ক'দিন থেকে সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে যখন দাঁড়াই।
মনটা খারাপ হতে থাকে। দুরের Gatineau শহরের পাহাড়গুলোর উপর গাছগুলো এত দ্রুত রং বদলাচ্ছে। পাতা ঝরার বেলা আসলো বলে। প্রথম দেশ ছেড়ে এসেছিলাম নভেম্বরে। তখন গাছে কোন পাতা ছিলো না। জীর্ন শীর্ণ গাছগুলো দেখে death and decay -র কথা মনে পড়তো। মাটি থেকে উঠে আসা কেমন এক অদ্ভুত গন্ধ,ঝরা পাতাদের কষ্ট আমাকে ব্যথিত করতো। তবু অনেকগুলো বছরে কাটিয়ে ফেললাম এই বৈরী আবহাওয়ার দেশে । কালই দেশেথাকা এক প্রিয় বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিলো বললাম জানো এই দেশে চারটা ঋতু এত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
Winter এ প্রচন্ড শীত। Summer এ বেশ গরম। Autumn এ পাতার রং বদলানো,পাতা ঝরা। Spring এ ফুল ফোটা। যদিও সবঋতুতেই কিছু কিছু বৃষ্টি হয়।
কাল বিকালে রাইয়ানের আবদারে বের হতে হলো। প্রতি সপ্তাহে খেলনার দোকানে যাওয়া তার চাই। ছোট্ট হলেও একটা নতুন খেলনা। খুব বুঝিয়ে বের হলাম। কোনমেতেই আর নতুন কিছু নয়। খুব রাজি হলো। বললো ঠিকাছে কিছু কিনবো না।শুধু দেখবো।
রাইয়ান ওর প্রমিজ ভুলে যায়।একটা কিছু এনে ওর বাবার কাছে বলে। দোকান থেকে বের হতে হতে রাগ করি ওর সাথে। রাইয়ান দোকান থেকে বের হয়েই বুঝতে পারে ও কথা রাখেনি। স্যরি বলতে থাকে। বলে চলো ফেরত দিয়ে আসি।তাই কি আর হয়? ক'দিন পর হয়তো এমন কিনতে চাইবে না। রাশীক আজকাল আর কিছু কিনে চায়না।
ভীষন রোদেলা একটা দিন। যদিও তাপমাত্রা বেশ কম। ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস হলেও বাতাসের কারনে শুন্য মনে হচ্ছিল।
পার্লামেন্টের পিছনের ব্রীজটা দিয়ে গাড়ী চললো গ্যাতিনো।
একসময় গ্যাতিনো পার্ক এ চলে এলাম।রাস্তার দুধারে তাকিয়ে কেমন যে লাগছে।
সবুজ পাতাগুলো কেমন সোনালী হয়ে আছে।কখনো হলুদ। একটা জায়গায় গাড়ী ইমারজেন্সী দিয়ে পার্ক করা হলো। অনেকই ক্যামেরা হাতে ঘুরছে।
একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে ওর বাবা মা এসেছে। ওদের ছবি তুলে দিলাম।আবারো কিছুদুর গেলাম।
নাম পিন্ক লেক।পিন্ক লেকের কাছে কয়েক বছরে আগে এসেছিলাম। একটা কাঠের সিড়ি ভেঙে উঠতে হয়।রেলিং ঘরে এটা জায়গা।চোখ জুড়িয়ে গেলো।
যদিও ভীষন ঠান্ডা এই জায়গাটায়।পাহাড়ের অনেক উপরে বলে হয়তোবা।পিন্ক লেক কেনো নাম হলো জানবার ইচ্ছা হলো।(পরে কখনো জানলে লেখার ইচ্ছা থাকলো)।
একটা কাঠের পথ নেমে গেছে একদম লেকটার পানির কাছ পর্যন্ত।ওখানে যখন দিয়ে দাঁড়ালাম ।মুগ্ধতার সীমা ছিলোনা।রেলিং ঘেরা একটা জায়গা। চোখ জুড়িয়ে গেলো।
তাকিয়ে দেখলাম নানা বর্ণের পাতাগুলো পানির নীচে ও কেমন একই রং ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনটা যে কেমন লাগছিলো। ইচ্ছে করছিলো পৃথিবীর সব প্রিয় মানুষদের এই সুন্দর দেখাই।
ফিরে আসার পথটার পাশে দেখি বনের মধ্যে কি সুন্দর সব বাড়িঘর।ভাবছিলাম কারা থাকে এখানে। প্রকৃতির মাঝে এমন মিশে থাকে যারা কেমন তারা?কেমন তাদের জীবন যাপন?
পিংক লেকের ছায়া খেলা করছিলো মনে।
পাশ থেকে বলছে সে ,"কি আজ কবিতা হবে তো?"
কেমন করে যে শুধু ঋণী করে দেয় ও আমাকে। সারাজীবনই এমন।
তাকিয়ে বলি ,"জানো আগে পাতার রং বদলানো দেখলে মন কেমন করতো।পাতা ঝরে যাওয়া দেখলে কান্না পেতো।এখন মনে হয় ,সবি তো দরকার আছে।পাতারা ঝরে যায় আবার আসবে বলে।এই আশাটুকুই তো নিজেকে বাঁচতে শেখায়।শত প্রতিকূলতায়।"
কবি গুরুর কত গান যে মনে আসে।গুন গুন করি। শরতের কত গান মনে পড়ে।
"আমার নয়ন-ভুলানো এলে,
আমি কি হেরিলাম হৃদয় মেলে।
_____
বনদেবীর দ্বারে দ্বারে শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
আকাশবীণার তারে তারে জাগিয়ে তোমার আগমনী।"
এমন সুন্দর নয়নভোলানো পাতার রং দেখে সব দুঃখ ভুলে যাই।
আসন্ন পাতাঝরার কষ্ট ভুলে যাই। দুঃখ না থাকলে আসলে আনন্দ যেমন বোঝা যায় না।একটা অদ্ভুত অনুভূতির দোলায় দুলতে দুলতে ঘরে ফিরে আসি। সেই অনুভবের নাম দেই পাতাদের হাসিকান্নার রং।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

