somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.২ (একটি কথ্য ইতিহাস)

০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্র: ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান আর্ম ফোর্সেস সদস্যদের মধ্যে যে বাঙালি সদস্য ছিলো,সেই শক্তি দিয়ে মার্চ মাসে পাকিস্তানি শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব ছিলো কি,আপনি কি মনে করেন ?
উ: আমার তো সন্দেহ আছে- এই জন্য যে,এটা করতে হলে বিষয় সম্পর্কে প্রথমত সবাইকে জানাতে হবে। বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে যেখানে যেখানে বাঙালি আছে তাদের সকলের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিয়ে বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এই কাজটি যদি সফলভাবে করা সম্ভব হতো এবং এরা যদি সবাই একত্রে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারতো- তাহলেই কেবল এটা সম্ভব ছিলো। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি,যশোর সেনানিবাস থেকে লে. হাফিজ যিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন- তিনি এবং তাঁর বাহিনী যখন পাক সেনাদের দ্বারা আক্রান্ত হন- তখন লে. হাফিজ কোনোরকমে আত্মরক্ষা করে সেনানিবাস থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু তাঁর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিল আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান পক্ষকেই সমর্থন দিলেন, মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না। দেশ স্বাধীন হবার বহু বছর পর আমি রেজাউল জলিলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন তিনি আত্মসমর্পণ করলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না। তিনি তখন জানালেন,২৫ মার্চের কয়েকদিন আগে যশোর সেনানিবাস থেকে ডাক্তার কর্নেল হাই ঢাকা এসেছিলেন। তাঁকে কর্নেল রেজাউল জলিল নাকি বলেছিলেন যে,অনুগ্রহ করে আপনি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন আমাদের কি করা উচিত। কর্নেল ডা: হাই যখন যশোর ফিরে গেলেন তখন লে. কর্নেল রেজাউল জলিল কর্নেল হাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা এবং কথা হয়েছে কি না। ডা: কর্নেল হাই তখন ওসমানীর ভাষ্য জানালেন এভাবে: ‘টেল জলিল,নট টু প্রিসিপিটেট ম্যাটার এনি ফারদার’। এর অর্থ কি দাঁড়ালো ? অর্থাৎ কর্নেল ওসমানীর কোনো ধারণায় ছিলো না কি হতে যাচ্ছে। অথবা কর্নেল ওসমানী এমন ধারণাও করতে পারেন যে,একটা রাজনৈতিক সমাধান হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীর জুনিয়র সদস্যরা ওসমানীর উপর ভরসা রেখেছিলো। তারা মনে করেছিলো যদি পাকিস্তানিরা মারাত্মক কোনো সামরিক ব্যবস্হা নিতে যায়, তাহলে সে সংবাদ অবশ্যই তিনি জানবেন এবং তিনি সেটা সবাইকে জানাবেন এবং তার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলবেন। যদিও অনেকেই পাকিস্তানিদের মতলব আগাম অনুমান করেছিলো। কিন্তু ওসমানী সাহেব পাকিস্তানিদের মতলব বা পরিকল্পনা আঁচ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ তাঁকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেও তিনি বিষয়টিকে আমলেই নেন নি। যেমন- আমি নিজেই তাঁকে ২২ মার্চ তারিখে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। আসলে, ইতিহাসের অনেক কথাই লেখা যায় না। History as written is not the history that happened.

যাহোক,২২শে মার্চের র‌্যালি শেষে আমি আমার কাজিন রব সাহেবের বাসায় গেলাম। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদকে খুব ভালোভাবেই জানতেন। আমি রব ভাইকে বললাম,আপনি রাজনৈতিক পরিস্হিতিকে কিভাবে দেখছেন বা এ বিষয়ে কি ভাবছেন ? রব সাহেব বললেন যে,মহাত্মা গান্ধীও ১৯২০ সালের দিকে অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন,কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত নন ভায়োলেন্ট থাকেনি। আমি তখন বললাম যে,আপনি নিজে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে কথা বলেন। কেননা পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। আমি তখনই অনুমান করেছিলাম যে,এখানে পাকিস্তানি বাহিনী একটা ভয়ানক ধ্বংসলীলা চালাবে। এই ধ্বংসলীলা হবে অকল্পনীয়- হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের মতোন। রব সাহেবকে আমি আমার ধারণাটা জানিয়ে বললাম,গিয়ে দেখুন,শেখ সাহেব কি ধরনের প্রস্তুতির কথা ভাবছেন। রব সাহেব আমাকে পরদিন সন্ধ্যায় যেতে বললেন। আমি পরদিন ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় আবার রব সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম।

রব সাহেব বললেন যে,তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাজউদ্দীন সাহেব বলেছেন,পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোপন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তিনিও কিছুটা জানেন। তারা যে ব্যাপক কিছু করতে পারে সে আশঙ্কা তিনিও করছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এদিকে বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারটাকে অতো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেননা ওসমানী সাহেব এবং আরো কয়েকজন বঙ্গবন্ধুকে নাকি বলেছেন, এ ধরনের কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা নাই।

২৩ মার্চ তারিখেই আমি সোবহানবাগ দিয়ে যাচ্ছি,এমন সময় দেখা হলো এ. কে. এম, মাহবুবুল ইসলাম-এর সঙ্গে। তিনি পাবনার এম. পি. এ. ছিলেন। প্রাক্তন নেভাল কমান্ডার। তিনি আমাকে নিকটেই একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়ির দোতলায় উঠে দেখি ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেব বসে আছেন। সঙ্গে আছেন সিরাজগঞ্জের এম. পি. এ. হায়দার সাহেব। মনসুর আলী সাহেবের সঙ্গে আমার অতোটা ঘনিষ্ঠতা ছিলো না। তারপরও আমি তাঁকে বললাম যে,বঙ্গবন্ধু সকল নেতাদেরকে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার কথা বলেছেন অথচ আপনি এখনো এখানে বসে আছেন। কেননা আমি জানতাম,যে কোনো মূহুর্তে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। আমাদের বসে থাকার সময় নেই। মনসুর আলী সাহেবকে আমার মতামত বললাম। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। আমি চলে আসলাম। তার দু’দিন পরই এলো সেই ভয়াল রাত,২৫ শে মার্চ।

চলবে........
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৪
৮টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×