somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১ (একটি কথ্য ইতিহাস)

০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?
উ: ১৯৭০ সালে তো সাধারণ নির্বাচন হলো। নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় আবার আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে লক্ষ্য করলাম যে,পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন প্রবলভাবে দানা বেঁধে উঠছে। মার্চ মাসের ২ তারিখে আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে বিমান বাহিনী অফিসে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মনোভাব জানতে চেষ্টা করি। বুঝতে চেষ্টা করি পরবর্তীতে কি হতে চলেছে। পরে আমি কথা বললাম গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের সঙ্গে। ক্যান্টনমেন্টের বাসায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর লক্ষ্য করলাম তিনি খুবই আপসেট। তিনি আমাকে ইঙ্গিতে ঘরের বাইরে যেতে বললেন। আমি বুঝলাম,তিনি একান্তে কিছু বলার জন্য আমাকে লনে যেতে বলছেন যাতে অন্য কেউ আমাদের আলোচনা শুনতে না পায়। লনে এসে এ. কে. খন্দকার কয়েকটি বিষয় আমাকে ইংরেজিতে অবহিত করলেন। প্রথমত: পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের কাছে কোনোক্রমেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। দ্বিতীয়ত: তারা ইতোমধ্যে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১২টি ট্যাঙ্ক ঢাকার কুর্মিটোলায় নিয়ে এসেছে। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধ প্রস্তুতি আছে কিনা তা জানার জন্য। যুদ্ধ বলতে ঐ বাঁশের লাঠি দিয়ে যুদ্ধ নয়। রীতিমতো অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ। তখন তাঁকে বললাম,আওয়ামী লীগের বড় নেতা পর্যায়ের দু-এক জনকে হয়তো আমি চিনি। কিন্তু তাদের কারো সঙ্গে তো আমার ঘনিষ্ঠতা নাই। আমি আমার এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন এম. এন. এ. বা এম. পি. এ. অথবা আওয়ামী লীগের নেতা- তাদেরকে চিনি। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কারো সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ নেই। তাঁকে আরো বললাম,আমাকে ৩/৪ দিন সময় দাও এর মধ্যে কারো মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলে তোমাকে আমি জানাচ্ছি।

এ সময় ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো এক সেক্রেটারি ছিলেন আমার কাজিন। তাকে গিয়ে ঘটনাটা বললাম। তার কাছেই জানতে চাইলাম আওয়ামী লীগের যুদ্ধ প্রস্তুতি কি ? সে আমাকে তেমন কিছু বলতে পারলো না। আমি তাকে এ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাবার জন্য বললাম। দু’ দিন পর সে আমাকে জানালো যে,আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই। এমনিতেই আন্দোলন চলছে। আমি এটা এ. কে. খন্দকারকে জানালাম। এটা জেনে তিনি খুব হতাশ হলেন। আমিও হতাশ হয়েছিলাম। আমি রাজনৈতিক পরিস্হিতির দিকে নজর রাখছিলাম। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে এটা সকলের কাছে প্রত্যাশিত ছিলো। যে কোনো গণতনমনা মানুষেরই এটা কাম্য। কিন্তু এটা না করে পাকিস্তান সরকার যে পন্থা বেছে নিলো সেটা আমার কাছে সম্পূর্ন নির্বুদ্ধিতার শামিল বলে মনে হলো। হয়তো ওরাও বুঝতে পারেনি যে সত্যিকার অর্থে অবস্হাটা কি এবং দেশে কি হতে যাচ্ছে।

যাহোক,সময় তো দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিলো। এর মধ্যে আমার এক ভাতিজা ফোন করে আমাকে জানালো যে,২২ মার্চ তারিখে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক লোকদের একটি র‌্যলি হবে বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে। কর্নেল ওসমানী সেখানে থাকবেন। আমি যেন উপস্হিত থাকি। আমি সম্মতি জানালাম এবং বিকেল বেলা নিজের গাড়িতে করে সেখানে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম কর্নেল ওসমানী,জেনারেল মজিদ প্রমুখ রয়েছেন। কর্নেল ওসমানী সাহেবকে আগে থেকেই আমি চিনতাম। কিন্তু ’৭১-এর মার্চ মাসে তখনো কর্নেল ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। আমরা তিন লাইনে দাঁড়ালাম। আমি সামনের লাইনে ছিলাম। কর্নেল ওসমানী এসে আমাকে বললেন,বিমান বাহিনীর মধ্যে তুমিই সবচেয়ে সিনিয়র,তুমি বিমান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করবে। এতে আমি সম্মত হলাম। র‌্যালি শুরু করে আমার গাড়িতে করে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম। আমরা সেখানেই অপেক্ষা করছিলাম। কারণ র‌্যালি সেখানে এসেই শেষ হবার কথা। বঙ্গবন্ধু তাদের সালাম গ্রহণ করবেন এবং তারপর আমরা তাঁর সাথে দেখা করবো।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করার সময় আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে রাজনৈতিক পরিস্হিতি বোঝার এবং পাকিস্তানিরা কি করতে যাচ্ছে সেটা তাঁকে বলার চেষ্টা করলাম। আমি ওসমানী সাহেবকে বললাম,‘স্যার,দে উইল টেক মিলিটারি অ্যাকশন এগনেস্ট আস। ডু ইউ রিয়ালাইজ ইট’। আমার কথায় ওসমানী সাহেব বললেন যে,‘দিস ইজ ননভায়োলেন্ট অ্যান্ড ননকো-অপারেশন মুভমেন্ট। দিস মুভমেন্ট উইল স্টপ দ্যা ট্যাংকস,দেয়ার মে বি ফরেন ইন্টারভেনশন’। আমি তাঁর উত্তরে একটু আশ্চর্যই হলাম। প্রকৃতপক্ষে তিনি পাকিস্তানি শাসক এবং সামরিক বাহিনীর তৎপরতাকে কোনো আমলেই নেন নি। আমি তখন মনে মনে ভাবলাম,কখন ফরেন ইন্টারভেনশন হবে,আর তার জন্য তিনি বসে আছেন! যাহোক,এই কথা বলার পরও আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে পরবর্তী পরিস্হিতি বিশেষত: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবেলা করার বিষয়ে কিছু কথা বললাম। আমি কর্নেল ওসমানীকে আরো জিজ্ঞেস করলাম,স্যার,আপনি পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবেলা করার কথা কি কিছু ভাবছেন। সেদিন তাঁর কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সুশ্চষ্ট উত্তর পাওয়া গেলো না। আমি বললাম যে,শুধু অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবেলা করা যাবে না। তাদেরকে সশস্ত্র ভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু এই জাতীয় সামরিক পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ছিলো কিনা সেটা ওসমানী সাহেব আমাকে বলতে পারেননি। আমি দেখলাম,ওসমানী সাহেব প্রথাগত ধারণা নিয়ে বসে আছেন। আমি খুব হতাশ হলাম। পরে কর্নেল রব আমাকে ওসমানী সম্পর্কে বলেছেন যে,তিনি তখন এ সব ভাবা তো দূরের কথা,সে সময় তাঁকে পাকিস্তানি কমান্ডোরা ধরে নিয়ে যেতে পারে- এই ভয়েই তিনি নাকি সারাক্ষণ অস্হির ছিলেন। অথচ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাঁর উপর ডিপেন্ড করে বসে আছেন। এমন কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোনো কোনো বাঙালি অফিসার পর্যন্ত কর্নেল ওসমানীর সিগনালের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে তাদের সকলকে অন্ধকারে রেখেছিলেন।

ঢাকা Air Base-এ কর্মরত গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার সাহেব আমাকে বলেছিলেন গোদনাইলে সরকারি তেল ডিপোতে একটা কিছু করার জন্য। আমি এ সংবাদ ছাত্র লীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। ওরা সেখানকার রাস্তায় কেবল ছোট কয়েকটা ট্রেঞ্চ খুঁড়েছিলো পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য। এর বেশি কিছু তারা করতে পারেনি।

আমি তাদের বলেছিলাম নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে পাকিস্তানি বাহিনী যাতে জ্বালানি তেল না নিতে পারে বা তেল না আসতে পারে সে বিষয় নিশ্চিত করার জন্য। এ. কে. খন্দকার আমাকে বলেছিলেন,দাদাভাই,আপনি একটু দেখেন পাকিস্তানি আর্মিদের তেল আনার জন্য গোদনাইলে যাবার যে পথ আছে সেটা বন্ধ করা যায় কি না। আমি সে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমি ছাত্র লীগ নেতাদের বিষয়টি বলেছিলামও। কিন্তু বিষয়টিকে তারা খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এটা বন্ধ করা গেলে বা সেখানে কোনো বড় অবরোধ সৃষ্টি করা গেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের যানবাহনের জন্য ওখান থেকে তেল আনতে পারতো না এবং তাদের ২৫ মার্চ এবং তার পরবর্তীতে অপারেশন চালানো সহজ হতো না।
চলবে......
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:০৪
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×