নাম : উইং কমান্ডার (অব
পিতা : মৃত মীর্জা ফজলুল করিম
গ্রাম : ঠাকুরগাঁও,
ডাক : ঠাকুরগাঁও,
পৌরসভা : ঠাকুরগাঁও
থানা : ঠাকুরগাঁও,
জেলা : ঠাকুরগাঁও (১৯৭১ সালে দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত মহকুমা)
বর্তমান ঠিকানা : অর্কিড ভিলা, অ্যাপার্টমেন্ট ই/২
প্লট ১৮,সড়ক ১,বারিধারা, ঢাকা ১২১২
শিক্ষাগত যোগ্যতা : আই. এস. সি.
১৯৭১ সালে বয়স : ৪২
১৯৭১ সালে পেশা : ব্যবসা,
বর্তমান পেশা : অবসর জীবন
-------------------------------------------------
প্র: পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে আপনি কোন সালে যোগদান করেন এবং কতদিন এই পেশায় ছিলেন ?
উ: ১৯৪৯ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি আমি পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগদান করি। পাকিস্তানের রিসালপুরে আমার ট্রেনিং শুরু হয়। ট্রেনিং শেষ হবার পর ১৯৫১ সালের ২৬ মে আমি কমিশনপ্রাপ্ত হই। কমিশন লাভের পর ১৯৬৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আমি পাকিস্তানেই ছিলাম। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে আমাকে ঢাকায় বদলি করা হয় অ্যাজ অফিসার কমান্ডিং অ্যাড্মিন উইং অ্যান্ড সেকেন্ড-ইন-কমান্ড,পাকিস্তান এয়ারফোর্স হেড-কোয়ার্টার্স,ইস্ট পাকিস্তান,ঢাকা।
তখন ঢাকায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি স্কোয়াড্রন ছিলো। এটাকে অপারেশনাল Base বলা হতো। আমার ঢাকায় বদলি হবার পিছনেও একটা ঘটনা আছে। সেটা এখানে বলা প্রয়োজন। এয়ারফোর্সে প্রমোশন পাওয়ার পর আমার ফ্লাইং করাটা কমে গেলো বা বলা যায় কমিয়ে দেয়া হলো। অথচ আমি ফ্লাইং করাটা খুব পছন্দ করতাম। যতদিন আমি ফ্লাইংয়ে ছিলাম ততদিন আমি পাকিস্তান এয়ারফোর্স খুব এনজয় করেছি। এ ছাড়া পছন্দ করার আরো কিছু কারণ ছিলো। তখন পাকিস্তান এয়ারফোর্স খুব ডিসিপ্লিনড ফোর্স ছিলো। আমার জানা মতে,কোনোরকম করাপশন ছিলো না,কোনো গ্রুপিং বা নেপটিজমও ছিলো না। একটা ডিসিপ্লিনড ফোর্স বলতে যা বোঝায়,পাকিস্তান এয়ারফোর্স তখন তাই ছিলো। আমি সিনিয়র হলাম ১৯৬৪ সালে। তখন আমাকে স্টাফ পোস্টিং দেওয়া হলো। এই স্টাফ জব আমি পছন্দ করিনি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এয়ারফোর্সে আমি আর থাকবো না। এ সময় এয়ারফোর্সের চাকরি ছেড়ে পি.আই.এ.-তে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। আমি একদিন এয়ার মার্শাল নূর খানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে পি.আই.এ.-তে নিতে রাজী হয়ে বললেন,এয়ারফোর্স যদি তোমাকে ছেড়ে দেয় তাহলে আমি তোমাকে নেবো। তাঁর সঙ্গে দেখা করার আগেই কিন্তু আমি স্বেচ্ছা অবসরের জন্য দরখাস্ত দিয়েছিলাম। এয়ার মার্শাল নূর খানের সঙ্গে দেখা করে আমি এয়ারলাইন্স ট্রান্সপোর্ট পরীক্ষা দিলাম এবং পাশ করলাম। এ সব কাজ শেষ করে করাচী থেকে পেশোয়ারে ফিরে যাওয়ার পর এয়ার সেক্রেটারি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যাওয়ার পর তিনি বললেন,সি.এন.সি. তোমাকে রিটায়ারমেন্ট দিতে রাজি নন। তখন সি.এন.সি. ছিলেন এয়ার মার্শাল আজগর খান। এয়ার সেক্রেটারি তখন আমাকে বললেন,তোমার সামনে দু’টি পথ খোলা আছে। এক,তুমি কমিশন রিজাইন করতে পারো। সে ক্ষেত্রে তুমি পেনশন ল্যুজ করবে ওয়ান ফোর্থ। দুই,এয়ার মার্শাল আজগর খান তোমাকে ইস্ট পাকিস্তানে অ্যাজ সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অ্যান্ড ওসি অ্যাডমিন উইং করে পাঠাবে। তুমি যদি ওটাতে রাজি হও তা হলে আমাকে জানাও। তখন আমি দ্বিতীয় প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম এবং এপ্রিল মাসে পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের আগ দিয়ে অপারেশনাল Base- এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ডারদেরকে নির্দেশ দেয়া হলো যে,ঢাকা বিমান বন্দরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণ করতে। নির্দেশ অনুযায়ী আমরা কিছু প্রস্তাব পাঠালাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানালেন এখন এ সব কাজ করানো সম্ভব হবে না। কারণ এ জন্য অর্থের কোনো সংস্হান নেই। এই সময়ই অর্থাৎ ১৯৬৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি একটা ফ্ল্যাগ সিগনাল পেলাম। এটা থেকে বুঝতে পারলাম যে,ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর তারিখে ভারতীয় বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি টার্গেটে আক্রমণ করলো। সে দিন আমি অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে ঘুমিয়েছিলাম। আমার এক কাজিন ছিলেন তখন গভর্নরের সামরিক সচিব,কর্নেল মনিরুল হক। তিনিই প্রথম ফোনে আমাকে এ খবরটি দেন। আমি তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে এয়ার ইধংব-ঋ গেলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম- ভারতীয় বিমান বাহিনী শিবগঞ্জ এয়ারফিল্ড আক্রমণ করেছে,একটা পাম্প হাউজেও হামলা করেছে। রংপুর রেলওয়ে স্টেশন এবং কুর্মিটোলা রাডার স্টেশনের উপরও তারা আক্রমণ চালিয়েছে। তবে রাডার ধ্বংস করতে পারেনি। পাশের একটা টিন সেডে গোলা এসে পড়েছে। কিন্তু রাডার স্টেশনে কর্মরত একজন এয়ারম্যান এই হামলায় মারা গেছে। তখন আমরা সম্পূর্নভাবে অপ্রস্তুত ছিলাম। আমাদের বিমানগুলি ছিলো সম্পূর্ন উন্মুক্ত জায়গায়। সেখানে তারা আক্রমণ করেনি। অথচ ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদের অরক্ষিত বিমানগুলির উপর হামলা চালাতে পারতো। এই পরিস্হিতিতে কি করবো এটা আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন গভর্নরের সামরিক সচিবকে ফোন করলাম এ বিষয়ে গভর্নরের নির্দেশের জন্য। তখন গভর্নরের প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলো শামীম আহসান। আমি সামরিক সচিবকে ফোন করার ঘন্টাখানেক পর শামীম আহসানের কাছ থেকে ফোনে জানতে পারলাম যে,গভর্নর আমাকে দেখা করতে বলেছেন। আমি স্টেশন কমান্ডারকে না জানিয়ে গভর্নরের সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি গভর্নরকে সামগ্রিক পরিস্হিতি সম্পর্কে অবহিত করলাম। আমি বললাম যে,স্যার,পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র এক স্কোয়াড্রন বোমারু বিমান আছে। এই মুহূর্তে প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা জোরদার করার জন্য Passive defence-এর প্রয়োজন। গভর্নর আমার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামরিক সচিবকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বললেন। একই সঙ্গে বিমান বন্দরের প্রতিরক্ষার জন্য কিছু পেন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর থেকেই এ কাজ শুরু হয়ে গেলো। এরপর আমরা এখান থেকেই কয়েকটা ইন্ডিয়ান এয়ার ফিল্ড আক্রমণ করলাম।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৭ দিন ধরে চললো। যুদ্ধের এই কয়দিনে ভারতীয় বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিমান ঘাঁটি তেজগাঁওয়ে কোনো হামলা পরিচালনা করেনি। এটা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগলো। আমাদের মাত্র এক স্কোয়াড্রন বিমান এখানে ছিলো। তারা এটাকে সহজেই ধ্বংস করতে পারতো। বিক্ষিপ্ত বিমান আক্রমণ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও ইন্ডিয়ান আর্মি আক্রমণ করেনি। এই যুদ্ধ থেকে আমি তখনই বুঝতে পারলাম যে,ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে চাচ্ছে না। তারা জানতো,পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে যে বৈষম্য,সেই বৈষম্য নিয়ে পূর্বাংশের মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে। পরিণতিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে সংঘাত অনিবার্য। আমি মনে করি যে,এই কারণেই ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বস্তুত কোনো প্রকার আক্রমণ পরিচালনা করেনি।
তখনকার ঘটনাবলী থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে,আজ হোক,কাল হোক পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এর অনেকগুলি কারণও আমি লক্ষ্য করেছিলাম। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে অসম উন্নয়ন,আর্থিক বৈষম্য,চাকুরি ক্ষেত্রে বৈষম্য,প্রতিরক্ষা খাতে বৈষম্য ইত্যাদি কারণে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রবল হয়ে উঠছিলো।
পাকিস্হানের দুই অঞ্চলের অসম বিকাশের বিষয়টিও আমাদের চোখে পড়ছিলো। তখন ছয়-দফা আন্দোলন চলছিলো। আমি পত্র-পত্রিকা পড়ে আন্দোলনের খবর জানতাম। সত্যি কথা বলতে কি আমি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কড়া বেষ্টনীতে অবস্হান করেও এই বিষয়গুলি বুঝতাম। যদিও পাকিস্তান বিমান বাহিনী তখন রাজনীতির ধারে কাছেও ছিলো না। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৫৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবেই হয়েছিলো। প্রায় অরক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়টি এ সময়ের রাজনীতিতে খুবই প্রাধান্য পায়। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং মিলিশিয়া গঠনের দাবিও ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ব থেকেই পূর্বাঞ্চলে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে,পাকিস্তানকে আর ঐক্যবদ্ধ রাখা যাবে না। এই আবহাওয়া আমাদেরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
যাহোক,১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় আমার জীবনে আর একটি ঘটনা ঘটে। ঢাকায় এয়ার Base - এর যিনি স্টেশন কমান্ডার ছিলেন তাঁর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা এবং আরো কিছু বিষয় নিয়ে আমার ডিফারেন্স অব অপিনিয়ন হয়। যার জন্য আমি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য হই। এ সময়ই সিদ্ধান্ত নিলাম যে,আমি আর পাকিস্তানে ফিরে যাবো না। আমি ১৯৬৮ সালে আবার স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করি। ১৯৬৮ সালের অগাস্ট মাসে উইং কমান্ডার হিসেবে আমি এল.পি.আরে যাই। ১৯৬৯ সালের অগাস্ট মাসে আমার এল.পি.আর. পূর্ণ হয়। আমার জায়গাতে পোস্টেড হয়ে আসেন আরেক জন বাঙালি অফিসার,তিনি আমারই আত্মীয়,বন্ধু এবং ভগ্নিপতি এ. কে. খন্দকার। তিনি তখন গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন। এ. কে. খন্দকার পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকেও গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদ অফার করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই পদ গ্রহণ না করে আমি স্বেচ্ছা অবসরই বেছে নেই। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আমি ঢাকাতেই বসবাস করতে থাকি এবং পেশা হিসেবে বেছে নেই ব্যবসা।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


