তোর মুখোমুখি না হয়েই ঢাকা থেকে দিব্বি চলে আসলাম।
বলাকা এক্সপ্রেস এর হালকা নীল আর ক্রীম কালারের দরজাতে দাড়িয়ে ভাবছিলাম সেকথা।
মাফ চেয়ে নিচ্ছি। পরীক্ষা ভালো দিইনি। মন হয়ে ওঠেনি তাই দেখা করার।
জানলাম একদিন বাসায় গিয়েছিলি।খুশি হলাম।
সব মিলিয়ে দিনগুলো যাচ্ছে একরকম।
এক দুই তিন চার এ রকম।
সকালবেলার পড়ার টেবিলে বসলে জানালা দিয়ে কাঁচা রোদ এসে গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়,তারপর ক্যান্টিনের বিনয়ী ছেলে শামসু মিঞার পরিবেশেনে দুটা পরোটা।একটু ভাজি,এক কাপ গরম চা,
ক্লীপ ফাইলটা হাতে চাপিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে তড়িঘড়ি করে ক্লাসে যাবার সময় এখানে ওখানে ফ্যান্সি গেটআপের ফুটফুটে বাগান গুলোতে রুপসী কুমারী কুচি দেয়া শাড়ি পড়া গাঁদা,কসমস,জিনিয়া ,গোলাপ আর মল্লিকাদের সাথে একপলকে দেখা হয়।
তার পর ক্লাসে চাঁদমুখীরা তো আছেই।
ক্লাসগুলো চলে যায় হৈহুল্লোর আর লেখাপড়ায়।
গবেষনাগারের রাসায়নিক গন্ধে অথবা মাছের দেহ দেখে দেখে।
বিকাল বেলা শান্ত নদীটার চাহনী দেখতে যাওয়া।,ব্যাডমিন্টন,টেবিল টেনিস।
রাতে পড়ালেখা ,গানশোনা ,ঘুম।
কেটে যায় দিন গুলো এই রকম। রঙিন সাদাকালো যাই মনে করিস।
মন চাইলে কখনো মন এর জানালা দরজা ,মেইন গেট সব খুলে দিয়ে টেবিলটাকে সাথী করে বা বিছানায় গা বিছিয়ে ,বা পকেটে হাত পুড়ে ভাবতে শুরু করি।
ভালোই লাগে তখন।
কখনোবা খারাপ ও লাগে।
না,না
অন্য তেমন কিছু ভাবিনা।
এই ধর এই সব দিন রাত্রি নিয়ে।
হলে চিঠি পাওয়ার দূর্লভ আনন্দটুকু তুই মনেহয় ভুলে গেছিস। তা না হলে তো মন চাইলেই লিখতে পারতি।
চিঠিটা পড়ে আমার ও হয়তো একটু ভাল্লাগতো।
"ভালো করে খাস,ভালো করে পড়িস,ভালো থাকিস।" তোর এইসব স্বচ্ছ আদরমাখা কথাগুলো পড়ে আনন্দে মনটা ভরে উঠতো।হয়তো রুমমেটকে বলতাম আমার একজন নির্মল বন্ধু আছে।নিঃস্বার্থ শুভার্থী।
পরীক্ষা তাই পড়ছি আর পড়ছি।
শোন,
একদিন আয় না অন্য বন্ধুদের নিয়ে আমাদের এখানে।মজা করে বেড়াব।
দিনেই চলে যাবি। জানি চিন্তাযোগ্য প্রস্তাব।
অজস্র শুভেচ্ছা।
পড়ালেখা ঠিকমত করিস।
খারাপ লাগলে গান শুনিস।
ঘুরে বেড়াস যেখানে ইচ্ছে হয়।
উত্তর:
তোর এই চিঠির যে উত্তর আমি দিয়েছিলাম আমি জানি সেটা তোর কাছে নেই।
কেউ কি রেখে দেয় ছেলেবেলার বন্ধুর চিঠি?
আমি রেখেছি।
ডাইরীর পাতার ভাজে । মনে ভাবছিলাম কি মাস ছিলো সেটা।
ধরে নিচ্ছি তখন ছিলো বসন্তকাল।
আমি ও অন্য এক হলের বাসিন্দা ।
সকাল হলেই ক্যান্টিনের পরোটা।ডিমভাজি আর গরম চা।
তোর চিঠি এলে রুমমেটরা সবাই খুব কাড়াকাড়ি করে পড়তো। তোকে সেকথা বলা হয়নি কখনো।
আমার তখন একজন খুব কাছের মানুষ ছিলো।
যে এখনো কাছেই আছে।
যার সাথে আমি ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে বেড়াতাম ঢাকা শহরের অলিগলি।
রিকশায় ভ্রমন হতো আমাদের।
কোনদিন পুরাতন ঢাকার বইপাড়া।
কোনদিন গেন্ডারিয়ার বন্ধু শামীমদের পুরাতন সেই বাড়িতে।
শামীম এর বিয়ে হয়ে গেলো ফাইনাল এর আগেই।
বরের সাথে থাকে মেলবোর্ণে।
মাঝে মাঝে নানান সব গাছ দেখতে যেতাম।
কত সব জায়গায়।
তোকে চিঠি দেয়া হতোনা আর নিয়মিত।
জানিস প্রতিদিন আমাকে চিঠি লিখতে হতো ওর জন্য।
আমাদের এক একটা দেখা হওয়া দিন, অজস্র চিঠিময় ছিলো।
তখন আমাদের মুঠোফোন ছিলোনা বলেই,
অনুভব ছিলো অন্যরকম।
এই ধর, এই যে তোর সেই প্রত্যাশাটুকু,
আমার চিঠি।
আমি বুঝে নিতাম কতটা অপেক্ষা ছিলো এই চিঠির কারনে।
জানিস তোদের ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম।
তোর সেই ব্রক্ষ্মপুত্র।
সেখানে নৌকায় চড়ে ঘুরেছিলাম আমরা কয়েকজন।
তোর কথা মনে হচ্ছিল খুব।
অথচ শীতের দিন।
টুপ করে বেলা বয়ে গেলো।
ফিরে এলাম।
তোর চিঠিতে লেখা সেই ছিমছাম পথ,বাগান আর ফুলগুলো দেখা হলোনা।
তুই চেয়েছিলি একদিন আসি।
গেলাম অথচ ,দেখা হলো কই।
মানুষের জীবনে প্রাওরিটিজ এভাবে পাল্টে যায়।
তোর সেই নির্মল বন্ধুটা যার জন্য তুই গর্ব করতিস।
কেমন পাল্টে গেলাম।পাল্টে গেলি তুইও।
জীবনটা এমনই।
এমনই জীবন...........
যোগাযোগটা রইলো না আগের মতন।
অবশ্য এ নিয়ে কারো কোন অনুযোগ বা অভিযোগ ছিলোনা।
খুব শান্তি পাই। আমাদের সেই বন্ধুত্ব আজীবন একই অনুভবে বয়ে গেলো।
এখনো কথা হলে বলি,ভালো থাকিস। নিজের যত্ন নিস।
তুই বলিস,ভালো থাকিস। আলো হয়ে থাকিস সবখানে।
আজ বসে গান শুনছিলাম।
সারাজীবন ধরে প্রিয় গানের লিস্টে পুরাতন গান গুলো একইভাবে রয়ে গেলো।
মানুষের জীবনে কিছু কিছু পুরাতন একইভাবে সুর ছড়ায়।
ভালো বন্ধু এবং সুরেলা গান।
তুই বলেছিলো মন খারাপ থাকলে গান শুনতে।
এবং বেড়াতে।
সব মনে আছে।সব।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০১১ রাত ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


