প্র: কলকাতা থেকে ফিরে এসে আবার কখন কলকাতা গেলেন ?
উ: কলকাতা থেকে ইসলামপুরে ফিরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পরও কলকাতা থেকে কোনো খবর পেলাম না। অথচ সিরাজুল আলম খান আমাকে বলেছিলো,ওসমানী সাহেব ফেরা মাত্র আমাকে খবর দেবে। শেষ পর্যন্ত মে মাসে আবার আমি কলকাতায় গেলাম। মে মাসের মাঝামাঝি সময় হবে। কলকাতা যাওয়ার আগে শিলিগুড়ির দিকে খবর নিলাম যে,গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার সীমান্ত অতিক্রম করেছেন কিনা। এ. কে. খন্দকার সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারলো না। তখন থেকে কলকাতাতেই আছি। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে থিয়েটার রোডের দিকে যাচ্ছি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। তখন দেখি এ. কে. খন্দকার অফিস গেটের সামনে দাঁড়ানো। আমরা পরসঙর পরসঙরকে দেখে আনন্দে উল্লসিত হলাম। খন্দকার সাহেবের সঙ্গে ওখানে কিছুক্ষণ আলাপ হলো। তিনি জানালেন তিনি লিটন হোটেলে দু’জন মিলে এক রুমে আছেন।
খন্দকার সাহেবের সঙ্গে দেখা হওয়াতে আমার মুক্তিযুদ্ধে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি আরো সহজতর হলো। কর্নেল ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করার পরও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আমার জন্য সহজ হচ্ছিলো না। কর্নেল ওসমানী একটু খ্যাপাটে এবং সন্দেহ প্রবণ লোক ছিলেন। তিনি বোধহয় আমাকে সন্দেহ করেছিলেন। যাহোক,তখন থেকে আমি কলকাতাতেই থেকে গেলাম। প্রথম দিকে সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ ছিলো না। যখন যে দায়িত্ব পাচ্ছিলাম সেটা করছিলাম। জুন মাসেই বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিলো যে,আমাকে যুব শিবিরের দায়িত্ব দেবে। সিদ্ধান্ত কার্যকরি হতে জুলাই মাস এসে গেলো। জুলাই মাসের শুরুতে আমি যুব শিবিরের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পাই।
প্র: যুব শিবিরে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি কোন কোন দায়িত্ব পালন করেন ?
উ: এ সময়ে আমার উপর কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিলো না। একেক সময় একেক কাজে সমঙৃক্ত করা হয়েছে। যেমন- জুন মাসে একদিন আমি লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান-এর সঙ্গে দেখা করি। আমি ১৯৫৬ সাল থেকে কাজী নুরুজ্জামানকে জানতাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি জানালেন যে,তাঁকে ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হচ্ছে,কিন্তু তিনি ঐ এলাকাটা ভালো চেনেন না। ঐ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর নজমুল। তিনি এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে দায়িত্ব পান লে. কর্নেল জামান। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন,তাঁর সঙ্গে ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় যেতে। কারণও ছিলো,আমি ছিলাম দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও এলাকার মানুষ। আমি এই এলাকা যেমন চিনতাম- তেমনি ঐ এলাকার রাজনৈতিক নেতা-ছাত্রনেতাদেরও চিনতাম। কর্নেল জামানের আদি নিবাস ছিলো পশ্চিম বাংলায়। তিনি আমাকে বললেন,আমি এই এলাকা তেমন চিনি না,আপনি উত্তর বঙ্গের লোক; আপনি আমার সঙ্গে গেলে খুবই ভালো হয়। আমি সন্মতি জানালাম এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিলাম।
আমরা একটি জীপে করে কলকাতা থেকে রওয়ানা হলাম দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও এলাকার দিকে। আমরা সরাসরি এলাম ৬ নম্বর সেক্টর এলাকা তেঁতুলিয়ায়। যার দায়িত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার এম. কে. বাশার। তাঁর হেডকোয়ার্টার তখন ছিলো তেঁতুলিয়ায়। আমরা তেঁতুলিয়া থেকে শুরু করলাম। তেঁতুলিয়া ঘুরে সেখান থেকে আসলাম ইসলামপুরে। ইসলামপুরে ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুরের- অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং এম. পি. ছিলেন। আমি ইতোপূর্বে ইসলামপুরে ওদের সঙ্গেই ছিলাম। কাজেই সকলকেই আমি চিনতাম। সন্ধ্যায় ইসলামপুরে যখন পৌঁছুলাম- তখন আমার ছোট ভাই,সেও একজন মুক্তিযোদ্ধা,যে আমার সঙ্গেই সীমান্ত অতিক্রম করেছিলো,তাকে এবং আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধুকে খোঁজ করলাম। তাদের সঙ্গে দেখা হলো। দেখলাম যে,তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে। ওরা দু’জন বললো যে,ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনের আন্ডারে তাদেরকে বাংলাদেশের অভ্যনরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো এবং তাদেরকে বলা হলো কয়েকজন নির্দিষ্ট মানুষকে হত্যা করার জন্য। অথচ আমরা জেনেছি যে,এরা পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিলো না বা বাংলাদেশ বিরোধী কোনো কাজও করেনি। লোকগুলোকে হত্যা করা হলো এবং সেই সঙ্গে লুটতরাজও চালানো হলো। ওরা আরো জানালো যে,বাংলাদেশের নিরপরাধ লোকদের মারার জন্য তারা এখানে আসেনি। সে কারণে তারা ফিল্ড ছেড়ে চলে এসেছে। এ ঘটনা জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকের। আমরা কেবল চুপ করে শুনলাম সব। এরপর আমরা ইসলামপুর থেকে রায়গঞ্জ এবং সেখান থেকে হাকিমপুর গেলাম। পশ্চিম দিনাজপুরের সাব সেক্টর ছিলো হাকিমপুর। বিকালে সেখানে পৌঁছে দেখা হলো ক্যাপ্টেন গিয়াসের সঙ্গে। এই এলাকা থেকে মেজর সাফায়াত জামিল সেই মুহূর্তে চলে যান জেড ফোর্সে কাজ করার জন্যে। হাকিমপুর গিয়ে শুনলাম আর এক কাহিনী। এক ইন্ডিয়ান সিনিয়র আর্মি অফিসার আমাদের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে,যাদের ভালো টেনিংও ছিলো না,তাদেরকে কেবল হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে বগুড়ায় পাঠিয়েছেন অপারেশনের জন্য। ক্যাপ্টেন গিয়াস বললেন,এই ত্রিশ জনের মধ্যে আটাশ জন ধরা পড়েছে এবং তাদেরকে পাকিস্তানিরা হত্যা করে। কেবল দু’জন পালিয়ে আসতে পেরেছিলো এবং তারাই এ সংবাদ দেয়। আমি এ সংবাদ শুনে মর্মাহত হয়েছিলাম। এরপর এখান থেকে লালগোলায় গেলাম এবং সেখান থেকে বহরমপুর। বহরমপুর থেকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর সফিউল্লাহ আমাদের সঙ্গী হলেন কলকাতায় আসার জন্য।
কলকাতা এসেই আমি যে কাজটি করলাম তাহলো- প্রথমেই আমি এ. কে. খন্দকার এবং প্রফেসর ইউসুফ আলীকে সীমান্ত এলাকার ঘটনাগুলো বর্ণনা করলাম। এ দু’জনের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা,তাদের ট্রেনিং,অস্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলাম। আমি বলেছিলাম, 1. No Guerilla fighter should be sent inside without training, 2. All Guerilla operations must be done under the leadership of our own people. আমার এই পরামর্শ এ. কে. খন্দকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে সেটি কার্যকর করা হয়েছিলো বলে আমি জানি। ৭ নম্বর সেক্টর এলাকা ছিলো বেশ বড় এবং সেখানে অফিসারের স্বল্পতাও ছিলো- সে কারণে কোনো কোনো সাব-সেক্টরে ভারতীয় সেনা অফিসারকে দেয়া হয়েছিলো কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য।
একজন গেরিলা যোদ্ধাকে কমপক্ষে তিন মাসের ট্রেনিং দিতে হয়। কিন্তু পরিস্হিতির কারণে সময় কমানো হয়েছিলো। তখন ৬ সপ্তাহ ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্হা করা হয়। আমি এই ৬ সপ্তাহের ট্রেনিং যেন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় সে ব্যাপারে জোর দিয়েছিলাম।
চলবে.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



