somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবুলের ফাঁসি ও আমজনতার আত্মতৃপ্তি

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছি! ছি! রব উঠে গেছে চারিদিকে। মানুষ কতোটা নিচে নামতে পারলে এমন কাজ করে। ছি! ছি! ছি!। এমন সুশাসন যে রাজ্যে সেই রাজ্যের রাজার বিরুদ্ধে কথা বলবে এটা তো মহাঅন্যায় অবশ্যই, মহাপাপও বটে। আরে বাবা রাজ্যজুড়েই তো খাদ্য সংকট। যেটুকুও খাদ্যদ্রব্য আছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য। তারওপর দামটা যে কম সেটাও বলছি না ? এর জন্য কি রাজা দায়ী ? রাজা কি বসে বসে ধান-চাল-গম-ভুট্টা হাত দিয়ে তৈরী করবেন নাকি? এসব হলো প্রকৃতির দান। সবই হলো ভাগ্যের লেখা।

এই রাজ্যের প্রজারাও বেশ ভালো, অত্যন্ত সহনশীল। ধর্মীয় গ্রন্থেই আছে- সহশীল ব্যক্তিদের সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন। তাই নিয়তিকে মেনে প্রজারা বাজারে তেমন একটা যায় না। তবুও তো ওদের চোখে-মুখে কষ্টের কোনো ছাপ নেই। ওরা অনাহারি মুখেও ব্যস্ত আছে রাজা বন্দনায়। আর রাজার বন্দনা করবেই না বা কেন? এমন রাজা কোনোকালে এ জাতির ভাগ্যে কখনো জুটেছে নাকি? রাজ্যে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি ও খাদ্য সংকট বাদে সবকিছুতেই ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ফুটপাত আর রাস্তাগুলো আজ পশ্চিমা রাজ্যগুলোর মতো হয়ে গেছে। রাতের বেলা রাজপথে হলুদাভ সোডিয়াম লাইট জ্বলে। তারপর আবার এই রাজা মহাশয় ও তার দেশপ্রেমিক সভাসদরা রাজ্যের সব দুর্নীতি উধাও করে দিয়েছেন। রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাইরের ধনি রাজা-বাদশাদের বাহবা পেয়েছেন প্রচুর। আর কি চাই? মানুষ খাবার কিনতে পারছে না, খেতে পাচ্ছে না তো কি হয়েছে? খাওয়াটাই কি সব? গোগ্রাসে পেটপুরে খেয়ে অসম্মানজনক জীবন যাপনের চেয়ে না খেয়ে সম্মানের সাথে মরে যাওয়াই ভালো। কি বলেন? আমি কি খারাপ কিছু বললাম?

রাজপ্রাসাদের সামনে বিশাল মাঠে হাজির করা হলো আবুলকে। তার সামনে হাজার হাজার মানুষ বিােভ করছে। স্লোগান দিচ্ছে আবুলের ফাঁসি চাই। দীর্ঘদিনের ুর্ধ্তা অবস্থায় স্লোগান দিতে গিয়ে কয়েকজন ওই মিছিলের মধ্যেই মৃত্যুমুখে ঢলে পড়লো। তাদেরকে একে একে শহীদের মর্যাদায় কফিনে ভরতে লাগলো রাজার বলিষ্ঠ সৈনিকেরা। দামি দামি তকতকে ঝকঝকে সব বিদেশী কফিন। খাদ্যের অভাব হলেও কফিনের কোনো অভাব নেই। আরে এমন কফিনে মরে পড়ে থেকেও শান্তি। মিছিলের মধ্যে একের পর মৃত্যুকোলে ঢলে পড়লেও মিছিল থামছে না।
আমি গুটিগুটি পায়ে মাঠের শেষপ্রান্তে অবিস্থিত বিশাল মঞ্চের কাছে এসে দাঁড়ালাম। আবুলকে দেখে আমারও ঘৃণা হলো। তাকে একটি কাঠের গুঁড়িতে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এই পুচকে আবুলের কত্তো বড় সাহস! খাবার না পেয়ে ওর দুই ছেলে এক মেয়ে মারা গেছে। গতকাল মারা গেছে ওর বউটাও। এরপর যে সে এমন ন্যাক্কারজনক কাজ করবে ভাবতেই অবাক লাগছে। খাবারের দাবিতে পাড়ার কয়েকজন পাগলকে সাথে করে হাজির হলো রাজপ্রাসাদের সামনে। খাবারের জন্য রাজার বিরুদ্ধে কথা বললো, স্লোগান দিলো। হারামির কত্তো বড়ো বুকের পাটা। যে রাজার জন্য আমাদের এতো সম্মান তার বিরুদ্ধে কথা? আজ পশ্চিমের রাজ্যগুলোর লোকেরা আমাদের কতো প্রশংসা করে। কতো ভালোবাসে। তারা বলে, এ রাজ্যে খাবার না থাকুক আইন-শৃংঙ্খলা ও প্রশাসনের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আমাদের জন্য তারা কতো ভাবে।
অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণে রাজ্যের বাতাসে একটু পঁচা গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই দেখে এক বিদেশী রাজা কোটি কোটি টাকার সুগন্ধি পাঠিয়েছেন আমাদের রাজ্যে। আমাদের খাবার হিসেবে পাঠিয়েছেন কয়েক জাহাজ হাওয়াই মিঠাই আর চুয়িংগাম। আমাদের প্রতি তাদের কতো দরদ!
শালা বেকুব আবুলটাই বুঝলো না। আমার কতো আত্মীয়-স্বজন অনাহারে মারা গেলো। পরশু দিনই তো আমার দাদা মরলো। মৃত্যুকালে হাসিমুখে দাদা আমাকে বলেছিলো, শোন্, এমন রাজ্যে বাস করে না খেয়ে মরার মধ্যেও শান্তি আছে। কখনো রাজা বাহাদুরের বিরুদ্ধাচারণ করবি না। এ পাপ কিন্তু খন্ডাতে পারবি না।
দাদার কথা মনে হয়ে আমার চোখে জল চলে এলো। এ জল গৌরবের । আমার চোখের সামনেই দাদা না খেয়ে মারা গেলো। এমন মৃত্যুতে সুখ আছে। কয়েকদিন ধরে আমার পেটেও কিছু নেই। শরীর চলছে না। তবুও পকেটে রাখা একটা দামি বিদেশী চুইংগাম চিবোতে চিবোতে চলে এলাম এই বেহায়াকে দেখতে।
হঠাৎ রাজা মশায় চলে এলেন মঞ্চে। বাহ্ কি সুন্দর টসটসে চেহারা তার। গায়ে আঙুলের টোকা দিলে রক্ত বেরুবে। পাশে টেবিলে সাজানো আছে থরে থরে আপেল, কমলা, বেদেনা, আঙুরসহ কতো কি? রাজাকে দেখে মনে মনে ভাবলাম, এমন ভালো রাজার উপর ঈশ্বরের ছায়া আছে। ঈশ্বর ওনাকে দীর্ঘজীবী করুন।
রাজাকে দেখে বন্যার ঢলের মতো জনসমূদ্রে জয়ধ্বনি উঠলো। রাজা হাত নেড়ে সবাইকে শান্ত হতে বললেন।
এবার রাজা জনগণের উদ্দেশে ভাষণ শুরু করলেন, “ প্রাণপ্রিয় প্রজারা আমার। আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতায় আমার রাজ্য আজ দুর্নীতিমুক্ত। আমরা আজ সভ্য জাতিতে পরিণত হয়েছি। কতো লাখ মানুষ না খেয়ে শহীদ হলো তার হিসাব রাখেন আপনারা ? জেনে রাখবেন, ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। এতো ভালো প্রজা কোন রাজ্যে আছে। সত্যিই আপনাদের জন্য আমার গর্ব হয়। বাইরের বহু রাজা আপনাদের সংযমের প্রশংসা করে। এমন ভাগ্য কয়টা জাতির কপালে আছে, কয়টা রাজার কপালে আছে। বলতে বলতে রাজার গলাটা ভারী হয়ে এলো আর চোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগলো। শুভ্র টিস্যু পেপার দিয়ে চোখদুটো মুছে নিলেন তিনি।
এরপর তিনি আবুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, সভ্য রাজ্যে বাস করেও অসভ্য রয়ে গেছে এই জানোয়ারটা। দেশের জন্য জীবন দেওয়াটাও যে বীরত্বের কাজ এই উজবুক এটাও জানে না। বলেন এর কি শাস্তি হওয়া উচিত?”
ক্ষুধার্ত জনগণ গলাফাটিয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিতে লাগলো, আবুলের ফাঁসি চাই। আবুলের ফাঁসি চাই। আমিও স্লোগানে যোগ দিলাম। শরীরটা কেমন যেনো টলমল করছে। তবু স্লোগান ছাড়লাম না। দেখলাম স্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপছে। এরইমধ্যে আমার পাশেই কয়েকজন মৃত্যুকোলে ঢলে পড়লো। শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তাদের মুখ দিয়ে বের হচ্ছিলো....আবুলের ফাঁসি চাই.........আবুলের ফাঁসি চাই। আবুল কাঠের গুঁড়িতে ঝুলে বিক্ষুব্ধ জনগণের দিকে টুল টুল করে চয়ে থাকলো।
কয়েক ঘন্টা রাখলে এমনিতেই মারা যাবে হারামিটা। কারণ ওর পেটে তো কিছু নেই।
এরপর জনসম্মুখে আবুলের ফাঁসি কার্যকর হলো। খুব মজা পেলো প্রজারা। আনন্দে হাসতে গিয়ে পেটে খিল লেগেও মরলো কয়েক শ' জন।
সন্ধ্যায় যখন আমি বাড়ি ফিরছিলাম তখন ক্ষুধায় নিস্তেজ আমার শরীর। পরপারের ডাক আমার কানে ভেসে আসছিলো। তবুও মনের শক্তি ও দেশপ্রেমের জোরে কোনোমতে নিজের ঘরের দরজার চৌকাঠ পার হলাম। ধুপ করে লুটিয়ে পড়লাম আমার আদরের ছোট বোনের মৃতদেহের ওপর। সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ও বলেছিলো, ভাইয়া কোথাও খাবার পেলে তুই খেয়ে নিস।#
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×