আমার প্রিয় পোস্ট

http://joyodrath.blogspot.com/

মান্দার, সুমন প্রবাহন, আর সব নিখোঁজ মুখেরা

১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:২৪

শেয়ারঃ
0 0 0

২০০৩ সাল। দীর্ঘদিনের হাইবারনেশন কাটিয়ে ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছি। ঢাকায় এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরানো বন্ধুদের একসাথ করলাম। তাদের কেউ কেউ নেই, কেউ কেউ মুমূর্ষু, কারো কারো জীবনের পথই পাল্টে গেছে। আমাদের জং ধরা সব তলোয়ার, ঠিক করলাম পত্রিকা করবো একটা। জীবন থেকে জং ছাড়াতে হবে।

পত্রিকার নাম ঠিক হল "মান্দার"। একে ঘিরে রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, কফিল আহমেদ, শামসেত তাবরেজী, মাহবুব পিয়াল, আয়শা ঝর্ণা এবং আমি একত্র হলাম। কখনো শাহবাগ, কখনো কাজল শাহনেওয়াজের বাসায়, কখনো ধানমন্ডির কোনো রেস্তোরাঁয় বসে বসে পরিকল্পনা আগায় আমাদের।

এর মধ্যেই কফিল আহমেদ বললেন, কাগজ করতে হলে এখনকার যারা তরুণ তাদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে তো জানতে হবে। আকাশ থেকে পড়লাম। তাইতো? আমরা তো আর তরুণ নই! আমাদের পর আরো দুটি প্রজন্ম চলে এসেছে এতদিনে। কী করছে তারা? কী লিখছে? তারা কি আমাদের নন্দনতত্ত্বের উত্তরাধিকার বহন করছে?

চোখে পড়ল "কালনেত্র" নামে একটা পত্রিকা। কী ঝকঝকে! শাহবাগের অন্যসব জটায়ুমার্কা লিটলম্যাগ নয়, কী প্রকরণে, কী লেখায়। একে একে আরো কয়েকটি কাগজ চোখে পড়ল। ভাবলাম "মান্দার" এসব তারুণ্যের সাথে আমাদের যোগাযোগের একটা পাটাতন হোক।

এমনি এক সময়ে সুমন প্রবাহনকে প্রথম দেখি। কফিল আহমেদ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। অন্তর্মুখী এক তরুণ। এমন নিচুস্বরে কথা বলেন যে কান খাড়া করে শুনতে হয়। বিভিন্ন জায়গায় ওর দুয়েকটা কবিতা পড়েছিলাম, ঠিক করলাম ওকে "মান্দার"এ লিখতে বলবো। বলাতে রাজি হয়ে গেলেন।

এভাবেই আমার সম্পাদিত একমাত্র সাহিত্য পত্রিকার একমাত্র ইস্যুতে সুমন প্রবাহনের নামটি আমাদের সাথে গেঁথে রইল। "মান্দার" প্রশংসা কুড়িয়েছিল, অঘটনও কম ঘটে নি এর প্রকাশনা ঘিরে। সেসব অন্য কোনো সময়ে বলা যাবে। কাগজ নাম কুড়ালেও এর হ্যাপা সামলাতে গিয়ে আমার দম শেষ হয়ে গেছিল। ফলে, আর সব প্রকৃত লিটলম্যাগের মত "মান্দার"ও প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় আটকে থাকল।

বলা বাহুল্য, সুমন প্রবাহনের সাথে আমাদের যোগাযোগটিও "মান্দার" দ্বিতীয় সংখ্যার মত পেন্ডিং হয়ে থাকল। দেখা হত শাহবাগে, মাঝে মাঝে একসাথে চা-সিগ্রেটও হত। আস্তে আস্তে খেয়াল করছিলাম আমাদের তরুণ কবিবন্ধুটি একটু একটু করে ছন্নছাড়া জীবনের দিকে যেন ঝুঁকছেন। দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আশির দশকে এরকম বদলে যাওয়ার চিত্র অনেক দেখেছি। নতুন কিছু তো নয়। সুমন প্রবাহনকে দেখি, মনে পড়ে শাহেদ শাফায়েত এর কথা, বিষ্ণু বিশ্বাসের কথা, এমন কি শোয়েব শাদাব এর কথাও। কী সব অমিত প্রতিভাবানদের সেই সময়। কিন্তু কখনো মনে পড়ে নি শামীম কবির এর কথা। কখনো ভাবি নি আমাদের তরুণ এই কমরেড শামীম কবির এর পরিণতি নিজের জন্য নির্বাচন করবেন।

মাঝে মাঝে ভাবি, সেই আশির শুরু থেকে আমাদের প্রিয় প্রতিভাগুলোর ঘাড় মটকিয়ে বাঙলা কবিতা বেশ রক্তপায়ী হয়ে উঠেছে। রক্তের নেশা ওকে পেয়ে বসেছে। ইতোমধ্যে ঝরে যাওয়ার তালিকাটি কিন্তু ফুলে ফেঁপে উঠছে ক্রমশ: সুনীল সাইফুল্লাহ, সাবদার সিদ্দিকী, বিষ্ণু বিশ্বাস, শোয়েব শাদাব, শাহেদ শাফায়েত, শামীম কবির, সঞ্চয় প্রথম এবং সুমন প্রবাহন। এদের মধ্য সুনীল, শামীম আর সুমন বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছামৃত্যু। বাকিদের কেউ মৃত, কেউ বা নিখোঁজ, কেউ শেকলবন্দী, কেউ বা স্রেফ ভবঘুরে।

সুমন প্রবাহনের ৩৩তম জন্মদিবসের এই দিনে একে একে অন্য সবার মুখ মনে পড়ছে আমার। যেন একটা ছোটখাট মিছিল, বাঙলা কবিতার বলয় থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া আমার ভাইদের।

কবিতা এসব অসম্পূর্ণ চেষ্টাগুলোকে, এই উল্কাপিন্ডের মত জীবনগুলোকে, এইসব তীব্র ভালোবাসাগুলোকে কিভাবে মনে রাখবে? তারা কি তাদের নিজ নিজ পরিবার আর বন্ধুদের স্মৃতির উপলক্ষই হয়ে থাকবেন?

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): স্মৃতিতর্পণ ;
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৩২ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫৯
সোহেল হাসান গালিব বলেছেন: সুমনের সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিলো। সেটা মৃত্যুর কিছু আগে। আমি শুনলাম ও কিছুটা অপ্রকৃতস্থ। কী করে ওর কাছ থেকে কবিতা নেয়া যায়, ভাবছিলাম। `শূন্যের কবিতা' সংকলনের কাজ অনেকদূর এগিয়েছে তখন। ঘটনাক্রমে আজিজে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। দূতিয়ালি করেছিলো খুব সম্ভবত সরফরাজ। ওর সঙ্গে কমিউকেট করতে সমস্যা হচ্ছিলো। আমি ঠিক স্পষ্ট হতে পারছিলাম না, এ ধরনের দশকী সংকলনে কবিতা দিতে ওর সায় আছে কিনা। শেষে ও-কে আমার ই-মেইল অ্যাড্রেসটা লিখে দিয়ে বললাম, আপনি কষ্ট করে আমাকে মেইল করেন। তবে সেটা ১০ জানুয়ারির মধ্যে।

বলা বাহুল্য, ওর কোনো মেইল আমি আর পাই নি।

আমার কেন জানি মনে হয়, সব সৃষ্টিশীল মানুষই কোনো না কোনোভাবে কিছু না কিছু মাত্রায় সিজোফ্রেনিক। এটা চরম আকার পায় তার প্রতিপার্শ্বের কারণে। কিছুটা সহানুভূতি, নিদেনপক্ষে দুএকটি হৃদয়ের আনুকূল্য তার চাই। কিন্তু আমাদের আশপাশটা তা দিতে যেন একেবারেই নারাজ। একটা হিশাব-নিকাশের ব্যাপার বোধ হয় থাকছেই। সঙ্গ মানেই যেমন সান্নিধ্য নয়, ঠিক তেমনি বন্ধু মানেই `অন্য আমি' নয়। কবিদের এই পরিণতির জন্য শেষ পর্যন্ত দায়ী কি নই আমরাও? আমাদের ঈর্ষা-অসূয়াই শুধু নয়, উপেক্ষা বা উদাসীনতার কথাও বলছি।
১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:১২

লেখক বলেছেন: এই "আমরা"টা কারা? যদি তারা সৃষ্টিশীল মানুষজনই হন তাহলে তারাও তো তাদের নিজস্ব সিজোফ্রেনিয়ার চক্করে আছেন।

শুধু কবিরাই নন, গালিব। এই বঙ্গদেশে কোনো সিজোফ্রেনিককে তিলমাত্র সহমর্মিতা জানানোর মত অবকাশ কারোরই বোধ হয় নেই। এমন কি তার পরিবারেরও। জীবনের সাথে কঠিন কঠোর সব শরীরী সংগ্রাম করতে করতে আমরা বোধ হয় ভুলেই যাই যে কিছু কিছু মানুষ তার মস্তিষ্কের সাথে এরচে কঠিন বোঝাপড়ায় লিপ্ত থাকতে পারে।

২. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:০৪
মুয়ীয মাহফুজ বলেছেন: আপনার লেখাটি পড়ে ভালো লেগেছে বললে ভুল হবে,ভালো লাগা নয় আপনার স্মৃতিতর্পনের সাথে আমি নিজেও যেন এক অনাহূত আগন্তুক হয়ে ব্যাক্তিবিষাদের সহভাগী হয়ে গেলাম।সচল উপস্থিতির মাঝখানে হঠাৎ সে দীর্ঘদিনের জন্য অনুপস্থিত হয়ে যেত।মনে পড়ে গেলো দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের পরে সুমন এসে মাঝে মাঝে দেখা করতো...কুশলাদি বিনিময়ের আগেই বুঝতাম ভালো নেই সে।

ব্যাক্তিক ভাবে আমার কাছেও মনে হয়,আমিও কি ভালো আছি?কারা ভালো থাকে?

তবু তা কবিতারা অন্তত ভালো থাকুক।

ধন্যবাদ আপনার লেখাটির জন্য।
ভালো থাকুন।
১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:১৫

লেখক বলেছেন: কি যেন বলবে আমাকে, বলেছিল সুমন প্রবাহন। বলতে বলতে থেমে গেছিল। বলল, অন্যদিন বলব। তারপর মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। আমি জানতাম এর দুদিন পর আমার উড়াল। ভাবলাম, এমন কি কথা। দেশে ফিরে এসে শোনা যাবে।

হয়ত কিছুই বলার ছিল না ওর। হয়ত ছিল। কে জানে?

ধন্যবাদ আপনাকে।

৩. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:১৫
মজনু শাহ বলেছেন: hay mandar !

ekta boro dukkher sriti mone porlo.

oi sonkhar jonno ami shamim kobirer kisu kobita ar amar kisu kobita sdiyesilam sapar jonno.

apni pialer songe dotolar sirite bose bolsilen, samimer lekha sapa somvob na... morbid ekta... ami mamar dokane cha khachsilam... khub kosto peyesilam,,, apnar montobbe... pore ami lekha firiye nei... amartao...

apnake sedin boli ni ar keno lekha uthiye nilam dujoner....

mandarer sei songkhata khub valo hoyesilo. dui boro vaiyer maramarir dineo ami silam...
১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:২১

লেখক বলেছেন: এত দিনে বললেন?

শামীম-এর লেখা মরবিড লাগে ঠিক। কিন্তু সে প্রতিভাবান কবি সন্দেহ নাই। সমস্যাটা হয়েছিল অন্যখানে। আমি চেয়েছিলাম প্রাণপ্রাচূর্যে ভরা উদ্বোধনী সংখ্যাটা হোক। শামীম-এর লেখা আমাকে নভেরা হোসেনও দিতে চেয়েছিলেন। সেখানেও আমি একই কথা বলেছিলাম। আর তা শামীম এর কবি প্রতিভাকে বিন্দুমাত্র অসম্মান না করে।

শামীম কবির কে নিয়ে আপনাদের সংবেদনার মাত্রাটুকু আন্দাজ করি নি আগে। নভেরা তার নিজের লেখাও উঠিয়ে নিলেন। আপনিও। যদিও কারণ বললেন অন্যটা।

দুই ভাই এর মারামারিই শেষমেষ আমাদের প্রাপ্তি!

ধন্যবাদ মজনু। আছেন কেমন?

৪. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:৫৬
মজনু শাহ বলেছেন: valo na. abar bekar. ei rome shohore jeno dhakar koster jibon abar fire esese...
৫. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:০৯
আলিফ দেওয়ান বলেছেন: বাথিজা, তুমি কি কবিথা লিক না একন?
১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫২

লেখক বলেছেন: নাহ।

৬. ১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:০৯
মাঠশালা বলেছেন: আপনার লেখাটি পড়ে শেষ করতে করতে একটা মিছিল চলে গেল। মিছিলের শেষ সদস্যটি আমাকে পিঠ দেখিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে।

ভালো থাইকেন।
১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫৩

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মাঠশালা। অনিঃশেষ এক মিছিল!

৭. ১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:৫২
হাইগ্যানী হাবাজন ব্যবিলন বলেছেন: সুমন প্রবাহন

এই শব্দখানার মানে কী ভাইগনা?
৮. ২৬ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১:১৭
সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস বলেছেন: লেখাটি প্রিয় পোস্টে নিয়ে গেলাম।

ধন্যবাদ।ভালো থাকুন।
১০. ০৭ ই নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৫:৩১
গুহামানব বলেছেন: শাহেদ শাফায়েত এর "কোরপাটেলিক" পড়েছেন কেউ?

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৬৭৫ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ