প্র: ঠাকুরগাঁও পৌঁছে আপনি সেখানকার অবস্হা কি দেখলেন ?
উ: ঠাকুরগাঁও পৌঁছে ঐ রাতেই আমি আওয়ামী লীগের তখন নেতৃস্হানীয় যাঁরা ছিলো- তাঁদের সাথে মিট করলাম। তাঁরা প্রায় সবাই আমার বন্ধু ছিলো- কেউ ক্লাস ফ্রেন্ড,আর কেউ সমবয়সী হিসেবে। সবার সাথে তখনকার পরিস্হিতি নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁদের আমি বললাম যে,যুদ্ধ ছাড়া এখন তো আর কোনো উপায় নেই। এখন আমাদের যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের ইন্ডিয়া যেতে হবে সাহায্যের জন্য। এখন আমাদের হাতে যা আছে তাই নিয়েই যুদ্ধ করতে হবে। তাঁদের কাছে জানতে চাইলাম তাঁরা কি চিন্তা করছে বা এই মুহূর্তে তাঁরা কি করতে চায়। তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনলাম।
ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে আরো শুনলাম যে,ইপিআর বাহিনীর সিনিয়র সুবেদার কাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে ২৭/২৮ মার্চ তারিখে ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে। আরো শুনলাম এখান থেকে ইপিআরের দু’জন অবাঙালি অফিসার পালাচ্ছিলো বলে তাদেরকে হত্যা করা হয়। পরদিন আমি লক্ষ্য করলাম যে,ইপিআর-রা যা করছে সেটা তারা নিজেদের মতো করেই করছে,দে আর নট আন্ডার কমান্ড অব আওয়ামী লীগ অর সংগ্রাম কমিটি। আওয়ামী লীগ বা সংগ্রাম কমিটি সেপারেট, ইপিআর-রা সেপারেট। এখানে সুবেদার কাজিমউদ্দীনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলো,আওয়ামী লীগ বা সংগ্রাম কমিটি নয়। আমি ঠাকুরগাঁও যাওয়ার পর পরই খবর পেয়ে সুবেদার কাজিমউদ্দীন আমার সঙ্গে দেখা করলো। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম ঠাকুরগাঁও এয়ার ফিল্ড নষ্ট করা হয়েছে কি না। সে বললো, না। এ সময় সেখানে আরো কয়েকজন ছিলো। তারাও বললো,তারা এখানকার এয়ার ফিল্ডটা নষ্ট করে দিতে চায়। কিন্তু সেটা কি ভাবে করবে। আমি তাদের বলে দিলাম সেটা কিভাবে নষ্ট করতে হবে। তারপর শ’ খানেক লোক সেখানে গিয়ে এয়ার ফিল্ডটা নষ্ট করে ফেললো। ঠাকুরগাঁও পৌঁছে আরো জানতে পারি ইপিআর সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে আমার বাড়ি এসেছিলো তাদের নেতৃত্ব নেয়ার জন্য। কিন্তু আমি তো তখন ছিলাম না। তখন ওরা ঠাকুরগাঁও থেকে ১৫ মাইল দূরে রানীশৈংকল বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে এক অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন থাকতেন,তাঁকে এনে তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু আমি দেখলাম,ঐ ক্যাপ্টেন কোনো ব্যাপার নয়- সুবেদার কাজিমউদ্দীনই সব করছিলো। অ্যাকচুয়ালি সেই রিয়াল কমান্ডার।
এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে আর একটা সমস্যা দেখা দিলো। ইপিআর-রা বলছে তারা বিহারীদের মারবে। তাদেরকে জেলে রাখা হয়েছিলো। এই বিহারীদের মধ্যে ব্যাংকের দু’জন ক্যাশিয়ারও ছিলো। তখন সবাই জানতো যে,আমাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চলে যেতে হবে ভারতে। এ জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে হবে। বহু লোক এই পরিস্হিতিতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলবে। এমন অবস্হায় এম. পি. এ. ফজলুল করিম এসে আমাকে বললো যে,তুই যেয়ে ওদের (ইপিআর) বল্,এখনই বিহারীদের না মারার জন্য। যদি মারতেই হয় তা হলে সেটা পরেও করা যাবে। আমিও দেখলাম যে,দুটি ব্যাংকের ক্যাশিয়ারই হলো বিহারী। এখন বিহারীদের হত্যা করলে পরিস্হিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে,ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমি ইপিআর বাহিনীর অফিসিয়াল কমান্ডার,সেই ক্যাপ্টেনকে কথাটা বললাম। কিন্তু তিনি কিছু করতে পারলেন না। ইপিআর-রা বিহারীদের হত্যা করলো। আসলে যুদ্ধের এই সময়টিতে কোথায়ও কোনো শৃক্মখলা ছিলো না। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বও তখন এ ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারেনি। অবশ্য সে সময় সার্বিক শৃঙ্খলা আশা করাও যায় না। কোনো বিপ্লবেই যথাযথ শৃঙ্খলা থাকে না। অবশ্য পরে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিলো। তাজউদ্দীন আহমদ যদি সময় মতো সরকার গঠন না করতে পারতেন তবে যুদ্ধরত বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুবই কষ্টকর হতো। সরকার গঠিত হওয়ার পর এই সমস্যা কেটে যায়। সবাই একটা কমান্ডের অধীনে আসে। যুদ্ধরত সব বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারের কমান্ড মেনেই যুদ্ধ করতে হয়েছে।
এদিকে ১১/১২ এপ্রিল কাউকে কিছু না বলে এম. পি. ফজলুল করিম চলে গেলো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে। সম্ভবত: ১২ তারিখ রাতে আমিও ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত আমার আগেই ছিলো। কারণ আমি জানতাম যে,যুদ্ধে ভারত আমাদের সাহায্য করবে। আমি ৮ এপ্রিল তারিখে ঠাকুরগাঁও পৌঁছেই জানতে পারি যে,ভারত সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশে কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যেতে পারে। সম্ভবত: ভারত সরকার সীমান্ত খুলে দেয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই। এদিকে শহরের সকলেই তখন আশঙ্কা করছিলো যে,যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তান আর্মি ঠাকুরগাঁও চলে আসতে পারে। ১২ তারিখ রাতে দু’টি ট্রাকে আমরা আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে রওয়ানা হলাম। ঐ রাতেই আমরা আমাদের মীর্জাপুর গ্রামে এসে পৌঁছি। আমার সাথে আমার পরিবার,আমার ছোট ভাই ও তার পরিবার এবং আমার চাচাতো ভাইয়ের পরিবার ছিলো। পরদিন আমরা মির্জাপুর থেকে রওয়ানা হয়ে কোন্দিক দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা সঙ্গত হবে- সে সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ায় আবার মীর্জাপুর ফিরে আসি। ১৫ তারিখে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করি। এখানে আমাদের দু’টি ট্রাক ছিলো এবং দু’টি ট্রাকই আমাদের নিজস্ব। পরে ট্রাক দু’টি দিয়ে দেয়া হয় ই.পি.আর বাহিনীকে। ১৫ তারিখেই তেঁতুলিয়া থেকে দু’জন লোক মোটর সাইকেলে করে এসে আমাদের বললো যে, পাকিস্তানিদের হাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পতন হয়েছে,আমাদের দু’ভাইকে নাকি পাকিস্তানিরা খুঁজছে। এ সংবাদ পাওয়ার পরই আমরা ওপারে চলে যাই।
আমরা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসলামপুরের কাছে লক্ষ্মীপুর বলে একটা গ্রাম আছে,দুপুরে সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম এবং সেখানেই আশ্রয় নিলাম। এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরে ঠাকুরগাঁও এলাকার সকল আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছে। ইসলামপুরে তখন অনেক রিফিউজি। ভারত সরকারের নির্দেশে তখন সীমান্ত সংলগ্ন স্কুলগুলো বন্ধ করে সেগুলোকে সাময়িকভাবে আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সব ধরনের লোক সেখানে জমা হয়েছে। ঐ এলাকায় আমার বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন ছিলো। আমার বড় মামা ছিলেন জলপাইগুড়ি জেলার চামুর্সিতে,এটা একদম ভূটান সীমান্তে। তিনি আগে থেকেই সেখানে বসবাস করতেন। ঐ মামার বাড়িতে আমার পরিবারের সকল সদস্যকে রেখে আমি আবার ইসলামপুরে ফিরে আসি। এসে শুনি আমাকে থানায় রির্পোট করতে বলা হয়েছে। পরে থানা কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নাম ধাম সব লিখে নিয়ে গেলো। এখানে একটি কথা বলে রাখি,পশ্চিম বাংলায় সকল হিন্দুরা আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। অন্যান্য অঞ্চলের কথা আমি বলতে পারি না, এখানে তারা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আমাকে আশ্রয় দেয়া হলো একটা স্কুলে। ইসলামপুর থাকা অবস্হায় আওয়ামী লীগের লোকেরা আমাকে বললো যে,আপনি কলকাতা যান এবং খোঁজ খবর নেন কোথায় কি হচ্ছে,আপনি তো সামরিক বাহিনীর লোক। আমি দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করতাম যে, যুদ্ধ সংগঠিত হবেই। ১০ এপ্রিল তারিখেই ঘোষণা করা হয়েছিলো যে,যারা যুদ্ধে যোগ দিতে চান তারা যেন নিকটস্হ আওয়ামী লীগ- সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাজউদ্দীন সাহেব এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর আমি ইসলামপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে করে কলকাতা রওয়ানা হলাম। ২৫ এপ্রিল কলকাতার শিয়ালদা স্টেশনে পৌছলাম। আমি আওয়ামী লীগ নেতা প্রফেসর ইউসুফ আলীকে জানতাম। তিনি দিনাজপুরের লোক। কর্নেল ওসমানীকে জানতাম। কলকাতা পৌঁছে আমি জানতে পারি তাঁরা পশ্চিম বাংলার এম.পি. হোস্টেলে অবস্হান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। এম. পি. হোস্টেলে গিয়ে একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাঁকে আমার পরিচয় দেয়ার পর তিনি বললেন,তাঁর নাম সোহরাব হোসেন। যশোরের এম .পি. এ.। আমি জানতে চাইলাম কর্নেল ওসমানী কোথায় ? তিনি জানালেন যে,কর্নেল ওসমানী শিলিগুড়ির দিকে গেছেন। এম.এন.এ. প্রফেসর ইউসুফ আলীর কথাও জিজ্ঞাসা করলাম। বললেন,তিনি গেছেন তেঁতুলিয়ার দিকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেখানে আর একজন আসলো। তাঁকে দেখে মনে হলো লোকটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতে চাইলেন আমি কে ? আমি তাঁকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম যে,আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তিনি বললেন,আপনি একটু বসেন, আমি আসছি। সেখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তাঁর আর দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত বিকেল তিনটার দিকে লোকটা আসলো। তখন জানতে পারলাম,ওর নাম সিরাজুল আলম খান। একজন যুব নেতা। সে এসে আমাকে বললো যে,কর্নেল ওসমানী না হলে তো হবে না। তিনি কোন্দিন শিলিগুড়ি থেকে আসবেন তার তো ঠিক নেই। আপনি বরং ইসলামপুর চলে যান। সেখানে অপেক্ষা করেন। কর্নেল ওসমানী আসলেই আপনাকে খবর দেয়া হবে। আমি বললাম যে, আমি একটা আবেদনপত্র লিখে রেখে যাই। সিরাজুল আলম খান বললো,এটার দরকার নেই। এখন তো আপনার মতো মানুষেরই দরকার। এরপর আমি ইসলামপুর ফিরে আসলাম।
চলবে.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


