somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... মাহবুব সুমনের খেরোখাতা ব্যক্তিগত সাইটের ঠিকানা দিলাম, ইচ্ছে হলে ঢুঁ মারবেন।

সুমনের খেরোখাতা

http://www.mahbub-sumon.com]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29339433 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29339433 2011-03-06 19:44:43
বুদ্ধিজীবিয় বেশ্যাবৃত্তি আর কত দেখবো ?
এক সময় জানতাম অমুক লেখক তমুক ঘরানার, ওখান ছাড়া লেখনই না। কেউবা আওয়ামী ঘরানার, কেউবা বাম ঘরানার, কেউবা জামাত ঘেঁষা কলামিস্ট। যাই হোক, মেঘনায় অনেক পানি গড়িয়েছে, ভৈরবের আড়তে অনেক শুটকি বিক্রিও হয়েছে। কালের বিবর্তনে সেই ধারনাও বদলেছে। এখন একজন অনেক জায়গায় লিখছেন। আজ প্রথম আলোতে তো কাল ভোরের কাগজে, পরশু যুগান্তরে তো তরশু হালের "কালের কন্ঠে"। সুযোগে নয়া দিগন্তের মতো রাজাকারী পত্রিকাও বাদ যায় না । সে উনারা লিখতেই পারেন। কে কোথায় লিখবেন সেটা ধরিয়া দেবার আমি কে ! লিখে দুটা টাকা পান, পত্রিকার পাতায় নিজের নাম ছাপা হয়। উনাদের পেটে লাথি মারার চিন্তা করাই বেসম্ভব ব্যপার।

বেশ কদিন হলো মহা ধুমধাম করে "কালের কন্ঠ", তাদের শ্লোগান ' আংশিক নয় পুরো সত্য'। সত্য জিনিসটাকেই এরা খেলো করে ফেলছে কিনা সেটা পরে আসবে, হয়তো অন্য লেখায়। বিখ‌্যাত - কুখ্যাত সব "বুজী" সেখানে লেখা দিয়ে কালের কন্ঠকে ধন্য করেছেন। এক সময় রাজাকার মওলানা আবদুল মান্নানের ইনকিলাবকে লেখা দিয়ে ধন্য করেছিলেন হুমায়ুন আহমেদ , এখন দিয়েছেন খুনী -দর্নীতির হোতা- ভূমিদস্যু শাহ আলমের কালের কন্ঠকে। উনার মতো আরো অনেক রথি - মহারথিরাই সেখানে লিখছেন, এখানে তাদের কিছু তালিকা পাওয়া যাবে কালের কন্ঠ বনাম মুড়ির ঘন্ট (আলী মাহমেদ)

বেশ্যা যেমন টাকার বিনিময়ে দেহ বিক্রি করে তেমন এই সব বুদ্ধিজীবি টাকার কাছে লেখা বিক্রি করছেন। বিবেক এখানে বিবেচ্য নয়। বিক্রয় যোগ্য পণ‌্যের মতো এরা প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছেন। প্রয়োজন বোধ করছেন না দেখার কোথায় - কার কাছে বিক্রি হচ্ছেন। বেশ্যাও একটা নীতি মেনে চলে, এই সব 'বুজীর' সেই নীতিবোধও নাই। এরাই হয়তো অন্য পত্রিকার কলাম ভড়বেন দূর্নীতির বিরুদ্ধে, ভূমি দস্যুতার বিরুদ্ধে , দূর্নীতির বিরুদ্ধে, খুনের বিচার নিয়ে গরম গরম বুলি কপচিয়ে। এরাই নাকি আমাদের জাতির বিবেক হিসেবে গণ্য !!! ???

ধিক এই সব বুদ্ধিবৃত্তিক বেশ্যার প্রতি। রাজাকার কাশেমের নয়া দিগন্তে লিখলে যদি রাজাকার- হিডেনে জামাতি হতে হয় তবে খুনী- দূর্নীতির দোসর- ভূমি দস্যু- চিহ্নিত অপরাধী শাহ আলমের কালের কন্ঠে বা বাবুলের মতো চিহ্নিত ভূমিদস্যুর যুগান্তরে লিখলে তাদের কি বলা যাবে ??
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29080333 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29080333 2010-01-17 16:00:40
একাত্তরের যুদ্ধাপোরাধীদের বিচার কাজ শুরু করতে সরকার কতটুকু প্রস্তুত ?
ব্লগে রুবেলের এক পোস্টে দেখলাম গোল টেবিল বৈঠকে সবাইকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবারো নজাগরন ও সচেতনতা স্মৃস্টি করতে আহবান জানিয়েছেন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা ঠিকই আছে, আছে বিচার চাইবার আখুতি, আছে ঐকান্তিক জাগরন। কিন্তু কথা হচ্ছে আর কতটুকু জাগরন স্মৃস্টি হলে হলে সরকারের বাস্তব কিছু করার প্রেরণা জাগবে?

রুবেল - অরন্যরা সব কিছু ফেলে ফুলে পাগলের মতো মানুষের স্বাক্ষর জোগার করবে আর সেই স্বাক্ষরগুলো গুদামঘরে পঁচে মরবে সেটাতো হতে পারে না। সাধারন মানুষের মাঝে জাগরন ঠিকই আছে , সবই ঠিক ; আছে । এখন দরকার সরকারের কাজ শুরু করবার পালা, বিচার কাজ শুরু করবার পালা। এটা না করে হাজারো সুশীল গোল টেবিল করলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছে করে।

১) বিচারে কাজে কারা কারা অভিযুক্ত হবে ?
হাতে গোনা - মুখ পরিচিত কিছু গোআ- নিজামী জাতীয় জামাতি নেতা না একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী ও যুদ্ধাপোরাধী সকল রাজনৈতিক নেতা- কর্মী ?
মুখ চেনা কিছু পরিচিত পশুর বিচার হলে সেটা মুলত আই ওয়াশই হবে, পরিপূর্ন বিচার হবে না।
২) রাজনৈতিক অভিযুক্ত ছাড়াও যারা শান্তি কমিটিতে ছিলো বা কোলাবেরটর হিসেবে কাজ করেছিলো তারাও কি বিচারের সম্মুখিন হবে ?
৩) পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপোরাধীদেরও কি বিচারের সম্মুখিন করা হবে ?
৪) রাজাকার বাহিনীতে কাজ করা রাজাকার ও ইপকাফ এর সদস্য অবাঙালীরাও কি বিচারের সম্মুখিন হবে ?
এ ব্যাপরে সরকারের কোনো সুনির্দিস্ট ঘোষনা আছে কি ?

যাই হোক, ধরা যাক জাগরন স্মৃস্টি হলো। তার পর সরকারকে কিন্তু অনেক কাজ করতে হবে। আনুস্ঠানিক ভাবে অভিযোগ আনতে হবে, সেটার তদন্ত করতে হবে। তদন্ত শেষে পুলিশের অভিযোগপত্র জমা দেয়ার পরই বিচার কাজ শুরু হবে। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ন মামলা বলে এটায় এমনভাবে তদন্ত করতে হবে ও অভিযোগপত্র দিতে হয় যাতে আদালতে গিয়ে কোনো ফাঁক ফোকরেই যুদ্ধাপোরাধীরা ছাড় না পায়। অনেকে হয়তো বলবেন, তথ্য- উপাত্ত- প্রমান অনেক আছে। মানছি আছে; কিন্তু আবেগের কাছে যা প্রমান সেটা আদালতের কাছে অনেক সময়ই প্রমান হিসেবে গন্য না। আবেগ ও আদালত দু ভাবে চলে।

এসময় আরেকটি আরেকটি প্রশ্ন জাগছে মনে।

৫) বিচারের জন্য স্পেশাল ট্রাইবুনাল করা হবে নাকি সাধারন আদালতেই বিচার কাজ শুরু হবে?

যে আদালতেই করা হোক না কেনো আদালতের বিচারে অনেক সময় লেগে যায়। আদালতে যে রায়ই হোক না কেনো সেটায় উচ্চ আদালতে আপিল করা যায়। সব কিছু মিলে অনেক সময় লেগে যায় বাংলাদেশের বর্তমান বিচার ব্যবস্থায়। এটা একটা বড় আশংকার বিষয় আমার কাছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া এসময় উদাহরন হিসবে আসতে পারে ।

এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ন কাজে সরকারের বলার মতো কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না। গোল টেবিল বৈঠকে বা সেমিনারে সাদা কালো বাল ফেলানো ছাড়া কোনো কাজের কাজ হয় না।

আরেকটি কথা হলো,
তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের জন্য এমনটি কি কোনো সেল গঠন করা হয়েছে যারা এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে?
আইনজীবিদের নিয়ে কি কোনো বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে যারা আইনগত বিষয় নিয়ে কাজ করছেন ?

বর্তমান আওয়ামী সরকারের মেয়াদ থেকে ১ বছর চলে গেলো প্রায়। হাতে আছে ৪ বছর। এই ৪ বছরের শেষ ১ বছর যাবে পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে। থাকলো মোটে ৩ বছর। ৩ বছর কিন্তু খুব অল্প সময় এরকম একটি বিশাল কাজের জন্য।

কথা অনেক হয়েছে, অনেক প্রতিশ্রুতিও অনেক শোনা হয়েছে। এখন কিছু করবার পালা। এবার না হলে এই জীবনে আর হবে না যুদ্ধাপোরাধীদের বিচার কাজ।

পোস্ট মাহবুব সুমন.কম একই সাথে প্রকাশিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29039418 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29039418 2009-11-07 20:10:48
মৃত্যু এসে উনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যু আমাকে কস্ট দেয়নি, লজ্জা দিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মৃত্যুই এসে উনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর সমস্ত লজ্জার হাত হতে।

পত্রিকার পাতা খুলতেই চোখে পড়ছে এক গাদা গৎ বাঁধা শোকবার্তা। কাঁদতে কাঁদতে লুঙি ভেজানোর উপক্রম করছি আমরা। মৃতদেহ দেখতে বা জানাজায় দলে দলে আসা অমুক তমুকের সার্কাস দেখতেও খারাপ লাগছে না। আজ কালকার জামানায় এগুলো স্বাভাবিক। আগামী বছর ধুম ধাম করে উনার মৃত্যবার্ষিকী পালন করা হবে নিয়ম মেনে। পরের বছর আবেগের তোড় একটু কম থাকাতে সেটা একটু কম ধুম ধামের করে পালন করা হবে। আবেগ কমতে কমতে যখন সেটা যখন শুন্যে পরিণত হবে তখন উনার কথা স্মরন করবে শুধুমাত্র উনার পরিবার আর উনার শীষ্যরা। আমরা সুশীল মধ্যবিত্ত মেতে উঠবো অন্য কাউকে নিয়ে। আবেগ হোলো মধ্যবিত্তের ফ্যাশন। ঈদের ফ্যাশনের মতো আবেগও বদলে যায় বছর বছর - আবেগের ব্যক্তি/বস্তুও বদলে যায়।

অনেক সময়ই দেখেছি সিডি বা ক্যসেটের ফ্ল্যাপে গানের সুরকার/গীতিকারের নামের জায়গায় লেখা "সংগৃহিত"। ভেবেছিলাম হয়তো সেই মহান শিল্পী অনেক খেটে খুটে - বন বাদারে ঘুরে ঘুরে গান সংগ্রহ করে বাঙালী জাতির সংগীত সম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছেন। পরে শুনেছি, সেটা বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের লেখা - সুর করা। চরম অকৃতজ্ঞ এবং চোর সেই শিল্পী বেমালুম চেপে গিয়েছেন। পরে ধরা পরার পর ইয়ে ইয়ে বলে পার পেতে চেয়েছিলেন সেই ভদ্রবেশী চোর। এর পর যা হয় , শাহ আবদুল করিমের ভাগ্যে স্বীকৃতিতো দূরের কথা ; রয়ালটির ক্ষুদ্রাংশ টুকুও জুটেনি।

বেঁচে থাকতে শাহ আবদুল করিম‌ অনেক পদক পেয়েছিলেন, অনেক সম্মাননাও পেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে উনার পেটে যখন ভাত জুটতো না তখন কোনো সুশীলই তার খবর নেয়নি। এই মানুষটাই একদিন কস্ট নিয়ে বলেছিলেন
"এত সংবর্ধনা, সম্মান দিয়ে আমার কী হবে! সংবর্ধনা বিক্রি করে দিরাই বাজারে এক সের চালও কেনা যায় না"। (প্রথম আলো)

আজকে ফেসবুকের পাতায়, ব্লগের পাতায়, পত্রিকার পাতায় যারা শোকগাঁধা লিখছি ফ্যাশন করে তারাও কোনো খোঁজে নেইনি সেসময়।

এক বোতল ব্লাক লেভেলের দাম দিয়ে কয় সের চাল কেনা যায় সেটা ভাবছি, একটা ডিএসএলআর এর দাম দিয়ে কয় মাস পেট পুরে খাওয়া যায় সেটাও ভাবার চেস্টা করছি। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম যখন ক্ষুদায় কাতর ছিলেন, চিকিৎসার অভাবে ভাঙা কুঁড়ে ঘরে কাতরাচ্ছিলেন তখন অবশ্য এসব হিসেব করার ফুসরত হয়নি আমার বা আমাদের। এখন যা করছি তার সব কিছুই ভন্ডামী। এসব ভন্ডের মাঝে আমিও একজন।

ভাবছি সামনে কার পালা ?

এ লেখাটি সর্বপ্রথম মাহবুব সুমন.কম এ প্রকাশিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29010977 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/29010977 2009-09-15 17:25:06
শুভ জন্মদিন প্রিয় প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব
তারপর দেখি আমগো টুটুল চৌধুরির স্ট্যাটাসে লেখাআজ স্বল্প সময়ের এই জীবনে কত্ত কতো সীমাবদ্ধতা নিয়ে পার করে দেয়া জীবনের অনেকটা সময় ... এখনো আমি আপনাদের সামনে... এটাইবা কম কি? বন্ধু, তোমার ভালোবাসায় আমি আপ্লুত... এ পর্যন্ত যারা উইশ করেছেন/যারা জানাবেন বলে ভেবেছেন কিন্তু ভুলে গেছেন... এবং যারা জানাতে চান... না ... তাদের সকলকে শুভেচ্ছা... সংযম সবকিছুতেই ... শুভকামনা তো অবশ্যই থাকে/থাকবে সব সময়... ভাল থাকুন... আনন্দে থাকুন
এটা পড়েই মনে পড়ে গেলো আমার প্রিয় প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের জন্মদিন আজ।

শুভ জন্মদিন বস।
অনেক কিছুই লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু কি লিখবো সেটা গুছিয়ে উঠতে পারছি না। সুখ - শান্তিতে ভরে উঠুক জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত।

সবতে মিল্লা আওয়াজ তুলেন কেক্কুক খাইতাম ছাই<img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28999148 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28999148 2009-08-24 20:14:34
অতিথি দেবতা
প্রকৃতির সপ্ত-আশ্চর্যের শর্ট লিস্টে কক্সবাজারের নাম যখন নেই শুনতে পেলাম, তখন খারাপ লাগলেও অবাক হয়নি। হয়তো বড়াই করে আমরা বলি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, কিন্তু বড়াই করে বলতে পারি না সেখানকার সুযোগ সুবিধাগুলোর কথা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বাদ দিয়েই একজন বিদেশী কক্সবাজারে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করলে কি করবেন সেটা চাকুরিগত অভিজ্ঞতা দিয়েই আন্দাজ করতে পারি।

আন্তর্জালে কক্সবাজারকে নিয়ে পুর্নাংগ কোনো অফিসিয়াল ওয়েব সাইট এখনো দেখতে পাইনি যা দ্বারা কোনো পর্যটক প্রাথমিক তথ্য থেকে শুর করে একটা হোম ওয়ার্ক করতে পারবেন। একজন পর্যটক বিদেশে বেড়াতে গেলে অবশ্যই হোমওয়ার্ক করে যান, আমার পর্যবেক্ষন ও অভিজ্ঞতা তাই বলে।

অনলাইনের কোনো ওয়েবসাইটেই হোটেল /মোটেলে রুম বুকিং দেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে কক্সবাজারের কোনো হোটেল/মোটেলের সেরকম ওয়েবসাইট দেখতে পাইনি যা দ্বারা কোনো বিদেশী পর্যটক রুম বুকিং দিতে পারেন বা সেই হোটেল/মোটেল/রেস্ট হাউজ সম্পর্কে ধারনা নিতে পারেন। বেশীর ভাগ বিদেশী পর্যটকই বুকিং ছাড়া কোথাও যেতে চান না। ব্যাক প্যাকারদের ক্ষেত্রে অবশ্য সেটা তেমন খাটে না।

পর্যটন তথ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিদেশ হতে অনেকেই হয়তো বিমানে এসে ঢাকায় এসে নামলেন। সেখান থেকে কক্সবাজারে যেতে হলে কিভাবে যাবেন সেটা একজন নতুন মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যপার। পর্যটন কর্পোরেশনের একটি বুথ থাকলেই অনেক সময়ই সেটা হয় বন্ধ পাওয়া যায় বা দরকারী তথ্য পাওয়া যায় না। যেকোনো ভাবেই হোক সেই পর্যটক কক্সবাজারে এসে পৌঁছুলেন। এর পর ? কোথায় থাকা যাবে, কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যাবে , কিভাবে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যাবে ইত্যাদি নানাবিধ তথ্যে পাবার জন্য কক্সবাজারে কোনো ব্যবস্থাই নেই। “তথ্যকেন্দ্র” এটা যেকোনো পর্যটন কেন্দ্রের জন্য ফরজ জিনিস।

একজন বিদেশী পর্যটক শুধু বালি দেখতে আসবে না বা মুখের কথায় সমুড্র সৈকত দেখতে চলে আসবেন না। জেনে শুনে ও পৃথিবীর অন্যান্য ট‌্যুরিস্ট স্পটের সাথে তুলনা করেই আসবেন। যতই বড়াই করি পযটন কেন্দ্র হিসেবে কক্সবাজার এখনো শিশু।

কক্সবাজারে হয়তো হোটেল /মোটেল নামে কিছু বিল্ডিং তৈরি হয়েছে কিন্তু চরম অপেশাদারীভাবে সেগুলো চলছে। স্থানীয় মানুষের বিরূপ আচরন ও সুযোগসন্ধানী মনোবৃত্তি, বাজে আইন শৃংখালা পরিস্থিতি, সৈকতে সুযোগ সুবিধার অভাব ইত্যাদি নানা সমস্যাতো আছেই। পর্যটক আকর্ষন করতে হলে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতেই হবে। মাঝে মাঝে ভাবি দেশের পর্যটনের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গাগুলোকে নিয়ে ঠিক মত প্রচারণা, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, থাকা খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা, সার্বিক নিরাপত্তা, সুন্দর ও সাবলিল উপস্থাপনা, দায়িত্বশীল নজরদারী, পর্যটকদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, সর্বোপরি যা যা করা দরকার তা যদি আমরা দ্বায়িত্ব নিয়ে এবং আন্তরিকতার সাথে করি, তবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পর্যটক তথা বিশ্ববাসীর নজর কাড়বেই। আর পাশাপাশি আমাদের দেশের সুনাম যেমন বাড়বে তেমনি জাতীয় আয়ে এক বড় ভুমিকা পালন করবে।

একজন বিদেশী পর্যটক যা আশা করেন তা পুরন না করতে পারলে হাজার ভোটাভুটি করেও লাভ হবে না। যেখানে স্থানীয় পর্যটকদেরই কক্সবাজারে এসে হাবুডুবু খেতে হয় সেখানে বাহিরের মানুষদের অবস্থা চিন্তা করলে নিজেরই খারাপ লাগে।

কিছু দিন আগে এখানকার টিভিতে (অস্ট্রেলিয়া এসবিএস) “অতিথি দেবতা” শীরোনামে একটা বিজ্ঞাপন দেখাতো। প্রাইম টাইমে দেখানো সেই কমার্শিয়ালে ভারতের পর্যটনকে তুলে ধরা হতো। দেখা মনে হতো, বাংলাদেশেও অনেক কিছু আছে দেখাবার মতো কিন্তু আমরা অতিথিকে দেবতা না মনে করে মুরগি মনে করছি, যেনো পেলেই জবাই করা হবে।

এ অবস্থা শুধু যে কক্সবাজারে নয়,দেশের অন্য সব আকর্ষনীয় জায়গাতেই। আমরা শুধু যে আমাদের দেশকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছি তাই নয়, বিশাল এক ব্যবসা হারাচ্ছি।

মাহবুব সুমন.কম একই সাথে প্রকাশিত এবং আমারব্লগ এ সর্ব প্রথম প্রকাশিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28987149 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28987149 2009-08-01 14:07:04
অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্হানীয় বিশ্ববিদ্যালয় “অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি”তে টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত
গত শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০০৯, “ম্যানিং ক্লার্ক সেন্টারে” অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে এ আশংকাও প্রকাশ করা হয় যে, ভারত হয়তো টিপাইমুখকে “Bargaining tool” হিসেবে ব্যবহার করবে।


দক্ষিণ এশিয়ার নদী ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং ‘World Water Forum’ এর পরিচালক জেমি পিটক বাংলাদেশের সরকারের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশনকে (International Watercourse Convention) র‌্যাটিফাই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের হারানোর কিছু নেই। উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশ, দুটো দেশই এ চুক্তিতে সাক্ষর করেনি; যা আন্তর্জাতিক ফোরামে টিপাইমুখকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধক। বিভিনè উপাত্ত সহকারে তিনি দাবি করেন যে টিপাইমুখ বাঁধ সিলেট অঞ্চলের জৈববৈচিত্র, বিশেষত মৎস্যস্পদকে ধংস করবে যার প্রভাব হবে চিরস্হায়ী । তাছাড়া এ বাঁধের ফলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের বন্যার শিকার হতে পারে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন।

ভারতের বড় বাঁধের কারণে সৃষ্ট সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রিসার্চ স্কুল অফ প্যাসিফিক এন্ড এশিয়ান স্টাডিজের ফেলো ডঃ কু›তলা লাহিড়ী দত্ত। তিনি নদীর ওপর বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক “অতি নিয়নত্রনের” এর সমালোচনা করেন। টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতায় দুটো দেশের সরকারের বাইরে “তৃতীয় পক্ষ” উভয় দেশের সিভিল সোসাইটির মিলিত কার্যক্রমের উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সিডনী ওয়াটার্সের পরিবেশ বিজ্ঞানী ডঃ নার্গিস আক্তার এই বাঁধের সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন আন্তর্জাতিক আইন না মানা ও স্বচ্ছতার অভাবের জন্য তিনি ভারতীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

টিপাইমুখকে ভারত সরকার “Bargaining tool” বা দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে অন্য কোন ক্ষেত্রে সুবিধা আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন মানবাধিকার কর্মী, আইটি স্পেশালিস্ট একরাম চৌধুরী। তিনি মনে করেন আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিবর্তন করে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক পরাশক্তির ভুমিকা পালন করলেই ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়া প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হবে। তিনি আরও বলেন, টিপাইমুখ বাঁধের ফলে বাংলাদেশে “Environmental Refugee” র সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বিষয়টিও তুলে ধরা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের সকল বক্তা উভয় দেশের সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে এই নির্মাণকাজ বন্ধ সম্ভব নয় বলে অভিমত দেন। বিষয়াটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা অভিমত প্রকাশ করেন।

মুল খবরটি প্রিয় অস্ট্রেলিয়ায় সর্বপ্রথম প্রকাশিত। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28979636 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28979636 2009-07-17 18:00:20
দূখিত হাসান, চাকুরিটা এন্ড্রুই পাচ্ছে
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদরা তাদের ২ বছরের পর্যবেক্ষনের ফলাফল প্রকাশ করেছেন যেখানে তারা ৫০০০ এরও বেশী আ্যংলো, মধ্যপ্র্যচীয়, আদিবাসী, চায়নিজ এবং ইটালিয়ান বনাম ব্যবহার করা মিথ্যে জীবন তথ্য পাঠিয়েছিলেন। সিডনী, মেলবোর্ন এবং ব্রিসবেনের বিভিন্ন অনলাইন চাকুরির বিগ্যপ্তির প্রেক্ষিতে তারা এ সিভিগুলো পাঠিয়েছিলেন।

এই প্রতিবেদন দেখে গিয়েছে যে চায়নিজ ও মধ্যপ্রাচ্যীয় চাকুরি সন্ধান প্রার্থীরা সবচাইতে বেশী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অধ্যাপক এলিসন বুথ, অধ্যাপক এন্ড্রু লেই এবং গবেষক এলেনা ভারগানোভা লিখিত প্রতিবেদন "ক্ষুদ্রতর গোস্ঠীর মধ্যে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য আছে কি ? " অনুসারে একজন চায়নিজ চাকুরীপ্রার্থীকে শতকরা ৬৮ ভাগ বেশী আবেদন করতে হয় একজন আ্যংলো -স্যাক্সনের চেয়ে শুধুমাত্র সাক্ষাতকার পাবার জন্য।
মধ্যপ্রাচ্যীয়দের ক্ষেত্রে তা শতকরা ৬৪ ভাগ বেশী, আদিবাসীদের তা শতকরা ৩৫ এবং ইটালিয়ান চাকুরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে শতকরা ১২ ভাগ বেশী আবেদন করতে হয়।

গতমাসে ছাপা ক্যানেবরা টাইমস এর খবরটি অপটু হাতে অনুবাদ করে দিলাম। বিস্তারিত পরে জানাবার চেস্টা করবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28978647 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28978647 2009-07-15 14:52:56
যারা অস্ট্রেলিয়াতে মাইগ্রেশন নিয়ে আসছেন তাদের জন্য কিছু টিপস
এ পোস্ট নিজস্ব অভিগ্যতা ও পর্যবেক্ষনের সাথে সাথে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরছি। আশা করি যারা নতুন আসছেন তাদের কাজে লাগবে। পোস্টটি যারা মাইগ্রেশন নিয়ে আসছেন শুধুই তাদের জন্য, পড়াশোনা বা বেড়াতে যারা আসছেন তাদের জন্য নয়।

এ পোস্টটি অস্ট্রেলিয়াতে যারা আসছেন তাদের জন্যই লিখছি।

১.
যারা জীবনে প্রথমবারের মতো আসছেন তারা প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখিন হোন তা হচ্ছে " কালচারাল শক "। এটা সবারই হয়ে থাকে তবে প্রথমবারের মতো যারা দেশের বাহিরে দীর্ঘসময়ের জন্য থাকতে এসেছেন তাদের বেশী হয়। দেশে যা দেখে এসেছেন তার অনেককিছুই এখানে অনুপস্থিত দেখতে পেয়ে তারা শক্ড হয়ে যান, যদিও এ শক সাময়িক এবং কমাস বাদেই কেটে যায়। আস্তে আস্তে তারা স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে পারেন। একেক দেশের একেক রকম সংস্কৃতি, আশার কথা এটায় অভ্যস্ত হতে মানুষ খুব সহজেই পারে।

২.
যারা স্থায়ী অভিবাসী হিসেবে আসেন তারা দেশে কম-বেশী একটি ভালো ও নিশ্চিৎ অবস্থা থেকে এখানে আসেন। এখানে এসে তাদের মুলত শুন্য থেকেই শুরু করতে হয়। এই স্ক্র্যাচ স্ট্রার্টিং অনেকের কাছেই অভিশাপের মতো মনে হয়। মনে রাখতে হয়, যারা মাইগ্রেন্ট তাদের সবারই এটা হয়েছে, নিজেকে একা ভাবার কোনো কারন নেই। অস্ট্রেলিয়ায় চাকুরিদাতাদের একটি প্রবনতা হলো অস্ট্রেলিয়াতে কাজের অভিগ্যতা ও অস্ট্রেলিয়ান ডিগ্রী যা দেশ থেকে আসা কারো থাকে না; এ কারনে নিজের ফিল্ডে চাকুরি খুঁজতে গিয়ে তারা প্রচন্ড সমস্যা ভোগ করেন। তবে চেস্টা চালাতে থাকলে এটা উৎরানো সম্ভব ও অনেকেই এটা করতে পেরেছেন, দরকার 'হাল না ছেড়ে চেস্টা চালিয়ে যাওয়া'; এটাই মুল সুত্র। যোগ্যতা থাকলে নিজের ডোমেইনে চাকুরি পাওয়া যায়।

৩.
প্রথম অবস্থায় এসে নিজের ফিল্ডে চাকুরি না পেয়ে অনেককেই মনোকস্টে ভুগেন। হয়তো দেশে সফট ওয়্যার ইন্জিনিয়ার ছিলেন বা সরকারী আমলা ছিলেন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু এখানে এসে প্রথম অবস্থায় চাকুরি না পেয়ে তাদের হয়তো রেস্টুরেন্টের রান্না ঘরে কাজ করতে হয়, হয়তো ট্যাক্সি চালাতে হয়, হয়তোবা সুপার মার্কেটে কাজ করতে হয়। দেশে এ ধরনের কাজকে ছোট করে দেখতে দেখতে মন মানসীকতা এরকমই হয়ে যায় যে তারা এখানে এসে এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে হিনমন্যতায় ভুগেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াতে সব ধরনের কাজকেই সম্মান করা হয়, মানুষ হিসেবে সম্মান করা হয়, এখানে অন্য কিছু বিচার্য না। এজন্যও গার্বেজ কালেক্টরও এম.পি হতে পারেন, এজন্যই মন্ত্রি বা বিশাল আমলার সন্তান প্লাম্বারের কাজ করে নিজের কাজ লুকায় না, গর্ব করে বলে। দেশ থেকে যারা আসছেন তারা তাদের মধ্যযুগীয় ইগোকে দেশের মাটিতে রেখে আসবেন।

৪.
বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের দেশ থেকে যারা মাইগ্রেশন নিয়ে আসছেন তাদের বেশীরভাগেরই ইংরেজী বলতে ও বুঝতে খুব সমস্যা হয়। আই.ই.এল.টি.এস এ ভালো স্কোর পাওয়া আর তার বাস্তব প্রয়োগ ভিন্ন জিনিস। ইংরেজীর সমস্যার কারনে তারা ভালো চাকুরি পান না। যারা এ সমস্যা কাটাতে পারেন তারা ছাড়া অন্যদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এটার বিকল্প নেই।

৫.
আরেকটি সমস্যা যা দেশ হতে আসা স্থায়ী অভিবাসীরা মুখোমুখি হোন তা হচ্ছে " সিস্টেম" । একেক দেশ একেকভাবে চলে, একেক ভাবে ভাবে। বাংলাদেশে যে সিস্টেমে তারা চলে এসেছেন সেটা এ দেশে আশা করা বোকামী। নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে, এখানকার সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে। চাপা মারা, সময়ের মুল্য না দেয়া, ধান্দাবাজী, দূর্নীতি করার প্রবনতা, ইত্যাদি ইত্যাদি এখানে করলে চলেবে না। এখানের মতো চলবে হবে। তবে নিজস্ব স্বকীয়তা বিসর্জন দিতে বলছি না।

৬.
যারা এখানে আসছেন বা নতুন এসেছেন তারা অনেক সময়ই রঙিন চশমা পরে রঙিন স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তাদের বাস্তববাদী হতে হবে। দেশে থেকে এখানকার অনেক রঙিন গল্প, অনেক মিথ্যে গল্প তারা শুনতে শুনতে তারা যে স্বপ্নের জগৎ গড়ে তুলেন তা এখানে মিথ্যে হয়ে যায় আসার পর। তবে স্বপ্নকে স্বার্থক করা সম্ভব, অনেক অনেক মানুষ করেছেন, আপনিও পারবেন। বাস্তববাদী হতে হবে, কঠিন পরিশ্রম করতে হবে সফল হতে।

৭.
মানুষ তার স্বপ্নের সীমা ছুতে পারে, আপনিও পারবেন। শুধু দরকার " লাইনে থাকা, লাইনচ্যুত হওয়া যাবে না।" ধীরে ধীরে সব কিছুই আপনি নিজেই শিখে নেবেন, বুঝে নিবেন। আশাহত হওয়া যাবে না। সফল আপনি হবেনই।
------
শুভকামনা।

অন্যরাও যোগ করে পারেন নিজেদের টিপস গুলো।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28973444 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28973444 2009-07-04 15:06:39
একদা ক্ষমতাশালী একজন ক্ষমতাহীন মানুষের পদাবলী
আজকের গল্পের একটি চরিত্র আমারই এদেরই একজনকে নিয়ে। কোনো এক সময় তিনি পুলিশে ছোটখাটো একজন অফিসার ছিলেন। এখন অফুরন্ত অবসরে রাজা উজির মারেন, বিশাল বিশাল ফাইল তৈড়ি করে সারা জীবনের সন্চয়ের হিসেব নিকেশ করেন। অবশ্য ফাইল তৈড়ি করা ছাড়া কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না।

বেশ ক বছর আগের কথা । যথারীতি ব্যান্ডেজ বেঁধে উনি অফিস করছেন, দূপুরে ফায়ারিং প্রাকটিসও করছেন। গুলি টার্গেটে পৌঁছুচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে অবশ্য তেমন মাথা ব্যাথা দেখা যায়নি উনার মাঝে। গুলি ছোঁড়া হচ্ছে এটাইতো অনেক কিছু ! প্রাকটিস শেষে গতদিনের দেয়া ফখরুদ্দিনের কাচ্চি না আজকের হাজির বিরিয়ানী খেতে ভালো সেটা নিয়েই মনে হয় বেশী মাথা ব্যাথা ছিলো উনার। এটা নিয়েও গল্প বলছি না আজ।

যাই হোক; আবেগীয় মানুষদের মাঝে যেটা হয় । বাসায় এসে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পরিবেশ কত সুন্দর, কত নিরাপদ সেটা নিয়ে মোটামুটি একটা বড় বক্তমা ঝেড়ে ফেল্লেন। ঢাকার মানুষ কেনো বোটানিক্যাল গার্ডেনে সকাল বিকাল বেড়াতে যায় না সেটা নিয়ে কস্ট প্রকাশ করার সাথে সাথে সাংবাদিকরা সেখানকার ছিনতাই নিয়ে গল্প ফাঁদে , কেনোই বা হকারদের হয়রানী নিয়ে নিউজ করে মানুষের মাঝে আতংক স্মৃস্টি করে সেটা নিয়ে সাংবাদিকদের একরকম ঝেড়েই ফেলেছিলেন। পুলিশদের সাংবাদিক বিদ্বেষ অবশ্য সেটায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিলো। বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারনা না থাকাতেই উনি এসব বলেছিলেন। একগাদা ডি.বি. অফিসার গাড়ি হাঁকিয়ে সকাল বিকেল সেখানে যাচ্ছেন , গুলি ফোটাচ্ছেন ! আর কোন ছিনতাইকারীর বাপের সাধ্য আছে সেখানে যাবার ? আর সেটা দেখেই উনার ধারনা হয়েছিলো ওখানকার পরিবেশ কতো সুন্দর !!

এত সব কিছুর বলার উদ্দেশ্য, পুলিশের অফিসাররা নিরাপদ পরিবেশ বসে ও ক্ষমতার বলয়ে বাস করে আশে পাশের কতকিছুই যে দেখতে পান না-- কতকিছুই যে বোঝার ক্ষমতা হারান সেটাই বোঝানো। এটা যে শুধু উনার ক্ষেত্রেই হয়েছে সেটা নয়, এটা আমি অনেক পুলিশ অফিসারদের মাঝেই দেখেছি। উপরের ছোট্ট একটি উদাহরন দিয়ে জিনিসটা বোঝাতে চেয়েছি। চাইলে আরো অনেক উদাহরন দেয়া যাবে। অবশ্য এ বোঝার ক্ষমতাহীনতা বা বোধহীনতা অনেক অনেক সময়ই ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকে সেটাও অস্বীকার করছি না।

এসব পুলিশ অফিসার বা ক্ষমতায় থাকা মানুষগুলোর সমস্যা শুরু হয় যখন তারা ক্ষমতা হাড়িয়ে সাধারন মানুষের কাতারে এসে দাঁড়ান। সেসময় পরনে তারকা লাগানো ইউনিফর্ম থাকে না, নীল রঙের পুলিশের গাড়ি থাকে না, বডি গার্ড থাকে না, স্যালুট করবার কেউ থাকে না। সম্মান করে স্যার বল্লেও যখন আদেশ শোনবার কেউ থাকে না তখন জীবনটাকে খুব কাছ থেকে দেখে উনাদের অনেকেই অসহায় হয়ে পড়েন। অবশ্য যে সমস্ত পুলিশ অফিসার অজস্র টাকার মালিক ও রাজনীতির ছায়ার নৃত্যরত তাদের ক্ষমতার হেরফের হয় না, নাটক তখন টিলিফিল্মে রূপ নেয়।

এবারের সিকোয়েন্সে ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা। গত দু মাস ধরে আমাদের পরিবার একটি দূঃসময় পার করছে যার আপাত সমাধান গতকাল আমরা করতে পেরেছি । যে সমাধান আমরা করতে চেয়েছি আইনের মাধ্যমে, যে সমাধান আমরা করতে চেয়েছি প্রশাসনের মাধ্যমে, যে সমাধান আমরা করতে চেয়েছি শান্তিপূর্ন ভাবে সেই সমাধান আমাদের করতে হয়েছে আইন না ভেঙে - আইনের ফাঁক গলে শক্তি দিয়ে। আদালত যখন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়, পুলিশ যখন টাকার কাছে বিবেক বিক্রি করে, রাজনীতির নামে তথাকথিত দেশ সেবকরা যখন টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না, স্বজনও যখন পিঠে দেখায় তখন কিইবা করা থাকে আয়ের একমাত্র সংস্থানকে নিজের দখলে ফীরে পেতে ? হয়তো লিখে লিখে অনেক কিছুই বলা যায় - গলাবাজী করা যায় কিন্তু বাস্তবতা সবসময়ই অন্য কিছু বলে।

এর সব কিছুই হয়েছে আমার বাবার চোখের সামনে, যিনি এ গল্পের এক চরিত্র বটে। দিন দূপুরে আয়ের একমাত্র সংস্থানের বেআইনী ভাবে দখল হয়ে যাওয়া , সাহায্যের জন্য এক সময়ের সহকর্মী পুলিশদের কাছে ধর্না দেয়া , আদালত ঘুরে ঘুরে টাকার মোচ্ছবে সামিল হওয়া , দেশ সেবকদের দরজায় দরজায় ঘুরে ক্লান্ত হওয়া, অনেক কিছুই হয়েছে- কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

অথচ উনার ধারনা ছিলো এর সবগুলোই অসম্ভব ! সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে যে সম্ভব সেটা উনাকে দেখতে হয়েছে। আমার বলেছি শক্তির বদলা শক্তি দিয়েই দিতে হয়। উনি শুনতে চান নাই। এখনো বিশ্বাস করেন এভাবে কোনো কিছু দখল হতে পারে না , পুলিশে এখনো ভালো মানুষ আছে, পুলিশ পুলিশের মাংস খায় না, আদালতে এখনো সুবিচার পাওয়া যায় , ইত্যাদি ইত্যাদি। হয়তো আজ উনি উনার এতকালের বিশ্বাস- এতকালের ধারনা ভেঙে যাওয়াতে কস্ট পাচ্ছেন, অবাক হচ্ছেন। আমরা উনাকে বলছি ব্যাকডেটেড - ভুল চিন্তার মানুষ - ভুল সময়ের মানুষ - হয়তো অবাকও হচ্ছি কি ভাবে এতটা বছর পুলিশে কাজ করলেন।

হয়তো আজ হতে ৩০ বছর পরে আমার সন্তানও আমার অনেক কিছুতে অবাক হবে, যেমনটি হচ্ছি আমি আমার পিতাতে। হয়তো আমার মতো আমার সন্তানও আমাকে বলবে ভুল চিন্তার মানুষ - ভুল সময়ের ভুল মানুষ, যেমনটি বলছি আমি আমার পিতাকে। হয়তো আমার সন্তানো আমার মতো আমার পিতার কস্টকে যেভাবে বুঝতে পারছি , সেভাবেই বুঝতে পারবে।

দোষ দেবার এ চক্রটা চলতেই থাকবে। মাঝ খান থাকে মানুষ পরিবর্তিত হতে বাধ্য হবে যেভাবে আমার পিতা হচ্ছেন, আমি হচ্ছি। মাঝ খান থেকে হারিয়ে যাবে বিশ্বাস নামের অমুল্য বস্তু।

অনেক কাল আগে থানার সদর দরজার বাহিরে কিছু মানুষকে অসহায়ের মতো বসে থাকতে দেখতাম। সময়ে মানুষের মুখগুলো বদলে গেলেও ঘটনার রকমফের হতো না। বিচারের আশায় - একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় একদল অসহায় মানুষের পুলিশের কাছে ছূটে আসা। নিরাপদ দূরত্বে থেকে সেসব মানুষগুলোর আকুতি হয়তো পিতার হৃদয়ে স্পর্শ করতো না কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে একদা ক্ষমতাশালী সেই মানুষদটিই যখন সেই অসহায় মানুষগুলোর কাতরে নেমে এসেছিলেন তখন কি একবারের জন্যও সেই মানুষগুলোর চেহারে ভেসে উঠেছিলো উনার চোখে মাঝে ? কে জানে !
হয়তোবা - হয়তোবা না।

( লেখাটি আমারব্লগে পূর্বে প্রকাশিত )।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28972035 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28972035 2009-07-01 10:16:45
জন্মদিনের কড়চা
জন্মদিনে ঘটা করে কিছু করবার বয়স সম্ভবত পার হয়ে এসেছি। এখন ইচ্ছেও হয় না তেমন একটা কিছু করতে। এটা কিন্তু মিথ্যে বলছি; এখনো ইচ্ছে হয় কেকে মোমবাতি সাজিয়ে এক নিঃশ্বাষে সবগুলো মোমবাতি নিভিয়ে দিতে, ফানুস দিয়ে ঘর সাজাতে - রঙ বেরঙের কাগজ দিয়ে ঘর সাজাতে। কিন্তু করা আর হয়ে উঠে না। এখন যা কিছু করি তার সবটুকুই একান্তই নিজের মাঝে।

গত বছর জন্মদিনের দিনটি কেটেছিলো অফিসের ডেস্কে সামনে বসে ভুঁরু কুঁচকিয়ে বিরক্তিকর এক সিস্টেমের এনালাইসিস করে , আর সন্ধ্যায় বউকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের আলো আঁধারিতে পেটপুঁজো। এবারে যে তেমনটি হবে না সেটা আগেই জানা ছিলো। বউ- ছেলে দেশে বেরাতে যাওয়াতে এবারের জন্মদিনটি একাকীই কেটেছে। আগে থেকেই ডে অফ নেয়া থাকাতে বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে দেশে ফোন করেছি। মাঝ রাত থেকেই অবশ্য অনেকগুলো মুঠোফোনের সংক্ষিপ্ত বার্তাও পেয়েছি বন্ধু - ভাই- বোন - আত্মীয়দের কাছ থেকে, জন্মদিনের শুভেচ্ছা। ভালোই লাগে শুভেচ্ছা পেতে। তারপরো কেনো জানি ছোট বেলা - কৈশোর বেলার জন্মদিন গুলোর কথা মনে পরে। সে সময় কার্ড দেয়ার চল ছিলো, এখনতো অনেকেই ই-মেইলে ই-কার্ড পাঠিয়েই দায় সেরে ফেলেন। কাগুজে কার্ডগুলোতে যে মায়ার স্পর্শ লেগে থাকতো তা আর পাওয়া হয় না। বড্ড মিস করি সেই ভালোবাসার স্পর্শটুকু।

বিকেলে টুকটাক শপিং করে ফুডকোর্টে ফ্রায়েড চিকেনকে যখন সাইজ করতে ব্যস্ত তখন পাশেই এক দঙল ছেলে-মেয়ের হইচই জন্মদিনের পার্টি নিজের সেই বয়সের সময়গুলোর কথা মনে পরে যাচ্ছিলো। মডেল স্কুলের হোস্টেলে থাকতে এমনি এক জন্মদিনে নজরুল হাউসের পেছনের দেয়াল টপকিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের পারাটা- টিকিয়া -চাপ খেয়েছিলাম সবাই এদের মতোই হইচই করে। কি সুন্দরই না ছিলো সেই সব দিনগুলো ! আহ, আবার যদি ফেরত যাওয়া যেতো সে বয়সে , সে দিন গুলোতে !!

গত বছর ডিনারে ছিলো পশ মরোক্কান রেস্টুরেন্টে , আজ রাতে ডিম ভাজি ও গত রাতে রান্না করা মোটা চালের ভাত। ম্যারিড ব্যাচেলর হলে যায় হয় আর কি। রাতে বাসায় ফীরে নেটে গুতোগুঁতি করেই সময় কাটালাম। বাসার সবার সাথে ভিডিও কনফারেন্সিং করে মনটা একটু ভালোও হয়েছে। এভাবেই কাটলো আমার ৩২ তম জন্মদিন।

হেপ্পি বাড্ডে মাইট।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28941442 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28941442 2009-04-22 23:24:08
"শহীদ" কিভাবে হওয়া যায় সেটা নিয়া ভাবছি যে রিকশাচালক গুলিতে মারা গেলো সে শহীদ না,
যে বিডিআর সুবেদার গুলিতে মারা গেলো সে শহীদ না,
যে ছাত্রটি ওষুধ কিনতে গিয়ে গুলিতে মারা গেলো সেও শহীদ না।

এদের "রাস্ট্রীয়" মর্যাদায় দাফন হবে না,
জাতীয় পাতাকায় মুড়িয়েও দেয়া হবে না কফিনটি।

এদের ছেলেমেয়েরা আজীবন সরকারী খরচে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে না।
৫ লাখ টাকা করে টাকাও জুটবে না তাদের ভাগ্যে।
অন্য যারা মারা গিয়েছে তাদের কথা তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম।

নমঃশুদ্রদের ভাগ্যে এরকমটিই হয়।
এদের নিয়ে কোনো শোক গাঁথাও লেখা হবে না, হবে না কোনো কলাম লেখা।

এরা আমজনতা; "শহীদ" হবার যোগ্যতা এদের নেই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28917958 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28917958 2009-02-28 12:21:24
ভারত মহাসাগরে হারিয়ে যাওয়া ( থাই নৌবাহিনী কতৃক ) হতভাগ্য মানুষগুলো নিয়ে নিউজ ক্লিপ

ভারত মহাসাগরে হারিয়ে যওয়া হতভাগ্য মানুষগুলো নিয়ে নিউজ ক্লিপ। অস্ট্রেলিয়া এসবিএস ওয়ার্লড নিউজে আজকের নিউজটি দেখলাম।



আপডেট ( ০১.০২.২০০9 )



03.02.2009]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28903113 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28903113 2009-01-27 18:03:54
গাজার প্রতিটি মৃত্যু যখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়
দেশের সংবাদপত্রগুলো যখন নির্বাচন নিয়ে মহাব্যস্ত তখন প্যালেস্টাইনের গনহত্যা অনেকের চোখকে এরিয়ে যাচ্ছে ইচ্ছে করেই, কিন্তু মানুষের বিবেকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে নোংরা রাজনীতির কাছে মানবতা কতটুকু অসহায়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৭৫, যা ক্রমাগত বাড়ছেই। টিভির খবরে নিহত-আহত মানুষ নিয়ে অসহায় ছুটোছুটির ফাঁকে আকাশ থেকে ধেয়ে আসছে মৃত্যুবান। মানবতা সেখানে অসহায় - শান্তির বাণী সেখানে অদৃশ্য -ধর্মের বাণী যেখানে অচ্যুত।

গাজার এই মানুষগুলো কি আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো শান্তিতে বাঁচতে চায়নি ?
নৈতিকতার কোন মানদন্ডে এই হত্যাকে সমর্থন করা যায় ?
আইনের কোন দৃস্টিকোনে এ হত্যাযগ্যকে সমর্থন করা যায় ?
এ গনহত্যা কি আসলেই প্রয়োজনীয় ছিলো ?
সীমান্তের এপার-ওপারের সাধারন মানুষ কি এ হত্যা- সন্ত্রাসকে সমর্থন করে ?

এইসব প্রশ্নের উত্তর কখনোই পাওয়া যাবে না, যায় না। নোংরা ক্ষুদ্র রাজনীতি, যুদ্ধকৌশল, নিরাপত্তা ও সীমান্ত প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রনীতি এবং একই সাথে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিবেচনার উপরে নির্ভর করে এইসব প্রশ্নের উত্তর। তবুও উত্তর মেলে না।

শান্তির মা আজ মৃত। ইশ্বর আজ বধির-মৌন।

গাজার এই সব মানুষগুলোর জন্য সমবেদনার সাথে সাথে সৌহার্দ পোষন করছি। এ চরম অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাই। প্রতিরোধের সাথে সহমর্মিতা জানাই প্রতিটি মুহুর্তে।

ছবি সত্বঃ বিবিসি]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28889354 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28889354 2008-12-28 21:31:08
যৌবনজ্বালার সাথে না থাকতে পারি, তবে অমি পিয়ালের সাথে আছি
প্রকৃত যু্দ্ধে অনেকেই হয়তো দামী ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে পাখির ছবি তলে বেরাবেন, কেউবা গিটার বাজিয়ে " বউ কথা কও" সুর তুলবেন, কেউবা যত্ন করে বালিকাদের গাল কামড়ানোর স্বপ্নদোষে ভুগবেন , কেউবা পুরুষাংগ বাঁচিয়ে ইয়ারা নদীর পারে হাওয়া খেয়ে বেরাবেন কিন্তু অমি পিয়ালকে যু্দ্ধের ময়দানে ঠিকই দেখা যাবে।

বস, হয়তো চলার পথে অনেক সময়ই আপনার সাথে আমার মতের মিল হবে না। হয়তো গালী বিনিময় হবে তবুও যু্দ্ধে ময়দানে আমাকে পাশে পাবেন। কসম খোদার। আপনার ভাষাতেই বলছি " মহল্লায় আছি, দরকার হইলে আওয়াজ দিয়েন। "

মুক্তিযু্দ্ধেকে জীবনের পরতে পরতে মিশিয়ে ফেলা অমি পিয়ালের পাশে আমি আছি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28885819 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28885819 2008-12-21 19:09:33
বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর জন্য একটি ভন্ড এলিজি বীরাঙ্গনা গুরুদাসী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাতের লাঠির আলতো বাড়ি মেরে আর এসে বলবেন না, ‘কেমন আছিস বাবা? ভালো আছিস তো? দে কয়ডা টাহা (টাকা) দে, তোরা না দিলি পাব কনে ক।’

স্বাধীনতার পর কোনো এক বিষন্ন দূপুরে বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করে আমরা উনাদের ধন্য করেছিলাম, যথাসময়ে ভুলেও গিয়েছিলাম। দীর্ঘ ৩৭ টি বছর ধরে উনাদের কেউ হয়তো বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর মতো ভিক্ষের ঝোলা হাতে আমাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেরিয়েছেন, কেউবা আত্নহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন আবার কেউবা আজো কস্টে নিভৃতে কাঁদেন। পাগলী বলে হয়তো অনেকের দিকেই ছুড়ে দিয়েছি ঢিল।

স্বাধীনতার জন্য নিজের সম্মান বিলিয়ে দিতে বাধ্য হওয়া এসব মানব সন্তানের খবর নেবার তাগিদ বা প্রয়োজন অবশ্য আমাদের নেই। আমরা উনাদের বীরাঙ্গনা বলে নিজেদের ধন্য করেছি কিন্তু সমাজে-পরিবারে গ্রহন করে নেইনি।

আজ পত্রিকার ভেতরের পাতার ছোট্ট কবরটি পড়ে কেউবা তাকে জননী ডাকছি, আমার মতো কেউবা ব্লগের পাতায় ভন্মামী করে এলিজি লিখে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি কিন্তু জীবদ্দশায় কেউ তাঁদের খোঁজ নেবার প্রয়োজনটুকু বোধ করিনি। জীবিত অবস্থায় কিছু না করে মারা যাবার পরে এসব করা ভন্ডামী ছাড়া আর কি !

বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় না থাকাতে রাস্ট্রীয় সম্মান অবশ্য উনার ভাগ্যে জুটেনি। যে মানুষটি ৩৭ টি বছর কোনো সম্মান পাননি দেশের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে, আমাদের কাছ থেকে; তার কাছে একদিনের লোক দেখানো সম্মানে কি এসে যায়।

বীরাঙ্গনা গুরুদাসী ওপার থেকে তাকিয়ে অভিশাপ দিয়ে বলছেন " ধিক এই অকৃতগ্য বাঙালী জাতি"।

------------------------------
বীরাঙ্গনা গুরুদাসী আর নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক( প্রথম আলো) , খুলনা

বীরাঙ্গনা গুরুদাসী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাতের লাঠির আলতো বাড়ি মেরে আর এসে বলবেন না, ‘কেমন আছিস বাবা? ভালো আছিস তো? দে কয়ডা টাহা (টাকা) দে, তোরা না দিলি পাব কনে ক।’ সবার পরিচিত সেই অসহায় গুরুদাসী মন্ডল (৬৫) চিরবিদায় নিয়েছেন। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে নিজ বাড়িতে গত ৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে তিনি পরলোকগমন করেন। ছাব্বিশে মার্চ, ষোলই ডিসেম্বর, একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে আর তাঁকে দেখা যাবে না।
গুরুদাসীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে খুলনার সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধারা কপিলমুনিতে হাজির হন। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুর রউফ, পাইকগাছার নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। একাত্তরের এই দিনে কপিলমুনি হাইস্কুলের যে মাঠে গণ-আদালত বসিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল, সেই মাঠেই গুরুদাসীকে শেষ শ্রদ্ধা ও সালাম জানায় মুক্তিযোদ্ধাসহ উপস্িথত সাধারণ মানুষ। এ দৃশ্য দেখে কপিলমুনির হাজার হাজার শোকার্ত সাধারণ মানুষ।
গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য পুলিশের একটি চৌকস দল উপস্থিত থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গুরুদাসীর নাম না থাকায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তবে মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় পতাকা দিয়ে তাঁর মরদেহ আচ্ছাদিত করে পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে শেষ সালাম জানান। পরে কপিলমুনি শ্মশানঘাটে তাঁকে দাহ করা হয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28881447 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28881447 2008-12-12 18:00:19
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১৩ শেষ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা )
প্র: স্বাধীনতার পর সকল মুক্তিযোদ্ধাকে কোনো একক সরকারি ব্যবস্হার অধীনে আনা হলো না বা তাদেরকে কাজে লাগানো হলো না। এর ফলে সমাজে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো- এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন ?
উ: মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের জন্য বিরাট একটা ফোর্স ছিলো। সেই ফোর্সকে বঙ্গবন্ধু সরকার একদম ভুলে গেলো। তাদের জন্য কিছু করা হলো না বা তাদেরকে নিয়ে কিছু করা হলো না। তাদেরকে বাড়ি চলে যেতে বলা হলো। অথচ উচিত ছিলো এদের সকলের একটা তালিকা তৈরি করে মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুলে তাদেরকে দেশ গড়ার নানামুখী কাজে লাগানো। এটা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বুঝেছিলেন। সে জন্য তিনি মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব বুঝলেও অন্য নেতারা সেটা বোঝেননি। বঙ্গবন্ধু মিলিশিয়া বাহিনী গঠন পরিকল্পনা বাতিল করে দিলেন। এর ফলে সমাজে ক্রমশ: এক ধরনের অস্হিরতা দেখা দিলো।

আর একটি বিষয়ে বলবো। স্বাধীনতার পরও পাকিস্তানি যে শাসন ব্যবস্হা ও কাঠামো ছিলো- সেই কাঠামো ও প্রশাসন ব্যবস্হা রেখেই বঙ্গবন্ধু কাজ শুরু করলেন। একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী শাসন ব্যবস্হা যা মানুষের প্রত্যাশা ছিলো- সেটা তিনি করলেন না। এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ন ভুল ছিলো। এই কাঠামো ভেঙে নতুন করে স্বাধীন বাংলার উপযোগী করে প্রশাসন ব্যবস্হা গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিলো। অনত: যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো তাদেরকেই মূল দায়িত্ব দেয়া উচিৎ ছিলো। স্বাধীনতার পর পরই আপনারা শুনেছেন বহুল আলোচিত,বহুল উচ্চারিত সিকসটিনথ্‌ডিভিশনের কথা। যুদ্ধের পর পরই কর্নেল ওসমানীর স্বাক্ষরে হাজার হাজার সার্টিফিকেট দেয়া হলো যারা কোনোদিন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো না। এ দেশের মানুষ এদেরকেই ঐ বাহিনী নামে অভিহিত করলো। সিকস্‌টিনথ্‌ডিভিশন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরে যারা মুক্তিযোদ্ধা হলো।

মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ব্যবস্হার অধীনে না আনার ফলে যা হলো- সেটা তো আপনি আজো দেখতে পাচ্ছেন। সারা দেশে বিশৃঙ্খলা এসে গেলো। যে স্পিরিট নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে নেমেছিলাম- সেই স্পিরিটটাকে কিভাবে আস্তে আস্তে ধ্বংস করা যায়- সেই চেষ্টা চলতে লাগলো। এ জন্য অনেক ঘটনাও কাজ করেছিলো। যেমন- বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে স্বাধীনতা বিরোধী প্রায় সকলকে ক্ষমা করে দিলেন। আর দালাল আইন যেটা করা হয়েছিলো- সেটারও ছিলো অনেক ফাঁক ফোকর। এই ফাঁক-ফোকরের ভেতর দিয়ে অনেক হত্যাকারী,নারী নির্যাতনকারী জেল থেকে বেরিয়ে আসলো। যারা প্রকৃত কালপ্রিট,যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো- তাদের তো কোনো বিচার হলো না। এভাবে কমবিনেশন অব অল দিস ফ্যাক্টরস্‌কাজ করায় স্বাধীনতার পর যে সুন্দর বাংলাদেশের কল্পনা আমরা করেছিলাম--যেখানে সবাই সুখে থাকবে,কেউ না খেতে পেয়ে মারা যাবে না,গরীব থাকবে না,সম্পদের সুষম বন্টন হবে- এ সবের কিছুই হলো না।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমি আরো দু’একটি কথা বলতে চাই। আমার মতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ওয়াজ লুটেড ফোর টাইমস্‌। প্রথমে আমরা লুট শুরু করি ১৯৭১ সালের মার্চে। তারপর তো আমরা বেরিয়ে গেলাম এবং আশ্রয় নিলাম ভারতে। দিনাজপুর এলাকার কথা আমি জানি,হিন্দুরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো,তখন কিছু কিছু মুসলমান হিন্দুদের সাহায্য করছিলো ভারতে চলে যাওয়ার জন্য। অন্য এলাকাতেও এমনটা দেখা গেছে। পাবনায় আমার আত্মীয় ছিলেন রাজা মিয়া,তিনি হিন্দুদের চলে যেতে সাহায্য করেছেন,পঞ্চগড়ের চলনবাড়ি,এটা বোদা থানায়,সেখানে আমার এক মামা ছিলেন- তিনি হিন্দুদের চলে যেতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু বর্ডারে কিছু কিছু মুসলমান কেবল দিনাজপুর এলাকাতেই নয়- অন্যান্য বেশ কয়েকটি এলাকায়ও মুসলমানরা বিশেষ করে ময়মনসিংহ এলাকার মানুষ হিন্দুদের সমস্ত কিছু- বাসনপত্র,টাকা-পয়সা,সোনাদানা যা ছিলো সব,এমন কি কাপড় চোপড় পর্যন্ত ছিনিয়ে নেয়। এইসব অসহায় মানুষগুলো রিক্ত হস্তে ভারতে পৌছায় কেবল প্রাণে বাঁচার জন্য।

আপনারা তো জানেন একটা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছিলো সারা দেশেই। আমি যখন ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছিলাম তখন শেরপুরে,বগুড়ায় সংগ্রাম কমিটিকে কাজ করতে দেখেছি। ঠাকুরগাঁওয়ের এম.পি ছিলো আমার বন্ধু মানুষ। অন্যান্য নেতাদেরও আমি চিনতাম যেহেতু আমি ঠাঁকুরগাঁওয়ের মানুষ। ঠাকুরগাঁওয়ে যখন ইপিআর-রা বিদ্রোহ করলো-তখন ঐ বাহিনীর অবাঙালি কিছু সৈনিক-অফিসার প্রাণ হারায়। কিছু কিছু অবাঙালি যারা বিহারী নামে পরিচিত- তাদের অনেকেই নিহত হলো বাঙালি বিদ্রোহীদের হাতে। এ সমস্ত জায়গা থেকে যে সমস্ত টাকা-পয়সা,সোনাদানা এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করা হয়- সেগুলো রক্ষার ভার দেয়া হয়েছিলো একজনকে। আমি জানি, যে ভদ্রলোককে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তিনি বর্ডার ক্রস করে ভারতে গেলেন বিশাল অঙ্কের ঐ টাকা, সোনাদানা,মূল্যবান সামগ্রী নিয়েই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে হি ডিড নট ডু এনিথিং। সেখানে তার এক আত্মীয় ছিলো- সেখানেই তিনি যুদ্ধের পুরো সময়টা ছিলেন এবং বেশ ভালোভাবে ছিলেন। এটা আমি জানি।

এরপর তৃতীয় স্টেজে এসে যুদ্ধের সময় আবার লুট শুরু হলো পাকিস্তানিদের দ্বারা। মুক্তিযুদ্ধের সময় নর্থ বেঙ্গল থেকে চাল ভর্তি গাড়ি আসতো ঢাকায়। কুর্মিটোলায় অবস্হানরত আর্মিরা এ সব চাল জোর করে রেখে দিতো। পেপসি কোলার আগের মালিক সে সময় চালের ব্যবসায়ী ছিলো। তার নামটা এখন আমার মনে পড়ছে না তিনি মারা গেছেন। আর্মিরা তার কাছে চাল বিক্রি করতো খুবই কম দামে। চাউল লে যাও,রুপিয়া দেও। মালিক তো মহাখুশী। সে চাল বিক্রি করেই মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলো। স্বাধীনতার পর অবশ্য তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিলো। তবে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আমরা স্বাধীনতার পর যখন দেশে ফিরলাম- তখন আবার লুট শুরু করলাম। সুতরাং এক বছরের মধ্যে বেঙ্গল ওয়াজ লুটেড ফোর টাইমস্‌।

প্র: মুক্তিযুদ্ধকালের কোনো ঘটনার কথা কি মনে পড়ে- যা আজো আপনার স্মৃতিকে নাড়া দেয় ?
উ: সেপ্টেম্বর মাসে আর্মির দ্বিতীয় অফিসার্স ব্যাচের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে মালদহ থেকে ট্রেনে করে আমি যখন কলকাতা ফিরছিলাম তখন ট্রেনেই এক হিন্দু ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হলো। তিনি একটি বিজনেস অরর্গানাইজেশনে কাজ করেন। তিনি আমাকে চিনলেন যে,আমি বাংলাদেশের মানুষ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। নানা কথাও হলো। তিনি এক পর্যায়ে বললেন,আপনারা খুব লাকি মানুষ যে ইন্দিরা গান্ধী বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আপনারা তাঁর পুরো সহায়তা পাচ্ছেন। কিন্তু যদি মুরারজী দেশাই প্রধানমন্ত্রী থাকতেন তাহলে এই সাহায্য আপনারা পেতেন না। তিনি আরো বলেন, মুরারজী দেশাই নাকি প্রো-আমেরিকান। আর একটা কথা তিনি বললেন,আপনারা যখন স্বাধীন হবেন তখন আপনাদের দেশে মাড়োয়ারিদের কিছুতেই ঢুকতে দেবেন না। ভদ্রলোকের সেই কথা দু’টি কেন জানি আজো আমার কানে বাজে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম: ড. সুকুমার বিশ্বাস
সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : অক্টোবর ০২, ০৩, ২০০৩

শেষ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880989 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880989 2008-12-11 11:59:22
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১২ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা ) প্র: স্বাধীনতার পর কবে দেশে ফিরলেন ?
উ: ১৭ ডিসেম্বর তারিখে একজন ম্যাসেঞ্জার এসে আমাকে একটা চিঠি দিয়ে গেলো। সেটা ছিলো একটা অফিস অর্ডার। সেই অফিস অর্ডারে দেখি আমার এবং আরো কয়েকজনের নাম। আমাদের টিম লিডার সি.এস.পি অফিসার তখনকার চীফ সেক্রেটারি রুহুল কুদ্দুস সাহেব। আমাদেরকে অবিলম্বে ঢাকা গিয়ে দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সিভিল অ্যাভিয়েশনের। মহাপরিচালক,সিভিল অ্যাভিয়েশন। ১৮ তারিখ সকালে আমি দমদম এয়ারপোর্টে রিপোর্ট করি। অন্যরাও যথাসময়ে আসেন। ওখান থেকে আমরা বাগডোগরা আসি। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে বিকেল বেলা ঢাকা এসে পৌঁছি। ঢাকা পৌঁছেই পরদিন থেকেই আমরা নিজ নিজ দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

প্র: ঢাকা এসে আপনি কি দেখলেন ?
উ: তখন ঢাকার অবস্হা সেভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। আমি ঢাকা পৌঁছেই বিমান বন্দর সচল করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ঢাকায় সে সময় সিভিল অ্যাভিয়েশনের কোনো সিনিয়র অফিসার ছিলেন না। সব জুনিয়র অফিসার এবং অল্প কিছুসংখ্যক কর্মী। ঢাকা বিমান বন্দর খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। সেই বিমান বন্দর দ্রুত চলাচল উপযোগী করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমি তো বিমান বন্দরের সিভিল অ্যাভিয়েশনের বিশ্রামাগারে রাত কাটাতাম। আমাকে সেখানেই থাকতে হতো। ফলে,এ সময় আমার কোথাও যাওয়া বা কিছু দেখার সুযোগ হয়নি। তবে প্রথম যে দিন আমরা এলাম সে দিনের কথা কিছু মনে আছে। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে পূর্বাণী হোটেলে যাওয়ার পথে দেখলাম শহরে তেমন লোকজন নাই। কেমন জানি নিস্তব্ধ সব। সন্ধ্যা হয় হয় সময় আমরা পূর্বাণী হোটেলে পৌঁছলাম।

প্র: সিভিল অ্যাভিয়েশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর এই সংস্হাকে গড়ে তুলতে কি কি পদক্ষেপ নিলেন ?
উ: আমি আগেই বলেছি,১৮ ডিসেম্বর বিকালে আমরা ঢাকা পৌঁছুলাম হেলিকপ্টারযোগে। ঐ দিন রাতে আমাদের পূর্বাণী হোটেলে রাখা হলো। পরদিন সিভিল অ্যাভিয়েশন অফিসে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম যারা বাঙালি সিনিয়র অফিসার তারা সব পাকিস্তানে। তারা ছিলো ৮ জনের মতো। যারা বাংলাদেশে আছেন তারা সব জুনিয়র অফিসার। এয়ার ফিল্ডগুলো বোম্ববার্ট করা হয়েছিলো বাই ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স টু প্রিভেন্ট আমেরিকান সেভেন-থ্‌ফ্লিট অ্যান্ড চায়না সোলজার- যাতে তারা এই এয়ারপোর্ট ব্যবহার করতে না পারে। সম্পূর্ন এয়ারফিল্ড অকেজো করে দেয়া হয়েছিলো। বিরাট বিরাট গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো। আমার মনে আছে ১৯টি বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছিলো। সেভেন-থ্‌ফ্লিট থেকে বিমান এসে যেন এখানে না নামতে পারে সেটার প্রতি লক্ষ্য রেখেই বেশি বোমা ফেলা হয়েছিলো। আবার যাতে কোনোভাবেই এই এয়ারপোর্ট আমেরিকানরা ব্যবহার করতে না পারে সেদিক লক্ষ্য রেখেও বোমা ফেলা হয়েছিলো। আমার দায়িত্ব হলো ঢাকা এয়ার ফিল্ডকে আগে সচল করা। আমি সে লক্ষ্যেই কাজ শুরু করলাম।

এ দিকে ৮ জন সিনিয়র সিভিল অ্যাভিয়েশন অফিসার যারা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন তারা বাংলাদেশে ফিরে আসলেন। আমি মন্ত্রণালয়কে জানালাম যে,এই ৮ জনের মধ্যে যিনি সবার সিনিয়র অফিসার অর্থাৎ গুলজার হোসেন,তিনিই আমার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবেন। কারণ আপনি জানেন যে,অনেক আগেই আমি পাকিস্তান এয়ারফোর্স থেকে উইং কমান্ডার হিসাবে অবসর নিয়েছিলাম এবং স্বপ্রণোদিত হয়েই আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। আমাকে কেউ বলেননি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। আমার সুপারিশ সত্ত্বেও কর্নেল ওসমানী সিনিয়র অফিসার গুলজার হোসেনকে দায়িত্ব দিলেন না। অথচ তিনি সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিজস্ব অফিসার ছিলেন। কর্নেল ওসমানী বিমান বাহিনী থেকে একজন অফিসারকে নিয়ে এসে এখানে বসালেন। এই ঘটনায় গুলজার হোসেন খুবই ব্যথিত হলেন। তিনি পদত্যাগ করে চলে গেলেন এবং ‘আকিএও’তে ভালো বেতনের চাকরি পেলেন। আসলে এগুলো পার্ট অব আওয়ার ম্যাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এটা আমরা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে শিখেছি। আর্মিতেও এখনো তাই চলছে। জেনারেল এরশাদের আমলে ব্রিগেডিয়ার এনামকে দিয়ে রির্পোট তৈরি করানো হয়--সেখানে সিদ্ধান্ত বদল করে বলা হয় যে,সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং বাংলাদেশ বিমানের প্রধান উইল অলওয়েজ বি ফ্রম এয়ারফোর্স। আমি মনে করি,এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত। সিভিল অরগানাইজেশন চালাবে সিভিল অফিসার। হোয়াই আর্মি। এগুলো তো পাকিস্তানিদের করা। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা পাকিস্তানি কাঠামোই অনুসরণ করলাম।

চলবে..........

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880784 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880784 2008-12-10 18:29:14
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১১ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা ) প্র: প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে যে সব অরগানাইজেশন গড়ে তোলা হয়- সে সব সংগঠন কিভাবে কাজ করেছিলো,কতটা করতে পেরেছিলো ?
উ: মুজিবনগর সরকার গঠনের পর কয়েকটি মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। যেমন- অর্থ মন্ত্রণালয়,প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়,স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়,ত্রাণ ও সাহায্য মন্ত্রণালয়- এ রকমভাবে প্রপার একটা অরগানাইজেশন গড়ে তোলা হয়। এ সব মন্ত্রণালয়ের প্রতিটির জন্য একজন করে সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। এর নিচের ধাপে উপ-সচিব,তারপর সহকারী সচিব- এ ভাবে একটা প্রপার প্রশাসন খাড়া করা হয়। এ ছাড়াও মুজিবনগর সরকার আর একটি বিষয় করেছিলেন- তা হলো ‘জোনাল কাউন্সিল’। পুরো বাংলাদেশ এলাকাকে কয়েকটি জোনে ভাগ করা হয়। এ সব জোনাল কাউন্সিলের ভার দেয়া হয় আওয়ামী লীগ এম.এন.এ. ও এম.পি.এ.-দের উপর। যুদ্ধ পরিচালনায় সেক্টর যেভাবে ভাগ করা হয়েছিলো- তেমনিভাবেই এই কাউন্সিলও ভাগ করা হয়। জোনাল কাউন্সিলে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। তাদের দায়িত্ব ঠিক কি ছিলো- এখন আর তা বলতে পারবো না।

মুজিব নগর সরকারের অসুবিধা ছিলো অনেক। প্রপার অফিস ছিলো না,বসার জায়গা তেমন ছিলো না। অন্যান্য সংকটও ছিলো প্রচুর। তারপরও বলবো যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের লজিস্টিক সার্পোট দেয়ার জন্য। সহযোগিতা করা হয়েছে একটা প্রপার অরগানাইজেশন চালাবার জন্য। একদিকে শরণার্থী সমস্যা,অন্যদিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা,অন্যদিকে আবার ভারতের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বা যথাযথ সমঙর্ক বজায় রাখা,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক,আওয়ামী লীগ দলীয় নানা কোন্দল ইত্যাদি বিষয়গুলো সফলভাবে মোকাবিলা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কাক্মিখত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন মুজিবনগর সরকার- আর সে সরকারের প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সত্যিই একজন বিচক্ষণ,ধিরস্হির সহনশীল মানুষ ছিলেন। যদি তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী না হতেন- তাহলে এই যুদ্ধের পরিণতি কি হতো তা বলা মুস্কিল। ১০ এপ্রিল আগরতলাতে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সেখানে খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। সেটা হতে পারেননি বলে তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন। অনেক বুঝিয়ে তাঁকে মন্ত্রিসভায় অনর্ভুক্ত করা হলেও তিনি কখনোই তাজউদ্দীন আহমদ-কে মেনে নিতে পারেননি।

প্র: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের পাসিং আউট হয় ১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর। অস্হায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্যারেডে সালাম গ্রহণ করেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণও শুরু হয়। এই দ্বিতীয় ব্যাচের অফিসার সিলেকশনে আপনার ভূমিকা ছিলো। এ সম্পর্কে কি আপনি কিছু বলবেন ?
উ: সেপ্টেম্বর মাসে আর্মির দ্বিতীয় অফিসার্স ব্যাচ ট্রেনিংয়ের জন্য সদস্য নির্বাচনে কর্নেল ওসমানী এবং প্রফেসর ইউসুফ আলীর অনুমতি নিয়ে আমাকে পাঠানো হলো সেক্টর ৬ এবং ৭ নম্বরে। আমার দায়িত্ব ছিলো ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডারদ্বয় যাদের নির্বাচন করেছেন সেই তালিকা অনুযায়ী সদস্যদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করে ফোর্সেস হেড কোর্য়াটারে উপস্হাপন করা। ৭ নম্বর সেক্টরের সদস্যদের জমা করা হয়েছিলো মালদহতে। আর ৬ নম্বর সেক্টরের সদস্যদের জমা করা হয়েছিলো তেঁতুলিয়া ডাক বাংলাতে। আমি তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করি। আমি দু’টি সেক্টর থেকে ৩০ জনের একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করি এবং সেটি ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারে উপস্হাপন করি।

চলবে...........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880690 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28880690 2008-12-10 09:13:57
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১০ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা )
প্র: মুজিব বাহিনী সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?
উ: মুজিব বাহিনী সম্পর্কে তখন শুনেছিলাম তোফায়েল আহমদ নাকি কর্নেল ওসমানীকে প্রস্তাব দেন যে,যদি তাঁকে অনুমতি দেয়া হয় তাহলে তিনি ভালো ভালো ছেলে যোগাড় করে তাদেরকে ট্রেনিং-য়ের ব্যবস্হা করবেন এবং একটি বাহিনী গড়ে তুলবেন। এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কর্নেল ওসমানী বিষয়টিতে সম্মতি জানান এবং তোফায়েল আহমদকে এ কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য তাঁকে পর্ণ কর্তৃত্ব দিয়ে একটি চিঠিও ইস্যু করেন। সেই চিঠিতে মুজিব বাহিনী গঠনের কথা ছিলো না। কিন্তু ঐ চিঠিটাকে কাজে লাগিয়ে তোফায়েলরা মুজিব বাহিনী গঠন করে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত ছিলো না।

একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি,এই বাহিনীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবার ছাড়া কোনো গরীব কিংবা চাষী পরিবারের ছেলেদের নেওয়া হয়নি। কোনো শ্রমজীবী মানুষকেও এই বাহিনীতে নেওয়া হয়নি। তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলো যে,এই আন্দোলন বা যুদ্ধ যাতে বামপন্থীদের হাতে চলে না যায়। বোধহয় সে জন্যই কোনো গরীব,মজদুর,চাষী বা সাধারণ ঘরের ছেলেদের মুজিব বাহিনীতে নেওয়া হয়নি। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে যে এফ. এফ. বা গণবাহিনী ছিলো,যারা প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং যাদের সংখ্যায় ছিলো সর্বাধিক তাদের ৭০ ভাগই ছিলো কৃষক শ্রেণীর বা কৃষক পরিবারের। আমি বেশ কিছুসংখ্যক মুজিব বাহিনীর সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি- তারা সবাই বেশ ভালো,শিক্ষিত,স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে।

বিভিন্ন এলাকা থেকে মুজিব বাহিনীতে যে সব ছেলেকে নেওয়া হয়- সে সম্পর্কে প্রথমে আমরা কিছুই জানতে পারিনি বা আমাদের জানতে দেয়া হয়নি। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গেই এ কাজটি করা হয়। প্রথমে আমি যুব শিবিরগুলির পরিচালক এবং পরে মহাপরিচালক ছিলাম তথাপি আমাকে কিছুই বলা হয়নি বা এর রিক্রুট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও মুজিব বাহিনীর ব্যাপারটা পরে জানতে পারেন। আমার মনে হয়েছে যুব অভ্যর্থনা ক্যাম্পে রির্পোট করার আগেই ঐসব ছেলেদের রিক্রুট করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে এম. পি.,এম. এন. এ. গণ নিয়মিত যাচ্ছেন, থাকছেন। কিন্তু তাঁরা বা তাঁদের কেউ মুজিব বাহিনীর জন্য সদস্য রিক্রুট করছেন- এমন কথা তাঁরা কোনো দিন বলেননি। এ বিষয়টি জেনেছি অনেক পরে,যখন মুজিব বাহিনীর ছেলেরা প্রশিক্ষণ শেষ করার পর সেক্টরের মাধ্যমে তাদেরকে Induct করা শুরু হলো। এ কাজটিও করা হলো সেক্টর কমান্ডারদের না জানিয়ে। এ সময়ই আমরা বিভিন্ন সেক্টর থেকে মুজিব বাহিনী সম্পর্কে খবর পাওয়া শুরু করলাম। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে আমি প্রথম জানতে পারলাম যখন আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে এই বাহিনী সম্পর্কে নানান অভিযোগ ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারে আসতে লাগলো। তাঁরা জানালেন,এরা কারা,কেন-ই বা তারা এখানে এসেছে,আমরাই তো যুদ্ধ করছি,আমাদের গেরিলা যোদ্ধাও রয়েছে, রেগুলার ফাইটারও আছে- তাহলে তাদের ভূমিকা কি ? তাদের কার্যক্রম বন্ধ করা দরকার। মুজিব বাহিনী নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনাও অনেক ঘটেছে। ৮ নম্বর সেক্টরের অন্যতম সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হুদা আমাকে বলেছিলেন, এক রাতে যখন মুজিব বাহিনীর একটি গ্রুপ বাংলাদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো- তখন বি. এস. এফ. তাদেরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বন্দি করে রাখে সারা রাত। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছিলো। যাহোক,শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর হস্তক্ষেপে মুজিব বাহিনীর তৎপরতা যুদ্ধের শেষ দিক থেকে সীমিত হয়ে পড়ে।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই যে,এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। কারণ এটা ছিলো জনযুদ্ধ। সুতরাং এর মধ্যে আলাদা কোনো বাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা আমি দেখি না। পরে এই বাহিনী যে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে সেটাও আমার মনে হয়েছিলো। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তাহলে যুদ্ধের নেতৃত্ব হয়তো বামপন্থীদের হাতে চলে যাবে- এই ভীতি হয়তো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কারো কারো মধ্যে ছিলো। আওয়ামী যুব নেতাদের মধ্যেও এই ভীতি ছিলো। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের একটা অংশের মধ্যেও এমন আশঙ্কা ছিলো। নেতৃত্ব যাতে বামপন্থীদের হাতে না চলে যেতে পারে মূলত সে জন্যই হয়তো মুজিব বাহিনীর সৃষ্টি। আমি অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে শুনেছি যে,মুজিব বাহিনীর অনেক সদস্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যারা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলো তাদের অনেককে হত্যা করেছে। এমন কি বাম রাজনীতি করে- এমন সন্দেহ বশবর্তী হয়েও অনেককে হত্যা করা হয়।

জেনারেল ওবান ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের একজন বিশেষজ্ঞ। How to suppress the Guerillas. He was an expert on that. এই ওবান-ই ট্রেনিং দিয়েছিলেন এই বাহিনীকে। তার অর্থ দাঁড়ালো যে,স্বাধীনতার পর যদি দরকার পড়ে তাহলে এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে অন্য সব গেরিলাদের দমন করার জন্য।

প্র: ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা কালে আপনি ঢাকায় ছিলেন। এ সময়ের কথা কিছু বলবেন কি ?
উ: এ কথা সত্য যে,১৯৭১ সালে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দিলেন- সেখানে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তিনি স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য বাঙালিদের সংগ্রামে নামতে বলেছিলেন, যুদ্ধ করতে বলেছিলেন। বলা হয়,২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি হান্নান সাহেব পাঠ করেছিলেন। কিন্তু সেটা আমি শুনিনি। এ সময় শ্যামলিতে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে আমি ছিলাম। ২৭ মার্চ সন্ধ্যার দিকে পরিষ্কার শুনলাম বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। সেখানে পাকিস্তানিদের আক্রমণ,বৈদেশিক নীতি অবস্হান ইত্যাদি বিষয় ছিলো।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কোনো আলোচনা বা বিতর্ক আমি শুনিনি। এমন কি স্বাধীনতার পরও এ নিয়ে কোনো বিতর্ক শুনিনি। বিতর্ক শুরু হলো দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে। শেখ মুজিব যতদিন বেঁচে ছিলেন- ততদিন পর্যন্ত এ নিয়ে কেউ কোনো কথা উত্থাপন করেননি বা বিতর্ক হয়নি। এটা শুরু হলো সম্ভবত: ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। বিএনপি নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর যখন আওয়ামী লীগ মেজর জিয়াকে ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করলো- তখন থেকেই বিবাদটা প্রকট আকার ধারণ করলো।

চলবে........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879526 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879526 2008-12-07 08:40:40
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৯ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা )
প্র: আপনি বাংলাদেশ ফোর্সেস হেড-কোয়ার্টারের কর্মকান্ড সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ?
উ: যুব শিবির সূত্রে আমাকে ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হতো। এ ছাড়া আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিলো পুরনো সম্পর্ক সূত্রে। এই দু’টো সূত্রেই আমি হেড কোয়ার্টারের খবরা খবর জানতে পারতাম। ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারে কর্মরত ডেপুটি চীফ অব স্টাফ এ. কে. খন্দকার সাহেব একবার আমাকে বলেছিলেন যে,২২টি নতুন ব্রিগ্রেড গঠন করা হবে। কিন্তু পরে এটা আর হয়নি। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে,প্রতি মাসে অন্তত: ১০ হাজার তরুণকে গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে ভেতরে পাঠানো হবে। এ লক্ষ্যে আমরা কাজও করেছিলাম। ওসমানী সাহেব প্রথম দিকে গেরিলা বাহিনীর ব্যাপারে তেমন উৎসাহী ছিলেন না। তিনি বলতেন,রেগুলার বাহিনী গঠন করে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। কর্নেল ওসমানী সাহেবের একটা সমস্যা ছিলো যে,তিনি গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যে,গেরিলা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করেছে,এটা বোধহয় তিনি জানতেন না। তিনি একমাত্র কনভেনশনাল যুদ্ধেই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সেই কনভেনশনাল যুদ্ধেও তাঁর যোগ্যতা নিয়ে সে সময় নানা প্রশ্ন উঠেছিলো। তাঁর জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ই চীফ অব স্টাফ কর্নেল রব কলকাতায় আমাকে একদিন বলেছিলেন,কর্নেল ওসমানীর কর্মজীবনের কথা। আমি কর্নেল রবকে জানি ১৯৪৮ সাল থেকে। তখন তিনি ছিলেন একজন স্টাফ ক্যাপ্টেন। পাকিস্তান আর্মি হেডকোয়াটার্সের স্টাফ ক্যাপ্টেন ছিলেন। অমায়িক এক ভদ্র লোক। সে সময় আমিও আই. এস. সি. পাশ করে এয়ারফোর্সে যোগদান করি। তখন থেকেই আমার সাথে তাঁর আলাপ। মাঝে অবশ্য তাঁর সাথে আমার অনেক দিন দেখা হয়নি।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসের কথা। কর্নেল রব তখন বাংলাদেশ আর্মির চীফ অব স্টাফ। আগরতলাতে বসতেন। কলকাতা এসেছিলেন ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আমার অফিসে এসেছিলেন তিনি। আমি আর কর্নেল রব সাহেব এক সঙ্গে বসে কথা বলছিলাম আমার অফিসে। সেখানে রেজাও ছিলো। এক সময় রব সাহেব বললেন যে, আমাদের চাইনিজ খাওয়াবেন। আমি আর রেজা এটা শুনে তো মহা খুশি। অনেকদিন আমরা ভালো খাবার বা চাইনিজ খাবার খাইনি। সন্ধ্যেবেলায় কলকাতার একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন। খাওয়া শুরু করার পরপরই রব সাহেব ওসমানী সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। তিনি বললেন,জানো,কাশ্মীর যুদ্ধে ওসমানীকে একটা ট্রুপসের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। তাঁর সেনা ক্যাম্প যেখানে ছিলো,সেখানে একটা ট্রাইব ছিলো। এরা ছিলো অত্যন্ত যুদ্ধপ্রিয় জাতি। এই উপজাতি ওসমানীর সেনা অবস্হানের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে উদ্যত হয়। এটা শোনার পরপরই ওসমানী সাহেব তাঁর অবস্হান ছেড়ে পালিয়ে যান। পাকিস্তান সরকার এই বিষয়টির উপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে দেখা গেলো যে,সেখানে একজন সুবেদার মেজর তার বাহিনী নিয়ে স্হির ছিলেন। কিন্তু ওসমানী পালিয়ে যান। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় ওসমানীকে পরে কমান্ড থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর তাঁকে স্টাফ বিভাগে বদলী করে দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীতে চাকরি জীবনে তিনি আর কখনো কমান্ড পাননি। মূলত: তিনি ছিলেন স্টাফ অফিসার। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি হন পেপার জেনারেল। শুধু অফিসে বসে অর্ডার দেয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো কাজ ছিলো না।

আসলে কর্নেল ওসমানীর কারণেই বাংলাদেশ মিলিটারি হেড কোয়ার্টারে ওয়ার পরিকল্পনা বলতে তেমন কিছু ছিলো না। কর্নেল ওসমানী ছিলেন একগুঁয়ে। এখানে তার একটি উদাহরণ দিই। বিষয়টি আমার আজো মনে আছে। বিষয়টি ছিলো,গেরিলা উইল হ্যাভ টু বি ইনডাকটেড অ্যাট ফরিদপুর। স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত পথেই পাঠাতে হবে। অর্থাৎ যশোর সীমান্ত দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশের ফরিদপুরের উদ্দেশে পাঠানোটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু তা না পাঠিয়ে কর্নেল ওসমানীর অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং তাঁর যে সেক্টর এলাকা আগরতলা, সেই আগরতলা দিয়েই গেরিলাদের পাঠাবার জন্য তিনি চাপ দিলেন। মেজর খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে এই কাজটি করতে হবে সে কথাও তিনি বললেন। সমস্যা দাঁড়ালো ঐ এলাকা থেকে ফরিদপুরে আসতে হলে তাদেরকে নদীপথে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হবে। গেরিলারা তাঁর নির্দেশ মেনে খালেদ মোশাররফের এলাকা থেকে নদী পথে রওয়ানা হলো। এ দিকে পাক আর্মি নদীপথে এ সময় পেট্রোল করছিলো। পাক আর্মি তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করে এবং তাদের গুলিতে গেরিলাদের সবাই নিহত হয়। এমন অনেক ঘটনা সে সময় ঘটেছিলো।

কর্নেল ওসমানী অল্পতেই ভীষণ রেগে যেতেন এবং চিৎকার করতেন। এ বিষয়ে আর একটি ঘটনার উল্লেখ করতে পারি। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এম. জি. তাওয়াব ছিলেন একজন সিনিয়র দক্ষ অফিসার। তাওয়াবের ছিলো জার্মান স্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে পাকিস্তান থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। তাওয়াব তখন জার্মানী বা লন্ডনে অবস্হান করছিলেন। আমি ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারকে বললাম যে,তাওয়াবকে আমাদের নিয়ে আসা উচিত। গ্রীণ সিগনাল পেয়ে আমি তাওয়াবকে একটি চিঠি লিখলাম। তাঁর শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা আমি জানতাম। সেই ঠিকানায় তাঁকে আমি চিঠি পাঠালাম। কিন্তু চিঠিটি ফিরে আসলো। বিলি হয়নি। এরপর তখনকার গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাওয়াব আমাকে একটি লম্বা চিঠি লিখলো। সে তখন যুদ্ধে যোগদানের শর্ত জানতে চাইলো। অথচ আমি বা আমরা সকলে যুদ্ধ করছি শর্তহীনভাবে। খাদেম আলী বলে একজন স্হপতি ছিলেন। তাঁরও জার্মান স্ত্রী। খাদেম আলী ছিলেন তাওয়াব-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। খাদেম আলীর মাধ্যমে তাওয়াবকে আমি পুনরায় খবর পাঠালাম যাতে সে চলে আসে। এরপর তাওয়াব ওসমানী সাহেবকে একটা পত্র লেখে খাদেম আলীর মাধ্যমে। এক বিকেলে আমি আর রেজা বসে আছি অফিস কক্ষে,এ. কে. খন্দকার আর স'পতি খাদেম আলী গেছেন কর্নেল ওসমানীর রুমে। দরজা বন্ধ। এর মধ্যে বিকট চিৎকার। আমি আর রেজা চুপ করে বসে আছি। ওসমানী কি বলছেন বুঝতে পারছিলাম না। পরে খন্দকার সাহেব আর খাদেম আলী ফিরে আসলে তাদের জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে ? খন্দকার সাহেব বললেন যে,তাওয়াব মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করেছেন- এটা শুনেই ওসমানী রাগে অগ্নিশর্মা এবং এ জন্যই চিৎকার করছিলেন। এরপর তাওয়াব-এর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি। অথচ কর্নেল ওসমানী বিষয়টি ধীর স্হিরভাবে হ্যান্ডেল করে তাওয়াবকে পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসতে পারলে পাকিস্তানিরা অনেকটাই হতাশ হতো এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তো।

চলবে.........]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879205 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879205 2008-12-06 16:54:33
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৮ (একটি কথ্য ইতিহাস-উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মীর্জা )
প্র: ক্যাম্পের ছেলেদের কি পরিমাণ অর্থ দেয়া হতো ?
উ: অর্থ আসতো ভারত সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। একজন ছেলের জন্য প্রতিদিন খাওয়ার পেছনে ন্যুনতম কতো টাকা লাগে এটা দেখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মাথাপিছু অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করতেন। খাওয়ার অবস্হা খুব ভালো ছিলো না। প্রধানত ভাত,আলু ভাজি,কুমড়া ভাজি এ সবই ছিলো খাবার। ডাল দেয়া হতো। কোনো কোনো দিন শুধু ডাল ভাত। ছেলেরা খুবই কষ্ট করতো। এ অবস্হায় খাবারের মান উন্নত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকার যুবকদের জন্য মাথাপিছু ১ টাকা ২৫ পয়সা বরাদ্দ করে। তবে এই অর্থ সব জায়গায়,সব ক্যাম্পে ঠিক মতো পৌঁছতো কি না সে সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারবো না। সব এম. পি. ক্যাম্পে যেতেন না। অন্যদিকে অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তি শরণার্থী শিবিরে সাহায্য করতেন। যুব শিবিরে সবার মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধের নীতি ও কৌশল’নামে একটি পুস্তিকা বিতরণ করা হয়েছিলো। এই পুস্তিকায় এ ব্যাপারে একটা গাইড লাইন দেয়া ছিলো।

প্র: যুব শিবিরে যে অর্থ ও সাহায্য সামগ্রী বিতরণ করা হতো- এটা কিভাবে করা হতো এবং কারা করতেন ?
উ: এ বিষয়ে কিছু কথা আমি ইতোপূর্বেই বলেছি। যুব শিবিরের টাকা বিতরণ করতেন বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ আলী নিজে। যারা ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন বা ক্যাম্প চালাতেন আসলে তাদের কাছেই তিনি টাকাটা দিতেন। আমি বা আমার ডেপুটি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (অব.) রেজা কখনোই টাকা হ্যান্ডল করিনি। আমি আগেই বলেছি যে,এ সব ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন আওয়ামী লীগ এম.এন.এ.,এম.পি.এ. অথবা আওয়ামী লীগ অ্যাক্টিভিস্ট। অন্য কোনো ব্যক্তিকে ক্যাম্প ইনচার্জ করা হয়নি। ভারত সরকার টাকা দিতেন থ্রু মিনিস্ট্রি অব রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কিছু টাকা দেওয়া হতো প্রফেসর ইউসুফ আলীর মাধ্যমে। তারপরও এ অর্থ পর্যাপ্ত ছিলো না। বেশিরভাগ সময়ই আমাদের ছেলেরা কুমড়োর ঘন্টো আর ডাল ভাত খেতো,মাংস পেতো কদাচিৎ। মাসে একবার কিংবা দু’বার বি এস এফ ছাগল এনে দিলেই তারা মাংস পেতো। মাছ তো পেতোই না। কাপড় চোপড়ও বেশি দেয়া সম্ভব হয়নি। লুঙ্গি,শার্ট আর একটা গামছা দেওয়া হয়েছিলো। গেরিলারা গামছা মাথায় বেঁধে চলতো। এটাই ওদের চিম ছিলো, যে ওরা মুক্তিযোদ্ধা।

আমি এখানে আরো দু’একটি কথা যোগ করতে চাই। আমার একটি অবজারভেশন হলো মুক্তিযুদ্ধে যারা যোগ দিয়েছিলো তাদের বেশিরভাগকেই তাদের মায়েরা পাঠিয়েছিলেন যুদ্ধ করার জন্য। এ প্রসঙ্গে আমি একটি ঘটনার উল্লেখ করবো যুদ্ধের শেষের দিকে যখন পাকিস্তানিরা পিছু হটছে,আর সে সব জায়গা দখলে নিচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। এমন এক পর্যায়ে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল জামান এলেন এক মুক্ত গ্রামে,আশ্রয় নিলেন এক মোড়লের বাড়িতে। কর্নেল জামান তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,মুক্তিযুদ্ধে তুমি কি কাজ করেছো। মোড়ল জানালো যে,সে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সাহায্য করেছে,অনেক কাজ করেছে। ইত্যবসরে সেই মোড়ল কি কাজে যেন বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলে মোড়লের স্ত্রী কর্নেল জামানের কাছে এসে জানালো যে,স্যার,ওর একটা কথাও বিশ্বাস করবেন না। ও রাজাকার ছিলো এবং পাকসেনাদের সব সময় সাহায্য করতো। এ ঘটনা শুনেছিলাম কর্নেল জামান-এর কাছ থেকেই। এই ঘটনা থেকে আমি বলবো,আমাদের মায়েরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কমিটেড। চরম বিপদের মধ্য দিয়েও কিছু করার চেষ্টা করেছেন। অতি প্রিয়জনকেও অর্থাৎ নিজের ছেলেকে মুক্তিবাহিনীতে যেমন পাঠিয়েছে তেমনি স্বামী বা এমন কাউকে তার অপরাধের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।

চলবে ......
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879082 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28879082 2008-12-06 11:33:05
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৭ (একটি কথ্য ইতিহাস)
প্র: যুব শিবিরের কর্মকান্ড সম্পর্কে বলবেন কি ?
উ: আমি জুন মাসেই কাজ শুরু করি। জুলাই মাসের শুরুতে আমাকে আনুষ্ঠানিক নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথমে পরিচালক যুব শিবির। তখন পরিচালকের পদ একটিই ছিলো। পরে আগরতলাতে আরও একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। হেড কোয়ার্টারেও একজন পরিচালক পদ সৃষ্টি করা হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজাকে করা হলো হেড কোয়ার্টারের পরিচালক আর আমাকে যুব শিবিরের মহাপরিচালক পদে উন্নীত করা হলো। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সে সময়ের অধ্যক্ষকে যুব শিবিরের পরিচালক করা হয়। তিনি আগরতলাতে বসতেন। আমাকে পরিচালক করা হয় জুলাই মাসে,আর মহাপরিচালক পদে উন্নীত করা হলো নভেম্বর মাসে। আমাদের অফিস ছিলো থিয়েটার রোডেই। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী সহ আরো অনেকের অফিসই এখানে ছিলো।

সকল যুব শিবির ছিলো আওয়ামী লীগের এম. এন. এ.,এম. পি. এ. এবং Activist বা নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা ক্যাম্পের রাজনৈতিক দিকটি দেখাশোনা করতেন। আর একটি বিষয় যেটা আমি পরে বুঝতে পেরেছিলাম- বামপন্থী যুবকদের ট্রেনিং দেয়ার ব্যাপারে তাদের মারাত্মক অনীহা ছিলো। শেষের দিকে অবশ্য কিছু বামপন্থী যুবককে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিলো। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিলো। পরে সর্বদলীয় অর্থাৎ আওয়ামী লীগ,ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর এবং ভাসানী),কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাতীয় কংগ্রেস দলীয় সদস্যদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। সম্ভবত: এটা সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। এই উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর থেকে বামপন্থী যুবকদের ট্রেনিং দানের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মোট ১০২টা যুব শিবির ছিলো। যুব শিবিরে আমরা নিজেরা কোনো ট্রেনিং দেইনি। যুব শিবিরে শুধু যুবকদের বাছাই করা হতো। বাছাইয়ের পর আলাদা ক্যাম্পে বা ঐ শিবিরেই তাদেরকে ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রেনিং দিতো।

আমার সার্বক্ষণিক কোনো ট্রান্সপোর্ট ছিলো না। আমি যুব শিবিরগুলিতে খুব একটা যেতেও পারতাম না। কেউ গেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতো। আমার ভারতীয় কাউন্টার পার্ট ছিলেন একজন ব্রিগেডিয়ার। নাম ব্রিগেডিয়ার মাস্টার। নানা অসুবিধার মধ্যেও আমি কয়েকবার অবশ্য বিভিন্ন যুব শিবির পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছি। একবার ব্রিগেডিয়ার মাস্টারের সঙ্গে শিলং পর্যন্ত গিয়েছিলাম। এ সময় ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় গড়ে ওঠা যুব শিবিরগুলি ভালোভাবেই ঘুরে দেখেছিলাম। তাদের সুবিধা অসুবিধার কথা শুনেছিলাম। একবার কর্নেল ওসমানী আমাকে ৬ ও ৭ নম্বর সেক্টরে পাঠালেন সেকেন্ড বাংলাদেশওয়ার কোর্সেস অফিসারদের ফাইনাল সিলেকশনের জন্য। আর একবার বিগ্রেডিয়ার মাস্টার আমাকে তুরা নিয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণভাবে আমার কাছে যে সব এম. এন. এ.,এম. পি. এ. বা কোনো রাজনৈতিক নেতা আসতেন তাদের কাছ থেকেই ক্যাম্পের খবরাখবর পেতাম। তাদের মাধ্যমে যুব শিবিরে অবস্হানরতদের তালিকাও পেতাম। আমার মূল কাজ ছিলো ভারতীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের সাথে সার্বক্ষণিক লিয়াজোঁ রক্ষা করা। বিটুইন বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইন্ডিয়ান রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাভিলেটশন মিনিস্ট্রি। কর্নেল লুথ্‌রা ঐ মিনিস্ট্রির অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। সে সময় পশ্চিমবঙ্গের ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ আমাদের যুব শিবিরসমূহকে লজিস্টিক সার্পোট প্রদান করছিলো। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ সব যোগান দিতো। ত্রাণ হিসাবে কাপড়-চোপড়,খাদ্য ইত্যাদিই বেশি ছিলো। এম. এন. এ. এবং এম. পি. এ.-দের মাধ্যমে আমি আমাদের যুব শিবিরগুলির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতাম। এ সব ডিমান্ড এবং বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে খাদ্য,কাপড় চোপড় সম্পর্কে যে সব অভিযোগ আসতো সে বিষয়গুলি সম্পর্কে আমি ঐ বিগ্রেডিয়ার মাস্টারকে জানাতাম। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিতেন। ভারতীয় পুনর্বাসন বিভাগ থেকে যে অর্থ দেয়া হতো তাতে ক্যাম্পের ছেলেদের সব অভাব মিটতো না। বাংলাদেশ সরকার থেকেও ছেলেদের প্রতিদিন মাথা পিছু ১ টাকা ২৫ পয়সা করে দেয়া হতো। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত এই অর্থ বিলি করতেন ইয়ুথ কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান এম.এন.এ. প্রফেসর ইউসুফ আলী এবং ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত এম. এন. এ. এবং এম. পি.এ.গণ। এ বিষয়ে আমার কোনো সমঙৃক্ততা ছিলো না। ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথা হতো বিভিন্ন সমস্যাবলী নিয়ে।

প্র: ক্যাম্প কিভাবে পরিচালিত হতো ? এর কাঠামো সম্পর্কে বলবেন কি ?
উ: যুব শিবির ব্যবস্হাপনায় সবার উপরে ছিলেন প্রধানন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তাঁর অধীনে ছিলো ইয়ুথ কন্ট্রোল বোর্ড। এই বোর্ড-ই সবকিছু নিয়ন্ত্রন করতো। ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক এবং পরে মহাপরিচালক হিসেবে আমি ছিলাম ইয়ুথ কন্ট্রোল বোর্ডের অধীনে। আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের চীফ হুইপ প্রফেসর ইউসুফ আলী ছিলেন বোর্ডের চেয়ারম্যান। সদস্য ছিলেন বগুড়ার এম. পি. এ. ড. মফিজ চৌধুরী,যশোরের এম. পি. এ. সোহরাব হোসেন এবং ফরিদপুরের এম. পি. এ. বাবু গৌরচন্দ্র বালা। এরা যুব শিবিরের রাজনৈতিক দিকটি দেখাশোনা করতেন। কমিটির সদস্য গৌরচন্দ্র বালা খুব একটা আসতেন না। এর নিচে আর কোনো কাঠামো ছিলো না।

ইয়ুথ কন্ট্রোল বোর্ডের কাজ ছিলো বিভিন্ন ক্যাম্পে অর্থ বন্টন করা এবং যুবকদের ট্রেনিংয়ের জন্য সিলেকশন করা। ডেপুটি চীফ অব স্টাফ এ. কে. খন্দকার সাহেব আমাকে বললেন যে,গেরিলাদের দল হবে ১০ জনকে নিয়ে। একজন গ্রুপ লিডার থাকবে। তিনিই ঠিক করে দিতেন কার কাছে কি অস্ত্র থাকবে। কে কি বহন করবে।

ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনায় প্রথম দিকে শৃঙ্খলা বলে কিছু ছিলো না। টাকা পয়সা নিয়ে ক্যাম্প পরিচালনাকারীদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলতো। বিশেষত: কোন ‌ব্যক্তি কত টাকা পেলো ইত্যাদি নিয়ে। ক্যাম্পে এম. পি. এ. এবং এম. এন.এ.-রা ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করতেন। কেউ কেউ অবশ্য এ কাজটি ঠিকমতো করতেন না। দলীয় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতেন।

চলবে......
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878526 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878526 2008-12-05 07:32:40
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৬ (একটি কথ্য ইতিহাস)
প্র: কলকাতা থেকে ফিরে এসে আবার কখন কলকাতা গেলেন ?
উ: কলকাতা থেকে ইসলামপুরে ফিরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পরও কলকাতা থেকে কোনো খবর পেলাম না। অথচ সিরাজুল আলম খান আমাকে বলেছিলো,ওসমানী সাহেব ফেরা মাত্র আমাকে খবর দেবে। শেষ পর্যন্ত মে মাসে আবার আমি কলকাতায় গেলাম। মে মাসের মাঝামাঝি সময় হবে। কলকাতা যাওয়ার আগে শিলিগুড়ির দিকে খবর নিলাম যে,গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার সীমান্ত অতিক্রম করেছেন কিনা। এ. কে. খন্দকার সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে পারলো না। তখন থেকে কলকাতাতেই আছি। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে থিয়েটার রোডের দিকে যাচ্ছি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। তখন দেখি এ. কে. খন্দকার অফিস গেটের সামনে দাঁড়ানো। আমরা পরসঙর পরসঙরকে দেখে আনন্দে উল্লসিত হলাম। খন্দকার সাহেবের সঙ্গে ওখানে কিছুক্ষণ আলাপ হলো। তিনি জানালেন তিনি লিটন হোটেলে দু’জন মিলে এক রুমে আছেন।

খন্দকার সাহেবের সঙ্গে দেখা হওয়াতে আমার মুক্তিযুদ্ধে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি আরো সহজতর হলো। কর্নেল ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করার পরও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আমার জন্য সহজ হচ্ছিলো না। কর্নেল ওসমানী একটু খ্যাপাটে এবং সন্দেহ প্রবণ লোক ছিলেন। তিনি বোধহয় আমাকে সন্দেহ করেছিলেন। যাহোক,তখন থেকে আমি কলকাতাতেই থেকে গেলাম। প্রথম দিকে সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ ছিলো না। যখন যে দায়িত্ব পাচ্ছিলাম সেটা করছিলাম। জুন মাসেই বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিলো যে,আমাকে যুব শিবিরের দায়িত্ব দেবে। সিদ্ধান্ত কার্যকরি হতে জুলাই মাস এসে গেলো। জুলাই মাসের শুরুতে আমি যুব শিবিরের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পাই।

প্র: যুব শিবিরে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি কোন ‌কোন ‌দায়িত্ব পালন করেন ?
উ: এ সময়ে আমার উপর কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিলো না। একেক সময় একেক কাজে সমঙৃক্ত করা হয়েছে। যেমন- জুন মাসে একদিন আমি লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান-এর সঙ্গে দেখা করি। আমি ১৯৫৬ সাল থেকে কাজী নুরুজ্জামানকে জানতাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি জানালেন যে,তাঁকে ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হচ্ছে,কিন্তু তিনি ঐ এলাকাটা ভালো চেনেন না। ঐ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর নজমুল। তিনি এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে দায়িত্ব পান লে. কর্নেল জামান। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন,তাঁর সঙ্গে ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় যেতে। কারণও ছিলো,আমি ছিলাম দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও এলাকার মানুষ। আমি এই এলাকা যেমন চিনতাম- তেমনি ঐ এলাকার রাজনৈতিক নেতা-ছাত্রনেতাদেরও চিনতাম। কর্নেল জামানের আদি নিবাস ছিলো পশ্চিম বাংলায়। তিনি আমাকে বললেন,আমি এই এলাকা তেমন চিনি না,আপনি উত্তর বঙ্গের লোক; আপনি আমার সঙ্গে গেলে খুবই ভালো হয়। আমি সন্মতি জানালাম এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিলাম।

আমরা একটি জীপে করে কলকাতা থেকে রওয়ানা হলাম দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও এলাকার দিকে। আমরা সরাসরি এলাম ৬ নম্বর সেক্টর এলাকা তেঁতুলিয়ায়। যার দায়িত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার এম. কে. বাশার। তাঁর হেডকোয়ার্টার তখন ছিলো তেঁতুলিয়ায়। আমরা তেঁতুলিয়া থেকে শুরু করলাম। তেঁতুলিয়া ঘুরে সেখান থেকে আসলাম ইসলামপুরে। ইসলামপুরে ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুরের- অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং এম. পি. ছিলেন। আমি ইতোপূর্বে ইসলামপুরে ওদের সঙ্গেই ছিলাম। কাজেই সকলকেই আমি চিনতাম। সন্ধ্যায় ইসলামপুরে যখন পৌঁছুলাম- তখন আমার ছোট ভাই,সেও একজন মুক্তিযোদ্ধা,যে আমার সঙ্গেই সীমান্ত অতিক্রম করেছিলো,তাকে এবং আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধুকে খোঁজ করলাম। তাদের সঙ্গে দেখা হলো। দেখলাম যে,তারা খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে। ওরা দু’জন বললো যে,ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনের আন্ডারে তাদেরকে বাংলাদেশের অভ্যনরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো এবং তাদেরকে বলা হলো কয়েকজন নির্দিষ্ট মানুষকে হত্যা করার জন্য। অথচ আমরা জেনেছি যে,এরা পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিলো না বা বাংলাদেশ বিরোধী কোনো কাজও করেনি। লোকগুলোকে হত্যা করা হলো এবং সেই সঙ্গে লুটতরাজও চালানো হলো। ওরা আরো জানালো যে,বাংলাদেশের নিরপরাধ লোকদের মারার জন্য তারা এখানে আসেনি। সে কারণে তারা ফিল্ড ছেড়ে চলে এসেছে। এ ঘটনা জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকের। আমরা কেবল চুপ করে শুনলাম সব। এরপর আমরা ইসলামপুর থেকে রায়গঞ্জ এবং সেখান থেকে হাকিমপুর গেলাম। পশ্চিম দিনাজপুরের সাব সেক্টর ছিলো হাকিমপুর। বিকালে সেখানে পৌঁছে দেখা হলো ক্যাপ্টেন গিয়াসের সঙ্গে। এই এলাকা থেকে মেজর সাফায়াত জামিল সেই মুহূর্তে চলে যান জেড ফোর্সে কাজ করার জন্যে। হাকিমপুর গিয়ে শুনলাম আর এক কাহিনী। এক ইন্ডিয়ান সিনিয়র আর্মি অফিসার আমাদের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে,যাদের ভালো টেনিংও ছিলো না,তাদেরকে কেবল হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে বগুড়ায় পাঠিয়েছেন অপারেশনের জন্য। ক্যাপ্টেন গিয়াস বললেন,এই ত্রিশ জনের মধ্যে আটাশ জন ধরা পড়েছে এবং তাদেরকে পাকিস্তানিরা হত্যা করে। কেবল দু’জন পালিয়ে আসতে পেরেছিলো এবং তারাই এ সংবাদ দেয়। আমি এ সংবাদ শুনে মর্মাহত হয়েছিলাম। এরপর এখান থেকে লালগোলায় গেলাম এবং সেখান থেকে বহরমপুর। বহরমপুর থেকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর সফিউল্লাহ আমাদের সঙ্গী হলেন কলকাতায় আসার জন্য।

কলকাতা এসেই আমি যে কাজটি করলাম তাহলো- প্রথমেই আমি এ. কে. খন্দকার এবং প্রফেসর ইউসুফ আলীকে সীমান্ত এলাকার ঘটনাগুলো বর্ণনা করলাম। এ দু’জনের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা,তাদের ট্রেনিং,অস্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলাম। আমি বলেছিলাম, 1. No Guerilla fighter should be sent inside without training, 2. All Guerilla operations must be done under the leadership of our own people. আমার এই পরামর্শ এ. কে. খন্দকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে সেটি কার্যকর করা হয়েছিলো বলে আমি জানি। ৭ নম্বর সেক্টর এলাকা ছিলো বেশ বড় এবং সেখানে অফিসারের স্বল্পতাও ছিলো- সে কারণে কোনো কোনো সাব-সেক্টরে ভারতীয় সেনা অফিসারকে দেয়া হয়েছিলো কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য।

একজন গেরিলা যোদ্ধাকে কমপক্ষে তিন মাসের ট্রেনিং দিতে হয়। কিন্তু পরিস্হিতির কারণে সময় কমানো হয়েছিলো। তখন ৬ সপ্তাহ ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্হা করা হয়। আমি এই ৬ সপ্তাহের ট্রেনিং যেন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় সে ব্যাপারে জোর দিয়েছিলাম।

চলবে.........


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878224 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878224 2008-12-04 17:26:11
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৫ (একটি কথ্য ইতিহাস)
প্র: ঠাকুরগাঁও পৌঁছে আপনি সেখানকার অবস্হা কি দেখলেন ?

উ: ঠাকুরগাঁও পৌঁছে ঐ রাতেই আমি আওয়ামী লীগের তখন নেতৃস্হানীয় যাঁরা ছিলো- তাঁদের সাথে মিট করলাম। তাঁরা প্রায় সবাই আমার বন্ধু ছিলো- কেউ ক্লাস ফ্রেন্ড,আর কেউ সমবয়সী হিসেবে। সবার সাথে তখনকার পরিস্হিতি নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁদের আমি বললাম যে,যুদ্ধ ছাড়া এখন তো আর কোনো উপায় নেই। এখন আমাদের যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের ইন্ডিয়া যেতে হবে সাহায্যের জন্য। এখন আমাদের হাতে যা আছে তাই নিয়েই যুদ্ধ করতে হবে। তাঁদের কাছে জানতে চাইলাম তাঁরা কি চিন্তা করছে বা এই মুহূর্তে তাঁরা কি করতে চায়। তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনলাম।

ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে আরো শুনলাম যে,ইপিআর বাহিনীর সিনিয়র সুবেদার কাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে ২৭/২৮ মার্চ তারিখে ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে। আরো শুনলাম এখান থেকে ইপিআরের দু’জন অবাঙালি অফিসার পালাচ্ছিলো বলে তাদেরকে হত্যা করা হয়। পরদিন আমি লক্ষ্য করলাম যে,ইপিআর-রা যা করছে সেটা তারা নিজেদের মতো করেই করছে,দে আর নট আন্ডার কমান্ড অব আওয়ামী লীগ অর সংগ্রাম কমিটি। আওয়ামী লীগ বা সংগ্রাম কমিটি সেপারেট, ইপিআর-রা সেপারেট। এখানে সুবেদার কাজিমউদ্দীনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলো,আওয়ামী লীগ বা সংগ্রাম কমিটি নয়। আমি ঠাকুরগাঁও যাওয়ার পর পরই খবর পেয়ে সুবেদার কাজিমউদ্দীন আমার সঙ্গে দেখা করলো। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম ঠাকুরগাঁও এয়ার ফিল্ড নষ্ট করা হয়েছে কি না। সে বললো, না। এ সময় সেখানে আরো কয়েকজন ছিলো। তারাও বললো,তারা এখানকার এয়ার ফিল্ডটা নষ্ট করে দিতে চায়। কিন্তু সেটা কি ভাবে করবে। আমি তাদের বলে দিলাম সেটা কিভাবে নষ্ট করতে হবে। তারপর শ’ খানেক লোক সেখানে গিয়ে এয়ার ফিল্ডটা নষ্ট করে ফেললো। ঠাকুরগাঁও পৌঁছে আরো জানতে পারি ইপিআর সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে আমার বাড়ি এসেছিলো তাদের নেতৃত্ব নেয়ার জন্য। কিন্তু আমি তো তখন ছিলাম না। তখন ওরা ঠাকুরগাঁও থেকে ১৫ মাইল দূরে রানীশৈংকল বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে এক অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন থাকতেন,তাঁকে এনে তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু আমি দেখলাম,ঐ ক্যাপ্টেন কোনো ব্যাপার নয়- সুবেদার কাজিমউদ্দীনই সব করছিলো। অ্যাকচুয়ালি সেই রিয়াল কমান্ডার।

এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে আর একটা সমস্যা দেখা দিলো। ইপিআর-রা বলছে তারা বিহারীদের মারবে। তাদেরকে জেলে রাখা হয়েছিলো। এই বিহারীদের মধ্যে ব্যাংকের দু’জন ক্যাশিয়ারও ছিলো। তখন সবাই জানতো যে,আমাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চলে যেতে হবে ভারতে। এ জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে হবে। বহু লোক এই পরিস্হিতিতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলবে। এমন অবস্হায় এম. পি. এ. ফজলুল করিম এসে আমাকে বললো যে,তুই যেয়ে ওদের (ইপিআর) বল্‌,এখনই বিহারীদের না মারার জন্য। যদি মারতেই হয় তা হলে সেটা পরেও করা যাবে। আমিও দেখলাম যে,দুটি ব্যাংকের ক্যাশিয়ারই হলো বিহারী। এখন বিহারীদের হত্যা করলে পরিস্হিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেবে,ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমি ইপিআর বাহিনীর অফিসিয়াল কমান্ডার,সেই ক্যাপ্টেনকে কথাটা বললাম। কিন্তু তিনি কিছু করতে পারলেন না। ইপিআর-রা বিহারীদের হত্যা করলো। আসলে যুদ্ধের এই সময়টিতে কোথায়ও কোনো শৃক্মখলা ছিলো না। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বও তখন এ ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারেনি। অবশ্য সে সময় সার্বিক শৃঙ্খলা আশা করাও যায় না। কোনো বিপ্লবেই যথাযথ শৃঙ্খলা থাকে না। অবশ্য পরে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিলো। তাজউদ্দীন আহমদ যদি সময় মতো সরকার গঠন না করতে পারতেন তবে যুদ্ধরত বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুবই কষ্টকর হতো। সরকার গঠিত হওয়ার পর এই সমস্যা কেটে যায়। সবাই একটা কমান্ডের অধীনে আসে। যুদ্ধরত সব বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের ফোর্সেস হেড কোয়ার্টারের কমান্ড মেনেই যুদ্ধ করতে হয়েছে।

এদিকে ১১/১২ এপ্রিল কাউকে কিছু না বলে এম. পি. ফজলুল করিম চলে গেলো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে। সম্ভবত: ১২ তারিখ রাতে আমিও ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত আমার আগেই ছিলো। কারণ আমি জানতাম যে,যুদ্ধে ভারত আমাদের সাহায্য করবে। আমি ৮ এপ্রিল তারিখে ঠাকুরগাঁও পৌঁছেই জানতে পারি যে,ভারত সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশে কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যেতে পারে। সম্ভবত: ভারত সরকার সীমান্ত খুলে দেয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই। এদিকে শহরের সকলেই তখন আশঙ্কা করছিলো যে,যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তান আর্মি ঠাকুরগাঁও চলে আসতে পারে। ১২ তারিখ রাতে দু’টি ট্রাকে আমরা আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে রওয়ানা হলাম। ঐ রাতেই আমরা আমাদের মীর্জাপুর গ্রামে এসে পৌঁছি। আমার সাথে আমার পরিবার,আমার ছোট ভাই ও তার পরিবার এবং আমার চাচাতো ভাইয়ের পরিবার ছিলো। পরদিন আমরা মির্জাপুর থেকে রওয়ানা হয়ে কোন্‌দিক দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করা সঙ্গত হবে- সে সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ায় আবার মীর্জাপুর ফিরে আসি। ১৫ তারিখে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করি। এখানে আমাদের দু’টি ট্রাক ছিলো এবং দু’টি ট্রাকই আমাদের নিজস্ব। পরে ট্রাক দু’টি দিয়ে দেয়া হয় ই.পি.আর বাহিনীকে। ১৫ তারিখেই তেঁতুলিয়া থেকে দু’জন লোক মোটর সাইকেলে করে এসে আমাদের বললো যে, পাকিস্তানিদের হাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পতন হয়েছে,আমাদের দু’ভাইকে নাকি পাকিস্তানিরা খুঁজছে। এ সংবাদ পাওয়ার পরই আমরা ওপারে চলে যাই।

আমরা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসলামপুরের কাছে লক্ষ্মীপুর বলে একটা গ্রাম আছে,দুপুরে সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম এবং সেখানেই আশ্রয় নিলাম। এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরে ঠাকুরগাঁও এলাকার সকল আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা আশ্রয় নিয়েছে। ইসলামপুরে তখন অনেক রিফিউজি। ভারত সরকারের নির্দেশে তখন সীমান্ত সংলগ্ন স্কুলগুলো বন্ধ করে সেগুলোকে সাময়িকভাবে আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। সব ধরনের লোক সেখানে জমা হয়েছে। ঐ এলাকায় আমার বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন ছিলো। আমার বড় মামা ছিলেন জলপাইগুড়ি জেলার চামুর্সিতে,এটা একদম ভূটান সীমান্তে। তিনি আগে থেকেই সেখানে বসবাস করতেন। ঐ মামার বাড়িতে আমার পরিবারের সকল সদস্যকে রেখে আমি আবার ইসলামপুরে ফিরে আসি। এসে শুনি আমাকে থানায় রির্পোট করতে বলা হয়েছে। পরে থানা কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নাম ধাম সব লিখে নিয়ে গেলো। এখানে একটি কথা বলে রাখি,পশ্চিম বাংলায় সকল হিন্দুরা আমাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। অন্যান্য অঞ্চলের কথা আমি বলতে পারি না, এখানে তারা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আমাকে আশ্রয় দেয়া হলো একটা স্কুলে। ইসলামপুর থাকা অবস্হায় আওয়ামী লীগের লোকেরা আমাকে বললো যে,আপনি কলকাতা যান এবং খোঁজ খবর নেন কোথায় কি হচ্ছে,আপনি তো সামরিক বাহিনীর লোক। আমি দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করতাম যে, যুদ্ধ সংগঠিত হবেই। ১০ এপ্রিল তারিখেই ঘোষণা করা হয়েছিলো যে,যারা যুদ্ধে যোগ দিতে চান তারা যেন নিকটস্হ আওয়ামী লীগ- সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাজউদ্দীন সাহেব এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর আমি ইসলামপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে করে কলকাতা রওয়ানা হলাম। ২৫ এপ্রিল কলকাতার শিয়ালদা স্টেশনে পৌছলাম। আমি আওয়ামী লীগ নেতা প্রফেসর ইউসুফ আলীকে জানতাম। তিনি দিনাজপুরের লোক। কর্নেল ওসমানীকে জানতাম। কলকাতা পৌঁছে আমি জানতে পারি তাঁরা পশ্চিম বাংলার এম.পি. হোস্টেলে অবস্হান করছেন। আমি সেখানে গেলাম। এম. পি. হোস্টেলে গিয়ে একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। তাঁকে আমার পরিচয় দেয়ার পর তিনি বললেন,তাঁর নাম সোহরাব হোসেন। যশোরের এম .পি. এ.। আমি জানতে চাইলাম কর্নেল ওসমানী কোথায় ? তিনি জানালেন যে,কর্নেল ওসমানী শিলিগুড়ির দিকে গেছেন। এম.এন.এ. প্রফেসর ইউসুফ আলীর কথাও জিজ্ঞাসা করলাম। বললেন,তিনি গেছেন তেঁতুলিয়ার দিকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেখানে আর একজন আসলো। তাঁকে দেখে মনে হলো লোকটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতে চাইলেন আমি কে ? আমি তাঁকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম যে,আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তিনি বললেন,আপনি একটু বসেন, আমি আসছি। সেখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তাঁর আর দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত বিকেল তিনটার দিকে লোকটা আসলো। তখন জানতে পারলাম,ওর নাম সিরাজুল আলম খান। একজন যুব নেতা। সে এসে আমাকে বললো যে,কর্নেল ওসমানী না হলে তো হবে না। তিনি কোন্‌দিন শিলিগুড়ি থেকে আসবেন তার তো ঠিক নেই। আপনি বরং ইসলামপুর চলে যান। সেখানে অপেক্ষা করেন। কর্নেল ওসমানী আসলেই আপনাকে খবর দেয়া হবে। আমি বললাম যে, আমি একটা আবেদনপত্র লিখে রেখে যাই। সিরাজুল আলম খান বললো,এটার দরকার নেই। এখন তো আপনার মতো মানুষেরই দরকার। এরপর আমি ইসলামপুর ফিরে আসলাম।

চলবে.........

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878041 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28878041 2008-12-04 10:08:02
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৪ (একটি কথ্য ইতিহাস)
প্র: দিনাজপুর শহরে পৌঁছে সেখানকার অবস্হা কি দেখলেন ?
উ: দিনাজপুর তখন বিদ্রোহী ইপিআর বাহিনীর দখলে। আমরা দিনাজপুরে এসে দেখি শহরে লোকজন প্রায় নেই। অল্প কিছুসংখ্যক লোক। আমরা যেখানে রিকশা থেকে নেমে ছিলাম সেখানে দিনাজপুরের কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে দেখলাম না। আমি দিনাজপুরের কিছু নেতা কর্মীকে অবশ্য চিনতাম। বগুড়া-শেরপুরে যেমন সংগ্রাম কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বা ছাত্রলীগের ছেলেপেলেরা ছিলো, এখানে তেমন কিছু চোখে পড়লো না। আমরা অবশ্য খুবই অল্প সময় দিনাজপুরে ছিলাম। এই সময়ের মধ্যে দিনাজপুরের সার্বিক পরিস্হিতি আমাদের জানা সম্ভব ছিলো না।

যাহোক,রিকশা আমাদের যেখানে নামিয়ে দিলো- সেখানে ঘোরাফেরার সময় একটা ছোট রেস্টুরেন্ট খোলা আছে দেখলাম। আমরা সেই রেস্টুরেন্টে নাস্তা করলাম। তারপর দু’টা রিকশা ভাড়া করে আবার ঠাকুরগাঁও রওনা হলাম। দিনাজপুর থেকে ঠাকুরগাঁও পর্যন্ত ভাড়া ৩০ টাকা ঠিক হলো। এই রিকশায় আমরা সামনে এগুতে থাকলাম। পথে দশ মাইল বলে একটা জায়গা আছে। এই স্হানটি থেকে সড়ক পথে বিভিন্ন জায়গায় যাবার সুযোগ রয়েছে। ঐ জায়গায় এসে দেখি আমাদের পক্ষের সেনা সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে তারা প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছে। এরা সব ইপিআর। তাদের কাছে একটা টু অথবা ফোর পাউন্ডের কামানও দেখলাম। আর কোনো ভারী অস নেই। এর বাইরে সৈয়দপুর-রংপুর- পলাশবাড়ি পর্যন্ত সড়ক পাকিস্তানি আর্মির নিয়নণে। এটা ৮ই এপ্রিল তারিখের কথা। পাকিস্তানি বাহিনীকে বাধা দেয়ার জন্যই ইপিআরদের এই প্রতিরোধ। কিন্তু আমরা যারা আর্মির লোক তারা জানতাম যে,এই অল্প অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যাবে না। যাহোক, বিকেল বেলা আমি ঠাকুরগাঁও পৌছলাম। কিন্তু বাসায় পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। এখানেই আমাদের বাড়ি। আমার ছোট ভাই ওখানে থাকে। বাড়িতে এসেই জিজ্ঞেস করলাম বাবলু কোথায় ? বাবলু আমার ছোট ভাই। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আমাকে জানালো,বাবলু এম.পি. ফজলুল করিম এবং আরও কয়েকজনের সঙ্গে একত্রে বর্ডারে গেছে। এম. পি. ফজলুল করিম ছিলো আমার বাল্য বন্ধু। সে বর্ডারে গেছে শুনে একটু আশ্বস্ত হলাম। ঠাকুরগাঁও থেকে ভারতের বর্ডার হলো ১৫ মাইলের মতো। দিনাজপুরের পশ্চিমেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইসলামপুর থানা। তার সাথেই হলো বিহার প্রদেশ। বিহারের চীফ মিনিস্টার কর্পুরী ঠাকুর-এর কাছে তারা অস্ত্র শস্ত্র চান। সে জন্য আমাদের লোকেরা তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে গেছেন বলে জানতে পারলাম।

প্র: ১৯৭০-৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের বিন্যাস কেমন ছিলো ?
উ: তখন ঢাকায় মাত্র একটা ফাইটার স্কোয়াড্রন ছিলো। এক স্কোয়াড্রনে ১২টা থেকে ১৬টা বিমান থাকে। এখানে ১২টা বিমান ছিলো। সব এফ-৮৬। এটাকে স্যাবর জেটও বলা হতো। এগুলো সে সময় খুব ভালো ফাইটার প্লেন ছিলো। রেসকিউ পারপাসের জন্য ছিলো একটা হেলিকপ্টার।

প্র: ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চের আগে ঢাকায় পাকিস্তান এয়ারফোর্সের শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছিলো কি ?
উ: না,১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তান এয়ারফোর্সের স্ট্রাকচারে পুনর্বিন্যাস করলেও তারা কোনো শক্তি বৃদ্ধি করেনি। যা বাড়ানোর তা শুধু পদাতিক বাহিনীতেই বাড়িয়েছে।

চলবে............]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877777 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877777 2008-12-03 17:51:54
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.৩ (একটি কথ্য ইতিহাস)
প্র: পাকিস্তানি বাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?
উ: আমি আগে থাকতাম মীরপুরে। বাসাটা ছিলো আমার স্ত্রীর এক চাচাতো ভাইয়ের। মার্চ মাসের শুরুতেই আমি বাসা পরিবর্তন করে শ্যামলিতে আসলাম। শ্যামলিতে এসেছিলাম সম্ভাব্য পাকিস্তানি আক্রমণের ভয়ে। এ সময়ই আমার পরিবারের সদস্যরা বিভক্ত হয়ে গেলো। লক্ষ্য ছিলো, যাতে একসঙ্গে সবাইকে মরতে না হয়। আমার শ্যালক ছিলো পি.আই.এ-য়ের ক্যাপ্টেন। এটা ওরই বাসা। তখন ঢাকায় এতো হাইরাইজ বিল্ডিং ছিলো না। শ্যামলিতে যে বাসায় আশ্রয় নিলাম সেখান থেকে পুরো ধানমন্ডি এলাকাটি দেখা যেতো। বিমানবন্দর এলাকাও দেখা যেতো। ২৫ তারিখ রাত ১১টা কিংবা তার কিছুক্ষণ পরই প্রথম আওয়াজ শুনতে পেলাম। ধুম করে শব্দ হলো। আওয়াজ পাওয়া মাত্র ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ালাম। ১২টার পর দেখলাম একটা গ্রীন রকেট সিগন্যাল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা থেকে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হলো। এটা কি কারণে দেয়া হলো সেটা সাধারণ লোকেরা না বুঝলেও আমি বুঝলাম। সামরিক ভাষায় এটা ওহফরপধঃব দেয়া হলো যে, মিশন সফল হয়েছে। আমি তখন বুঝতে পারলাম যে,হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আমার স্ত্রী তখন মিরপুরের পল্লবীতে। আর আমার ছেলে দু’জন ঠাকুরগাঁও-য়ের গ্রামের বাড়িতে আমার ছোট ভাইয়ের কাছে। আমি ১৪ মার্চ তারিখে ঠাকুরগাঁও গিয়ে তাদেরকে সেখানে রেখে ১৬ মার্চ তারিখে আবার ঢাকায় ফিরে আসি। ছেলেদেরকে রেখে আসলাম এই কারণে যে,যদি আমি কোনো কারণে মরে যাই তবে অন্তত: আমার ছেলেরা যেন বেঁচে থাকতে পারে। ২৫শে মার্চ তারিখে সারা রাত জেগে থেকে দেখলাম শহরের চারিদিকে কেবল ফ্ল্যাশের আলো। শাখারি পট্টি অর্থাৎ পুরনো ঢাকার দিক থেকেও গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। আমি তো সামরিক বাহিনীর লোক। তাই কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম। আমার মনে হলো,পাকিস্তান আর্মি রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইউনিভার্সিটি,শাখারি পট্টি,পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার এবং ব্যারাকসহ আরো কয়েক জায়গায় আাক্রমণ করেছে। তাদের ফ্ল্যাশ এবং সিগন্যালে আমি শ্যামলিতে থেকেও সব আন্দাজ করতে পারছিলাম কোথায় কি ঘটছে। পাকিস্তানি বাহিনীর সারা রাতের সেই তান্ডবের মধ্য দিয়েই সকাল হলো।

২৬ তারিখেও এভাবে বন্ধ বাড়িতে থাকলাম। সারাদিন গোলাগুলি চললো চারিদিকে। এই সময়ের মধ্যে আমি কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। ২৭ তারিখে দিনের বেলায় ২ ঘন্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলো। কারফিউ শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার স্ত্রীকে মিরপুর থেকে নিয়ে এলাম। আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসার পর পরই ঐ এলাকায় বিহারীরা প্রচন্ড হামলা চালায় এবং লুটতরাজ করে। বিহারীরা সেখানে বেশ কিছু বাঙালিকে হত্যা করে। আমার স্ত্রী যে বাসায় ছিলো সেই বাসার অপর এক পরিবার বিহারীদের হামলায় নিহত হয়। অবশ্য ২৫ মার্চের আগেই বিহারীরা বিভিন্ন জায়গায় দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিলো। ২৩ মার্চ সৈয়দপুরে বাঙালি-বিহারী দাঙ্গা হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ তারিখে বিহারীরা মিরপুরে হত্যাকান্ড চালায়। আমার স্ত্রীকে আনার পরই আমি গাড়িতে পেট্রোল আনতে গেলাম। তারপর আমি দেখতে চাইলাম ঢাকায় কোথায় কোথায় পাকিস্তানি আর্মি আঘাত হেনেছে। প্রথমেই গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। সেখানে গিয়ে দেখি বেশ কিছু মৃতদেহ তখনও পড়ে আছে। তারপর গেলাম রাজারবাগে। তখনও ওখান থেকে গুলির শব্দ আসছিলো। রাজারবাগ তখন জনশূন্য। ৫০ গজ দূরে দেখলাম পাকিস্তানি সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো পাঞ্জাবি সৈন্য। আমি কাছাকাছি যেতেই সে আমাকে বললো,ওয়াপস যাও। ঐখান থেকেই সে আমাকে ফিরিয়ে দিলো। আমি আর সামনে গেলাম না। এভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে ফিরে দেখলাম পাকিস্তানিরা কি ধরনের কান্ডকীর্তি করেছে। তারপর আবার শ্যামলিতে ফিরে এলাম। ২৭ মার্চ রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটাও শুনলাম। এই ঘোষণায় একটা ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলো। তখনো পর্যন্ত যারা মনস্হির করতে পারেনি তাদের জন্য ঘোষণাটা কাজে লেগেছিলো। এই ঘোষণা শুনে অনেককেই যুদ্ধে যোগ দিতে দেখলাম। বিশেষ করে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের ওপর এর একটা প্রভাব পড়েছিলো।

২৭ মার্চের পর ঢাকা শহর থেকে কিভাবে বাইরে চলে যাবো সেই ভাবনায় আমাকে তখন পেয়ে বসলো। আমি এবং আমার স্ত্রী কিভাবে ঢাকা থেকে বের হতে পারি,কোথায় যেতে পারি- এটা নিয়েই ভাবছিলাম। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা থেকে নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁও যাবো। ওখানে যারা আওয়ামী লীগের নেতা,আমি তাদের সবাইকে চিনি। এ ছাড়া সেখান থেকে ভারত সীমান্ত খুবই কাছাকাছি। সীমান্তের ওপারে আমাদের বেশ কিছু আত্মীয়ও ছিলো। তারা আমাকে চেনে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমি ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে যেতে চাইলাম। আমি ডিসাইড করলাম,যেভাবে হোক আমি প্রথম ঠাকুরগাঁওয়ে যাবো,তারপর সেখান থেকে ইন্ডিয়া যাবো এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবো। ইন্ডিয়ার সহযোগিতা আমাদের নিতে হবে। আদার ওয়াইজ ইট ইজ নট পসিবল।

৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় ছিলাম। এ সময় দুই রাতের বেশি এক বাসায় থাকিনি। শুধু মেজর খানপুরের বাসায় ছিলাম তিন রাত্রি। এর মধ্যে চেষ্টা করলাম ভগ্নিপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের খবর নেওয়ার। কিন্তু তাঁর খবর পেলাম না। পরে জানতে পারলাম তিনি ৩ এপ্রিল তারিখে ঢাকা থেকে বেরিয়ে গেছেন।

আমিও ৪ এপ্রিল তারিখে সস্ত্রীক ঢাকা ছেড়ে রওয়ানা হলাম। লক্ষ্য ঠাকুরগাঁও পৌঁছানো। আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী এবং একজন কাজের লোক। আমাদের এক বন্ধু মিন্টু ভাই,তিনি মারা গেছেন,তার ভালো নাম কাজী রশীদ,তিনি আমাদের আরিচায় পৌঁছে দিয়ে আসলেন গাড়িতে করে। রাস্তায় দেখলাম বহু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই বললেই চলে। সকাল ৮টায় গিয়ে পৌঁছলাম আরিচায়। আরিচা ঘাটে দেখলাম কোনো ফেরি বা স্টিমার নেই। শুধু বড় বড় গয়নার নৌকা। এগুলিতে করেই অসংখ্য মানুষ নদী পার হচ্ছে। আমিও একটি নৌকায় উঠলাম। প্রায় ১০০ জন যাত্রী আছে নৌকাটিতে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। নদীর ওপারে অর্থাৎ নগরবাড়ি ঘাটে গিয়ে পৌঁছলাম বিকেল বেলা। নগরবাড়ি পৌছে দেখি সেখানেও অসংখ্য মানুষ যারা প্রায় সবাই শহর থেকে এসেছে। ঢাকা থেকে নিরাপদ দরত্বে এসেও মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত। সকলেই গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। আমরা ঘাটে নেমে ঘোরাঘুরি করছি,এমন সময় দেখলাম একটা ট্রাক। শুনলাম ট্রাকটি পাবনার বেড়া থানার দিকে যাচ্ছে। বেড়ায় আমার এক আত্মীয় আছে। ভাবলাম আপাতত: ওখানেই যাই। তখন ঐ ট্রাকে করেই আমরা বেড়ায় গেলাম। বেড়ায় পৌঁছে আমাদের সেই আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম। আত্মীয় রাজা সাহেব ছিলেন আমার স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী। তিনি পরে মারা গেছেন। আমি ঐ রাতটা বেড়ায় কাটালাম। পরদিন সকালে রওয়ানা দেবো,এমন সময় আমার মনে হলো,বাকি পথটা নিরাপদে পৌঁছতে পারি কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আমার স্ত্রীকে বেড়ায় রেখে যাবো।

স্ত্রীকে রেখে আমি একাই রওয়ানা হলাম। বেড়া থেকে কয়েক মাইল দূরে হলো বাঘাবাড়ি ঘাট। তখন ওখানে ব্রিজ ছিলো না। আমি বাঘাবাড়ি ঘাট পর্যন্ত গেলাম। বাঘাবাড়ি পৌঁছে মানসিক দ্বন্দ্বে আর সামনে এগুতে পারলাম না। আমি পুনরায় বেড়া-তে ফিরে এলাম। এবার আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম ভাগ্যে যা আছে তাই হবে,আমরা একত্রে যাবো। বেড়া থেকে বাঘাবাড়ি ঘাট পার হয়ে শেরপুরে পৌঁছলাম। বগুড়া থেকে ১৫/২০ মাইল দূর শেরপুরে পৌঁছলাম বিকেল বেলা। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলাম কখনো পায়ে হেঁটে,কখনো রিকসায় চড়ে আবার কখনো বা ট্রাকে করে। পথে কোথাও কোথাও ব্যারিকেড দেওয়া ছিলো। তখন পথে ঘাটে মানুষ খুবই সহযোগিতা করেছে। শেরপুরে দেখলাম ছাত্র লীগ এবং সংগ্রাম কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে। তাদের কাছে আমি আমার পরিচয় দিলাম। তারা আমাদের খুব সহযোগিতা করলো। খাওয়ার ব্যবস্হা করে সেখানকার পি.ডব্লিউ.ডি-র একটা রেস্ট হাউজে থাকার ব্যবস্হা করে দিলো।

রাতটা শেরপুর কাটিয়ে পরদিন সকালে রওয়ানা হয়ে বগুড়া পৌঁছলাম। বগুড়া পৌঁছে জানতে পারলাম যে,আওয়ামী লীগ সংগ্রাম কমিটি অফিস সার্কিট হাউজে। আমরা সংগ্রাম কমিটি অফিসে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম এক ভদ্রলোক বসে আছেন। তাঁকে আমার পরিচয় দিয়ে তাঁর কাছে আমি ঠাকুরগাঁও যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন,আপনি রংপুরে যেতে পারবেন না। আপনি পলাশবাড়ি পর্যন্ত যেতে পারেন। পলাশবাড়ির পর মেইন রাস্তা পাকিস্তানি আর্মি দখল করে রেখেছে। তাঁর সাথে কথা বলে বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেলাম একটি ট্রাক যাচ্ছে পলাশবাড়ি। আমরা তখন ঐ ট্রাকে করে পলাশবাড়ি এলাম। পলাশবাড়িতেও আমার এক আত্মীয় ছিলো। ওখানে গিয়েই উঠলাম। সেখানেও জানতে পারলাম,রংপুর হয়ে ঠাকুরগাঁও যেতে পারবো না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পলাশবাড়ির বাম দিক দিয়ে ঘোড়াঘাট-ফুলবাড়ি হয়ে দিনাজপুর পৌঁছাবো। রাতটা পলাশবাড়িতেই কাটালাম। পরদিন সকালে দু’টো রিকশা করে দিনাজপুর রওয়ানা হলাম। এখনো মনে আছে রিকসা ভাড়া নিয়েছিলো ৪৫ টাকা। পথিমধ্যে আমরা একটা বিপদে পড়লাম। তখন কারো গায়ের রং ফর্সা দেখলেই লোকজন বলতো এরা পাকিস্তানি। আমরা রিকশা করে যাচ্ছি হঠাৎ দেখি রাস্তার ওপর এক ইপিআর জওয়ান। ইপিআর বাহিনী তখন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। রাস্তায় সেই ইপিআর জওয়ান আমাকে থামালো। তার কাছে আমি আমার পরিচয় দিলাম। কিন্তু কাজ হলো না। সে আমাদেরকে গ্রামের একটু ভেতরে নিয়ে গেলো। গ্রামের ভিতরে যাওয়ার পর আমার কাছে অবস্হা খুব খারাপ বলে মনে হলো। তখন আমি আমার চাচার পরিচয় দিলাম। চাচা ছিলেন বৃটিশ ভারতের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য। দিনাজপুরে তিনি খুবই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। সে আমার কোনো কথা বিশ্বাস করলো না। এমন সময় এক ভদ্রলোক সেই পথ দিয়ে রিকশা করে যাচ্ছিলো। সে আমাদেরকে দেখে থামলো। এই স্হানটি হলো ঘোড়াঘাট পার হয়ে ফুলবাড়ির দিকে। জায়গাটার নাম জানি না। ভদ্রলোক আমার পরিচয় জানতে চাইলো। আমি পরিচয় দিলাম। চাচার কথাও বললাম। তিনি আমার চাচাকে চিনতে পারলেন এবং ঐ ইপিআর জোয়ানকে বললো যে,এরা বাঙালি,এদেরকে ছেড়ে দিন। তখন সে আমাদেরকে ছেড়ে দিলো। আমরা আবার রিকসা করে রওয়ানা দিলাম। ফুলবাড়ি গিয়ে পৌছলাম সন্ধ্যে বেলায়। ফুলবাড়িতে একটা ছোট বাড়িতে আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্হা হলো। পরদিন খুব সকালে আমরা রিকশা করে দিনাজপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। ফুলবাড়ি থেকে দিনাজপুরের দূরত্ব প্রায় ৩০ মাইল। সকালে রওয়ানা হয়ে বেলা ১১টার দিকে দিনাজপুর পৌঁছলাম। সেদিন ছিলো ৮ এপ্রিল ১৯৭১।

আমরা ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিলাম ৪ এপ্রিল সকাল বেলা। ৪ দিন এবং ৫ রাতে আমরা দিনাজপুর পৌঁছলাম। দিনাজপুরে এসে আর এক সমস্যা দেখা দিলো। ঘোড়াঘাট এলাকা থেকে আমরা যে রিকশা নিয়ে এসেছিলাম তারা বললো,তারা আর সামনে যাবে না। তারা আমাদেরকে অন্য রিকশা ঠিক করতে বললো। তখন আমরা বাধ্য হয়েই রিকশা থেকে নেমে পড়লাম।

চলবে........
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877590 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877590 2008-12-03 10:06:31
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.২ (একটি কথ্য ইতিহাস) প্র: ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান আর্ম ফোর্সেস সদস্যদের মধ্যে যে বাঙালি সদস্য ছিলো,সেই শক্তি দিয়ে মার্চ মাসে পাকিস্তানি শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব ছিলো কি,আপনি কি মনে করেন ?
উ: আমার তো সন্দেহ আছে- এই জন্য যে,এটা করতে হলে বিষয় সম্পর্কে প্রথমত সবাইকে জানাতে হবে। বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে যেখানে যেখানে বাঙালি আছে তাদের সকলের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিয়ে বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। এই কাজটি যদি সফলভাবে করা সম্ভব হতো এবং এরা যদি সবাই একত্রে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারতো- তাহলেই কেবল এটা সম্ভব ছিলো। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি,যশোর সেনানিবাস থেকে লে. হাফিজ যিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন- তিনি এবং তাঁর বাহিনী যখন পাক সেনাদের দ্বারা আক্রান্ত হন- তখন লে. হাফিজ কোনোরকমে আত্মরক্ষা করে সেনানিবাস থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু তাঁর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিল আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান পক্ষকেই সমর্থন দিলেন, মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না। দেশ স্বাধীন হবার বহু বছর পর আমি রেজাউল জলিলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন তিনি আত্মসমর্পণ করলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না। তিনি তখন জানালেন,২৫ মার্চের কয়েকদিন আগে যশোর সেনানিবাস থেকে ডাক্তার কর্নেল হাই ঢাকা এসেছিলেন। তাঁকে কর্নেল রেজাউল জলিল নাকি বলেছিলেন যে,অনুগ্রহ করে আপনি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করবেন এবং জিজ্ঞাসা করবেন আমাদের কি করা উচিত। কর্নেল ডা: হাই যখন যশোর ফিরে গেলেন তখন লে. কর্নেল রেজাউল জলিল কর্নেল হাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা এবং কথা হয়েছে কি না। ডা: কর্নেল হাই তখন ওসমানীর ভাষ্য জানালেন এভাবে: ‘টেল জলিল,নট টু প্রিসিপিটেট ম্যাটার এনি ফারদার’। এর অর্থ কি দাঁড়ালো ? অর্থাৎ কর্নেল ওসমানীর কোনো ধারণায় ছিলো না কি হতে যাচ্ছে। অথবা কর্নেল ওসমানী এমন ধারণাও করতে পারেন যে,একটা রাজনৈতিক সমাধান হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীর জুনিয়র সদস্যরা ওসমানীর উপর ভরসা রেখেছিলো। তারা মনে করেছিলো যদি পাকিস্তানিরা মারাত্মক কোনো সামরিক ব্যবস্হা নিতে যায়, তাহলে সে সংবাদ অবশ্যই তিনি জানবেন এবং তিনি সেটা সবাইকে জানাবেন এবং তার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলবেন। যদিও অনেকেই পাকিস্তানিদের মতলব আগাম অনুমান করেছিলো। কিন্তু ওসমানী সাহেব পাকিস্তানিদের মতলব বা পরিকল্পনা আঁচ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ তাঁকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেও তিনি বিষয়টিকে আমলেই নেন নি। যেমন- আমি নিজেই তাঁকে ২২ মার্চ তারিখে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। আসলে, ইতিহাসের অনেক কথাই লেখা যায় না। History as written is not the history that happened.

যাহোক,২২শে মার্চের র‌্যালি শেষে আমি আমার কাজিন রব সাহেবের বাসায় গেলাম। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদকে খুব ভালোভাবেই জানতেন। আমি রব ভাইকে বললাম,আপনি রাজনৈতিক পরিস্হিতিকে কিভাবে দেখছেন বা এ বিষয়ে কি ভাবছেন ? রব সাহেব বললেন যে,মহাত্মা গান্ধীও ১৯২০ সালের দিকে অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন,কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত নন ভায়োলেন্ট থাকেনি। আমি তখন বললাম যে,আপনি নিজে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে কথা বলেন। কেননা পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। আমি তখনই অনুমান করেছিলাম যে,এখানে পাকিস্তানি বাহিনী একটা ভয়ানক ধ্বংসলীলা চালাবে। এই ধ্বংসলীলা হবে অকল্পনীয়- হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের মতোন। রব সাহেবকে আমি আমার ধারণাটা জানিয়ে বললাম,গিয়ে দেখুন,শেখ সাহেব কি ধরনের প্রস্তুতির কথা ভাবছেন। রব সাহেব আমাকে পরদিন সন্ধ্যায় যেতে বললেন। আমি পরদিন ২৩ মার্চ সন্ধ্যায় আবার রব সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম।

রব সাহেব বললেন যে,তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাজউদ্দীন সাহেব বলেছেন,পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোপন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তিনিও কিছুটা জানেন। তারা যে ব্যাপক কিছু করতে পারে সে আশঙ্কা তিনিও করছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এদিকে বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারটাকে অতো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেননা ওসমানী সাহেব এবং আরো কয়েকজন বঙ্গবন্ধুকে নাকি বলেছেন, এ ধরনের কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা নাই।

২৩ মার্চ তারিখেই আমি সোবহানবাগ দিয়ে যাচ্ছি,এমন সময় দেখা হলো এ. কে. এম, মাহবুবুল ইসলাম-এর সঙ্গে। তিনি পাবনার এম. পি. এ. ছিলেন। প্রাক্তন নেভাল কমান্ডার। তিনি আমাকে নিকটেই একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়ির দোতলায় উঠে দেখি ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেব বসে আছেন। সঙ্গে আছেন সিরাজগঞ্জের এম. পি. এ. হায়দার সাহেব। মনসুর আলী সাহেবের সঙ্গে আমার অতোটা ঘনিষ্ঠতা ছিলো না। তারপরও আমি তাঁকে বললাম যে,বঙ্গবন্ধু সকল নেতাদেরকে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার কথা বলেছেন অথচ আপনি এখনো এখানে বসে আছেন। কেননা আমি জানতাম,যে কোনো মূহুর্তে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। আমাদের বসে থাকার সময় নেই। মনসুর আলী সাহেবকে আমার মতামত বললাম। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। আমি চলে আসলাম। তার দু’দিন পরই এলো সেই ভয়াল রাত,২৫ শে মার্চ।

চলবে........
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877279 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877279 2008-12-02 16:51:26
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২.১ (একটি কথ্য ইতিহাস) প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?
উ: ১৯৭০ সালে তো সাধারণ নির্বাচন হলো। নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় আবার আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে লক্ষ্য করলাম যে,পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন প্রবলভাবে দানা বেঁধে উঠছে। মার্চ মাসের ২ তারিখে আমি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে বিমান বাহিনী অফিসে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মনোভাব জানতে চেষ্টা করি। বুঝতে চেষ্টা করি পরবর্তীতে কি হতে চলেছে। পরে আমি কথা বললাম গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের সঙ্গে। ক্যান্টনমেন্টের বাসায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর লক্ষ্য করলাম তিনি খুবই আপসেট। তিনি আমাকে ইঙ্গিতে ঘরের বাইরে যেতে বললেন। আমি বুঝলাম,তিনি একান্তে কিছু বলার জন্য আমাকে লনে যেতে বলছেন যাতে অন্য কেউ আমাদের আলোচনা শুনতে না পায়। লনে এসে এ. কে. খন্দকার কয়েকটি বিষয় আমাকে ইংরেজিতে অবহিত করলেন। প্রথমত: পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের কাছে কোনোক্রমেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। দ্বিতীয়ত: তারা ইতোমধ্যে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১২টি ট্যাঙ্ক ঢাকার কুর্মিটোলায় নিয়ে এসেছে। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধ প্রস্তুতি আছে কিনা তা জানার জন্য। যুদ্ধ বলতে ঐ বাঁশের লাঠি দিয়ে যুদ্ধ নয়। রীতিমতো অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ। তখন তাঁকে বললাম,আওয়ামী লীগের বড় নেতা পর্যায়ের দু-এক জনকে হয়তো আমি চিনি। কিন্তু তাদের কারো সঙ্গে তো আমার ঘনিষ্ঠতা নাই। আমি আমার এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন এম. এন. এ. বা এম. পি. এ. অথবা আওয়ামী লীগের নেতা- তাদেরকে চিনি। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কারো সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ নেই। তাঁকে আরো বললাম,আমাকে ৩/৪ দিন সময় দাও এর মধ্যে কারো মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলে তোমাকে আমি জানাচ্ছি।

এ সময় ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো এক সেক্রেটারি ছিলেন আমার কাজিন। তাকে গিয়ে ঘটনাটা বললাম। তার কাছেই জানতে চাইলাম আওয়ামী লীগের যুদ্ধ প্রস্তুতি কি ? সে আমাকে তেমন কিছু বলতে পারলো না। আমি তাকে এ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাবার জন্য বললাম। দু’ দিন পর সে আমাকে জানালো যে,আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই। এমনিতেই আন্দোলন চলছে। আমি এটা এ. কে. খন্দকারকে জানালাম। এটা জেনে তিনি খুব হতাশ হলেন। আমিও হতাশ হয়েছিলাম। আমি রাজনৈতিক পরিস্হিতির দিকে নজর রাখছিলাম। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে এটা সকলের কাছে প্রত্যাশিত ছিলো। যে কোনো গণতনমনা মানুষেরই এটা কাম্য। কিন্তু এটা না করে পাকিস্তান সরকার যে পন্থা বেছে নিলো সেটা আমার কাছে সম্পূর্ন নির্বুদ্ধিতার শামিল বলে মনে হলো। হয়তো ওরাও বুঝতে পারেনি যে সত্যিকার অর্থে অবস্হাটা কি এবং দেশে কি হতে যাচ্ছে।

যাহোক,সময় তো দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছিলো। এর মধ্যে আমার এক ভাতিজা ফোন করে আমাকে জানালো যে,২২ মার্চ তারিখে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক লোকদের একটি র‌্যলি হবে বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে। কর্নেল ওসমানী সেখানে থাকবেন। আমি যেন উপস্হিত থাকি। আমি সম্মতি জানালাম এবং বিকেল বেলা নিজের গাড়িতে করে সেখানে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম কর্নেল ওসমানী,জেনারেল মজিদ প্রমুখ রয়েছেন। কর্নেল ওসমানী সাহেবকে আগে থেকেই আমি চিনতাম। কিন্তু ’৭১-এর মার্চ মাসে তখনো কর্নেল ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। আমরা তিন লাইনে দাঁড়ালাম। আমি সামনের লাইনে ছিলাম। কর্নেল ওসমানী এসে আমাকে বললেন,বিমান বাহিনীর মধ্যে তুমিই সবচেয়ে সিনিয়র,তুমি বিমান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করবে। এতে আমি সম্মত হলাম। র‌্যালি শুরু করে আমার গাড়িতে করে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম। আমরা সেখানেই অপেক্ষা করছিলাম। কারণ র‌্যালি সেখানে এসেই শেষ হবার কথা। বঙ্গবন্ধু তাদের সালাম গ্রহণ করবেন এবং তারপর আমরা তাঁর সাথে দেখা করবো।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করার সময় আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে রাজনৈতিক পরিস্হিতি বোঝার এবং পাকিস্তানিরা কি করতে যাচ্ছে সেটা তাঁকে বলার চেষ্টা করলাম। আমি ওসমানী সাহেবকে বললাম,‘স্যার,দে উইল টেক মিলিটারি অ্যাকশন এগনেস্ট আস। ডু ইউ রিয়ালাইজ ইট’। আমার কথায় ওসমানী সাহেব বললেন যে,‘দিস ইজ ননভায়োলেন্ট অ্যান্ড ননকো-অপারেশন মুভমেন্ট। দিস মুভমেন্ট উইল স্টপ দ্যা ট্যাংকস,দেয়ার মে বি ফরেন ইন্টারভেনশন’। আমি তাঁর উত্তরে একটু আশ্চর্যই হলাম। প্রকৃতপক্ষে তিনি পাকিস্তানি শাসক এবং সামরিক বাহিনীর তৎপরতাকে কোনো আমলেই নেন নি। আমি তখন মনে মনে ভাবলাম,কখন ফরেন ইন্টারভেনশন হবে,আর তার জন্য তিনি বসে আছেন! যাহোক,এই কথা বলার পরও আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে পরবর্তী পরিস্হিতি বিশেষত: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবেলা করার বিষয়ে কিছু কথা বললাম। আমি কর্নেল ওসমানীকে আরো জিজ্ঞেস করলাম,স্যার,আপনি পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবেলা করার কথা কি কিছু ভাবছেন। সেদিন তাঁর কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সুশ্চষ্ট উত্তর পাওয়া গেলো না। আমি বললাম যে,শুধু অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবেলা করা যাবে না। তাদেরকে সশস্ত্র ভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু এই জাতীয় সামরিক পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ছিলো কিনা সেটা ওসমানী সাহেব আমাকে বলতে পারেননি। আমি দেখলাম,ওসমানী সাহেব প্রথাগত ধারণা নিয়ে বসে আছেন। আমি খুব হতাশ হলাম। পরে কর্নেল রব আমাকে ওসমানী সম্পর্কে বলেছেন যে,তিনি তখন এ সব ভাবা তো দূরের কথা,সে সময় তাঁকে পাকিস্তানি কমান্ডোরা ধরে নিয়ে যেতে পারে- এই ভয়েই তিনি নাকি সারাক্ষণ অস্হির ছিলেন। অথচ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাঁর উপর ডিপেন্ড করে বসে আছেন। এমন কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোনো কোনো বাঙালি অফিসার পর্যন্ত কর্নেল ওসমানীর সিগনালের অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে তাদের সকলকে অন্ধকারে রেখেছিলেন।

ঢাকা Air Base-এ কর্মরত গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার সাহেব আমাকে বলেছিলেন গোদনাইলে সরকারি তেল ডিপোতে একটা কিছু করার জন্য। আমি এ সংবাদ ছাত্র লীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। ওরা সেখানকার রাস্তায় কেবল ছোট কয়েকটা ট্রেঞ্চ খুঁড়েছিলো পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য। এর বেশি কিছু তারা করতে পারেনি।

আমি তাদের বলেছিলাম নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে পাকিস্তানি বাহিনী যাতে জ্বালানি তেল না নিতে পারে বা তেল না আসতে পারে সে বিষয় নিশ্চিত করার জন্য। এ. কে. খন্দকার আমাকে বলেছিলেন,দাদাভাই,আপনি একটু দেখেন পাকিস্তানি আর্মিদের তেল আনার জন্য গোদনাইলে যাবার যে পথ আছে সেটা বন্ধ করা যায় কি না। আমি সে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমি ছাত্র লীগ নেতাদের বিষয়টি বলেছিলামও। কিন্তু বিষয়টিকে তারা খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। এটা বন্ধ করা গেলে বা সেখানে কোনো বড় অবরোধ সৃষ্টি করা গেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের যানবাহনের জন্য ওখান থেকে তেল আনতে পারতো না এবং তাদের ২৫ মার্চ এবং তার পরবর্তীতে অপারেশন চালানো সহজ হতো না।
চলবে......
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877107 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28877107 2008-12-02 09:02:48
মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, পর্ব ২ (একটি কথ্য ইতিহাস)

নাম : উইং কমান্ডার (অব<img src=" style="border:0;" /> এস. আর. মীর্জা (সাইফুর রহমান মীর্জা)
পিতা : মৃত মীর্জা ফজলুল করিম
গ্রাম : ঠাকুরগাঁও,
ডাক : ঠাকুরগাঁও,
পৌরসভা : ঠাকুরগাঁও
থানা : ঠাকুরগাঁও,
জেলা : ঠাকুরগাঁও (১৯৭১ সালে দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত মহকুমা)
বর্তমান ঠিকানা : অর্কিড ভিলা, অ্যাপার্টমেন্ট ই/২
প্লট ১৮,সড়ক ১,বারিধারা, ঢাকা ১২১২
শিক্ষাগত যোগ্যতা : আই. এস. সি.
১৯৭১ সালে বয়স : ৪২
১৯৭১ সালে পেশা : ব্যবসা,
বর্তমান পেশা : অবসর জীবন
-------------------------------------------------
প্র: পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে আপনি কোন ‌সালে যোগদান করেন এবং কতদিন এই পেশায় ছিলেন ?
উ: ১৯৪৯ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি আমি পাকিস্তান এয়ারফোর্সে যোগদান করি। পাকিস্তানের রিসালপুরে আমার ট্রেনিং শুরু হয়। ট্রেনিং শেষ হবার পর ১৯৫১ সালের ২৬ মে আমি কমিশনপ্রাপ্ত হই। কমিশন লাভের পর ১৯৬৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আমি পাকিস্তানেই ছিলাম। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে আমাকে ঢাকায় বদলি করা হয় অ্যাজ অফিসার কমান্ডিং অ্যাড্‌মিন উইং অ্যান্ড সেকেন্ড-ইন-কমান্ড,পাকিস্তান এয়ারফোর্স হেড-কোয়ার্টার্স,ইস্ট পাকিস্তান,ঢাকা।

তখন ঢাকায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি স্কোয়াড্রন ছিলো। এটাকে অপারেশনাল Base বলা হতো। আমার ঢাকায় বদলি হবার পিছনেও একটা ঘটনা আছে। সেটা এখানে বলা প্রয়োজন। এয়ারফোর্সে প্রমোশন পাওয়ার পর আমার ফ্লাইং করাটা কমে গেলো বা বলা যায় কমিয়ে দেয়া হলো। অথচ আমি ফ্লাইং করাটা খুব পছন্দ করতাম। যতদিন আমি ফ্লাইংয়ে ছিলাম ততদিন আমি পাকিস্তান এয়ারফোর্স খুব এনজয় করেছি। এ ছাড়া পছন্দ করার আরো কিছু কারণ ছিলো। তখন পাকিস্তান এয়ারফোর্স খুব ডিসিপ্লিনড ফোর্স ছিলো। আমার জানা মতে,কোনোরকম করাপশন ছিলো না,কোনো গ্রুপিং বা নেপটিজমও ছিলো না। একটা ডিসিপ্লিনড ফোর্স বলতে যা বোঝায়,পাকিস্তান এয়ারফোর্স তখন তাই ছিলো। আমি সিনিয়র হলাম ১৯৬৪ সালে। তখন আমাকে স্টাফ পোস্টিং দেওয়া হলো। এই স্টাফ জব আমি পছন্দ করিনি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এয়ারফোর্সে আমি আর থাকবো না। এ সময় এয়ারফোর্সের চাকরি ছেড়ে পি.আই.এ.-তে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। আমি একদিন এয়ার মার্শাল নূর খানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে পি.আই.এ.-তে নিতে রাজী হয়ে বললেন,এয়ারফোর্স যদি তোমাকে ছেড়ে দেয় তাহলে আমি তোমাকে নেবো। তাঁর সঙ্গে দেখা করার আগেই কিন্তু আমি স্বেচ্ছা অবসরের জন্য দরখাস্ত দিয়েছিলাম। এয়ার মার্শাল নূর খানের সঙ্গে দেখা করে আমি এয়ারলাইন্স ট্রান্সপোর্ট পরীক্ষা দিলাম এবং পাশ করলাম। এ সব কাজ শেষ করে করাচী থেকে পেশোয়ারে ফিরে যাওয়ার পর এয়ার সেক্রেটারি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যাওয়ার পর তিনি বললেন,সি.এন.সি. তোমাকে রিটায়ারমেন্ট দিতে রাজি নন। তখন সি.এন.সি. ছিলেন এয়ার মার্শাল আজগর খান। এয়ার সেক্রেটারি তখন আমাকে বললেন,তোমার সামনে দু’টি পথ খোলা আছে। এক,তুমি কমিশন রিজাইন করতে পারো। সে ক্ষেত্রে তুমি পেনশন ল্যুজ করবে ওয়ান ফোর্থ। দুই,এয়ার মার্শাল আজগর খান তোমাকে ইস্ট পাকিস্তানে অ্যাজ সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অ্যান্ড ওসি অ্যাডমিন উইং করে পাঠাবে। তুমি যদি ওটাতে রাজি হও তা হলে আমাকে জানাও। তখন আমি দ্বিতীয় প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলাম এবং এপ্রিল মাসে পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের আগ দিয়ে অপারেশনাল Base- এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ডারদেরকে নির্দেশ দেয়া হলো যে,ঢাকা বিমান বন্দরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণ করতে। নির্দেশ অনুযায়ী আমরা কিছু প্রস্তাব পাঠালাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানালেন এখন এ সব কাজ করানো সম্ভব হবে না। কারণ এ জন্য অর্থের কোনো সংস্হান নেই। এই সময়ই অর্থাৎ ১৯৬৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে আমি একটা ফ্ল্যাগ সিগনাল পেলাম। এটা থেকে বুঝতে পারলাম যে,ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর তারিখে ভারতীয় বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি টার্গেটে আক্রমণ করলো। সে দিন আমি অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে ঘুমিয়েছিলাম। আমার এক কাজিন ছিলেন তখন গভর্নরের সামরিক সচিব,কর্নেল মনিরুল হক। তিনিই প্রথম ফোনে আমাকে এ খবরটি দেন। আমি তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে এয়ার ইধংব-ঋ গেলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম- ভারতীয় বিমান বাহিনী শিবগঞ্জ এয়ারফিল্ড আক্রমণ করেছে,একটা পাম্প হাউজেও হামলা করেছে। রংপুর রেলওয়ে স্টেশন এবং কুর্মিটোলা রাডার স্টেশনের উপরও তারা আক্রমণ চালিয়েছে। তবে রাডার ধ্বংস করতে পারেনি। পাশের একটা টিন সেডে গোলা এসে পড়েছে। কিন্তু রাডার স্টেশনে কর্মরত একজন এয়ারম্যান এই হামলায় মারা গেছে। তখন আমরা সম্পূর্নভাবে অপ্রস্তুত ছিলাম। আমাদের বিমানগুলি ছিলো সম্পূর্ন উন্মুক্ত জায়গায়। সেখানে তারা আক্রমণ করেনি। অথচ ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদের অরক্ষিত বিমানগুলির উপর হামলা চালাতে পারতো। এই পরিস্হিতিতে কি করবো এটা আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম না। তখন গভর্নরের সামরিক সচিবকে ফোন করলাম এ বিষয়ে গভর্নরের নির্দেশের জন্য। তখন গভর্নরের প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলো শামীম আহসান। আমি সামরিক সচিবকে ফোন করার ঘন্টাখানেক পর শামীম আহসানের কাছ থেকে ফোনে জানতে পারলাম যে,গভর্নর আমাকে দেখা করতে বলেছেন। আমি স্টেশন কমান্ডারকে না জানিয়ে গভর্নরের সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি গভর্নরকে সামগ্রিক পরিস্হিতি সম্পর্কে অবহিত করলাম। আমি বললাম যে,স্যার,পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র এক স্কোয়াড্রন বোমারু বিমান আছে। এই মুহূর্তে প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা জোরদার করার জন্য Passive defence-এর প্রয়োজন। গভর্নর আমার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামরিক সচিবকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বললেন। একই সঙ্গে বিমান বন্দরের প্রতিরক্ষার জন্য কিছু পেন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর থেকেই এ কাজ শুরু হয়ে গেলো। এরপর আমরা এখান থেকেই কয়েকটা ইন্ডিয়ান এয়ার ফিল্ড আক্রমণ করলাম।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৭ দিন ধরে চললো। যুদ্ধের এই কয়দিনে ভারতীয় বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিমান ঘাঁটি তেজগাঁওয়ে কোনো হামলা পরিচালনা করেনি। এটা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগলো। আমাদের মাত্র এক স্কোয়াড্রন বিমান এখানে ছিলো। তারা এটাকে সহজেই ধ্বংস করতে পারতো। বিক্ষিপ্ত বিমান আক্রমণ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও ইন্ডিয়ান আর্মি আক্রমণ করেনি। এই যুদ্ধ থেকে আমি তখনই বুঝতে পারলাম যে,ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে চাচ্ছে না। তারা জানতো,পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে যে বৈষম্য,সেই বৈষম্য নিয়ে পূর্বাংশের মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে। পরিণতিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে সংঘাত অনিবার্য। আমি মনে করি যে,এই কারণেই ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং বিমান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বস্তুত কোনো প্রকার আক্রমণ পরিচালনা করেনি।

তখনকার ঘটনাবলী থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে,আজ হোক,কাল হোক পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এর অনেকগুলি কারণও আমি লক্ষ্য করেছিলাম। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে অসম উন্নয়ন,আর্থিক বৈষম্য,চাকুরি ক্ষেত্রে বৈষম্য,প্রতিরক্ষা খাতে বৈষম্য ইত্যাদি কারণে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রবল হয়ে উঠছিলো।

পাকিস্হানের দুই অঞ্চলের অসম বিকাশের বিষয়টিও আমাদের চোখে পড়ছিলো। তখন ছয়-দফা আন্দোলন চলছিলো। আমি পত্র-পত্রিকা পড়ে আন্দোলনের খবর জানতাম। সত্যি কথা বলতে কি আমি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কড়া বেষ্টনীতে অবস্হান করেও এই বিষয়গুলি বুঝতাম। যদিও পাকিস্তান বিমান বাহিনী তখন রাজনীতির ধারে কাছেও ছিলো না। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৫৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবেই হয়েছিলো। প্রায় অরক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়টি এ সময়ের রাজনীতিতে খুবই প্রাধান্য পায়। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং মিলিশিয়া গঠনের দাবিও ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ব থেকেই পূর্বাঞ্চলে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে,পাকিস্তানকে আর ঐক্যবদ্ধ রাখা যাবে না। এই আবহাওয়া আমাদেরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

যাহোক,১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় আমার জীবনে আর একটি ঘটনা ঘটে। ঢাকায় এয়ার Base - এর যিনি স্টেশন কমান্ডার ছিলেন তাঁর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্হা এবং আরো কিছু বিষয় নিয়ে আমার ডিফারেন্স অব অপিনিয়ন হয়। যার জন্য আমি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে বাধ্য হই। এ সময়ই সিদ্ধান্ত নিলাম যে,আমি আর পাকিস্তানে ফিরে যাবো না। আমি ১৯৬৮ সালে আবার স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করি। ১৯৬৮ সালের অগাস্ট মাসে উইং কমান্ডার হিসেবে আমি এল.পি.আরে যাই। ১৯৬৯ সালের অগাস্ট মাসে আমার এল.পি.আর. পূর্ণ হয়। আমার জায়গাতে পোস্টেড হয়ে আসেন আরেক জন বাঙালি অফিসার,তিনি আমারই আত্মীয়,বন্ধু এবং ভগ্নিপতি এ. কে. খন্দকার। তিনি তখন গ্রুপ ক্যাপ্টেন ছিলেন। এ. কে. খন্দকার পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকেও গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদ অফার করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই পদ গ্রহণ না করে আমি স্বেচ্ছা অবসরই বেছে নেই। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে আমি ঢাকাতেই বসবাস করতে থাকি এবং পেশা হিসেবে বেছে নেই ব্যবসা।
চলবে...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28876707 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonmahbubsblog/28876707 2008-12-01 13:06:29