somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপ্রকাশিত চিঠি ৫.........

২৯ শে জুলাই, ২০০৯ সকাল ১০:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অপ্রকাশিত চিঠি ১
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ২
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ৩
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ৪
Click This Link

তটিনী
এবার এর দেশে ফিরে যাওয়া সে এক অন্য অনুভব।
দেশ থেকে বের হয়েছিলাম একমাস আগে।
দুইটা দেশের বেশ ক'টি শহর।
সবশেষে তোমার শহরটায়।
পার্লামেন্টের সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তোমাকে এ কথাই বলছিলাম।
তুমি জানতে চাইছিলে একা একা ঘুরতে কেমন লাগে?
একা শব্দটাকে এমন করে ভাবিনি কখনো। বাবামার একমাত্র সন্তান হওয়াতে একা থাকার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো।
বাবা মা যখন ছিলেন,
একা মনে হতোনা নিজেকে।
কিন্তু উনারা চলে যাবার পর আজকাল খুব একা লাগে।
তোমাকেই তো বলেছিলাম মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে খুব প্রিয় একটা জায়গায় হাঁটবার সময় একটা প্রিয় অস্তিত্ব পাশে থাক।
হাতে হাত,
নিঃশ্বাসের খুব কাছে ঘুরে বেড়াক কেউ।

তুমি বললে চলো নদীর কাছে যাই।
পার্লামেন্টের পিছন দিক দিয়ে একটা কাঠের সিঁড়ি নেমে গেছে একদম নদীর কাছাকাছি।
আমরা মধ্যেখানে যেয়ে বসলাম,গাছের সবুজে মনে হচ্ছিল কোন গভীর বন।
আমরা সেই সবুজ বনের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছি।
আমি গাছ হয়ে গেছি।
আর তুমি পাতা।বাতাসে এলোমেলো দুলছো।
গাছ হলে বেশ হতো তাইনা? বললাম আমি।
তুমি বললে," বেশ হতো।
আমি পাতা হয়ে ঝিরঝির করে দুলতাম।"
আমি অবাক হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তুমি কি মন পড়তে জানো মেয়ে?

তুমি কাঠের সিঁড়িটায় হেলান দিয়ে বসলে । হঠাৎ নিজে থেকেই গাইলে,
"সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা
কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।"

এমন একটা দুপুর সার্থক হয়ে গেলো। আমাজনে যাইনি কখনো। মনে হচ্ছিল আমাজনে বসে আছি। মনে হচ্ছিল আমরা আমাজনে পথ হারিয়েছি আর
আর তুমি গানে গানে বন্দনা করছো বিশ্ব বিধাতার।
"কী হবে গতি, বিশ্বপতি, শান্তি কোথা আছে --
তোমারে দাও, আশা পূরাও, তুমি এসো কাছে।"
গানটা যখন শেষ হলো। তোমাকে খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিলো। ভেজা চোখ তোমার। মনে হচ্ছিল তোমাকে বুকের খুব কাছে নিই আর বলে দেই পৃথিবীর খুব পুরাতন একটা কথা।

তুমি বললে,'' জানো রবীন্দ্রনাথ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমার যখন মন খারাপ লাগে আমি গীতবিতান নিয়ে বসি।ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়।"
আমি বললাম রবীন্দ্রনাথ এর জন্য আমার বুকেও একটা আলাদা ঘর আছে। কত দিন গেছে ঘন্টারপর ঘন্টা শুধু উনার গান। উনার কবিতা।
উনার "শেষের কবিতা "আমার খুব প্রিয়।
আমি বললাম , আমি যখন ইউরোপে পড়তে গিয়েছিলাম বাবা আমাকে একটা গীতবিতান দিয়েছিলেন। কিছু গান আর শেষের কবিতার ক্যাসেট।
আমি এত অজস্রবার সেটা শুনেছি। মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
শেষের দিকে ক্যাসেটের ফিতা ছিড়তে শুরু করেছিলো।

অদ্ভুত এই দুপুরটায় রবীন্দ্রনাথ এসে কেমন অনায়াসে জায়গা করে নিলেন আমাদের মাঝে।
অদ্ভুত এই পরিবেশ।
আমাদের দুজনার নিঃশ্বাসের শব্দ।
আমি বললাম দেখেছো সবখানেই কেমন জীবন্ত হয়ে আছেন এই মানুষটা!
যেখানে জীবন আছে, মৃত্যু আছে।
যেখানে আনন্দ আছে, বেদনা আছে।
যেখানে কষ্ট আছে,মৌনতা আছে।
যেখানে প্রকৃতি আছে,প্রেম আছে, সবখানেই উনি আছেন।

তুমি চুপ করে বসে থাকলে।
আমি বললাম কথা বলো। তুমি বললে, এখন কথা বলার সময় না।
পাশাপাশি বসে থাকা দু'টো মানুষ ,হৃদয়ে ঝড় নিয়ে কেমন বসে থাকলাম চুপ করে।
মানুষ আমরা কত কি যে পারি আসলে!

আমার খুব ইচ্ছা করছিলো তোমার সামনে হাঁটুগেড়ে বসি।
প্রার্থনার মত হাত বাড়িয়ে বসে থাকি।
পারলাম না।
তোমার ব্যক্ত্বিত্বের কাছে নতজানু হলো আমার চাওয়া।
খুব বলতে ইচ্ছা করছিলো,
তুমি আমার অন্ধকারের আলো।
তুমি পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাধারা।
আরো কত কি!
অথচ তোমাকে বললাম আমার নানাবাড়ির গল্প।
রাশিয়ার পিটার্সবার্গ মায়ের বাড়ি ছিলো। মায়ের বাবার একটা বই এর দোকান ছিলো। নীচে দোকান আর উপরে আমার নানা নানী থাকতেন।
মায়ের দু'বোন ছিলো শুধু।
এক জন থাকতো ইটালীতে।
আমি ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার গেছি ওখানে। সারাদিন বই এর দোকানে বসে থাকতাম। কত রকম মানুষ আসতো। আমি বসে বসে নানান দেশের ম্যাপ দেখতাম আর স্বপ্ন দেখতাম বড় হলে সেই সব দেশ ঘুরবার। নানা খুব কম কথা বলতেন কিন্তু আমার সব প্রশ্নের জবাব দিতেন।
দোকান বন্ধ হলে আমাকে নিয়ে কত জায়গায় যেতেন।
উনার সাথে মিউজিয়াম এ ঘুরতাম।
তুমি তন্ময় হয়ে শুনছিলে।

বিকাল গড়িয়ে যাচ্ছিলো সেকথা কারো খেয়ালই ছিলোনা।
সূর্যাস্ত দেখতে রকলিফে যাবার কথা!
এমন সূর্যাস্ত দেখা অনেকদিন মনে থাকবে বলেছিলাম আমি। সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত দেখলে মনে হয় সূর্যটা সমুদ্রের নীচে হারিয়ে গেলো। নদীর ধারের অনুভবটা ভিন্ন। মনেহয় সূর্যটা পাহাড়ের পিছনে অন্য কোথায় লুকিয়ে গেলো।
আকাশটা এত লাল হয়েছিলো ,সেই লাল এর আভা তোমার মুখেও এসে পড়েছিলো।

দুপুর থেকে তোমার মুখটায় কেমন বিষণ্নতা খেলা করছে।
আমি বললাম আমি চলে যাবার পর খুব বাঁচা বাঁচবে। কটাদিন খুব জ্বালিয়ে গেলাম। উত্তরে কিছু বললেনা।
শুধু চোখ ভরা পানি দেখলাম।

সারাপথ আর কোন কথা হলোনা।
আমাকে আজ তাড়াআড়ি নামিয়ে দিয়ে চলে গেলে তুমি।
বলতে ইচ্ছা করছিলো থাকো। তোমার সাথে রাতের শহর দেখি।
রাত ঘুমানোর আগে ফোন এ কথা হলো। তোমার গলা শুনে বুঝলাম মনটা মেঘ হয়ে আছে।
চলে আসার আগের দিন বিকালে দেখা হলো।
সকালে তোমার কাজ ছিলো। তাই।
শহরের খুব কাছে একটা ফলস আছে। সেখানে গেলাম । ব্রীজটার নীচে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা।
তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা।
আকাশের সব কালো মেঘ মুখে নিয়ে আছো কেনো? বলতেই সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি নামলো। এত কান্না জমে ছিলো তোমার।
আমিও তোমার সাথে কাঁদতে থাকলাম।
আর কি আশ্চর্য্য আকাশ থেকেও বৃষ্টি নামলো অঝোরে।
এই কদিনে একবার ও বৃষ্টি পড়েনি এই শহরে।
আমাদের কান্নার সাথে বৃষ্টির এই যোগাযোগ কেমন যেনো লাগলো।
এই সেই ম্যাজিক।
আমি যার জন্য অপেক্ষা করে থাকি।

তুমি বললে," নিজেকে খুব একা লাগছে অনেকদিন পর।
তুমি হঠাৎ কোথা থেকে এসে কেমন পালটে দিলে সবকিছু। তুমি চলে যাবে।
ফিরে যাও তুমি।আমাদের কথা হবে।
আমার যদি কোন অসুখ হয়।
যে অসুখে সবকিছু শুন্য মনে হয়।
সেই অসুখ যদি তোমাকেও সংক্রমিত করে।
তাহলে না হয় আবার ও কোথাও দেখা হবে।
আবার!"

আমার খুব বলতে ইচ্ছা করছিলো ," দেখো আমাদের জীবনে সবগুলো দেখা না হওয়া দিন পুষিয়ে নেবো আমরা।
প্যারিসে যাবো।
অথবা আমাদের দেশের রাঙ্গামাটি।
পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবো আমরা।
নদীতে ।
আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে। রাতজেগে পাহাড়ীদের সাথে মিশে পূর্ণিমায় নাচবো আর মহুয়া খাবো।"

কত কিছু যে বলতে ইচ্ছা করছিলো তটিনী।
বলতে ইচ্ছা করছিলো কত কিছু যে সম্ভব হতে পারে আবার দেখা হলে।
চুপ হয়ে গেছিলাম।
ভালোলাগায় ডুবে যেতে যেতে এমন হচ্ছিল আমার।
শুধু মনে হচ্ছিল তোমার হাতদুটো ধরে বলি চলো তটিনী আমার সাথে।
ভয়ে বললাম না ।
যদি হারিয়ে ফেলি।
অপেক্ষাই করি।
যেই অসুখের কথা তুমি বলেছো। ।
তোমার সেই অসুখটা আমাকে সংক্রমিত করুক।
অথবা আমার যে অসুখটা হতে শুরু করেছে তা তোমাকে।
তাহলেই আবার দেখা হবে,
আবার!

রাজর্ষি

চলবে..
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ৮:৪৭
৫৯টি মন্তব্য ৫৩টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×