অভি প্রায় রাতেই খুব করে কাঁদতো। একেবারে গভীর রাতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে যায় অভি তখন কাঁদে। ওর কান্নার শব্দ আমার ঘুমকে হত্যা করেছে বহুরাত। মাঝে মাঝে আমিও ওর সাথে কান্নায় শরীক হয়েছি। অবশ্য আমার অংশগ্রহণ ওকে বুঝতে দিই নি। ও আমার খুব কাছের বন্ধু। গত বছর সামার ভ্যাকেশনে ওদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওর মায়ের আদর-যত্ন আর আতিথেয়তা আমাকে স্তব্ধ করেছিলো। অভি খুব ভালো গান করতে পারতো। রাতের বেলা আমরা ওর গান শুনতাম। ওর অধিকাংশ গানই ছিলো মাকে নিয়ে। আমি যে আমার মাকে কম ভালোবাসি তা নয়। জীবন দিয়ে ভালোবাসি। কিন্তু মায়ের প্রতি অভির ভালোবাসা দেখে নিজেই দ্বিধান্বিত হই- আমি কি তাহলে আমার মাকে অভির চেয়ে কম ভালোবাসি? রাতের বেলা সবাই যখন মোবাইল ফোনে প্রেমে মত্ত, তখন অভি ওর মায়ের সাথে সারাদিনের কর্মকান্ডের বর্ণনা শুনাতো। বাসার খুঁটিনাটি খবর নিতো। ওর বাবা দীর্ঘদিন আগেই মারা গেছেন। ওদের সংসারের অবস্থা খুবই নাজুক। বাসায় শেলাইয়ের কাজ করে যে টাকা হয় তা দিয়েই কোনো রকমে চলতো ওদের সংসার। অভি তিনটা টিউশনি করাতো। খুব কষ্ট করে চলতো। বাসা থেকে কোনো টাকা নিতো না। আমি বাসায় গিয়ে আমার মায়ের কাছে অভি ও তার মায়ের কথা অনেকবার বলেছি। অভি মাঝে মাঝে বলতো ইস্ আমার যদি মোবাইল ফোন থাকতো তাহলে মায়ের সাথে পেটপুরে কথা বলতাম। আমার দীর্ঘদিনের জমানো টাকা দিয়ে ওকে আর ওর মাকে দুটো অল্পদামের মোবাইল সেট কিনে দিয়েছিলাম। খুশিতে অভি সেদিন কেঁদেছিলো।
সবচেয়ে মজার বিষয় ও একবার বাসায় গেলে আর ক্যাম্পাসে ফিরতে চাইতো না। ক্লাসে উপস্থিতির হারটাও তাই খুবই গরীব। বাসায় গেলে ওর মাও ওকে ছাড়তে চাইতো না।
বেশ কিছুদিন থেকেই খেয়াল করছিলাম অভি ১০/২০ টাকা করে একটা বাক্সে রাখছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে ও বলেছিলো ওর মায়ের চোখের ভীষণ সমস্যা। ভালোমতো দেখতে পান না। সেলাইয়ের কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই ওর মা নাকি মাথা ব্যথায় ছটফট করে। তাই জমানো হাজার খানেক টাকা জমিয়ে ওর মাকে একটা ভালো ডাক্তার দেখাবে আর একটা চশমা কিনে দেবে।
ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে প্রায়ই অভি ঢুকে পড়তো চশমার দোকানে। পকেটে টাকা নেই; তারপরও অনেকক্ষণ ধরে ওর মায়ের জন্য চশমার ফ্রেম খুঁজতো।
একদিন মেসে এসে দেখি অভি নেই। কাউকে কিছু না জানিয়েই কোথায় যেনো গেছে। আমি ওর নম্বরে এবং ওর বাসার নম্বরে কল করলে মোবাইল বন্ধ পাই। সপ্তাহ খানেক কেটে গেলো। ওর কোনো খোঁজ-পাত্তাই পেলাম না। ফাইনাল পরীক্ষা চলার কারণে ওদের বাসায়ও যেতে পারিনি।
একদিন সন্ধ্যায় আমি ঘরে বসে পড়ছি। পেছন থেকে অভি আমার ঘারে হাত রাখলো। ওর চেহারা দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। একি হাল হয়েছে ওর। অভি ব্যাগ থেকে একটা সোনালী ফ্রেমের চশমা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললো, পরীক্ষা শেষে বাসায় যাবার সময় এটা নিয়ে যাস। খালাম্মাকে দিবি। বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। এরপর মোবাইল সেট দুটো আমাকে ফিরিয়ে দিলো। আমি নিতে না চাইলেও কেঁদে-কেটে খুব জোর করে আমার ড্রয়ারে সেটদুটো ভরে দিলো।
এরপর প্রতি রাতেই শুনি করুণ কান্নার কণ্ঠস্বর। এ কান্নাটা শুধুই ওর মায়ের জন্য। যিনি অকালে ওকে ছেড়ে গেছেন। আমিও কাঁদি। না কেঁদে থাকতে পারি না।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


