somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শায়লার দিকে যাওয়া

১৩ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সোয়াকোটি লোকের এই ঢাকা শহরে শায়লা নাজনীন কোথায় থাকতে পারে ?

আমার দারিদ্র বিমোচন প্রজেক্টের ড্যানিশ কনসালটেন্ট শীতের শুরুতে ঢাকায় ল্যান্ড করলে তারে এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে মারি, এজন্য না যে তিনি শায়লারে চেনেন, বরং এজন্য যে, গতবার নিজদেশে ফেরত যাওয়ার আগে তিনি বলতেছিলেন, হাতের তালুর মত আমাদের এই ঢাকাশহর মেট্রোপলিটন হয় কেম্নে? এইবার আমি তারে বিনয় মজুমদার স্টাইলে ধরি:

হাতের তালুর সমান স্পেস ঢাকা শহরকে মেট্রো বানায় না, বানায় সোয়া কোটি পপুলেশন। সোয়া কোটি লোক মানে সোয়া কোটি স্পেস, একেকটা গড়ে দেড়শ’ গিগা কইরা। এই শহরে তুমি যদি কাউরে হারায়া ফেল, নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে আবার ওরে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা সোয়া কোটি ভাগের এক ভাগ। তোমার কোপেনহাগেন-এ সেইটা বড় জোর বিশ লাখ ভাগের এক ভাগ। আবার ধর, প্রতিদিন এই শহরে তোমার সাথে বড়জোর শ’খানেক লোকের দেখাসাক্ষাৎ হয়। বছরে দেখা হয় চল্লিশ হাজার লোকের সাথে। টেনেটুনে তুমি যদি আর তিরিশ বছর বাঁচ, মোট বার লাখ লোকের দেখা পাবে তুমি। এখন দেখ, একবার যদি তুমি এই শহরে কাউরে হারায়া ফেল, বাকি জীবনভর খুঁজাখুঁজি কইরা তারে পাওয়ার সম্ভাবনা ১৪ শতাংশ মাত্র। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকস।

দেশী মসলার রান্না খাইয়া আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট ঘন ঘন কোপেনহাগেন। দারিদ্র বিমোচন পিছায়া যায়, এই অবসরে আমি শায়লারে খোঁজাখুঁজির প্লান করতে থাকি। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে যে চেষ্টা সুদূর পরাহত, কস্টার স্যামপ্লিং-এ সেইটা সম্ভাবনার সীমানায় আইসা দাঁড়ায়।

শায়লা পড়ত ইকনমিক্সে, মাঝারিমানের ছাত্রী ছিল বরাবর। নিম্নমধ্যবিত্ত রক্ষণশীল ব্যাকগ্রাউন্ড, সুতরাং ব্যাংকে বা কলেজে চাকরি করার সম্ভাবনা। ঢাকাশহরে তপসিলী অ-তপসিলী মিলায়া মোট ২৫ খানা ব্যাংক আছে, যাদের হেড অফিস, লোকাল অফিস, কর্পোরেট অফিস, মহিলা শাখা, বিলবুথ মিলায়া প্রায় ২৫০ টি শাখাপ্রশাখা। ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগৃহিত ডাটা থেকে খুঁজে খুঁজে আমি মোট ১৫ জন শায়লা নাজনীনকে বার করি, জন্মতারিখ বিবেচনায় বাদ দিই ১১ জনকে। বাকি থাকে ৪ জন। হইতে পারে এই চারজনের একজনই সেই শায়লা, যারে আমি খুঁজতেছি। হইতে পারে, পূবালী ব্যাংকের যে শাখায় আমি একটা একাউন্ট অপারেট করি, সেখানেই শায়লা চাকরি করে। হয়ত ব্যাংকের রিমোট কোনায় কিং সাইজের একটা লেজার বইয়ের উপর হামলে-থাকা হেজাব-পরা মহিলাটিই শায়লা, যার হেজাবের ভেতরে কোন মুখমন্ডল আছে কি না জানার প্রত্যাশা আমার কোনোদিন হয় নাই। আমার ভাবনার দৌড় এবার সত্যি-সত্যি আমায় আতংকিত করে:

ঃ হ্যালো ম্যাডাম, চিনতে পারছেন?
ঃ আরে.....তুমি? এখানে?
ঃ এখানে তো আমি আসি দু’বছর ধরে।
ঃ কিন্তু...একদিনও তোমার সাথে দেখা হয় নি....আশ্চর্য!

অভিযোগ-উতরানো আভা। আলোচনা, অত্যন্ত সঙ্গত কারণে, অফিসের টেবিল থেকে দ্রুত কোন রেস্তোরাঁর দিকে গড়ায়।

ঃ তুমি একদম বদলাও নি।

কোনো কোনো রেস্তোরাঁর পরিবেশে এরকম বিবৃতিদানের উস্কানি থাকে।

ঃ তুমি কিন্তু অনেক বদলেছ।

আমি হেজাব দেখাই। ব্যাংকার শায়লা হাসে।

ঃ হ্যাঁ...শ্বশুরবাড়ির নিয়ম। সবাই হেজাব পড়ে। ব্যাকডেটেড।

ঃ না না...বরং মোস্ট আপডেটেড। এখন তো পশ্চিমে হেজাব পরার রাইট নিয়ে ব্রাইট ব্রাইট সব মুভমেন্ট হচ্ছে।

ঃ তোমার একাউন্ট কি সেভিংস?

আমার বিত্তবৈভব আন্দাজ করার চেষ্টা শায়লার।

ঃ না। কারেন্ট। আমি ক্ষণবাদী মানুষ। সেভিংসে বিশ্বাস নেই।

স্পেস বাইর করার জন্য আমার একটু খ্যামটা। শায়লা তত্ত্বের ফাঁদে পা দেয় না।

ঃ কারেন্ট একাউন্টে খুব নমিনাল একটা ব্যালান্সের এগেইনস্টে আমাদের কনজিউমার ক্রেডিট লোনটা কিন্তু খুব ভাল। গাড়ি আছে তোমার?

ঃ আমার বসের একটা আছে।...আচ্ছা, টেবিলের কাচের নিচে যে ছবিটা ছিল...তোমার ছেলে?

ঃ হ্যাঁ, সানিডেলে পড়ে। টু-তে।

ঃ পাশেরটা নিশ্চয়ই স্বামীর।

ঃ না না...ওটাতো গাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ছবি। ঐ যে... আর্জেন্টিনার ফুটবলার।


মনে পড়ল, শায়লার সাথে হাকিম চত্বরে ঘুরাঘুরির মাত্র তৃতীয় দিনে ক্যাম্পাসের এক লম্বাচুল ক্যাডারের হাতে কী মাইরটাই না খাইছিলাম। ওরে সবাই বাতিস্তুতা ডাকত, শায়লার প্রেমাকাঙ্ক্ষী ছিল সে। শেষে একদিন পিস্তল ঠেকায়া সন্ধ্যাবেলা আমার কাছ থেকে নিয়া যায় শায়লারে, ছাড়ে পরেরদিন। শাপে বর হইল এই ঘটনা। বাতিস্তুতার প্রেমাগ্নি নির্বাপিত হইল, অনুতাপ আর অসহায়ত্বে আমরা আরো প্রেমঘন হয়া উঠলাম।

ব্যাংকার শায়লার সাথে বাক্যালাপ আর আগায় না। আমি নানাভাবে কল্পনাকে ঠেলি, কিন্তু ওর চাকা কাদার মধ্যে একেবারে ডাইবা গেছে মনে হয়। অগত্যা একদিন আমার কনসালটেন্টের অফিসে গিয়া ওর গলা জড়ায়া হাউহাউ কর‌্যা কাঁদি। বলি, লক্ষণ খুব খারাপ, ডাটার মধ্যে জিনি ইনডেক্স নাইমা যাইতেছে, পরিসংখ্যানের বই থেকে গরিবি বিদায় নিতেছে, আমার আর চাকরি নাই। কনসালটেন্ট হো হো হাসে। বলে, মন্দ কি, ফি বছর আসা লাগব না, তিন বছর পরপর আইসা একটা ইভালুয়েশন কইরা যামুগা। এই বালের বেইজলাইনে আমার জান কাবার হওয়ার দশা!

এ পর্যায়ে আমি টিচার শায়লারে নিয়া আশায় বুক বাঁধি। কল্পনায় তারে দেখি, হেজাব নয়, ফিনফিনে ফ্রেমের চশমাপরা। একদঙ্গল ছাত্রছাত্রীঘেরা অবস্থায় একটি বিরাট মথের মত কাশরুম থিকা বাইর হইতেছে। সেইদিনই ডাটার জন্য ব্যানবেইজ যাই। সরকারি-বেসরকারি মিলায়া মোট ৩৬টা কলেজ আছে ঢাকাশহরে। এর মধ্যে মাত্র দুইটিতে অর্থনীতি বিভাগ নাই। বাদবাকি ৩৪ টার মধ্যে শায়লা একাধিক থাকলেও অর্থনীতির প্রভাষক শায়লা নাজনীন আছে একজনই। পড়ায় তিতুমীর কলেজে।

অতএব ফিল্ড ইনভেস্টিগেশন। দুরুদুরু বক্ষে তিতুমীর কলেজে গিয়া দেখলাম বিশ্ব পরিষ্কার দুই শিবিরে বিভক্ত। এক শিবিরে ছাত্র, অন্য শিবিরে শিক্ষক। যেখানে ছাত্র আছে, সেইখানে শিক্ষক নাই। আবার যেখানে শিক্ষক আছে সেইখানে ছাত্র নাই। দুইদলই মহাখুশি। অর্থনীতি বিভাগের ম্যাডাম শায়লা নাজনীন ছুটিতে আছেন। চারমাসের প্রসূতি ছুটি।

আহাহা! এখন কি নিশ্চিন্ত মনে প্রকাশ্য সংবাদ হয়া গর্ভধারণ করলা প্রিয়তমা! মনে আছে, সেই যে ঝামেলা বাধায়া ফেললাম? তারপর তোমার কত হাতে ধরা পায়ে ধরা! রোজ সকালে এগারটা ম্যাটার্নিটি কিনিকের ঠিকানা নিয়া ধর্না দিতাম তোমার হলে। ডেসপ্যারেট বেলী-রাজু জুটির কাহিনী শুনাইতাম, আলাপ করায়া দিতাম তিন্নী-পিয়ারদের সাথে। তোমার ভয়ে-নীল মুখের সামনে ওরা ওদের এবরশনের ডালভাতমার্কা কাহিনীগুলি বলত সমানে।

কাজ পিছায়া যাইতেছে, কনসালটেন্টের এই অভিযোগ নিয়া একদিন তার সাথে তুমুল বাহাসে নামি। তারে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস থেকে হিড়হিড় কইরা বার কইরা আনি, আর বলি, ঐসব জিনি ইনডেক্স আমি বিশ্বাস করি না। এইসব ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকাখাওয়া আমাদের মাথামোটা ইকনমিস্টদের বুজরুকি। পভার্টি-গ্যাপ বাড়তেছে, আমি হলফ কইরা কইতে পারি। আলট্রা-পুউর দের নিয়া কোন বেইজলাইন নাই। সরকার, ওয়ার্ল্ডব্যাংক বা এডিবি কেউ করে নাই। ওরা মডারেট গরীবদের পরিস্থিতিরেই পভার্টি বইলা চালায়। সত্যিকারের পভার্টি লাইন অনেক নিচে ডাইবা গেছে, স্ট্যাটিস্টিকসে এইগুলা নাই, সব এইচআইভি/এইডস এর ফান্ড বাড়ানোর ধান্দা। ভাতের বদলে কনডম গিলাইতে চায় শালারা।

ঃ ওয়্যার য়্যু এভার ইন দ্য লেফট পলিটিকস?

আমার কনসালটেন্টের মুখে সস্নেহ সংশয়।

ঃ আই ওয়াজ নট, স্যার!

আমি মিলিটারি স্টাইলে চিল্লাই।

ঃ বাট আই ওয়াজ মাই সান। আই ড্রিমট অব অ্যা সোশ্যালিস্ট ডেনমার্ক থ্রু-আউট মাই ইয়ুথ।

খেদায় ঢুকাইতে চায়। বহুৎ পুরান ট্রিক।

ঃ দ্যাট এনাবলস ইউ টু কোপ উইদ ব্লাডি ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজম। গুড হোমওয়ার্ক।

মনে মনে বলি। আর মুখে বলি, ঐটা তোমার সমস্যা। বামপন্থার ভুত আমার ঘাড়ে নাই। ফলে কনসালটেন্ট তার পন্থাবদলের ইতিহাসবয়ান থিকা আমারে নিষ্কৃতি দেন।

টিচার শায়লার ব্যাপারে আমি বীতশ্রদ্ধ হয়া পড়ি। ওর গর্ভাবস্থার ডাটা আমার হাইপোথিসিসরে নাল বানায়া দিয়া ওর সুখীসমৃদ্ধ দাম্পত্যজীবনটাকে ফোরকাস্ট করতে থাকে। ব্যাংকার শায়লাও আমার মনে এতখানি আতংক পয়দা করতে পারে নাই। আগে মনে হইত, ওর সরকারি চাকরিজীবী স্বামী রিমোট পোস্টিং লয়া কোনো থানাসদরে হাবুডুবু খাইতেছে। এখন আমি শিউর ঐ ব্যাটার পোস্টিং সচিবালয়ে। নন-ক্যারিয়ারিস্ট মুডে সকালসন্ধ্যা সংসারসেবা করে। গর্ভবতী স্ত্রীর শয্যাপাশে একটি করুণ কমলালেবু। অসহ্য!

অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে, শায়লার যেবার অসুখ করল, দীর্ঘদিন বাড়িতে, বাড়ি থিকা আমার হলের ঠিকানায় চিঠি আসল ওর। করুণ আহ্বানভরা একটা চিঠি। আমারে সম্বোধন করা, চিঠির শেষে ওরই নাম, কিন্তু হাতের লেখা ওর ছিল না। পরে জেনেছিলাম, ঐ চিঠি লিখে দিছিল ওর মা। কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষরে একটি নিখুঁত পারিবারিক ষড়যন্ত্র। আমি দেখতে যাই নাই।

আমি তখন সাবরিনার নানারকম উচ্চাভিলাষের অংশ হয়া গেছি। সকালসন্ধ্যা ডাটা টেম্পার করি, প্রাইমারি ডাটা নষ্ট করি, শায়লার সাথে আমার এফেয়ারটাকে আমার তরফে চ্যারিটি বইলা চালাই। স্ট্যাটিস্টিকস আমায় উৎসাহ দেয়, স্ট্যান্ডার্ড এরর আওতার মধ্যেই থাকে। সাবরিনা আমার মহত্বে মুগ্ধ হয়, সাবরিনার মহত্বে আমিও পাল্টা মুগ্ধ হই, শেষে নিজের মহত্বে নিজেই মুগ্ধ হইতে শুরু করি। এতসব মুগ্ধতার মাঝে আলট্রা-পুউরের মত মিলায়া যায় শায়লা নাজনীন। মাস্টার্স ফাইনাল দিতে আইসা জ্বলজ্যান্ত দুইমাস হলে থাকলেও আমার সাথে দেখা হয় না তার।

আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট নানারকম মেইল কৈরা আমারে ডাক পাড়েন। বলেন, সেকেন্ডারি ডাটার নিচে তিনি নাকি আটার বস্তার মত চিৎপটাং হয়া আছেন। এখন নাকি গরিবদের এসেট-এনালিসিস করতে চান। আমি উত্তর দিই, ফালায়া থোও ঐসব ডাটার বস্তা, ঐখানে যারা আছে তারা মডারেট, পাতিবুর্জোয়ার চাইতেও ভয়ানক। ওরা জানে তোমার কী কী ডাটা লাগবে, তোমার প্রয়োজনে ওরা ল্যান্ডলেস হয়, ক্রেডিটের টাকা তুইলা মৌজ মারে। হার্ডকোর গরিব হয়া ওরা এনজিও অফিসে যায়, আবার ইভালূয়েশন রিপোর্টের সময় ঠিকঠিক প্রয়োজনমত ওয়েল-অফ হয়া যায়। এতে তোমার আত্মতুষ্টি হয়, তোমার আত্মতুষ্টি আর কিসে কিসে হয় ওরা জানে। ওরা তোমার জিনি-ইনডেক্স দিয়া মোয়া বানায়া খায়, এসেট এনালিসিস-এর কাগজ দিয়া বাচ্চার হাগা মোছে।

তুমি শীতকালে বেড়ায়া যাও, এসি-লাগানো পালকিতে উইঠা মানিকগঞ্জের দুইটা গ্রাম ঘুইরা ঘুইরা দেখ আর ফটাফট ছবি তোল। সন্ধ্যা হইতে-না-হইতেই তোমার গুলশানের রেস্টহাউজে হান্দায়া যাও। তুমি গ্রামে যাওয়ার তিনদিন আগে থেকে সেখানে রিহার্সাল চলে। আর সেই নাটকে ঢুইকা তুমিও ঘনঘন ঘড়ি দেখ, ওদের কাজ আরো সহজ কইরা দাও। তুমি পভার্টি মাপ তোমার প্রজেক্টে, এর বাইরে তোমার যাওয়ার উপায় নাই। আর তোমার লোকাল রিসিভার এনজিওরা মাত্র দুইদশকে এই দেশে এমন এক তুখোড় রেসপন্ডেন্ট জেনারেশন বানাইছে, যারা তোমার অফস্পিন, লেগস্পিন, গুগলি সব বুঝে। রাতের অন্ধকারে বুঝে। তাদের দুধের বাচ্চারাও বুঝে। কিন্তু তুমি দেখ নাই বর্ষায় অষ্টগ্রাম কেমন থৈ থৈ করে, ক্ষুধার মহামারী কি জিনিস, মঙ্গার অজগর কিভাবে চুপচাপ একসাথে দুইতিনটা গ্রাম গিল্যা ফালায়। তুমি কোনোদিন জানবা না আলট্রা-পুউর নিজের ঘরের মধ্যেই কেম্নে দিনের পর দিন ইনভিজিবল হয়া থাকে।

কথা শেষ করে আমি হাঁপাই।

ডিভোর্সের প্রথম বছরে পুরুষেরা এরকম একটুআধটু র‌্যাডিক্যাল হৈয়া যায়, আমার কনসালটেন্ট আমারে এইভাবে মাপেন। ফলে আমার চাকরি বহাল থাকে। উপরন্তু কয়েকদিনের ছুটি জোটে।

আচ্ছা, এমনও তো হৈতে পারে যে, শায়লা শেষমেষ নারীবাদী হয়া গেছে! কদমছাঁট চুলের শায়লা নাজনীন অ্যাকশন-এইডের টাকায় ডমিস্টিক ভায়োলেন্সের উপর ডকুমেন্টারি বানাইতেছে! লিভ টুগেদার করতেছে শশ্রুমন্ডিত ও নারীবাদী কোন যুবকের সাথে। রগরগে যৌনতা ছাড়াই। অতৃপ্ত আদর্শবাদী জীবন। উত্তেজনায় আমি শোয়া থেকে উইঠা বসি।

এনজিও ব্যুরো’র ডাটা রিলায়েবল লাগে না। ওরাই পইপই করে বৈলা দিছে, রেজিস্ট্রেশন দেখবেন এক নামে, সাইনবোর্ড দেখবেন আরেকটা। ক্যাব্লা ঘুইরা গেলে ওদেরও যে ঘুরতে হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম! তিনজন শায়লাকে পাওয়া যায় যারা নারীবাদী উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করে। ঠিক করি, র‌্যানডম নয়, যেখানেই নারী অধিকারের গন্ধ পাব, সেইখানেই শায়লা নাজনীনের কথা জিগায়া দেখব। খুঁজব সর্বত্র। পুরুষতান্ত্রিকতা সহ। শায়লা জানে, প্যাট্রিয়ার্কি ছাড়া যৌনতায় ইনটেনসিটি আসে না। ওর রক্তে সেই বীজ ঘুমন্ত আছে। প্রয়োজন তারে জাগায়া দেয়া।

একদিন আমার কনসালটেন্ট বাড়িতে আইসা হাজির। চোখেমুখে বামপন্থী অনুতাপ। ছাইচাপা। আলট্রা-পুউর বিষয়ে প্রাইমারি ডাটার সন্ধানে নামতেছেন। আমি তারে অনেক বুঝাই। বলি, দেখ, দেখানোর দা আর কোপানোর দা এক না। আলট্রা-পুউর নিয়া কথা কইবা, ফান্ড চালু থাকব। আলট্রা-পুউর খুঁজতে গেলে তুমিই আলট্রা-পুউর হয়া যাবা। এই কথায় আমার কনসালটেন্টের মনে আরো বিপ্লবী জোশ আসে। আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় আমার, রবার্ট চ্যাম্বার্স-এর আদলে চে’ গুয়েভারার ভুত দেখি আমি।

আলট্রা-পুউর নয়, নতুন চাকরি খুঁজি আমি। সাথে সাথে নারীবাদী অফিস। খোঁজ পাই, আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট মধুপুরের জঙ্গলে গিয়া খুঁটি গাড়ছেন। পায়ে পা বাধায়া ঝগড়া লাগাইছেন কারিতাসের সাথে। চার্চের একটি রেস্ট হাউজে থাকেন তিনি, রোজ রাতে তার টিনের ঘরের চালে আইসা হনুমান শাসায়া যায়। তিনি ফিল্ডে নামলেই চার্চের ফাদাররা নাকি আলট্রা-পুউরদের গহীন জঙগলের দিকে ভাগায়া দেয়। সেই অবসরে তিনি গোটা বর্ষাকাল ধরে হেন্ডারসন দ্য রেইনকিং-স্টাইলে একটা উপন্যাসও নাকি লিখতেছেন।

আর আমি অলিতে গলিতে চাকরি ও নারীবাদ খুঁজি। সোয়াকোটি স্পেসের বিশাল এই মেট্রোপলিটনে। এভাবে প্রতিদিন শায়লার দিকে একটু একটু করে আগাই। একেকটা এলাকায় খোঁজাখুজি শেষ কৈরা ফিরা যাবার পথে দেখি, আরো গোটাদুই নারীবাদী অফিস গজায়া গেছে। তাতে স্বস্তি হয়। মেটাফিজিক্স হয়। একই ক্যাটাগরিতে অনন্তকাল খোঁজাখুঁজি চালায়া যাওয়ার সম্ভাবনা বলবৎ থাকে।




টীকা (না পড়লেও ক্ষতিবৃদ্ধি নাই)

এসেট এনালিসিস: যাদের এসেট নাই, তাদের এসেট মাপার একখান পশ্চিমা ফরম্যাট।

আলট্রা পুউর: দারিদ্রসীমার তলানিতে যাদের থাকার কথা, কিন্তু হায়, তারা সেখানেও নাই!

প্রাইমারি ডাটা: ফিল্ড থেকে সরাসরি সংগৃহিত ডাটা। ফিল্ড রিসার্চার নামক একদল বোবা এবং কলুর বলদ এই কাজ করে থাকে।

সেকেন্ডারি ডাটা: উন্নয়ন-গবেষকদের স্বপ্নের ধন। অন্যের রক্তেঘামের এই জোগাড় তাদেরকে ঢাকা বা ন্যুইয়র্কে (কখনও প্লেনের মধ্যে ল্যাপটপে) বৈসা গিগা গিগা ম্যাটার বানাইবার উৎসাহ দেয়।

পভার্টি লাইন: দারিদ্রের লক্ষণরেখা। এই রেখার নিচে যাদের আয়ব্যয় তারাই গরিব, পশ্চিমা গবেষকেরা এইভাবে তৃতীয় বিশ্বে জুতা আবিষ্কার করেন। এ প্রসঙ্গে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত কবিতাটি স্মর্তব্য।

ব্যানবেইজ: বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থা যেখানে শিক্ষাবিষয়ক তথ্যাদি সংরক্ষণ (ও গবেষণা?) করার কথা। কেউ কথা রাখে না।

জিনি ইনডেক্স: একটা দেশে ধনীগরিবের ব্যবধান মাপার একটা ব্যবস্থা। নামটি গিনিপিগের কথা মনে করায়া দেয় বইলা এরে গিনি না বইলা আদর কইরা ‘জিনি’ ডাকা হয়।

রবার্ট চ্যাম্বার্স: সাসেক্সের শিক্ষক। গ্রামীণ দারিদ্র এবং উন্নয়নের রীতিকৌশল নিয়া অনেক চ্যাটাং চ্যাটাং আলাপসালাপ করেন, কিন্তু তার চাকরি ও প্রমোশন অব্যাহত থাকে।

স্ট্যান্ডার্ড এরর: যতটুকু ভুল করলে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ খাপ্পা হয় না।

প্যাট্রিয়ার্কি: একটি (অ)মানবিক, (অ)মানসিক এবং দৈশিক অবস্থা, যা নারীপুরুষ নির্বিশেষে কিছু কিছু মানুষের চেতনায় ও রাজনীতির মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু নারীবাদ এরে পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি বইলা হাহুতাশ করে।


মার্চ ২০০৫
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:১১
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×