
হাড্ডি খিজিরের পায়ে পায়ে হেঁটেই উনসত্তরের ঢাকার উত্তাল রাজপথকে চিনেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে। নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরে ওসমান চিলেকোঠাবাসী, বামপন্থী আনোয়ার মার্কসীয় বিধিমোতাবেক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য গ্রাম বেছে নেয়। এদের বাদ দিলে উনসত্তরের ঢাকার বিক্ষোভ বোঝার জন্য ছাত্রনেতারা ছিলেন যাদের আমরা অনেক প্রগলভ দেখেছি জহির রায়হানের উপন্যাসে ও সিনেমায়, ইলিয়াস সেসব চরিত্র থেকে সতর্ক দূরত্বে হেঁটেছেন, যদিও ছেঁটে ফেলেন নি একেবারে। নিজে মার্কসবাদে দীক্ষিত ছিলেন, বামপন্থী আনোয়ারকে গ্রামে পাঠিয়েছেন এবং আনোয়ারের সমান্তরাল আখ্যানটি বিবরবাসী ওসমান গণিকে আদর্শবাদের আঁচ থেকে রক্ষা করতে পেরেছে অনেকদূর পর্যন্ত। কিন্তু নিঃসন্দেহে এরচে অনেক বড় কৃতিত্ব নগর গরিবের প্রতিনিধি হাড্ডি খিজিরকে শ্রেণিবিশ্লেষণের প্ররোচনার বাইরে রেখে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বাড়তে দেয়া, চিলেকোঠার সেপাই যার অনাবিল প্রদর্শনী।
হাড্ডি খিজিরের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ঢাকাই নিম্নবর্গ বাংলা উপন্যাসে এতো কেন্দ্রীয় এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রবেশ করেনি। বইয়ের ফ্ল্যাপের বিবরণ অনুসারে হাড্ডি খিজির “নিজের বাপের নাম জানে না, যে বড় হয়েছে রাস্তায় রাস্তায়, যার মা বৌ দুজনেই মহাজনের ভোগ্য এবং গণঅভ্যুত্থানের সদস্য হওয়ার অপরাধে মধ্যরাতে কারফ্যু-চাপা রাস্তায় যে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হয় মিলিটারির হাতে”। এই মহাজন রিকশাগ্যারেজের মহাজন যার ঘরে খিজিরের বৌ পরিচারিকার কাজ করে। খিজিরের বৌ আবার জুম্মনের মা, জুম্মনের বাবা যেখানে খিজির নয়, কামরুদ্দিন মিস্ত্রি। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঘৃণা বা বিবমিষার নয়, বরং সমঝোতার এবং সচেতন দূরত্বের। রহমতউল্লা মহাজনের রিকশাগ্যারেজের ইন-চার্জ খিজির বসবাস করে রহমতউল্লারই বস্তিতে, অর্থাৎ যিনি গ্যারেজমালিক তিনি বস্তিরও মালিক। সেখানে ঘর যে খুব বেশি আছে এমন না, পাশের ঘরের বজলু যে সিনেমা হলে টিকেট কালোবাজারি করে তাকে বাদ দিলে সেই বস্তির অধিবাসী হিসেবে গুটিকয় রিকশাঅলার কথা খুব হালকাভাবে জানা যায়। বর্তমানের ঢাকাই বস্তি অনেক জটিল সে তুলনায়, জায়গাটিকে বরং রহমতউল্লার কর্মচারিদের কলোনী বললেই ভাল শোনায়। তবে মনে রাখতে হবে, এভাবেই ষাটের দশক থেকে ঢাকা শহরে বস্তি গজিয়ে উঠেছে।
গজিয়ে ওঠা বস্তির সাথে অভিবাসী শ্রমিকদের যে সম্পর্ক, খিজিরের তা নয়। তার জন্ম ঢাকায়, হয়ত তার পূর্বপুরুষ গ্রাম থেকে এসেছিল। উল্টো, মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি ওসমানই বরং ঢাকায় অভিবাসিত। ফলে, ওসমানের ঢাকা-অভিযোজনে এবং রাজনীতির পর্যবেক্ষণে খিজিরই যে ভাষ্যকারের ভূমিকা নেবে এতে বিস্ময়ের কিছু নাই। খিজির যতটুকু ভাষ্যকার তার চে বেশি প্ররোচক। তার প্ররোচনা শুধু ওসমান চরিত্রটিকে পূর্ণতা দেয়ার জন্যই যে, তা না। মধ্যরাতের বেবিট্যাক্সি থেকে স্ত্রী ছিনতাই হয়ে গেলে খিজির স্বামীপ্রবরটিকেও একই রকম প্ররোচনা দিয়েছিল রূখে দাঁড়াবার, যদিও সেই স্বামীপ্রবর খাঁটি মধ্যবিত্তের মতই পেছিয়ে এসেছিল। বস্তুত, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতি এই করুণামিশ্রিত অবিদ্বেষ “অন্তজ শ্রেণীর” প্রতিনিধি খিজিরের চরিত্রের একটি বড় দিক, যা ইলিয়াস সম্ভবত তাঁর মার্কসীয় তত্ত্বঘনিষ্ঠতা দিয়ে উদ্ঘাটন করেন নি। খিজিরে শ্রেণিসংঘাত নাই, এমন কিন্তু না। রহমতউল্লার বিরূদ্ধে তার প্রতিরোধ জারি ছিল, কিন্তু সেটা রহমতউল্লা যখন মিছিলের জন্য রিকশা দিতে অস্বীকার করে তখনই। অদ্ভূত বিষয়: রহমতউল্লাকে খিজিরের বাপ বলে লোকে যে সন্দেহটা করে সেটা খিজির জানে, তার স্ত্রী অর্থাৎ জুম্মনের মার সাথে রহমতউল্লার লদকালদকির খোঁটা খিজির নিজেই বৌকে দেয়, এমন কি রহমতউল্লা ওকে বস্তি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বললে খিজির বেরিয়ে যায়ও, কিন্তু সেখানে বিদ্যমান স্ট্যাটাস ক্যু চ্যালেঞ্জ করে না সে। সেই একই খিজির পূর্ব বাঙলার স্বাধিকারের দাবিতে আপোষহীন, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে অবিচল। রহমতউল্লার ব্যাপারে তার প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে শ্রেণীসংঘাতের প্রশ্নে নয়, জাতীয়তাবাদী প্ররোচনায়। পূর্ববাঙলা মুক্ত হলে ব্যক্তি খিজিরের জীবনে শোষণমুক্তি ঘটবে কি না এই বোঝাপড়া খিজিরে নাই, থাকলেও উপন্যাসে অনুপস্থিত। বরং পূর্ববাঙলার টাকায় করাচি শহর তৈরি হচ্ছে এই ম্যাক্রোলেভেলের উচ্চবর্গীয় অনুভব চালিত করে তাকে। খিজির কি লুম্পেনপ্রলেতারিয়েত? খিজির কি দার্শনিক? নাকি ওসমান বা আনোয়ারের সাহচর্যে তার ভাবনাপদ্ধতি শ্রেণিসীমা ডিঙাচ্ছে? খিজির কি সত্যি সত্যি অস্তিত্বশীল ছিল ঢাকাই নিম্নবর্গের অনামা মুখছবির মাঝে? নাকি সে চিলেকোঠায় থাকা নিম্নমধ্যবিত্ত কেরাণি ওসমানের কাউন্টার-পার্সোনালিটি?
ইলিয়াসের বিশাল এথনোগ্রাফিক উন্মোচনের এই দক্ষযজ্ঞে এসব দার্শনিক প্রশ্ন হয়ত নেহাত মামুলি। এ কারণে যে, গোটা উপন্যাসের শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা বাদ দিলে সামান্য সময়ের জন্যও খিজিরকে তত্ত্বচালিত মনে হয় না, এবং খিজিরের ঐতিহাসিক অস্তিত্বশীলতার বিষয়ে ইলিয়াস পূর্ণ সচেতন এমনটাই লাগে। জীবিত খিজির ইউটোপিয়া নয়, সমাজতাত্ত্বিকভাবে তো নয়ই। খিজিরের পরিবার সত্য, তার বস্তি সত্য, জুম্মনের মার পেটের অনাগত সন্তানের প্রতি তার টান সত্য, তার জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনাও সত্য। উনসত্তরের অভ্যুত্থান থেকে এর ভুরি ভুরি সমর্থন মেলে। এতসব সত্যনিষ্ঠতার শরীরে কোথায় সেই কসমেটিক সার্জনের কারিগরি যা বোবা নগরগরিবের প্রতিনিধি এক সামান্য রিকশাঅলাকে হাড্ডি খিজির বানিয়ে তোলে?
মনে রাখতে হবে খিজির “মুঝিক” নয়, শহরে বড় হওয়া নিম্নবর্গের প্রতিনিধি যার বস্তুগত সম্পদ বলতে গ্যারেজ থেকে “চুরি” করে আনা একটা স্ক্রু ড্রাইভার আর একটা রিকশা চেন। তারই আরেক সহকর্মীকে বলতে শোনা যায় এসব ছোটখাট চুরি দোষের কিছু নয়, মালিকের বেশি ক্ষতি না করে এরকম হাতিয়ে নেয়ায় সমস্যা নেই। এই “হাতিয়ে নেয়া”কেই জেমস স্কট বলছেন “পিলফারিং” (pilfering), আবার মিশেল দ্য সার্তিয়্যু বলছেন “পোচিং” (poaching)। মোর্যাল ইকনমি অব দ্য পুউর! ইলিয়াস তাদের থেকে ধার করেন নি এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, যেহেতু প্রায় কাছাকাছি সময়েই প্রকাশিত হয়েছে এদের বইপত্রসমূহ। স্কট বা সার্তিয়্যু বলছেন, শ্রেণিসংঘাত প্রকাশ্য যেমন হয় আবার অপ্রকাশ্যে দীর্ঘদিন ছোট ছোট প্রতিরোধের আকারে চলমান থাকতে পারে। এসব অপ্রকাশ্য প্রতিরোধের সম্মিলনে বড় আকারের প্রকাশ্য প্রতিরোধ বা বিপ্লব সংঘটিত হবে, এমন নয়। প্রায়শই এসব প্রায়-অদৃশ্য প্রতিরোধ দৃশ্যমান হবার আগেই মিলিয়ে যায়, ক্ষেতের ইটা ক্ষেতে যেমন ভাঙ্গে। এই “চুরি” তেমনি একটা অদৃশ্য প্রতিরোধ যা বিদ্যমান স্ট্যাটাস ক্যু-কে চ্যালেঞ্জ না করে শোষিত শ্রেণি এক ধরনের “মোর্যাল” ম্যানেজমেন্ট করতে চেষ্টা করে, তাদের ওপর ঘটতে থাকা শোষণের বিপরীতে। ফলে খিজিরের মধ্যে সরল শ্রেণিবিদ্বেষ তৈরি না হওয়ার একটা ব্যাখ্যা এখানে মেলে: শ্রেণিসংঘাত এড়িয়ে তার আউটরাইট জাতীয়তাবাদী হয়ে যাওয়ার মানে দাঁড়ায়। হাড্ডি খিজির যেন পরবর্তীকালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ-না-নেয়া বামপন্থীদের একাংশের মতাদর্শিক অবস্থানের একটা উজ্জ্বল সমালোচনা: প্রলেতারিয়েত তার নিজস্ব শ্রেণিসংগ্রামে অপ্রকাশ্য এবং আপাত প্রণোদনাহীন থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে একটা “বুর্জোয়া” জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে অপরাপর শ্রেণীর সাথে কাঁধ মিলিয়ে। ইলিয়াসের রাজনৈতিক অবস্থান মনে রাখলে এটা এক অর্থে আত্মসমালোচনা বৈকি।
কিন্তু শুধুই কি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে? ইলিয়াস এই পর্বে আরো বিধ্বংসী, খিজিরকে তিনি স্থাপন করেন ওসমানের চলন-সম্ভাবনার পুরোভাগে। বিবরবাসী নার্সিসাস ওসমান, পুঁথিগত শ্রেণিসংগ্রামের খোঁজে ব্যাকুল আনোয়ার, স্বাধিকার-প্রত্যাশী আলাউদ্দিন সবার সংশয়ের সামনে দিয়ে খিজির নাঙা পতাকার মত ঘোরে উত্তাল উনসত্তরের ঢাকাই রাজপথে। খিজির একটা এক্সিট, এইসব তত্ত্বদীর্ণ মধ্যবিত্ত হৃদয়ের। আবার, চিলেকোঠার সেপাই এর প্লট থেকে খানিক দূরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এগার দফার যে আন্দোলন, শিক্ষিত মানুষের মিছিলে নানাবর্ণের প্ল্যাকার্ডে ফেস্টুনে আড়াল হয়ে-থাকা মিছিলের মুখও এই খিজির। ঐ মিছিলে সে অনামা, সহস্র স্ফুলিঙ্গের একটিমাত্র। মিশেল দ্য সার্তিয়্যু যেমন বলেন, “.... the common hero, an ubiquitous character, walking in countless thousands on the streets....This anonymous hero is very ancient. He is the murmuring voice of societies. In all ages, he comes before texts. He does not expect representations. He squats now at the center of our scientific stages.” সেই অনামা, ভিড়ের হৃদয় থেকে তুলে আনা এক স্ফুলিঙ্গকে খিজির নাম দিয়ে হাজির করেছেন ইলিয়াস। বা, সার্তিয়্যু যেমন বলছেন, খিজিরই চুপে চুপে হাজির হয়েছে ইলিয়াসের টাইপ রাইটারের আখরগুলোর সামনে। তিনি তাকে বহু থেকে ভিন্ন না করেই এক-এর জীবন দিয়েছেন।
মাঝে মাঝে ভাবি, খিজিরের মৃত্যু ওসমানকে অত আউলা করে দিল কেন? ওসমানের যাবতীয় অবদমন কেনই বা বাঁধভাঙা স্রোত হবার আকাক্সক্ষায় খিজিরের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করল? তাহলে কি খিজির সত্যি সত্যি ওসমানের কাউন্টার-পার্সোনালিটি? নয়তো কেন মরণোত্তর খিজিরের আত্মা ওসমানের ঘরে বসত করতে আসবে, আর কেনই বা তাকেই বেরিয়ে পড়ার প্ররোচনা দেবে? বিবরবাসী মধ্যবিত্তের আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান করছিলেন ইলিয়াস? করতেই পারেন, কিন্তু ঠিক এই জায়গায় খিজির ইউটোপিয়া হয়ে গেল! খিজির একটা মতাদর্শে পরিণত হল, একটা কৌশলের নামান্তর হয়ে দাঁড়াল। সান্ত্বনা এটাই, সাহিত্য শেষমেষ শিক্ষিত উচ্চবর্গেরই ভোগ্য। শহরের নিম্নবর্গ হাড্ডি খিজিরেরও তাই হল। জুম্মনের মার এবরশন হবে কি হবে না, সেটা আর অশরীরী খিজিরের কাছে বড় প্রশ্ন নয়, অর্থাৎ সে তার আকাক্সক্ষার সাশ্রয় করে আইডেন্টিটি ইস্যুর ফয়সালা করে নিয়েছে, এখন তার কাছে বিপন্ন ওসমানের আত্মার মুক্তিটাই যেন মোক্ষ! ভাবি, সাহিত্যিক চরিত্র হবার কারণেই কি খিজিরকে এই মহত্ত্বের দায়ভার নিতে হল? নাকি সকল জাতীয়তাবাদী প্রণোদনার ধর্মই এটা, শ্রেণিনির্বিশেষ হয়ে গিয়ে সমাজাভ্যন্তরীন টেনশনগুলোতে খানিক রিলিফ ঢেলে দিতে চায়?
সূত্র
১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ১৯৮৬, চিলেকোঠার সেপাই, ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
২. জেমস সি স্কট, ১৯৮৫, ওয়েপনস অব দ্য উইক: এভরিডে ফর্ম অব প্যাজান্ট রেজিস্ট্যান্স, লন্ডন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস
৩. মিশেল দ্য সার্তিয়্যু, ১৯৮৪, দ্য প্রাকটিস অব এভরিডে লাইফ, লন্ডন: ইউনিভার্সিটি অব কালিফোর্নিয়া প্রেস
* ২০ মার্চ ২০০৯ শুক্রবার দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত[/si
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

