টেলিভিশন, নিউজপেপার, ব্লগ আর টেলিফোন... গত দুদিনের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা আমার এভাবে জানা হয়েছে। আমি পিলখানা থেকে তিন কিলোমিটার সার্কেলের মধ্যে থাকি না, বিডিআর কিংবা আর্মিতে আমার কোনো নিকটাত্মীয় নেই -- পুরো ঘটনাটিই আমার কাছে টেলিভিজুয়াল। তাই বলে এটা ভাবছি না যে এতসব দূরত্ব আমাকে আন-বায়াজড করে ফেলতে পারবে, পুরো ঘটনাটার একটা নির্মোহ বোঝাপড়া আমি করতে পারবো। এরকম ভাবলে নিশ্চয়ই ভুল হবে। অন্যসব প্রভাবকগুলো নিঃশব্দে নীরবে আমার মতামত প্রদানের মধ্যে কাজ করে চলেছে। যেমন করছে অন্যদের মাঝেও। নয়তো কি?
শুরুর দিকে, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় এই ঘটনাটি ছিল বিডিআর বিদ্রোহ। একে সাম্প্রতিক কালের আনসার বিদ্রোহ এমনকি ক্ল্যাসিক সিপাহী বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় ফোকাস করার চেষ্টা হয়েছে। করেছে কে? মিডিয়া। তাদের সুবাদে দেখলাম পিলখানার গেটের কাছে জড়ো হওয়া আম-পাবলিকও যেন এই বিদ্রোহে মনে মনে সামিল! এটা "সিপাহী" বিদ্রোহ হলেও এর অভিমুখ যেন "সিপাহী-জনতা" অভ্যুত্থানের দিকে। অন্তত মোরাল সাপোর্ট বিডিআর পেয়ে গেছে, প্রথমদিন এমনটাই ইংগিত দিয়েছে আমাদের মিডিয়া।
আমরা ভাবতে শুরু করেছি, এটা শ্রেণীসংগ্রাম। "নির্যাতিত" শ্রেণী তার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভুর বিরূদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। শ্রেণীসংগ্রামের আদলে ভাবলে বিষয়টার রক্তারক্তি ভুলে গিয়ে একে একটা ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য দিয়ে দেয়া যায়! খুব করে বলা হল, বিডিআর কিভাবে নির্যাতিত হয়েছে। অপারেশন ডালভাত কিভাবে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। কিভাবে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। টেলিভিশন তাদের সমব্যথী, নিউজ এজেন্সিগুলোও তাই, আর তার মূর্ত চেহারা আমরা দেখলাম ব্লগে। ব্যক্তিগত কথোপকথনে। বিডিআর যেন নির্যাতিত জনগণের একটা অংশ, তাই তাদের বিদ্রোহ ঐতিহাসিক।
লক্ষ্য রাখতে হবে, যে সময়টা আমরা বিডিআর সম্পর্কে মিডিয়ার এই ভাষ্য শুনছি এবং ইন্টার্নালাইজ করছি, সেই সময়টাতেই তারা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করছে তাদের অফিসারদের ওপর, গণকবর দিচ্ছে, বা ম্যানহোলে ফেলে দিচ্ছে ডেডবডি। হামলা করছে বাড়িঘরে, শ্লীলতাহানি করছে, শিশুহত্যাও করছে, আবার তাদের এলোপাথাড়ি গুলিতে মারা যাচ্ছে নিরীহ রিক্সাঅলা, পথচারী।
আবার, যখনি কিনা এই "বিদ্রোহ"এর ভবিতব্য স্পষ্ট হয়ে এল, বাইরে পজিশন নেয়া আর্মি-র লং-রেঞ্জ অস্ত্রের নিশানায় তাদেরও লাশ পড়তে লাগল, অস্ত্র সমর্পণ করল বিডিআর, পালাতে গিয়ে লাশ হতে লাগল তারা, গ্রেফতার হয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, মিডিয়ার কল্যাণে আমরা তখনি দেখতে শুরু করলাম নিহত আর্মি অফিসারদের শোকাকূল আত্মীয়স্বজনের চেহারা, জানতে শুরু করলাম তাদের মেধা ও প্রতিভার কথা, পিলখানার দখল নিয়ে নিল পুলিশ, কিন্তু আত্ম-সমর্পণকারী বিডিআর সদস্যদের ধরে নিয়ে যেতে লাগল আর্মি এবং র্যাব, তখন, যারা বিডিআর-সমব্যথী হয়ে উঠেছিলাম, এতক্ষণে আমরা তাদের কাপুরুষতার পরিচয় পেতে শুরু করেছি, তাদের নৃশংসতায় আমাদের গা শিউরে উঠছে, তারা যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অযোগ্য এ বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় আর নেই।
গত দুইদিনে এভাবেই আমাদের দুলিয়েছে মিডিয়া-পেন্ডুলাম। ঢাকায় থেকেও আমরা ঘটনার সাথে রিয়েল-টাইমে রিঅ্যাক্ট করতে পারছি না, রিঅ্যাক্ট করছি মিডিয়া-টাইমে। অর্থাৎ আমার রিঅ্যাকশনের মুহূর্তগুলো তৈরি করছে মিডিয়া। ফলে এটা আমার কাছে অনেকখানিই মিডিয়া-ইভেন্ট, এমনকি বাতাসে বারূদের গন্ধ পাবার পরেও।
হয়তো এই ঘটনার পেছনে জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কোনোদিন উদ্ঘাটিত হবে। হয়তো হবে না। হয়তো ষড়যন্ত্রের হদিস পাওয়া গেলেও আমরা সেটা জানবো না। ধরা-পড়া বিডিআর সদস্যদের অনেকেই হয়তো ফায়ারিং স্কোয়াডে যাবে, কিন্তু তাদের লাশ ঘিরে তাদের স্বজনদের গুমড়ানো কান্না আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে মিডিয়া সেখানে যাবে না। আমরা এই নিহতদেরকেই মনে রাখবো, আর্মি অফিসারদের স্বজনদের আহাজারিতেই বহুদিন আমাদের মন ভারি হয়ে থাকবে, শেষ পর্যন্ত এটা আর্মি ম্যাসাকার ট্রাজেডি হয়েই থাকবে।
মনে পড়ছে, টেলিভিশনে প্রথম দিন বিডিআর-এর মাইকিং দেখছিলাম। আর্মি অফিসারদের মেরে কেটে গণকবর দিয়ে এসে জনতার সমর্থন পাবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। সেই সমর্থন কিভাবে তৈরি হয় তাদের সেই ধারণা ছিল না। তারা জানতো না সেটা বায়বীয়, আর্টিকুলেটেড। একটা পেন্ডুলাম, এদিক থেকে ওদিক দোলাই তার নিয়তি। এই রশি টানাটানির খেলায় শক্তিমানেরই জয় হয়েছে।
সব শ্রেণীসংঘাতই মহৎ নয়। অর্থবহ নয়। কারণ, দুটো শ্রেণী লড়ছে আর বাকি সব ভেরিয়েবল স্থির হয়ে বসে আছে এমন তো নয়। ক্রুদ্ধতা এবং নৃশংসতা দিয়ে হয়তো শ্রেণীসংগ্রাম হয়, কিন্তু মুর্খতা দিয়ে হয় না। শুধু ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়েই বিডিআর এই মুর্খতার মূল্য দেবে এমনটা নয়, মূল্য দেবে সে ইতিহাসের পাতায় খলনায়ক হয়ে থেকে গিয়ে। যে শ্রেণীশোষণের এমন নৃশংস প্রতিবাদ তারা করেছে, শুধু প্রতিবাদের ধরনটির কারণেই তারা নিজেদের ওপর শোষণ আরো পাকাপোক্ত করল। তারা খুন করল তাদের কমান্ডিং অফিসারদের, সেই সাথে তারা খুন করল তাদের শোষণমুক্তির সম্ভাবনাকেও।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

