এবার নায়াগ্রা যাবার আগ্রহটা রাইয়ানের সবচেয়ে বেশী। গতবছর পর্যন্ত্ ও মেরীনল্যান্ডে যেতে চায়নি । এবার সামারের শুরু থেকে টিভিতে ম্যারিনল্যান্ডের আ্যাড দেখলেই সাথে গাইতে শুরু করে
Everyone loves Marine Land .....
রবিবার রাতে নায়াগ্রা ঘুরে আসবার পর সোমবার সারাদিন বৃষ্টি। আবহাওয়া রিপোর্টে বলছিলো মঙ্গলবারেও বৃষ্টি হবে। রাইয়ানের তো আর সময় কাটে না। মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি কোথায় বৃষ্টি! ঝকঝকে রোদেলা দিন। ঝটপট রেডী হয়ে নিলাম সবাই। মেরীন ল্যান্ডে যত তাড়াতাড়ি পৌছানো যায়। পথটা কেমন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো। দুর থেকে মেরীনল্যান্ডের সেই বিশাল টাওয়ারটা দেখে রাইয়ানের কি যে খুশী।
রাশীক ও প্রথমবার এসে এমন খুশী হয়েছিলো। যে কোন কিছুতে নিজ থেকে আগ্রহ জন্মালে সেটাতে আনন্দটা বেশী হয়। এ কারনে গত বছরগুলোতে ওকে আনিনি।
টিকিটের দাম একবার কিনলে যা ,পুরা সিজনের কিনলে খুব একটা বেশী না। এখানে যারা কয়েকদিনের জন্য এসে থাকে ,অথবা কাছাকাছি থাকে তারা সীজন পাস ই কিনে। কারন মেরীন ল্যান্ডের সব রাইডে চড়া একদিনে সম্ভব না বলে আমার মনে হয়।
গেট দিয়ে ঢুকেই বায়ে ডলফিন শো এর জায়গা।
আমার ওখানে যেতেই বুঝলাম পরের শো একটু পরই শুরু হবে।মানুষ ভর্তি হয়ে আছে গ্যালারী। সামনে জায়গা পেলাম না। মাঝামাঝির দিকে জায়গা নিয়ে বসলাম।
রাইয়ানের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ঘোরে আছে।স্বপ্নের মত লাগছে সব। ঢোকার মুখে ওর ছবি নিলাম।
একটু পরই তিনটা মেয়ে বালতিতে মাছ নিয়ে এলো।প্রথমে শুরু হলো সীল এর নাচ।
হেলেদুলে নানান ভাবে।
এরপর এলো walrus ।আসার পর থেকে রাগ করে থাকলো।
একটা মেয়ে অনেক আদর করে রাগ ভাঙালো।একটু পর হাত নাড়লো।
রাইয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখি স্বপ্ন পূরণএর আনন্দে বিভোর।
এরপর এলো ডলফিন।
কত ভাবে যে নাচতে থাকলো।বাতাসে ভেসে ভেসে পানিতে লাফ দিলো।
একদম সামনে যেয়ে দলবেঁধে সবাইকে হ্যালো বললো ।
শো শেষ হতেই আমরা বের হয়ে পড়লাম।ডানপাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল এক পিকনিক স্পটে পৌছুলাম।কিছু ছবি তুলে আবার হাঁটা শুরু। এবার পৌছুলাম সেই জায়গায় যেখানে কিলার হোয়েল শো হবে।
এত মানুষ ঠিকমত দাঁড়াবার জায়গাপেলাম না।আবার খুব সামনে দাঁড়ালে ঝামেলাও আছে।এমন জোরে জোরে লাফ দেয় ।ভিজে যাবার আশংকা থাকে।রাইয়ান একদম সামনে যেয়ে দাঁড়ালো।
ভাবুক রাইয়ান ভাবছিলো কতকিছু ।
একটা killer whale এত কাছে আসলো।
ওখান থেকে প্রথম গেলাম ফ্লাইং ড্রাগন রাইডে।
আমি আর রাইয়ান উঠলাম।রাশীক আর উর্মি বললো চড়বে না।পাশাপাশি অনেক গুলো রাইড...বাম্বল বী বেশ মজার। এছাড়া লেডী বাগ কোস্টার, হারিকেইন কোভ,স্কাই হ্যক রাইডগুলো ভালো।রাইয়ান যেটা যেটা পছন্দ করলো সেগুলোয় চড়া হলো।
পথে আবার আইসক্রিম আর কোক খাওয়া।
ভিতরে দোকান গুলোতে সব কিছুই অনেক দাম।
রাইয়ানের সবচেয়ে প্রত্যাশিতে রাইড এর দিকে যেতেই মাথা খারাপ।এত উচুঁতে উঠতে sky screamer(পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু triple tower ride, 137.2 metres বা 450 feet ) ।
পাহাড়ের পথে উঠতে থাকলাম।
রাইয়ান কিছুদুর দৌড়ে উঠলো। রাশীক কে বললাম আজকে জীবন শেষ। আমরা ধীরে ধীরে উঠতে থাকলাম। রাশীকের বাবা ফোন করলো। ও গেটের কাছে বসে ছিলো। রাইয়ান কি করছে বারবার জানতে চাইছিলো। বললাম লাফিয়ে লাফিয়ে পাহাড়ে উঠছে। যত এগোচ্ছি আকাশ তত কাছের মনে হচ্ছে।
রেলিং এর পাশে দাঁড়ালে কি দারুণ দৃশ্য সব। দুরের নায়াগ্রাও দেখা যাচ্ছে।
অবশেষে এলাম সেই উঁচু রাইডেরকাছে।
উর্মি আর রাশীক একদিকে বসবে। অন্যদিকে আমি আর রাইয়ান।
এক এক দিকে তিনজন এর বসার জায়গা। রাইয়ান ভীষন এক্সাইটেড।ওর দিকে তাকিয়ে নিজেও সাহস নিচ্ছি। আমাকে বলে মাম্মা আর ইউ স্কেয়ার্ড?
কে আমি? মোটেই না?
কথা শেষ না হতেই শুরু হলো উপরে ওঠা। সেই অনুভূতি বোঝানোর সাধ্য নাই।চোখ খুলে তাকালে দেখি পৃথিবী কোথায় আমি কোথায়? শুণ্যে ঝুলে আছি নাকি কিছুক্ষন। রাইয়ানে হাতটা মুঠোয় ধরা।বলে ,মাম্মা আই আ্যাম অলমোস্ট স্কেয়ার্ড। হাসলাম আর বললাম , তুমি তো সাহসী ছেলে। কথার ফাঁকেই দেখি থেমে গেছে সেই দম বন্ধকরা রাইড। রাশীক নেমে এসে বলে ভয় পেয়েছো? বললাম পেতাম রাইয়ান সাথে না থাকলে।
রাইয়ান এর স্বপ্ন পূরণ হোল। একটু তো ঘাবড়ে গেছে অবশ্যই। বুঝতে আর দিলো না। বাবাকে ফোন করে জানালো কি কি হলো।
নামার সময়তো সোজা। রাইয়ান ছুটে ছুটে নামতে থাকলো।
লেকের পারদিয়ে রাশীক, রাইয়ান দুই ভাই হাঁটছে। কি যে কথা এত, মনে হয় sky screamer নিয়ে কথা বলছে।
ডিয়ার পার্কে যেয়ে দেখি সব ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে।
রাইয়ান পাতা খাওয়ালো উঠে আসা একটাকে। কত কথা হরিণএর মায়াবী চোখে।
ভালুকের দল পানিতে খেলা করছিলো।গরমটা এত বেশী ছিলো,কোথাও দাঁড়ানো যাচ্ছিল না।
একটু বাতাসের অপেক্ষায় ক্লান্ত পথিক এক।
রাইয়ানও পা ব্যথা বলে বসে পড়লো।
মেরীনল্যান্ড ঘোরাঘুরি শেষ হলো আগেভাগে। গরমে হাঁটতে আর ভালো লাগছিলো না। গিফট শপ এ ঢুকে রাইয়ান বাবার জন্য কিনলো একটা ডলফিন।ওকে ফোন করতেই অবাক।এত তাড়াতাড়ি ঘোরা শেষ।গেট দিয়ে বের হতেই ও এসে পড়লো।
ওখানে থেকে সোজা জেড গার্ডেন। নায়াগ্রা আসলে এই চাইনীজ ব্যুফেটায় খাই। দেরী করে গেলাম তবু চেনা হওয়ায় লাঞ্চ ব্যূফেই দিলো। খেয়ে একটু রেস্ট করে আবার নায়াগ্রা ফলস।
প্রথমেই উদ্দেশ্য মেইড অব দ্য মিস্ট। রাশীকের বাবার প্রিয় রাইড।
গাড়ী পার্ক করে ওখানে হেঁটে যেতে প্রায় আধ ঘন্টা লাগে।
পড়ন্ত বিকালে বেশ লাগছিলো।ফলসের পানি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো চোখ,মুখ।
ক্লান্ত নাবিক রাইয়ান। জাহাজটা চলতে শুরু করলো ।আমরা ডেকের উপরে
আমেরিকার দিককার ফলসটার পাশ দিয়ে যাচ্ছি।ওখানে সিঁড়ি দিয়ে নীচে যায় মানুষ,সবাই হলুদ জ্যাকেট পড়া।
একদম ফলস এর কাছাকাছি।বৃষ্টির মত ভেসে আসা পানিতে ভিজে যাচ্ছি সবাই।
এ এক অন্যরকম অনুভূতিক্লান্ত শ্রান্ত একটা দিন। রাইয়ান এর চোখে মুখে সবচেয়ে বেশী আনন্দ।
ওদের বাবা তো সারাক্ষন গাইছে Every one loves Marineland.
রাইয়ান এতটাই ক্লান্ত ,বলে no more Marineland song.
গাড়ীতে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা।
নায়াগ্রার পানি যেখানে পাহাড়ের সমতল থেকে বয়ে যায়,ওখানে এসে দাড়িয়ে থাকলাম।
এখান থেকে বইতে বইতে একসময় পাহাতের ধাল বেয়ে পড়তে শুরু করে স্রোত। কি অদ্ভুত এই বয়ে চলা। এর কোন শেষ নেই।
মনের মধ্যে কিযে এক অনুপম অনুভূতি।
ফেরার পথ এ গেলাম ক্লিফটন হিল এ। সন্ধ্যার ক্লিফটন হিল রাস্তাটায় তখন উৎসবের মাতামাতি।
ওখানে কিছুক্ষন হাটাহাটি করে এরপর ফেরার পথ ধরা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। সবই ঘুমিয়ে পড়লো কিছুক্ষনের মধ্যে।
আমার ও চোখ বন্ধ হয়ে গেছিলো ,হঠাৎ শুনি রাশীকের বাবা গান গাইছে তার প্রিয় বারী সিদ্দিকীর সাথে..
"আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়ার করো তোমার মনে যাহা লয়।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

