।
নম্রতাকে দেশে যেতে হয়েছিলো।কাগজ পত্র জনিত ঝামেলার কারনে।
তিনটা বছর ওখানে থাকতে হয় মেয়েকে নিয়ে।মানস সব রকম সাহায্য করেছে।
আমি এত কিছু জানতাম না।অবাক হয়ে শুনলাম।
কাগজ টা ওর হাতে এসেছে।অনেক কষ্ট করে।
তিনটা বছর মেয়েটাকে নিয়ে যশোরে থাকতে হয়েছিলো।
একটা স্কুলে পড়াতো। ইমিগ্রেশন ওর প্রথম আবেদন নাকচ করে।
আপিল এ আবেদন গ্রহন করে ।অনেকগুলো সময় জীবন থেকে চলে যায়।মেয়েটাকে নিয়ে কত প্রতিকূল অবস্হা।এইজন্য ঢাকায় থাকেনি।মামার বাড়ীতে থাকলো।
কাগজ পাবার সাতদিনের মধ্যে চলে এসেছে।
মানসের সাথে বরাবর যোগাযোগ ছিলো ফোনে।
বললাম তোমরা কি থাকছো?সংসার করবে ভাবছো?কিছুক্ষন তাকিয়ে কেঁদে দিলো ও।থামছেই না।এক পাশে সরে আসলাম ওকে নিয়ে।একটা বেন্চে বসলাম ।কান্না থামিয়ে ও বললো মানস ওর জন্য যা করেছে তার ঋণ শোধরাবার মত কিছু নেই ওর।তবে ও এসে দেখে মানসের এক বান্ধবী হয়েছে।ওরা একসাথে থাকছে।নম্রতার সাথে ঝামেলা মিটে গেলে ওরা বিয়ে করবে।নম্রতা এই সবের কিছু জানতোনা।ও সব সময়ই চেয়েছে মানস বিয়ে করুক।কিন্তু আজ যখন ও এসে দেখে মানস একজনের সাথে থাকছে।ওর মন কেনো যে খারাপ লাগছে।মিথ্যা সংসারটার জন্য নম্রতার কান্না পাচ্ছে।তার মানে কি সেই কথাটাই সত্যি ?
"বলতে বলতে অনেক মিথ্যে সত্যি হয়ে যায়।"

নম্রতা আবার ও একটা ভুল ভালোবাসায় কাটিয়ে দিলো এতগুলো সময়?
মানস যাকে বিয়ে করবে তার ও তিনটা ছেলেমেয়ে।ওরা বেশ বড় হয়ে গেছে।নম্রতারজন্য বাসা নেয়া হয়েছে।পরশু থেকে ওখানে উঠবে।

নম্রতাকে কি বলবো?
ফোন নম্বর দিয়ে চলে আসলাম।যে কোন প্রয়োজনে ওকে জানাতে বললাম।
কি আশ্চর্য্য যে লাগছিলো।
কি দারুন সুখী হতে পারতো মেয়েটা।
ভুল ভালোবাসায় ওর জীবনটা শুরু হয়েছিলো।
ভুল ই বা কেনো বলবে।কি ভালোবাসার ছিলো সময়গুলো।যখন ওরা ভালবেসেছিল।
আসলে মানুষের জীবনটা ঋতু চক্রের বৈচিত্র বই কিছু নয়।ঝড় ,বৃষ্টি,খরা যেমন করে জীবনকে প্রভাবিতে করে।
সংসার জীবনটাও তাই।কার জীবনে যে কখন সুর থেমে যাবে,কে জানে।
রাতে বেলকনিতে বসে নম্রতার কথা ভাবছিলাম।
কত তারা আকাশে জ্বলছে।কত ব্যথা বুকে নিয়ে কে জানে।
নম্রতাও বাঁচুক যুদ্ধ করে।
একা একা পথ হাঁটতে গিয়ে আবার ও হয়তো কোন ভুল ভালোবাসা এসে সামনে দাঁড়াবে।হয়তোবা একটা তারা এসে ওর সামনে দাঁড়াবে।
বোকা মেয়েটা ভাববে এই সেই জন।
নম্রতাকে ছুঁতে পারে এমন কি কোন মানুষ আছে ?ওর ভালোবাসা ছুঁতে হলে একটা তারা দরকার।একদিন হঠাৎ ছিটকে পড়ে যে পৃথিবীতে এসেছিলো।

মানুষ তো শুধু দুঃখ দিলো ওকে।
এর পর ওর না হয় একটা তারার সাথে মিতালী হোক।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:৫৬
৩০টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×