ওদের কথোপকথনের কিছু আমরা শুনি.............
নীলা.........কত বছর পর আবার সেই একুশে ফেব্রুয়ারী।
কত স্মৃতি যে মনে পড়ছে। মনে আছে তোমার সেইসব দিনের কথা?
আনিস....... সেইসব স্মৃতিই তো চকমকী পাথর হয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। যখনি মন খারাপ হয়েছে। স্মৃতির বাগানে আনমনে হেঁটেছি।
নীলা........মনে পড়ে একুশের আগের রাতে আমরা সবই ফুলচুরি করতে বের হতাম? চাইলে মল্লিকার বাবা কিছুতেই ফুল দিতেন না। রাত গভীর হলে উনি যখন ঘুমিয়ে পড়তেন , মল্লিকাই আমাদের সাহায্য করতো ফুল চুরিতে। তারপর, বারান্দায় বসে রাতভর মালা বানানো, পোষ্টার লেখা আরো কত কি!
আনিস.......”তুমি বললে খোলাচুলে কালোব্যাজ শোকচিহ্ণ হয়
বুকে কালো ফিতে বাঁধা পুরুষে মানায়।
তুমি বললে তাই,
পান্জাবীতে কালো ফিতে গাঁথলো আলপিন
শহীদরা ফুল ভালোবাসে ,সবগুলো গোরস্থানে দেবো
তুমি বললে তাই অনেক ফুলের গাছ"……………………………..(কবিতাটা নির্মলেন্দু গুনের)
নীলা..........আহা কি দারুণ সেই সব সকাল।
আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী। আমি কি ভুলিতে পারি?
কেউ কি ভুলিতে পারে?
৫২ র একুশের রক্তঝরা সেই ইতিহাস?
আনিস.......”আহা বর্নমালা......আমার দুখিনী বর্ণমালা
তোমাকে উপড়ে নিলে বলো তবেকি থাকে আমার?
উনিশ শো বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুস্পাঞ্জলী
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
যে ফুলের একটি পাঁপড়িও ছিন্ন হলে আমার স্বত্তার দিকে
কত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।“……………………(কবিতাটা শামসুর রাহমানের বর্নমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা)
নীলা....... "এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামী
এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি খেউড়ের পৌষমাস।
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।“………………………( কবি শামসুর রাহমানের বর্নমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা)
আনিস.......প্রভাতফেরী ধরে হেঁটে যেতাম আমরা শিশির ভেজা সকালে।
সকলের গলায় অস্ফুট গুনগুন..."ছেলেহারা শত মায়ের রক্তে রাঙানো ফেব্রয়ারী......আমি কি ভুলিতে পারি?"
নীলা.........তুমি হঠাৎ হারিয়ে যাবার পর আর কখনো শহীদ মিনারে যেতে ইচ্ছা করতো না। কত একুশ এলো গেলো। সারাটা বছর একভাবে তো কাটতোই। কিন্তু একুশ এলে তোমাকে মনে পড়তো খুউব।
আনিস.......এত দ্রুত ঘটে গেলো সব।
রাজনীতির নোংরা খেলায় জড়িয়ে গেলাম।
মিথ্যা খুনের আসামী হয়ে পালিয়ে হলাম দেশ ছাড়া।
জার্মানীর পথে যখন রাত ভোর হয়ে সকাল নামতো । পেপার বিলি করতাম। খুব মনে পড়ো বাংলাদেশ। খুব মনে পড়তো তোমাকে।
এবং প্রিয়জন সব।
নীলা......তুমি চলে যাবার পর সেজপার কি যে হলো।
খাওয়া দাওয়া ভুলে শুধু তোমাদের বাড়ীর দিকটায় তাকিয়ে থাকতো।
বোকা আমি তোমার দেয়া শুকনো শিউলী ফুলের মালা পড়ে সুবাসিত হয়ে ঘুরে বেড়াতাম। ভালোবাসা এত গভীর ছিলো ওর, অথচ ও হারিয়ে গেলো।
কাছের মানুষগুলোকে হারিয়ে আমিও খুব একা হয়ে গেলাম।
আনিস.......দিন গড়িয়ে মাস। মাস গড়িয়ে বছর।
এক একটা সময় মনে হতো চলে আসি।
হোক জেল । হোক ফাঁসি। তবু তো দেশ।
তবু তো মায়ের কোল। তবুতো বাবার আদর। হয়নি.......
১৭ বছর লড়লেন বাবা।
সেই যে নেতা.....যার জন্য দেশ ছাড়া হলাম।
তাকেও মরতে হলো নিজের মানুষেরই হাতে.......
এবং একদিন রায় হলো ..."আমি নির্দোষ"
খুশীতে বাবা হার্ট এ্যাটাক করলেন।
মা তো আগেই চলে গেছিলেন.....
তাই আর ফেরা হলো না...........অভিমানে মুখ বুঁজে রইলাম একাকী।
নীলা.........আমি সব খবর জানতাম।
মানুষের কত শখ থাকে আনিস।
আমার শুধু একটাই শখ ছিলো ......ঘুরে ঘুরে তোমার শহরের সব ভিউকার্ড কিনতাম। মনে ভাবতাম তুমি কোন পথে হাঁটো? রাতের বার্লিন দেখতে দেখতে আমিও স্বপ্নে বার্লিনে ঘুরতাম।
তোমার একটা ছবিও লুকিয়ে নিয়েছিলাম আমি........
একটা রাস্তায় ওভারকোট পড়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছো। হাতে এক গোছা ফুল।
আমি সেই ফুলগুলো চেয়ে দেখতাম।
মনে হতো আমাদের আবারও দেখা হবে।একদিন।
আনিস.......আমার এই ফেরা ,তোমার জন্যই নীলা।
অনলাইনে হঠাৎ একটা বাংলা সাইট খুঁজে পাই। এবং দেখি নীলা আহমেদ নামে একজনের লেখা। পড়তে শুরু করি। সেই যে একুশ। প্রভাতফেরী। আমাদের কবিতার দিন সব,সব তুমি এত সুন্দর করে লিখেছো। এক একটা সময়কে তুমি এমন ভাবে ধরে রেখেছো লেখায়! আমি অবাক হয়ে যাই। একটা মেয়ে যাকে কবে তার কৈশোরে দিয়েছিলাম ভোরের শিউলী।
সেই শিউলী ফুলের সুবাসে সুবাসিতে হয়ে আজো সে ঘুরে বেড়ায়......
আমাকে ফিরে আসতেই হলো নীলা.......
নীলা........."মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে হাহাকার করে ওঠে
একশো বছর
ডেকে ওঠে এক জোড়া ব্যাথিত কোকিল।
তোমার মুখটা মনে পড়ে।
তোমার দু'চোখে যদি জল দেখি আমি বড় মনঃকষ্টে থাকি।
তোমাকে যে ভালোবাসি লুকানো ছাপানো কিছু নাই।
এখন তোমাকে আমি ভালোবাসি মানে স্নিগ্ধ করি সমস্ত আসল জুড়াই জীবন"
আনিস......."মাঝে মাঝে বুকের ভেতর থেকে হাহাকার করে ওঠো তুমি
হাহাকার করে ওঠে ভেতর মানুষ
ডেকে ওঠে বনের কোকিল হয় অঝোর বর্ষন
তোমাকে বেসেছি ভালো এক কোটি একশোবছর
বুকের ভেতর এই কেঁদে ওঠে আদ্যোপান্ত বৈষ্ণব কবিটা
তোমার প্রসন্ন মুখ মনে পড়ে যায়....."
নীলাএবং আনিস
"তোমাকে যে ভালোবাসি আজ সেকথা পাখিরাও জানে।
বুকের ভেতর তাই কেঁদে ওঠে সারাবাড়ি সমস্ত শহর।
তোমাকে বেসেছি ভালো এককোটি একশো বছর”...........( মহাদেব সাহার)....
শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুন, কবি শামসুর রাহমান এবং কবি মহাদেব সাহার কবিতা ব্যবহার করেছি উপরের কথোপকথন এ , তাঁদের প্রতি বিনত শ্রদ্ধা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

