Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ২
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ৩
Click This Link
অপ্রকাশিত চিঠি ৪
Click This Link
তটিনী
এবার এর দেশে ফিরে যাওয়া সে এক অন্য অনুভব।
দেশ থেকে বের হয়েছিলাম একমাস আগে।
দুইটা দেশের বেশ ক'টি শহর।
সবশেষে তোমার শহরটায়।
পার্লামেন্টের সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তোমাকে এ কথাই বলছিলাম।
তুমি জানতে চাইছিলে একা একা ঘুরতে কেমন লাগে?
একা শব্দটাকে এমন করে ভাবিনি কখনো। বাবামার একমাত্র সন্তান হওয়াতে একা থাকার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো।
বাবা মা যখন ছিলেন,
একা মনে হতোনা নিজেকে।
কিন্তু উনারা চলে যাবার পর আজকাল খুব একা লাগে।
তোমাকেই তো বলেছিলাম মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে খুব প্রিয় একটা জায়গায় হাঁটবার সময় একটা প্রিয় অস্তিত্ব পাশে থাক।
হাতে হাত,
নিঃশ্বাসের খুব কাছে ঘুরে বেড়াক কেউ।
তুমি বললে চলো নদীর কাছে যাই।
পার্লামেন্টের পিছন দিক দিয়ে একটা কাঠের সিঁড়ি নেমে গেছে একদম নদীর কাছাকাছি।
আমরা মধ্যেখানে যেয়ে বসলাম,গাছের সবুজে মনে হচ্ছিল কোন গভীর বন।
আমরা সেই সবুজ বনের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছি।
আমি গাছ হয়ে গেছি।
আর তুমি পাতা।বাতাসে এলোমেলো দুলছো।
গাছ হলে বেশ হতো তাইনা? বললাম আমি।
তুমি বললে," বেশ হতো।
আমি পাতা হয়ে ঝিরঝির করে দুলতাম।"
আমি অবাক হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তুমি কি মন পড়তে জানো মেয়ে?
তুমি কাঠের সিঁড়িটায় হেলান দিয়ে বসলে । হঠাৎ নিজে থেকেই গাইলে,
"সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা
কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।"
এমন একটা দুপুর সার্থক হয়ে গেলো। আমাজনে যাইনি কখনো। মনে হচ্ছিল আমাজনে বসে আছি। মনে হচ্ছিল আমরা আমাজনে পথ হারিয়েছি আর
আর তুমি গানে গানে বন্দনা করছো বিশ্ব বিধাতার।
"কী হবে গতি, বিশ্বপতি, শান্তি কোথা আছে --
তোমারে দাও, আশা পূরাও, তুমি এসো কাছে।"
গানটা যখন শেষ হলো। তোমাকে খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিলো। ভেজা চোখ তোমার। মনে হচ্ছিল তোমাকে বুকের খুব কাছে নিই আর বলে দেই পৃথিবীর খুব পুরাতন একটা কথা।
তুমি বললে,'' জানো রবীন্দ্রনাথ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমার যখন মন খারাপ লাগে আমি গীতবিতান নিয়ে বসি।ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়।"
আমি বললাম রবীন্দ্রনাথ এর জন্য আমার বুকেও একটা আলাদা ঘর আছে। কত দিন গেছে ঘন্টারপর ঘন্টা শুধু উনার গান। উনার কবিতা।
উনার "শেষের কবিতা "আমার খুব প্রিয়।
আমি বললাম , আমি যখন ইউরোপে পড়তে গিয়েছিলাম বাবা আমাকে একটা গীতবিতান দিয়েছিলেন। কিছু গান আর শেষের কবিতার ক্যাসেট।
আমি এত অজস্রবার সেটা শুনেছি। মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো।
শেষের দিকে ক্যাসেটের ফিতা ছিড়তে শুরু করেছিলো।
অদ্ভুত এই দুপুরটায় রবীন্দ্রনাথ এসে কেমন অনায়াসে জায়গা করে নিলেন আমাদের মাঝে।
অদ্ভুত এই পরিবেশ।
আমাদের দুজনার নিঃশ্বাসের শব্দ।
আমি বললাম দেখেছো সবখানেই কেমন জীবন্ত হয়ে আছেন এই মানুষটা!
যেখানে জীবন আছে, মৃত্যু আছে।
যেখানে আনন্দ আছে, বেদনা আছে।
যেখানে কষ্ট আছে,মৌনতা আছে।
যেখানে প্রকৃতি আছে,প্রেম আছে, সবখানেই উনি আছেন।
তুমি চুপ করে বসে থাকলে।
আমি বললাম কথা বলো। তুমি বললে, এখন কথা বলার সময় না।
পাশাপাশি বসে থাকা দু'টো মানুষ ,হৃদয়ে ঝড় নিয়ে কেমন বসে থাকলাম চুপ করে।
মানুষ আমরা কত কি যে পারি আসলে!
আমার খুব ইচ্ছা করছিলো তোমার সামনে হাঁটুগেড়ে বসি।
প্রার্থনার মত হাত বাড়িয়ে বসে থাকি।
পারলাম না।
তোমার ব্যক্ত্বিত্বের কাছে নতজানু হলো আমার চাওয়া।
খুব বলতে ইচ্ছা করছিলো,
তুমি আমার অন্ধকারের আলো।
তুমি পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাধারা।
আরো কত কি!
অথচ তোমাকে বললাম আমার নানাবাড়ির গল্প।
রাশিয়ার পিটার্সবার্গ মায়ের বাড়ি ছিলো। মায়ের বাবার একটা বই এর দোকান ছিলো। নীচে দোকান আর উপরে আমার নানা নানী থাকতেন।
মায়ের দু'বোন ছিলো শুধু।
এক জন থাকতো ইটালীতে।
আমি ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার গেছি ওখানে। সারাদিন বই এর দোকানে বসে থাকতাম। কত রকম মানুষ আসতো। আমি বসে বসে নানান দেশের ম্যাপ দেখতাম আর স্বপ্ন দেখতাম বড় হলে সেই সব দেশ ঘুরবার। নানা খুব কম কথা বলতেন কিন্তু আমার সব প্রশ্নের জবাব দিতেন।
দোকান বন্ধ হলে আমাকে নিয়ে কত জায়গায় যেতেন।
উনার সাথে মিউজিয়াম এ ঘুরতাম।
তুমি তন্ময় হয়ে শুনছিলে।
বিকাল গড়িয়ে যাচ্ছিলো সেকথা কারো খেয়ালই ছিলোনা।
সূর্যাস্ত দেখতে রকলিফে যাবার কথা!
এমন সূর্যাস্ত দেখা অনেকদিন মনে থাকবে বলেছিলাম আমি। সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত দেখলে মনে হয় সূর্যটা সমুদ্রের নীচে হারিয়ে গেলো। নদীর ধারের অনুভবটা ভিন্ন। মনেহয় সূর্যটা পাহাড়ের পিছনে অন্য কোথায় লুকিয়ে গেলো।
আকাশটা এত লাল হয়েছিলো ,সেই লাল এর আভা তোমার মুখেও এসে পড়েছিলো।
দুপুর থেকে তোমার মুখটায় কেমন বিষণ্নতা খেলা করছে।
আমি বললাম আমি চলে যাবার পর খুব বাঁচা বাঁচবে। কটাদিন খুব জ্বালিয়ে গেলাম। উত্তরে কিছু বললেনা।
শুধু চোখ ভরা পানি দেখলাম।
সারাপথ আর কোন কথা হলোনা।
আমাকে আজ তাড়াআড়ি নামিয়ে দিয়ে চলে গেলে তুমি।
বলতে ইচ্ছা করছিলো থাকো। তোমার সাথে রাতের শহর দেখি।
রাত ঘুমানোর আগে ফোন এ কথা হলো। তোমার গলা শুনে বুঝলাম মনটা মেঘ হয়ে আছে।
চলে আসার আগের দিন বিকালে দেখা হলো।
সকালে তোমার কাজ ছিলো। তাই।
শহরের খুব কাছে একটা ফলস আছে। সেখানে গেলাম । ব্রীজটার নীচে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা।
তোমার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা।
আকাশের সব কালো মেঘ মুখে নিয়ে আছো কেনো? বলতেই সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি নামলো। এত কান্না জমে ছিলো তোমার।
আমিও তোমার সাথে কাঁদতে থাকলাম।
আর কি আশ্চর্য্য আকাশ থেকেও বৃষ্টি নামলো অঝোরে।
এই কদিনে একবার ও বৃষ্টি পড়েনি এই শহরে।
আমাদের কান্নার সাথে বৃষ্টির এই যোগাযোগ কেমন যেনো লাগলো।
এই সেই ম্যাজিক।
আমি যার জন্য অপেক্ষা করে থাকি।
তুমি বললে," নিজেকে খুব একা লাগছে অনেকদিন পর।
তুমি হঠাৎ কোথা থেকে এসে কেমন পালটে দিলে সবকিছু। তুমি চলে যাবে।
ফিরে যাও তুমি।আমাদের কথা হবে।
আমার যদি কোন অসুখ হয়।
যে অসুখে সবকিছু শুন্য মনে হয়।
সেই অসুখ যদি তোমাকেও সংক্রমিত করে।
তাহলে না হয় আবার ও কোথাও দেখা হবে।
আবার!"
আমার খুব বলতে ইচ্ছা করছিলো ," দেখো আমাদের জীবনে সবগুলো দেখা না হওয়া দিন পুষিয়ে নেবো আমরা।
প্যারিসে যাবো।
অথবা আমাদের দেশের রাঙ্গামাটি।
পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবো আমরা।
নদীতে ।
আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে। রাতজেগে পাহাড়ীদের সাথে মিশে পূর্ণিমায় নাচবো আর মহুয়া খাবো।"
কত কিছু যে বলতে ইচ্ছা করছিলো তটিনী।
বলতে ইচ্ছা করছিলো কত কিছু যে সম্ভব হতে পারে আবার দেখা হলে।
চুপ হয়ে গেছিলাম।
ভালোলাগায় ডুবে যেতে যেতে এমন হচ্ছিল আমার।
শুধু মনে হচ্ছিল তোমার হাতদুটো ধরে বলি চলো তটিনী আমার সাথে।
ভয়ে বললাম না ।
যদি হারিয়ে ফেলি।
অপেক্ষাই করি।
যেই অসুখের কথা তুমি বলেছো। ।
তোমার সেই অসুখটা আমাকে সংক্রমিত করুক।
অথবা আমার যে অসুখটা হতে শুরু করেছে তা তোমাকে।
তাহলেই আবার দেখা হবে,
আবার!
রাজর্ষি
চলবে..

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

