somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... উইকিলিকস-অ্যাফেয়ার উইকিলিকস তাকে প্রামাণিকতা দিয়েছে মাত্র। এসব গোপন নথির "ফাঁস" হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক-কুটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা সামরিক প্রতিষ্ঠান কোনোটাই অচিরাৎ ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা নেই। উইকিলিকস-এর এই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিপ্লবও সংঘটিত হবে না। তাহলে, জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জের এই কীর্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এইরকম খ্যাপা কুত্তার দশায় ফেলল কেন? কোথায় সমস্যা তৈরি করলেন এই সাংবাদিক?


আমি মনে করি, জুলিয়াস আঘাত করেছেন মার্কিন হেজিমনিতে। হেজিমনি গড়ে ওঠে সম্মতির মধ্যে, যার বিস্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সম্মতিদানগোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে উঠতে দেখেছে গত অর্ধশতক ধরে, যারা তার স্পাইডার ওয়েবে নিরুপায় মাছির মত আটকা পড়ে আছে বুকভরা কামনা, চামচভরা প্রাপ্তি আর চোখভরা সন্দেহ নিয়ে। এই গোষ্ঠীর চোখে যেন ব্রাত্য রাইসুর কবিতার সেই প্রশ্ন: বাঘ বুঝবে আমায়? আমি জানি এবং জানি না, এভাবে বাঘের হেজিমনি তৈরি হয় আমার মনে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর ইউনিপোলার দুনিয়ায় এই হেজিমনি আরো তুখোড় হয়ে ওঠে। নিশ্চিত শত্রুতার সাবেক সম্পর্কগুলো পর্যন্ত এই সম্মতিদানের খেলায়, এই অন্তর্গত দোলাচলে সামিল হয়: বাঘ বুঝবে আমায়?


জুলিয়াস অ্যাসাঞ্জের "অপরাধ" হল, মার্কিন হেজিমনির মায়াবি পর্দাটা ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছেন তিনি। ফলে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে যেসব মার্কিন-মনোভাব প্রায়-প্রকাশ্য, অনুমান আকারে অহরহ উচ্চারিত, তাকে "ক্লাসিফায়েডে" পুরে রেখে, তার ব্যাপারে যেসব সংশয়ী কামনা সে তার মিত্রদের মাঝে বেড়ে ওঠতে দেখছিল, জুলিয়াস মার্কিন হেজিমনির সেই আত্ম-উদযাপনের বিনোদন নষ্ট করে দিয়েছেন।


জুলিয়াস কি নিও? নাকি "ভার্চুয়াল রবিন হুড"? নাকি বিন লাদেন? এদের বীরত্ব দিয়ে জুলিয়াসকে বুঝতে সমস্যা হয় আমার। তবে, বীর তিনি নিশ্চিত। তাহলে পৃথিবীর অনিঃশেষ পুরাণভাণ্ডার থেকে কোন্ চরিত্র তার জন্য বরাদ্দ করা যায়?


মিথলজিক্যাল, লিজেন্ডারি কিংবা সিনেম্যাটিক চরিত্রগুলো তৈরি হয় বাই-পোলারিটির মাধ্যমে। এই ধরনের "বাইনারী-অপজিট" (ভাল-মন্দ, শুভ-অশুভ, ন্যায়-অন্যায়) এর ধারণা, দেরিদা যেমন ভাবেন, শাদামানুষের বিশ্বাসকে অগ্রায়ন করার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের ক্ষমতাকাঠামোকেই শক্তিশালী করে। মার্কিন হেজিমনি যে বাই-পোলারিটির ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে, জুলিয়াস তারও সর্বনাশ করেছেন। তিনি শাদা, অস্ট্রেলিয়ান, ইংল্যান্ডে ও সুইডেনে বসবাসকারী, অমুসলিম। ফলে তিনি মিথ-বিধ্বংসী এক নতুন মিথ।


কিন্তু তাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে মার্কিন পৌরাণিক বলয়ের বাইরে যাবে মনে হয় না। পুরাণ-ধ্বংসের শাস্তিও পৌরাণিক হবার কথা। কী হবে জুলিয়াসের? আহত মার্কিন নিশ্চিতভাবেই জুলিয়াসকে দীর্ঘমেয়াদী পৌণপুণিক শাস্তির মহিমা দিয়ে তার সেক্সি হেজিমনি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করবে, যেটা তারা লাগাতার করছে বিন লাদেনকে বাঁচিয়ে রেখে-রেখে। ফলে নতুন-মিথ জুলিয়াসের অপরাধের শাস্তি পৌরাণিক ম্যানুয়াল ঘেঁটেই বের করা হবে। প্রমিথিউস। বা সিসিফাস।


এই নতুন মিথকে আমাদের সামনে এনে দিয়েছে নতুন মিডিয়া। ফলে আমরা তার প্রশংসা করছি। পাশাপাশি, গালমন্দও করছি কর্পোরেট-শাসিত মিডিয়াগুলোকে। এটা করতে গিয়ে আমরা খেয়াল করছি না যে, হাত-পা বাঁধা কর্পোরেট মিডিয়াও কিন্তু ব্রেখটিয়ান স্টাইলে এই লড়াইয়ে সামিল আছে। ভাবলেশহীন নিউজকাস্টার এবং ইনোসেন্ট মুদ্রকের মত এই অনলাইন মিডিয়াকে সে লোকের হাতে তুলে দিচ্ছে। মানুষ এখনো স্থানিকতার মহিমা দিয়েই বোঝে সবকিছু। ফলে, জুলিয়াস আন্তর্জাতিক হয়েও অস্ট্রেলিয়ান, নইলে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেভিন রাড (জুলিয়াসের বাড়ি যার সংসদীয় এলাকায়) কেন অদ্ভূত দ্ব্যর্থবোধক বিবৃতি দেবেন, যে, তথ্যফাঁসের জন্য জুলিয়াস নয় -- আমেরিকা দায়ী!


এই গল্পের শেষ কোথায়? উইকিলিকস-অ্যাফেয়ার মার্কিন-প্রবর্তিত বিশ্বব্যবস্থাকে রাতারাতি বদলে ফেলবে না। সৌদী বাদশা, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বা মিসরের প্রেসিডেন্ট আগে যা করছিলেন তাই করতে থাকবেন। শুধু আগের সেই মোহখানি তারা হারিয়ে ফেলবেন, কারণ জুলিয়াস তাদের প্রত্যেকের সামনে কিং-সাইজ আয়না দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। হেজিমনির মোহমায়ায় এখন আর তারা গাইতে পারবেন না "আমার আঁধার ভাল"! এ যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সেই নারীর মত যিনি তার স্বামীকে ভালবাসেন এবং স্বামীর ভালবাসাকে সন্দেহ করেন। স্বামীর কাছে স্ত্রীর এই মৃদুমন্দ সন্দেহ নিঃসন্দেহে উপভোগ্য, কারণ এতে করে স্বামীপ্রবর নিজের স্ত্রীর ওপর নিজের সীমাহীন প্রভাব বুঝতে পারেন। হেজিমনি তৈরি হয়। এখন কেউ যখন স্বামীর পরকীয়া প্রেমের/ স্ত্রীর প্রতি বিরাগের অকাট্য প্রমাণ সেই নারীর কাছে হাজির করবে, তিনি কী করবেন? যাই করুন তিনি, সংসার থাকুক বা নাই থাকুক, হেজিমনি আর থাকছে না নিশ্চিত। হেজিমনিহীনতায় মার্কিন কিভাবে বাঁচিবে?


প্রতীকী অর্থে, উইকিলিকস-এর হামলা টুইনটাওয়ার হামলা থেকেও সুদূরপ্রসারী। টুইনটাওয়ার হামলা মার্কিন হেজিমনিতে আঘাত করে নি, বরং তাকে সংহত করেছে। এর ফলে রেনেসাঁ-উত্তর মার্কিন ও তার মিত্রশক্তির পক্ষে দুনিয়াকে জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মগোষ্ঠীর বিভাজনে শাসন করার উছিলা তৈরি হয়েছে। উইকিলিকস তাকে এই সুযোগটা দেয় নি। তার হামলা মায়াবি, কারণ তিনি কোনোভাবেই পাশ্চাত্যের ডিফাইনড শত্রুবলয়ের প্যারাডাইমে বসবাস করেন না। (জুলিয়াসের এই স্থানিকতাকে আমাদের রিকনফার্ম করতে হবে।) তার ওপর, এই হামলায় আহত হবার দায় কেউ মুখে স্বীকার করবে না। সত্যিকারের অন্তর্ঘাতমূলক কাজ।

স্নায়ুযুদ্ধোত্তর মার্কিন হেজিমনির উঠানে জুলিয়াসই প্রথম বিষবৃক্ষ। তিনি ক্রমশই ফুলে-ফলে পয়মন্ত হতে থাকবেন, তার মৃত্যুতে, শাস্তিতে, কিংবা যাবতীয় অপবাদের ভেতর। ফলে, গল্পের শুরু এটা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29286837 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29286837 2010-12-10 09:11:58
তরল ভয়ের স্বরলিপি
বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবক্ষয়, যেখানে জীবনের সামান্য নিরাপত্তাটুকু নেই, সেরকম একটি দেশের অসহায় পিতামাতা হিসেবে আপনারা তাই করলেন যা ন্যুনতম বিবেচনাবোধ থেকে করা যেতে পারত। পুলিশ ডাকলেন না (কারণ ডেকে লাভ নেই), বরং ঐ বখাটে যুগলের সাথে কথা বললেন। বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে এটা কেন অসম্ভব। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ওরা পিস্তল বের করে গুলি করল, লুটিয়ে পড়লেন আপনারা। আর আমরা পত্রিকায় পড়লাম এই হত্যাকান্ডের ইতিবৃত্ত। পড়লাম, কন্যাকে তুলে না দেয়ার “অপরাধে” পিতামাতা খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ঙ্কর কাহিনী। আমরা এই হত্যাকান্ডের সাথে সমাজের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে মিলিয়ে ব্যাখ্যা একটা দাঁড় করিয়ে তড়িঘড়ি দায়মুক্ত হয়ে গেলাম!

আর খুনীরা যখন ধরা পড়ল, আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এরা কেউ মনস্টার নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র, মধ্যবিত্ত/উচ্চমধ্যবিত্ত পারিবারিক কাঠামোর মধ্যেই বড় হয়ে উঠেছে! এদেরকে আশপাশের সবাই চেনে, তারা বাসে-রিকশায় চড়ে, ইন্টারনেট ব্রাউজ করে, ফেসবুকে একাউন্ট আছে। আমরা কেউ ভেবেই দেখলাম না তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? তাদের হাতে যখন পিস্তল, তারা তো কন্যাটিকে রাস্তা থেকেও কিডন্যাপ করতে পারত, বাসা থেকেও পিস্তলের মুখে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সেটা তারা করল না, এমনকি পিতামাতাকে খুন করার পরও। বরং বলে গেল, “তোর বাবামাকে মেরে ফেললাম, এখন একলা একলা থাক”! আপনার কন্যা যদি আসাযাওয়ার পথে কিডন্যাপ হয়ে যেত, কিংবা পিস্তলের মুখে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেত ওরা তাতে আপনার বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ অন্তত জিম্মি হত না। কিন্তু এরা তা চায়নি। এরা চেয়েছিল আপনি এদের বখাটে জেনেও হাসিমুখে কন্যা সম্প্রদান করেন! হৃষ্টচিত্তে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে দেন আদরের কন্যাকে! সেই অর্থে, এরা শুধু আপনার কন্যাকে বলপূর্বক তুলে নিতে আসেনি, আপনার স্বাধীনতা, মূল্যবোধ আর বিশ্বাসকে ধর্ষণ করতেও এসেছিল। সেটা করতে দেননি বলেই খুন হতে হল আপনাকে।

কড়াইল বস্তিতে একটা গান শুনতাম প্রায়ই: “কোনো অস্ত্রধারীর হাতে আমার বোনকে দেবো তুলে/সে সন্ত্রাসী হোক কিংবা ক্যাডার, কার কি যায় আসে?/ আমার বোনটি নিরাপত্তা পাবে থাকলে যে তার পাশে”। মনির খানের সেই গানের শ্রোতা তো আপনি নন। এই গান বলছে শহরের সেই জনগোষ্ঠীর কথা যারা বস্তিতে থাকে শহরের আবর্জনা হিসেবে, যাদের পক্ষে কোনো থানাপুলিশ কোর্টকাচারি নেই, যারা ঘুমায় কিংবা জেগে থাকে আগুন আর বুলডোজারের দুঃস্বপ্নের মধ্যে প্রতিদিন। সেই বস্তিতে বড় হয়ে ওঠা একটি বোনের জন্য উদ্বিগ্ন ভাই এরচে বেশি কি নিরাপত্তা চাইতে পারে? কারণ সে জানে তার হাত আইনের দরজা পর্যন্ত কোনোদিন পৌঁছাবে না। তো, আপনি কেন সেভাবে ভাববেন? সমাজে আপনার প্রতিষ্ঠা আছে, সাংগঠনিক পরিচয়ও আছে খানিকটা, ছেলেমেয়েরা দেশেবিদেশে ভাল করছে, আপনি তো মনির খানের সেই গানের শ্রোতা হবেন না! আপনি আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, ভোট দেন, ট্যাক্স দেন, এমনকি সমাজের ভালমন্দ নিয়ে বন্ধুমহলে মতামতও দিয়ে থাকেন। এভাবে নিজের ক্ষমতায়ন সম্পর্কে আপনার একটি বায়বীয় ধারণা জন্মায়। আপনি ভাবেন যে, সমাজের সার্বিক পচন থেকে আপনার বিত্ত, সক্রিয়তা, বিশ্বাস আর মূল্যবোধ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আর নিরাপত্তার যে ব্যুহ আপনি নিজের চারপাশে অনুভব করছিলেন, আপনি খুন হয়ে যাওয়ার পর আমরা বুঝলাম এটা ছিল নেহাত কাচের দেয়াল!

খুন হওয়ার আগের মুহূর্তে যাই, যেখানে দেখবো যে দুই বখাটে আপনার বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছে কোমরে রিভলভার গুঁজে, আপনার কন্যাটিকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, বরং আপনারা হাসিমুখে কন্যাকে “সুপাত্রে” সম্প্রদান করবেন সেই আবদার নিয়ে! এবার অন্য পৃষ্ঠায় যাই, দেখবো আপনার কন্যার দীর্ঘদিনের “বন্ধু” তার অন্যত্র প্রেমের দেনা শোধ করতে গিয়ে ছুরি কিনছে আপনাকে রক্তাক্ত করে দেবে বলে। কারণ তার বিশ লাখ টাকা লাগবে এবং সেই টাকা কোনো কার্যকারণ ছাড়াই আপনাকে দিতে হবে! কন্যার এই বন্ধুটিকে নেহাত বখাটে ভাববার কোনো সুযোগ ছিল না আপনার, আপনি তো একে সুশীল ছাত্র এবং কন্যার বন্ধু হিসেবেই চেনেন। এবার আরেক পৃষ্ঠায় যাই, যেখানে আপনার ছাত্রীর প্রেমিক আপনারই বাড়ির সামনে ছুরি নিয়ে অপেক্ষা করছে আপনাকে খুন করবার জন্য। আপনার চোখের আড়ালে আপনার চেনাপরিচিত মানুষজন কী ভয়ঙ্করভাবে বদলে যাচ্ছে সেই হিসাব আপনি কিভাবে রাখবেন? কিন্তু হিসাব না রাখতে পারলেও দায় আপনাকেই নিতে হবে! খড়গ আপনার ওপরেই উঠানো, পচন যেখানেই থাকুক।

আপনার বেঘোরে খুন হয়ে যাওয়ার জন্য এসব উছিলাই যথেষ্ঠ। আপনি শুধু বেশুমার নৌ কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় পটল তুলবেন, লাগাতার ভূমিকম্পে থরহরিকম্প থাকবেন তাতো হবে না! আপনাকে শুধু ক্রসফায়ার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বুলেট, ছিনতাইকারীর ছুরি বা অজ্ঞানপাটির্র ধুতরাবিষ খুঁজে বেড়াচ্ছে ভাবলে ভুল হবে। আপনি খুন হতে পারেন নিজকন্যার বখাটে প্রণয়প্রার্থীর হাতে স্রেফ তার আবদার ফিরিয়ে দেয়ার অপরাধে। আরো তুচ্ছ অজুহাতে আপনাকে খুন করতে পারে আপনার সন্তানের বহুদিনের চেনা কোনো বন্ধু, কিংবা আপনার ছাত্রীর প্রেমিক, কিংবা আপনাকে খুন করার জন্য বিদেশে বসেও খুনী ভাড়া করতে পারে কোনো অনলাইন ফ্যানাটিক। আপনি খুন হতে পারেন নিজগৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পথে, মসজিদে, সভায়, মিছিলে, জানাজায়, কর্মস্থলে, এমনকি পুলিশী হেফাজতে। আপনার রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে থাকতে পারে আপনার বসার ঘরের সোফার ওপরে, কোনো আবাসিক প্রকল্পের ছাপড়াঘরের পাশে, ব্রিজের পিলারে, কিংবা তাকে পুঁতে রাখা হতে পারে কোনো দোকানের ভেতর, টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেয়া হতে পারে সারা শহরের ডাস্টবিনে!

এখন নিশ্চয়ই হেসে উঠবেন আপনি। বলবেন, আরে ধূর, এসব ঘটনা তো হরহামেশা ঘটে না, সরলীকরণ করছো তুমি! ঠিক। এসব ঘটনা কালেভদ্রেই ঘটে। তাই বলে কি এর ভয় থেকে আপনি মুক্ত থাকতে পারছেন? জমাট-বাঁধা ভয় হয়ত আপনার দম বন্ধ করে দিচ্ছে না, আপনি দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছেন ঘুরেও বেড়াচ্ছেন। কিন্তু শিরার ভেতর, রক্তপ্রবাহের সাথে অবয়বহীন তরল একটা ভয় ঠিকই বয়ে চলেছে। এই “তারল্য” পাতলা অর্থে মোটেও নয়, বরং এর অবয়বহীনতা একে সর্বগামী করে তুলছে, যেন সর্বভূতে বিরাজিত সে! কিন্তু এই ভয়কে বহন করে বেঁচে থাকার সামর্থ আপনাকে দিচ্ছে আমাদের “তরল আধুনিক” সমাজব্যবস্থা, সমাজতাত্ত্বিক জিগম্যান্ট বম্যান যেমন বলেন। আপনি পালিয়ে যাবেন না, আতঙ্কে চিৎকার করে উঠবেন না, ঘরে খিল লাগিয়ে কাঁপতে থাকবেন না, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী ভয়ের স্রোত আপনাকে একটু একটু করে গিলে ফেলবে। নীরবে টহল দিয়ে বেড়াবে আপনার শিরায় উপশিরায়। এভাবে ভেতরে ভেতরে আপনি অন্য মানুষ হয়ে উঠবেন ধীরে ধীরে।

বম্যান তিন ধরনের ভয়ের কথা বলছেন তার লিকুইড ফিয়ার(২০০৬) নামক বইতে। কিছু ভয় আছে আদিম বা প্রাকৃতিক। এর প্রতিক্রিয়ায় মানুষ আর জানোয়ারের পার্থক্য বিশেষ নেই: পারলে রূখে দেয়া নয়তো পালানো। কিছু “ডেরাইভেটিভ” অর্থাৎ সামাজিক-সাংস্কৃতিক: যেমন চাকরি হারানোর ভয়, স্ট্যাটাস নেমে যাওয়ার ভয়। আর কিছু ভয় আছে যা পুরো প্রাকৃতিকও নয় আবার পুরো সাংস্কৃতিকও নয়। এদের কোনো নাম নেই, এরা থাকে মাঝখানে ধূসর এলাকায়। এরা প্রাকৃতিক হলেও পুরোপুরি নয়, আবার মানবসৃষ্ট হলেও পুরোপুরি নয়। এই জোনে আপনার বিবেকবুদ্ধির বিশেষ ভূমিকা নেই, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রও এখানে কখনো বধির কখনো বা অকেজো, নৈতিকতা কিংবা রামসুন্দর বসাকের আদর্শ দিয়ে এর সামান্যই মোকাবেলা করা সম্ভব। একেই “তরল ভয়” নাম দিচ্ছেন বম্যান। এরা হল সেই ধরনের ভয়, যাদের অসংখ্য চোখ আছে এবং এরা মাটির নিচেও দেখতে পায় বলে সারভান্তেস লিখেছিলেন ডন কুইকজোট গ্রন্থে। আপনি ভ্রমণ করছেন ট্রেনে বোমা হামলা হতে পারে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন স্টক এক্সচেঞ্জে ধস নামতে পারে, ঘুমিয়ে পড়েছেন ভূমিকম্পে চিরকালের মত আটকে যেতে পারেন বিধ্বস্ত ভবনের ভেতর, মেয়ে বড় হয়েছে তার প্রণয়প্রার্থীর হাতে খুন হয়ে যেতে পারেন, ছেলে স্কুলে গেছে কিডন্যাপ হতে পারে, পাড়ার বখাটেদের উৎপাতে মেয়ে বিষ খেয়ে মরে যেতে পারে, স্কুটারে বাড়ি ফিরছেন চোখে মলম লাগিয়ে আপনাকে ট্রাকের নিচে ফেলে দেয়া হতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ভয় তরল, শ্রেণী-লিঙ্গ-বর্ণভেদে আগের মত জমাট বাঁধছে না। নাগরিক মধ্যবিত্ত, দেখুন না আপনার সম্ভাব্য খুনী শুধু নিম্নবর্গ থেকেই আসছে না, সে বেড়ে উঠছে আপনারই ড্রয়িংরুমে, তাকে আপনি চেনেন, রাস্তায় সালাম নিয়েছেন বহুবার, পালাপার্বণে হয়ত বাড়িতে ডেকে খাইয়েছেনও। তাকে এখন আর শ্রেণী দিয়ে বর্ণ দিয়ে ধর্ম দিয়ে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না, যাবেও না।

তো, আপনি যখন আপনার কন্যার প্রণয়প্রার্থীর গুলিতে খুন হয়ে যাবেন তাকে আমরা কি নাম দেব? সমাজের অবক্ষয় বা সহিংসতার বিস্তার যাই বলি, হাতের মুঠোয় যেন পুরোটা আসে না। যতই আমরা বিস্মিত না-হবার ভান করি, যতই হাজির করি রেডিমেড ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, এই খুন যেন সেসবের উর্ধ্বে উঠে থাকে! “সহিংসতা” কিংবা “অবক্ষয়”জাতীয় শব্দগুলোকেই খুব ক্লিশে লাগে, এদের সংজ্ঞাগুলো যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে! এই যে ভয়াবহ গতিশীলতা, যার জন্য অশুভ কোনো নাম আমরা ঠিক করতে পারছি না, তার সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে দিনে দিনে আরো অক্ষম হয়ে উঠছে আমাদের রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা, বিবেচনা, মূল্যবোধ এবং শুভবুদ্ধি। ফলে ভয় অবয়ব হারাচ্ছে আরো, পরিপুষ্ট হয়ে ওঠছে আমাদের তরল ভয়ের স্বরলিপি!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29129821 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29129821 2010-04-06 08:13:00
মাই নেম ইজ খান: "ভালো" এবং "খারাপ" মুসলমান
৯/১১ পরবর্তী দুনিয়ায় “মুসলিম” পুরাদস্তুর রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিচয় যার দিতে হয় তার যেমন রাজনীতি আছে, যার কাছে দিতে হয় তারও রাজনীতি আছে। পরিচয়দাতার রাজনীতি হল, তিনি তার মুসলিম পরিচয়ের মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার একচ্ছত্র মার্কিন/পশ্চিমা আধিপত্যকে যে বাতাবরণে ন্যুনতম চ্যালেঞ্জটুকু করা সম্ভব তাকে সচেতন কিন্তু ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন। আর পরিচয়গ্রহীতার রাজনীতি হল, তিনি “খারাপ” মুসলমানের মিথটুকু সামনে ঝুলিয়ে গোটা মুসলিম সমাজকে দিয়ে এর দায় বহন করানোর নৈতিক বৈধতা অর্জন করেন । বলাবাহুল্য, “ভাল” এবং “খারাপ” মুসলমানের ক্যাটাগরি তারাই তৈরি করেছেন, ৯/১১ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে। তারা কিন্তু বিলক্ষণ জানেন যে এমন অনেক মুসলিম আছে, মুসলমানিত্ব যাদের আত্মপরিচয়কে বিনির্মাণ করে নি। কিন্তু সেসব বিবেচনার মত ধৈর্য টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেছে (হায়, মানবতাবাদ!)। তাছাড়া গ্রে জোন সবসময়ই বিপজ্জনক, মুসলমানকে শাদায় এবং কালোয় দেখাটাই সুবিধার। ফলে যারা নিজেদের “ভাল” এবং সেক্যুলার ভাবেন, ঘটনাচক্রে মুসলমান, এবং নিজেদের ৯/১১ পূর্ব সুখস্বাচ্ছন্দ্যে বহাল থাকতে চান, তারা অতি দ্রুত “ভাল” এবং “খারাপ” মুসলমানের এই ক্যাটাগরিতে নিজেদের পরিচয়কে ঝালিয়ে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি বলিউড মুভি মাই নেম ইজ খান পশ্চিমাদেশে ছড়িয়ে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম প্রবাসীকুলের জন্য “ভাল” এবং “খারাপ” মুসলমানের ক্যাটাগরিটাকে খুব মনোগ্রাহীভাবে হজম করে দেখাল। ৯/১১কে কেন্দ্রে রেখে ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, ৯/১১ পূর্ব পরিস্থিতিতে ভারতীয় অটিস্টিক যুবক রিজওয়ান খান (শাহরূখ খান) মার্কিনদেশে অভিবাসিত হয়। আরেকটা বিষয়: মুসলমান রিজওয়ান খানের অটিজম নেহাত ঘটনাচক্রে নয়। পুরো ছবিতে অটিজমের একটা কার্যকরী রাজনৈতিক ভূমিকা আছে সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। কাহিনীতে আমাদের অভিবাসী রিজওয়ান স্বামী-পরিত্যক্তা আরেক ভারতীয় অভিবাসী হেয়ার ড্রেসার মন্দিরাকে (কাজল) বিয়ে করেন। মন্দিরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী, নিয়মিত পূজা অর্চনা করেন। আবার রিজওয়ানও একই ঘরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। যে সেক্যুলারিজম অর্ধশতাব্দীকাল ধরে প্রযুক্ত থাকার পরেও সংবিধান থেকে ভারতীয় নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনে সফলভাবে অবতরণ করে নি, রিজওয়ান-মন্দিরার দাম্পত্য সম্পর্ক তাকে অবলীলায় নামিয়ে আনে একটি ভিনদেশী ফ্লাটবাড়িতে। শেষমেষ সবই ইচ্ছাপূরণের গল্প!

যাই হোক, ৯/১১ উত্তর পরিস্থিতিতে কাহিনী দ্রুত বাঁক নেয়। মন্দিরার আগের তরফের স্কুলগামী সন্তানটি, যে তার নতুন পিতা (রিজওয়ান)র উপাধি নিজের নামের সাথে ব্যবহার করছিল, তাকে তার অমুসলিম সতীর্থরা খুন করে। সেই খুনটিও যথাসম্ভব কম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: কিছু মারধর করাই হয়ত উদ্দেশ্য ছিল এদের এমন একটা ইঙ্গিত আছে হালকাভাবে। রিজওয়ান খান তার স্ত্রী মন্দিরাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মার্কিন রাষ্ট্রপতির পিছু ধাওয়া করেন এই কথা বলার জন্য যে, তার নাম খান এবং (কিন্তু/তবু) তিনি “টেররিস্ট” নন। এক পর্যায়ে তিনি প্রেসিডেন্টের (জর্জ বুশ জুনিয়র) এক সভায় উপস্থিত হয়ে একথাটি বলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তারীরা কেবল “টেররিস্ট” শব্দটাই শুনতে পান। জর্জ বুশ জুনিয়রের পলিসিতে এটুকু শোনাই স্বাভাবিক এবং আরো স্বাভাবিক হল এরপর রিজওয়ানের গ্রেফতার হওয়া। বেচারা রিজওয়ান নানান ইন্টারোগেশন, নির্যাতন পার হয়ে অবশেষে তার “আল-কায়েদা” কানেকশন আবিষ্কৃত না হওয়ায় মুক্তি পান। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতির পিছু ধাওয়া অব্যাহত রাখেন। এভাবে, একবার আমাদের রিজওয়ান হারিক্যান-উপদ্রুত একটি কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত মার্কিন গ্রামকে সাহায্য করতে জীবন বাজি রেখে এগিয়ে যান। তার উদ্যোগেই গ্রামটিতে সাহায্য পৌঁছায় এবং বহু গ্রামবাসীর জীবন রক্ষা পায়। সংবাদমাধ্যমগুলো তখন রিজওয়ান খানের মধ্যে সেই “ভাল” মুসলিমটিকে খুঁজে পায় যে কিনা মানবতাবাদী! যে কিনা মসজিদে সন্ত্রাসী পরিকল্পনা করতে থাকা “খারাপ” মুসলমানের একটি দলকে মার্কিন পুলিশ বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেয়। ততদিনে মার্কিন রাষ্ট্র বুঝে যায় যে, এই হল “ভাল” মুসলিম। ততদিনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে এসেছেন কৃষ্ণাঙ্গ ওবামা। তিনি রিজওয়ানকে সাক্ষাৎ দেন, সমদুঃখী হন এবং রিজওয়ানের আদর্শে মার্কিন মুসলিমকে উজ্জীবিত হতে উপদেশ দেন। এই হল কাহিনী।

লক্ষ্য করা যায়, বেশ কিছুকাল ধরেই প্রবাসী ভারতীয় সমাজ বলিউড ফিল্মে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে প্রবাসের বাস্তবতা বলিউড ফিল্মে উঁকি দিতে শুরু করেছে। মুম্বাই ছবির একটা বড় বাজার এই প্রবাসী ভারতীয়বৃন্দ, তাদের স্বার্থকে অবজ্ঞা করার উপায় তো নাই। এ যাবতকাল আমরা ফিল্মে এ সংক্রান্ত যতটুকু দেখেছি তা মূলত প্রবাসী ভারতীয়দের জীবন, কর্ম, সম্পর্ক, স্মৃতি এবং স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি বিষয়ে। মাই নেম ইজ খান সে তুলনায় আরেকটু উচ্চাকাক্সী। এই ছবির অভিমুখ ভারত নয়, বরং এই ছবিতে ৯/১১-উত্তর মার্কিন রাষ্ট্রকাঠামোয় ভারতীয় অভিবাসীর রাজনৈতিক অভিযোজনের রাজনীতিটুকু অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠল, সম্ভবত এই প্রথম। মুসলিম অভিবাসী রিজওয়ান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সাক্ষাতের পর কিন্তু ভারতে প্রত্যাবর্তন করে না বা করার ইচ্ছাও পোষণ করে না। এটা একটা ইশারা। আরেকটা দিক হল, নিতান্ত অসুবিধাজনক সময়ে “ভাল” অভিবাসী মুসলিমদের এই রাজনীতি শুরু করতে হয়েছে। অসুবিধাটা ৯/১১-উত্তর দুনিয়া, যখন মুসলমান মানেই সম্ভাব্য টেররিস্ট! এরকম একটি পরিস্থিতিতে উত্তপ্ত এবং যুদ্ধংদেহী মার্কিনের সোজাসাপ্টা পলিসি-প্ল্যাকার্ডগুলো বহন করার জন্য রিজওয়ানের অটিজম খুবই কার্যকরী ফর্মূলা! অর্থাৎ, অটিজমের কারণেই রিজওয়ান জগতকে শাদায় এবং কালোয় দেখতে শিখেছে এবং গ্রে এরিয়া থেকে দূরে থাকতে সক্ষম। ফলে, মুসলিম তথা সমগ্র মানবতাকেই “ভাল” এবং “খারাপ” এই দুইভাগে ভাগ করে দিয়ে নিজেকে “ভাল” মানুষ এবং “ভাল” মুসলিম প্রমাণ করার রিজওয়ানীয় চেষ্টাটির মধ্যে আমরা কোনো আপত্তি তুলব না। এভাবে, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রেক্ষিতে যে শিক্ষা রিজওয়ান ছোটবেলায় মা-র কাছ থেকে পেয়েছিল (মানুষ দুই রকম: ভাল এবং খারাপ), তার অটিজম তাকে সেই সেক্যুলারিজমের শিক্ষাটা ৯/১১ উত্তর মার্কিনদেশে মুসলমানকে ক্যাটাগরাইজ করতে কার্যকরী সহায়তা দিয়েছে। এভাবে ভাবনা আরো আগানো যায় যে, মার্কিন-উদ্ভাবিত “ভাল” এবং “খারাপ” মুসলিমের ক্যাটাগরিটাকে প্রশ্নহীনভাবে হজম করার জন্যই রিজওয়ানকে অটিস্টিক হতে হয়েছে। অটিস্টিক থাকার কারণেই রিজওয়ান “খারাপ” মুসলমানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রহসনের রাজনৈতিক অর্থনীতিটুকু অনুধাবন করে না। ছবিতে আফগানিস্তান এবং ইরাকের প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু অদ্ভূতভাবে রিজওয়ানের মনে আফগানিস্তানে বা ইরাকে মার্কিন ভূমিকা নিয়ে কোনো ক্ষোভ বা প্রশ্ন তৈরি হয় না। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেয়ার চিন্তাও মাথায় আসে না তার। সে শুধু নিজের শাদা চরিত্রের বিবৃতি দিয়ে এবং তা প্রমাণ করেই খালাস। অটিস্টিক রিজওয়ানের পক্ষে আফগানিস্তানে বা ইরাকে মার্কিন ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দুকথা শুনিয়ে দেয়া খুব স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু প্রবাসী ভারতীয়/দক্ষিণ এশীয় মুসলমানদের মনোবাঞ্ছা তো সেটা নয়! তারা এতসব “ঝামেলা” নিশ্চয় বহন করতে চান না! তারা যা চান, রিজওয়ান তাইই করেছে। সেই অর্থে মাই নেম ইজ খান যতটা না ঘটনার বিবৃতি, তারচে বেশি হল আকাঙ্ক্ষার বিস্তরণ। এই আকাঙ্ক্ষা মার্কিন-প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় স্বচ্ছল ডায়াসপোরার। আর সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেছে বলেই মাই নেম ইজ খান ভারতের বাইরে রেকর্ডভাঙ্গা ব্যবসাও করেছে।

করণ জোহর (মাই নেম ইজ খান ছবির পরিচালক) যতখানি সপ্রতিভভাবে প্রবাসী মুসলিম তথা ভারতীয়র নাড়ি ধরেছেন, ততখানি সপ্রতিভভাবে মার্কিন রাজনীতির নাড়ি বুঝে উঠতে পারেন নি। পারলে তিনি এতটা আনক্রিটিক্যালি প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে আসা একজন “আফ্রিকান-আমেরিকান” প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় গলে যেতেন না। কালা-আমেরিকানদের সাথে বাদামি ভারতীয়দের যে সম্প্রীতির সম্ভাবনা তিনি আমেরিকার মাটিতে আবিষ্কার করতে চাইলেন তাও অনৈতিহাসিক এবং এক অর্থে বর্ণবাদীও বটে। কিন্তু মার্কিনী বর্ণবাদের ভবি তাতে ভোলবার নয়। ভোলবার নয় বলেই ইরাকে যুদ্ধরত মার্কিন বোমানিরোধক স্কোয়াডকে নিয়ে বানানো ছবি “হার্ট লকার” অস্কার পায় -- যে ছবিতে আমরা দেখি কিভাবে অদৃশ্য ইরাকী (মুসলিম) সন্ত্রাসীদের পাতা বোমাফাঁদ নস্যাৎ করছে “শান্তিকামী” মার্কিন সেনাবাহিনী! এটাই মার্কিন রাজনীতি, বুশ-ওবামা নির্বিশেষে, এটা পশ্চিমা মিডিয়ার রাজনীতিও।

মাই নেম ইজ খান প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় মুসলমানের নাড়িতে হাত দিয়ে মার্কিন রাজনীতির নাড়ি বোঝার চেষ্টা করেছে -- যে কারণে পশ্চিমা সিনেমা বিশেষজ্ঞবৃন্দ এই ছবির কাহিনীকে “রূপকথা”র চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নন। যদিও অ-মার্কিন চোখে মার্কিন রাজনীতির চেহারা নিশ্চয়ই তাদের কৌতুহলের খোরাক হয়েছে। তবে এই ছবির মূল গুরুত্বের জায়গাটি এটা নয় নিঃসন্দেহে। রিজওয়ান খান হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা স্বচ্ছল মার্কিন-প্রবাসীদের আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেন। আর সেটা ৯/১১ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে। পশ্চিম-উদ্ভাবিত “ভাল” মুসলিমের ক্যাটাগরিতে এই শ্রেণীটি কতখানি উদগ্রীব এবং অসহায়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে, মাই নেম ইজ খান তারই ইশারা। ফলে, খুব গূঢ় অর্থে, এই ছবি ডায়াসপোরার তরফ থেকে মার্কিন রাজনীতিকে এক ধরনের পলিসি অ্যাডভাইজও।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29120653 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29120653 2010-03-21 10:20:03
ফাঁসির রিচুয়াল এবং অধরা ডালিম
ব্লা ব্লা ব্লা.....

এই ধরনের তর্কে একটা সার্কুলার রিজনিং তৈরি হয়। ফলে, প্রথম সোজা যে রাস্তাটা দেখা যায় সেইটা ধরেই এই গোলক ধাঁধা থেকে বের হয়ে যাচ্ছি।

শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীদের এই প্রাণদণ্ডের শাস্তি প্রতিশোধমূলক নয়। প্রতীকী। আবার এই প্রতীক পরিকল্পিত নয়, অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে এই ঘটনায় বেসামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তার বিনীত দম্ভ প্রকাশ করল। কার সাথে?

মানস সেটা রাইসুর নোটে বলেছেন। একমত। সামরিকতন্ত্রের সাথে। যদিও আমাদের সেনাতন্ত্র লিবারাল-কর্পোরেট-এক্সট্রিম নানা ফর্মে আরো বহুদিন সিন্দাবাদের বুড়ার মত রাষ্ট্রের ঘাড়ে সওয়ার হয়েই থাকবে, তবু তাকে একটু ঐতিহাসিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলবে এই ফাঁসি।

আমার অস্বস্তি অন্যত্র। এই ঘটনাটা আমার মধ্যে এক বিচিত্র বিপর্যয় তৈরি করছে। এই বিপর্যয় মূলত স্মৃতির গঠনের সাথে ভিজুয়াল বাস্তবতার সংঘর্ষজাত, অনুমান করি।

যারা শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করেছিল, খুন করার পর এর মজুরি হিসাবে দেশে বিদেশে পুরষ্কৃত হয়েছে, বিভিন্ন সভায় সাক্ষাৎকারে ওয়েবসাইটে এই খুনাখুনিকে সদম্ভে জাস্টিফাই করে চলেছে..... এই দলটির ছবি এভাবেই আমার স্মৃতিতে। আর যারা ফাঁসিতে ঝুলল, তাদের কাকুতি, দেশ-দেশান্তর, এবং নির্জীব বার্ধক্য... এটা এদের ব্যাপারে আমার বর্তমানের পারসেপশন তৈরি করে। ফলে আমার মনে হতেই থাকে যে, যে বজলুল হুদার ব্রাশফায়ারে বঙ্গবন্ধু তাঁর বাড়ির সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েছিলেন, সেই বজলুল হুদা এবং ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া বজলুল হুদা এক ব্যক্তি নয়। যে যৌবন, সামরিকতা এবং দম্ভ এই ভয়াবহ খুনাখুনির লিগ্যাসীকে বহন করে গেছে দীর্ঘ তিন দশক অব্দি -- এই ফাঁসি যেন তার অট্টহাসি ম্লান করে দিতে পারল না। বরং এই ফাঁসি রিচুয়ালিস্টিক নিষ্ঠার সাথে জগতে মূল্যহীন হয়ে পড়া কিছু বুড়াকে এই "দেশে দেশে ভ্রমি" দশা থেকে মুক্তি দিয়ে দিল।

আরেকটু কনক্রিট দৃষ্টান্ত দেই: এসব আত্মস্বীকৃত খুনীদের মধ্যে একমাত্র মেজর ডালিমের ফটৌগ্রাফের কোনো আপডেট চোখে পড়ে না। অন্যদের ক্ষেত্রে যেমন তারা ধরা পড়ার আগেও তাদের বর্তমানের ফটো দেখা গেছিল, ডালিমের ক্ষেত্রে সেটা হয় নি। ফলে এদের ছবি যখন একসাথে ছাপা হয়, আমার বিপুল অস্বস্তি লাগে। মনে হয় এই সব বুড়ারা সবাই মিলে ডালিমের যৌবনকে পাহারা দিতেছে। তারা যেন তাদের যাবতীয় অপরাধ ডালিমের জিম্মায় রেখে দিয়েছে! আর সেসবকে সাথে নিয়ে ডালিমের খুনী যৌবন চিরকালের জন্য অধরা হয়ে গিয়েছে।

ফলে এই ফাঁসি প্রতীকী। তাকে ঘিরে আনন্দ বেদনার বিস্তারও রাজনৈতিক। এ নিয়ে আমার এর বেশি পর্যবেক্ষণ নাই। কিন্তু ডালিম সন্ধানে রাষ্ট্র যে তার কূটনৈতিক প্রতিভা ব্যয় করবে তাতে আমি খুশি। ওকে ধরতে পারলে আমার স্মৃতিসংক্রান্ত বিপর্যয়টুকুর অন্তত উপশম হবে। এই গ্রুপ ছবিটা আমি ভুলতে চাই, যেখানে জবুথুবু বুড়াদের মাঝখানে মেজর ডালিম তার সময়কে ১৯৭৫ এ থামিয়ে রেখেছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29087621 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29087621 2010-01-29 01:11:29
"ক"তে ক্রসফায়ার!
নব্বই দশকের “ডার্ক জাস্টিস” নামের টিভি সিরিয়ালটির কথা মনে পড়ে? বিচারক নিক মার্শালের পরিবার নির্মমভাবে খুন হওয়ার পর খুনীরা আইনের ফাঁক গলে তার এজলাশ থেকেই বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। তাই বিচারক নিক মার্শাল, যিনি আগে আবার পুলিশেও চাকরি করতেন, তিনি রাতের অন্ধকারে আইন নিজের হাতে তুলে নেন। আর আমরা যারা সমব্যথী দর্শক তারা নিক মার্শালের এই আইন হাতে তুলে নেয়ার ঘটনাটিকে নৈতিক সমর্থন দিতে থাকি। মনে রাখতে হবে, নাটকে নিক মার্শাল কিন্তু এক বিচারক, আবার তিনি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাও। নিক মার্শালের বিচারক পরিচয় তার কর্মকাণ্ডের পক্ষে আমাদের নৈতিক সহানুভূতিকে আরেকটু বৈধতা দেয়। অর্থাৎ যেহেতু নিজেই তিনি বিচারক ফলে তার পক্ষে অপরাধী আর নিরপরাধের ফারাক বোঝা সম্ভব। কিন্তু সেই সাথে তার "সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা" পরিচয়টির মাধ্যমে "ডার্ক জাস্টিস" নিশ্চিত করবার নৈতিক অধিকার বিচার বিভাগ থেকে নির্বাহী বিভাগে স্থানান্তরিত হয়।

ক্রসফায়ার-সংস্কৃতি বাংলাদেশে চালু হয় ঠিক তার এক দশক পর ২০০২ সালে, অপারেশন ক্লিনহার্ট-এর মাধ্যমে। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল অনেক আগে ১৯৭৩ সালে নকশাল দমনের পুলিশি কৌশল হিসাবে। আবার ১৯৭৫ সালের সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডটির আদলটিকে বর্তমান ক্রসফায়ারের পূর্বসূরী গণ্য করা যায়। সেই অর্থে নিখিল বঙ্গীয় ঐতিহ্য অনেকখানিই ধরে রেখেছে হালের এই ক্রসফায়ার, কারণ তা সম্ভবত সবচে বেশিবার প্রযুক্ত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের চরমপন্থীদের বিরূদ্ধে। কিন্তু অতীতের যে কোন দৃষ্টান্ত থেকে বর্তমানের এই ক্রসফায়ার গুণে, পরিমাণে এবং পরিণামে যে অনেক ভিন্ন তা বোঝার জন্যই এই লেখার অবতারণা।

প্রথম আলো-র এক সাম্প্রতিক জরিপে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সবচে জোরালো যে মতটি খেয়াল করা যায় সেটা হল, ক্রসফায়ারে দাগি সন্ত্রাসীকে মেরে ফেলা হলে সমস্যা নাই। নিরপরাধ লোক মারা গেলেই সমস্যা। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে ক্রসফায়ার করা হয়েছে যাদের বিরূদ্ধে পরে কোনো দাগ পাওয়া যায় নি। বাপী হত্যাকাণ্ড এর সাম্প্রতিকতম নমুনা। ফলে সমাজের একাংশ মনে করেন যে ক্রসফায়ার বন্ধ করা এ জন্যই উচিৎ যে এতে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এই যুক্তিটি কিন্তু ক্রসফায়ার সম্পাদনকারী বাহিনির হত্যা করবার এখতিয়ারকে প্রশ্ন করে না, বিচারে “নির্ভুল” থাকার ক্ষমতাকে সন্দেহ করে মাত্র।

ক্রসফায়ার নিয়ে জনমতের এই মিশ্র দশাটি তৈরি হয়েছে কেন? এক, এলিট ফোর্স র‌্যাবের ব্যাপারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে সমাজে। সেটা হয়েছে সাবেকী পুলিশ বাহিনীর ঢিলেঢালা দশার বিপরীতে র‌্যাবের কমাণ্ডো-ব্রান্ডিং এবং কর্মতৎপরতার ডিসপ্লে থেকে। ফলে শহরের মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবর্গের চোখেও র‌্যাব শুধু হুকুম-তামিল করা কোনো বাহিনি নয়, বরং এমন এক বাহিনি যে কিনা স্বয়ম্ভূ বিবেক দিয়ে পরিচালিত হয়। কড়াইল কিংবা ধলপুর বস্তিতে মাস্তানদের উৎপাত যে র‌্যাবের দৌরাত্ম্যেই কমেছে একথা বস্তিবাসীরা জোরগলায় বলে। আর দ্বিতীয় ফ্যাক্টরটা তৈরি হয়েছে বিচার বিভাগের ওপর বিদ্যমান অনাস্থার ফলে। মজার বিষয় হল, এই অনাস্থার জন্য বিচার বিভাগ দায়ী নয়, কারণ সে কখনই স্বাধীনভাবে ক্রিয়াশীল হয় নি। কিন্তু আমরা বিচার বিভাগের সদিচ্ছা আর ক্ষমতাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছি সে স্বায়ত্তশাসিত হবার আগেই। এভাবে আইনের শাসন আমাদের সামনে ইউটোপিয়াই রয়ে গেছে। এই দুই ফ্যাক্টর ক্রসফায়ারের মত ব্যবস্থাকে ব্যবহারিক অনুমোদন দেয় কারো কারো বিবেচনায়।

এখন কথা হচ্ছে, ক্রসফায়ার কি শুধু হত্যারই মামলা? তাহলে ঈদমৌসুমে বরিশালগামী লঞ্চডুবির সাথে এর পার্থক্য কি? কেউ বলবেন, পার্থক্য এটাই যে ক্রসফায়ার কেবল সন্ত্রাসীদের বিরূদ্ধে ব্যবহৃত হয়। সন্ত্রাসীকে মেরে ফেলার অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে কিনা সেটা নিয়ে প্রচুর আলাপ হয়েছে অতীতে। তবে সন্ত্রাসীর মৃত্যুকে ভিজুয়াল প্যাকেজ বানিয়ে টেলিভিশনে বা পত্রিকার পৃষ্ঠায় ছেড়ে দেয়ার রাজনীতি কিন্তু ভিন্ন। সেদিক দিয়ে বিচার করলে, ক্রসফায়ার সমাজে মোটামুটি তিন ধরনের সংক্রমণ করছে: হত্যার, মিথ্যার এবং আতঙ্কের। একটি সত্য হত্যাকাণ্ডের পর প্রচারমাধ্যমগুলো উদ্ধৃতি চি‎হ্নের ভেতরে উপহার দিচ্ছে একটি সার্বজনীন মিথ্যার প্যাকেজ। একেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটবার পরে যে সংবাদটি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত হয় তার মুখস্থ ফর্ম্যাট (অপরাধীসহ অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া > সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা সহযোগীদের হামলা > আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবের পাল্টা গুলি > অপরাধী হত) থেকে আমরা সহজেই বুঝি যে, হত্যাকাণ্ডের মত এই মিথ্যাকাণ্ডেরও পৃষ্ঠপোষকতা করছে স্বয়ং রাষ্ট্র। অর্থাৎ ক্রসফায়ার শুধু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই নয়, বরং একটি হত্যাকে মিথ্যার বাতাবরণে প্রকাশ করার রাষ্ট্রীয় কৌশলও। হত্যার সাথে মিথ্যার এই মনিকাঞ্চনযোগে যা উৎপন্ন হয় তার নাম নিখাদ আতঙ্ক এবং তাকে বইয়ে দেয়া হচ্ছে সমাজের মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে। তার ওপর, এক বাপ্পীর বদলে অন্য বাপ্পীর ক্রসফায়ার সমাজে নিরাপত্তাহীনতার যে বোধ ছড়িয়ে দিচ্ছে তা সংঘহীন সাধারণ মানুষকে দাগি সন্ত্রাসীর চেয়ে কোনো অংশে কম আতঙ্কিত করছে না। এভাবেই ক্রসফায়ার জিনিসটা হত্যা, মিথ্যা এবং আতংকের ত্রিবেণী হয়ে উঠেছে। এটাই রাষ্ট্রীয়ভাবে ফ্যাসিবাদ কার্যকর করার পদ্ধতি, যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যা এই গোটা প্রক্রিয়ার একটি উপাদানমাত্র। কিন্তু এর উপজাত হিসেবে উৎপন্ন মিথ্যা এবং আতঙ্ক সমগ্র সমাজের উপর সুদূরপ্রসারীভাবে প্রযুক্ত হচ্ছে। সামাজিক সন্ত্রাসকে মোকাবেলা করতে গিয়ে বানানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দক্ষযজ্ঞে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা নেহাত অধস্তনের ভূমিকা পালন করছে। ক্রসফায়ার যেন দলীয় এজেন্ডার বাইরে! ক্রসফায়ারপ্রশ্নে দৃশ্যত কোনো মতবিরোধ নাই ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতা-হারানো দলগুলোর! কারণ, এহেন ব্যবস্থা দিয়ে বিদ্যমান সন্ত্রাসকে মোকাবেলার ডিসপ্লে করা সহজ, এবং এর ফলে সন্ত্রাসের অদৃশ্য উৎসকে (যা কিনা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক) পর্দার আড়াল করে রাখাও সম্ভব হয়। ফলে তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতেই যেন ক্রসফায়ারের একটা “লার্জার দ্যান লাইফ” ইমেজ খাড়া করাতে চান। যেন জনমানস ভেবে নেয় যে ক্রসফায়ার স্বয়ংক্রিয় একটা জিনিস, রাষ্ট্রক্ষমতার আধিকারিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের নাকের ডগা দিয়ে স্বয়ম্ভূ কোনো ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে!

এই লেখার শিরোনাম “ক”-তে ক্রসফায়ার। কেন? উইকিপিডিয়া খুলে দেখুন: ইংরেজি উইকিপিডিয়া যেখানে ক্রসফায়ারকে প্রথম মহাযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক রণকৌশল হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, সেখানে বাংলা উইকিপিডিয়া বলছে “ক্রসফায়ার হল বন্দুকযুদ্ধের নামে কুখ্যাত অপরাধী বা অপরাধী সন্দেহভাজন বা অপরাধীগণ্য কোনো ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা”। ক্রসফায়ারপ্রশ্নে বাঙ্গালি জাতির মত উইকিপিডিয়া-পরিবারও যেন দ্বিধাগ্রস্ত! এক ভাষার অভিধানে ক্রসফায়ার তার সামরিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে বিরাজিত, অন্যভাষায় দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রযত্নে তার ইম্প্রোভাইজড চেহারা! বিদ্যাজাগতিক বলয়ে তাকে নিয়ে আরো ভাবনাচিন্তার অবকাশ তৈরি হচ্ছে বোঝা যায়। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই বাংলাদেশী তথা নিখিল বঙ্গীয় ক্রসফায়ার সংস্কৃতি ইংরেজি অভিধানেও আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এক মসজিদের ইমামকে গুলি করে হত্যা করার পর আইনপ্রয়োগকারী বাহিনির সদস্যরা যে বিবৃতি দিয়েছে তা কিন্তু আমাদের ক্রসফায়ার-বয়ানের মিলে যায় বেশ। রমরমা রপ্তানির এই কালে ক্রসফায়ার প্রযুক্তিরও নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানচিত্রে আটকে থাকার কোনো কারণ নেই!

আমাদের দেশে এই ব্যবস্থার ভবিষ্যত কি? আগে ক্রসফায়ারের সাথে শুধু র‌্যাবের নামই শোনা যেত, এখন পুলিশের প্রযত্নেও “বন্দুকযুদ্ধ” বা “এনকাউন্টার” ঘটছে বলে জানা যায়। অর্থাৎ ক্রসফায়ার অপারেশনের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটছে। সেটা কোথায় গিয়ে থামবে? ক্রসফায়ার কি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের অস্ত্র হয়ে উঠবে? ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অস্তিত্বের লড়াইকে কি ক্রসফায়ারে মোকাবেলা করা হবে? শিক্ষিত মধ্যবিত্তীয় অ্যাকটিভিজমের গায়ে ক্রসফায়ারের গরম নিঃশ্বাস পড়বে কবে? ক্রসফায়ারে বাপ্পী হত্যার মত “স্ট্যান্ডার্ড এরর” কি বাড়বে না কমবে? ক্রসফায়ারের ফলে সমাজ থেকে সন্ত্রাস কি নির্মূল হয়ে যাবে?

দ্য আনসার ইজ ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29042103 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29042103 2009-11-12 09:02:04
রসু খাঁ, তার খুনসমূহ এবং ক্রসফায়ারচিন্তা
শাহরিক রূপকথা তৈরি হচ্ছে ঢাকার, গত শতকের য়ুরোপ-স্টাইলে। আমরা এবার পেয়ে গেলাম আমাদের "জ্যাক দ্য রিপার" রসু খাঁকে। সেই আমাদের প্রথম "সিরিয়াল কিলার", এতোই হতচকিত আমরা যে, ভুলে চক্করে কোনো কোনো পত্রিকা তাকে অভিহিত করছে "লেডি কিলার" বলে! সত্য বটে, রসু খাঁ ১১ জন মেয়েমানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে। মওকা পেয়েছে পুলিশ। তারা সশব্দে অনুমান করছে, কমপক্ষে ৫০ জনকে হত্যা করে থাকতে পারে এই সিরিয়াল কিলার। অর্থাৎ যেসব হত্যাকাণ্ডের সুরাহা ইতোপূর্বে হয় নি, তার অনেকগুলোর দায় হয়ত নিতে হবে খাঁ সাহেবকে। আরো ভয়ানকভাবে ফোলানো-ফাঁপানো হতে পারে তাকে। আরো আরো রক্তহিম করা কাহিনী শুনতে হতে পারে আমাদের। ভয়ের বিনোদন কিন্তু ব্যাপক!

রসু খাঁর অতিদানবীয়করনের প্রকল্প মিডিয়া নিয়েছে, কাগজগুলো ঘাঁটলে এটা মনেই হয়। এমন এমন কাহিনী শোনাচ্ছে তারা, যেন একজন রশিদের খুনী রসু খাঁ হয়ে ওঠার কার্যকারণ আবিষ্কার করার দায় তাদেরই পড়ে গেছে। রসু-র বিকৃত যৌনরূচির গোড়া সন্ধানে এটাও আবিষ্কার করেছে তারা যে এই খুনী আপন দুই বোনকে বিয়ে পর্যন্ত করেছে! অথচ স্ত্রী-র মৃত্যুর পর শ্যালিকাকে বিয়ে করার একটা প্রায়-বৈধ চল বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কিন্তু আছে। সেসব এখন চলবে না। আমাদের একটা ফ্রাংকেনস্টাইন লাগবে। আমাদের একটা জ্যাক দ্য রিপার লাগবে। আমাদের শহর আমাদের চোখে আরো রহস্যময় হয়ে উঠুক। আমাদের আদর্শিক বিবেচনাবোধের পালে তেজী হাওয়া লাগুক, আমরা থুথু ছিটাব সেইসব খুনীদের মুখে।

আরো হাস্যকর লাগল মনোবিজ্ঞানীদের তোড়জোড়। সমাজে সহিংসতা বাড়ার ফলাফল এই রসু খাঁ, বেশ ঝেড়ে দিলেন তারা। একবারও ভাবলেন না, যে হারে সহিংসতা বেড়েছে তাতে বাংলাদেশের অর্ধেক লোকের রসু খাঁ হয়ে যাওয়ার কথা। আর রসু খাঁ-প্রতি ১১ টি লাশ গুনতে হলে গোটা দক্ষিণ এশিয়া নারীশূন্য হয়ে যাওয়ার কথা! এইটাকেই বোধ হয় ভালগার জেনারালাইজেশন বলে। যাক, পুলিশ, মিডিয়া এবং অপরাধ মনোবিজ্ঞান যুগপৎভাবে রসু খাঁর চরিত্র উদঘাটনের দায়িত্ব নিয়েছে। এতে করে পুলিশের খাতায় অমীমাংসিত লাশগুলোর হিল্লা হবে, পত্রিকার বাড়বে কাটতি, আর অপরাধ মনোবিজ্ঞান পাবে মনোহর কেস স্টাডি।

কেন এই ক্রনিক হত্যার নেশা রসু খাঁকে পেয়ে বসেছিল, এ নিয়ে প্রকল্পনার কি কোনোদিন শেষ হবে? নির্যাতন কিংবা ক্রসফায়ারের ভয়ে রসু তাইই বলবে, যা তাকে নিয়ে বলানো হবে। ফলে, রসু শুধু অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের দায় নেবে না, অপ্রমাণিত কোনো তত্ত্বের দায়ও নিতে পারে। বিনা আয়াসে নিশ্চয়ই পার পাবে না এই মানসিক বিকৃতি, তার পেছনে কোন-না-কোন যুক্তি খাড়া করাতেই হবে!

তবু ভিলেন হিসাবে রসু খাঁ নানা কারণেই আরামের। এই নিম্নবর্গীয় খুনীর দৌড় গার্মেন্টস বালিকা থেকে ভিখারিনী পর্যন্ত। ফলে মিডিয়াভোগী শাহরিক মধ্যবিত্ত কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে কাহিনীটা উপভোগ করতে পারছে। ক্ষমতাবানের জানমাল রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে কয়েদ থাকার সুবাদে রসু আরো উপাদেয় হয়ে উঠেছে, সন্দেহ নাই। অজানা আতংকে কেউ শিউরে উঠছে না এখন। ফলে আদর্শের চাপ বাড়ছে। রসুর গডফাদার নাই, রাজনীতিও নাই। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনাও শূন্যের কোঠায়। এত এত খুন জড়িত থাকার পরেও এমন নিরাপদ বিনোদন!

রসুর গলা যতটুকু শোনা গেছে, তাতে তার নিজেকে রাজনীতিকরনের চেষ্টাটা চিন্তার খোরাক জোগায়। "ক্রসফায়ার"এ মরতে চায় না সে। বিচারে তার ফাঁসি হবে, একথা নিশ্চিত জানার পরেও। কর্নেল ওয়েস্ট যেমন বলেন, মানুষের আইডেন্টিটি তৈরি হয় তার প্রত্যাশা এবং মৃত্যুভাবনা দিয়ে। রসুর এহেন মৃত্যুভাবনা তার আইডেন্টিটি তৈরি করে বৈকি। এরশাদ শিকদারের মৃত্যুভাবনাটির কথাও মনে হয় এই প্রেক্ষিতে। এমন ক্রুশিয়াল মুহূর্তগুলোতে তারা তাদের পরিচয়সংকটের সুরাহা করতে চাইল, ভেবে অবাক লাগে। এরশাদ শিকদার যেখানে জীবনের অনিত্যতার ব্যাপারে একটা দার্শনিক অবস্থান নিল, রসু সেখানে অনামা লাশ এবং বিচারবিহীন মৃত্যুকে নিজের নারকীয় কীর্তির চেয়ে আরো নারকীয় হিসেবে দেখল।

সেই অর্থে, রসু কি বলতে চাইল যে, রসু খাঁ নয় বরং ক্রসফায়ারই আমাদের সবচে নারকীয় সিরিয়াল কিলার? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29025415 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29025415 2009-10-14 00:19:02
রিকশাঅলার শ্রেণীসতর্কতা ও নৈতিক অধিগম্যতা: মিউজিক ভিডিওর রাজনীতি
মমতাজের এই গান:


ওরে ও রিকশাঅলা!

এই অভিসার কার? ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে আমাদের রিকশাঅলাটি অধোবদন, কেবল দায়িত্ব পালন করতেই এসেছে ধনীর কলেজ-পড়ুয়া দুলালীর বাড়ির গেটে। ধনীর দুলালী বরং প্রো-অ্যাকটিভ অনেক। রিকশাঅলাকে দেখেই প্রেম জেগেছে তার। সে প্রেমের ক্ষেত্রে শ্রেণীবিভেদ মানে না। রিকশাঅলা কিন্তু মানে। সে লোকের মন্দ কথার প্রেক্ষিতে দমে যেতে চায়। আবার আমাদের রিকশাঅলা নিজেও কলেজ পর্যন্ত পড়েছে, এর অর্থ অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভেদকে অস্বীকার করা গেলেও বিদ্যাবুদ্ধির ভেদকে অস্বীকার করা যাবে না। নিরক্ষর রিকশাঅলার সাথে কলেজগামী তরুণীর প্রেমকে স্বীকার করা যাবে না। পুরো ভিডিওতে রিকশাঅলাকে রোমান্টিক কোনো ভঙ্গিতে তার প্রেমে-পড়া তরুণীটির দিকে তাকাতে দেখা যায় না, তার চোখে যা দেখা যায় তা হল এক ধরনের বিবেকী অভিব্যক্তি। ধনীর দুলালীর খেয়ালখুশির স্রোতে খুব সতর্ক হয়ে নামছে সে। কিংবা নামছে না। কেবল নামতে দিচ্ছে। "আপনি" থেকে "তুমি"তে আসে নি সে একবারের জন্যও, অন্যদিকে তরুণী অবলীলায় তাকে "তুমি" সম্বোধন করে গেছে।

আমাদের রিকশাঅলা কিন্তু নগর গরিবের ভাবের আইকন হয়ে উঠতে চায়। ফ্যাশনেবল কুর্তা আর রঙ্গিন লুঙ্গি পরে রিকশা চালাচ্ছে এক ইন্টারমিডিয়েট-পড়া তরুণ। তার শ্রেণী-সতর্কতা এবং নৈতিক অধিগম্যতা তাকে নগরবাসী মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিতে এক ধরনের বৈধতা দেয়। আদর্শ নগর গরিব! তার কি উল্লম্ফনের বাসনা নাই? সে কি এই বিদ্যমান শ্রেণীব্যবস্থায় কোনোরকম আপসেট ঘটাবার সম্ভাবনা রাখে?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29024261 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/29024261 2009-10-12 00:20:36
সোয়াইন ফ্লু-এর করপোরেট জুজুবুড়ি সোয়াইন ফ্লু-এর জুজুবুড়ি অবশেষে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে লাশ গুনতে শুরু করেছে! এ পর্যন্ত গোটা চব্বিশজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও ১২০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে এটা কোনো সংখ্যাই নয়। সোয়াইন ফ্লু দিয়ে গোটা ভারতে আক্রান্ত হয়েছে হাজার খানেকের বেশি নয়। এরই মধ্যে পুনা বন্দরের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে, মুম্বাইয়ের স্কুলগুলোতে ছুটি চলছে, অন্য অনেক শহরে স্কুল-কলেজ-শপিংমল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, এ বছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব বাতিল ঘোষণা করেছে মুম্বাই কর্তৃপক্ষ, দিল্লির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় “সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং” অর্থাৎ একে অপরের থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে, গোয়া-র রাজ্য সরকার তার নাগরিকদের অত্যাবশ্যক কারণ ছাড়া অন্যান্য রাজ্যে ভ্রমণ না-করার পরামর্শ দিয়েছে, তামিল নাড়– এবং রাজস্থানের বাসিন্দাদের মহারাষ্ট্র থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় সরকারগুলো। সোয়াইন জুজুবুড়ির আতঙ্কে এ বছর ঘরে খিল লাগিয়েই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করেছে ভারতবাসী।
এ হেন আতঙ্কের উৎস কি? যে দেশে প্রতিবছর মৌসুমী জ্বরজারিতে ৫০,০০০ মানুষের প্রাণহানি হয়, যক্ষ্মাসহ অন্যান্য পরিচিত অসুখবিসুখে যেখানে প্রতিদিন গড়ে একহাজার মানুষের মৃত্যু হয়, সেই ভারত কেন সোয়াইন ফ্লু নামক জুজুবুড়ির আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করলো?
গার্ডিয়ানের সাইটে কপিল কমিরেড্ডি চমৎকার লিখেছেন এ নিয়ে। তাঁর মতে, এই মহামারী যতটা না সোয়াইন ফ্লু নামক রোগের, তারচে অনেক বেশি সোয়াইন ফ্লু-আতঙ্কের। ফলত প্রাণনাশের চেয়ে দ্রুতগতিতে ঘটছে বুদ্ধিনাশ। আর অত্যন্ত দায়িত্বহীনভাবে এই বুদ্ধিবিনাশী আতঙ্কের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে সংবাদমাধ্যমগুলো। এই ডামাডোল থেকে পুরোপুরি ফায়দা নিচ্ছে রকে (Roche) নামক সুইটজারল্যান্ড-ভিত্তিক বহুজাতিক অষুধ কোম্পানি। সোয়াইন ফ্লু-র অষুধ “টেমিফ্লু” ক্যাপসুল বিক্রি করে গত জুলাই মাসেই তারা এক বিলিয়ন ডলার কামিয়েছে বলে জানা যায়। ভারত সরকার কিনেছে এক মিলিয়নের মত ক্যাপসুল, বাংলাদেশ সরকারের স্টকে আছে ২৪,৯০,০০০ এর মত, বিডিনিউজ-এর সংবাদ অনুযায়ী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত সোয়াইন ফ্লু বহনকারী ভাইরাস এইচ-ওয়ান এন-ওয়ান দিয়ে বিশ্বের ১৬১ টি দেশে মোট ১,৩৪,৫০৩ লোকের আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে এবং এদের মধ্যে মারা গেছে মাত্র ৮৬১ জন। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার, উপেক্ষার নয়। তারপরও পরিসংখ্যান থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। সঙ্গত কারণেই সংস্থাটির একজন কর্তাব্যক্তি ড. জয় নারায়ন মনে করেন যে, রোগের বাস্তবতা আর রোগবিষয়ক আতঙ্কের বাস্তবতা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সোয়াইন ফ্লু নামক রোগ যা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই কোনোরকম অষুধপত্র ছাড়া ভালো হয়ে যায়, এতে যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগেরই অন্য অনেক রোগশোক ছিল বলে জানা গেছে, সেটা নিয়ে এই আতঙ্কের বিস্তারকে করপোরেট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সন্দেহ করার সঙ্গত কারণ আছে। জেনেরিক মালিকানা থাকায় রশে (Roche) কোম্পানি টেমিফ্লু বিক্রির ব্যবসা একচেটিয়া করছে, যদিও ভারতের অষুধ কোম্পানিগুলো এর বখরা পাবার জন্য সরকারকে লাইসেন্স কিনতে চাপ দিচ্ছে । আশা করা যায় বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকবে না। কপিল অনুমান করছেন যে, অষুধ বানাতে বানাতে বা কিনে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই দেখা যাবে এই ভাইরাসের প্রতিরোধ তৈরি হয়ে গেছে মানব শরীরে। অথবা আমাদের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এর মহাপরিচালক মাহমুদুর রহমান যেমন বলছেন: হয়তো সোয়াইন, বার্ড এবং হিউম্যান ফ্লু-র ভাইরাসের সংমিশ্রণে আরেকটা নতুন ধরনের ভাইরাসের আলামত হাজির হবে সমাজে। ফায়দা নেবে অন্য কোনো রকে কোম্পানি!

এরই মধ্যে বাংলাদেশে ৩৭ জনের সোয়াইন ফ্লু সংক্রমণের খবর জানা গেছে। এদের প্রায় সবাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সরকার নৌ, বিমান এবং স্থলবন্দরগুলোতে স্বাস্থ্যপরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আলাদা করে সোয়াইন ফ্লু রোগীদের জন্য বহির্বিভাগ খোলার আদেশ দেয়া হয়েছে। জুজুবুড়ি আসবে, তাই মঞ্চ তৈরি।

দক্ষিণ এশিয়ায় সোয়াইন ফ্লু-র বিস্তারের রাজনীতিটা একটু অন্যরকম। এক ভারতে যত লোকের বাস, দুই আমেরিকা মহাদেশেও এত লোক থাকে না। গোটা দুনিয়ার পাঁচভাগের একভাগ লোক থাকে দক্ষিণ এশিয়ায়, আয়তনে যেটা যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক। এর প্রায় ৪০ কোটি মানুষের কাছে সভ্যতার কোনো সেবা-ই পৌঁছায় না। এই সংখ্যাটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বমোট জনসংখ্যার অর্ধেক কিন্তু! সোয়াইন ফ্লু-র জুজুবুড়ি এবার এল এমন এক অঞ্চলে যেখানে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ এখনো “দলিত” বা স্পর্শযোগ্য নয় (আনটাচেবল)। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে চলা যেখানে একটা ঐতিহাসিক প্রপঞ্চ, যার বিরূদ্ধে সমাজের শুভশক্তি ক্রমাগত লড়াই করে একটা সহনীয় জায়গায় পৌঁছাতে চাইছে সেখানে সোয়াইন ফ্লু সমাজে আবার ছুৎমার্গীয়পনাকেই আমন্ত্রণ জানাবে। তবে, পরিহাস হল, যেসব দেশে এখনো ম্যালেরিয়া কিংবা যক্ষ্মার মত প্রায়-পৌরাণিক রোগব্যাধিতে হাজার হাজার গরিব মানুষ প্রতিবছর মারা যায়, সমাজের ক্ষুদ্র একটা অংশ যেখানে এক ধরনের শ্রেণী-বেষ্টনীর মাঝে নিজেদের সংক্রমণহীনতা নিশ্চিত করে, সেখানে সোয়াইন ফ্লু কিন্তু প্রাথমিকভাবে গরিবের রোগ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে আসে নি। এসেছে বিশ্বায়ন এবং মবিলিটির উপকারভোগীদের রোগ হয়ে। বেশিরভাগ রোগীদেরই আমরা পাচ্ছি এয়ারপোর্টে। স্কুল-কলেজ-সিনেমা হল-শপিংমল বন্ধ করে ঘরে খিল লাগিয়ে কিংবা সার্জারি মাস্ক পরে টেমিফ্লু সেবন করে আবার বিশ্বায়নের এই উপকারভোগীরা হয়ত এই ভাইরাসের নাগাল থেকে বাইরে থাকতে পারবে। কিন্তু রাত পোহালেই যাদের রাস্তায় নামতে হয় তাদের কী হবে? হাঁক না দিলে যে হকারের ব্যবসা মাটি, সে কি সার্জারি মাস্ক পরে থাকবে? ঘরে খিল লাগিয়ে পেটের খিল কিভাবে খুলবে রিকশাঅলা?

বিশ্বায়নের উপকারভোগীরা এই রোগের বাহক হলেও শেষমেষ তার ধারক কিন্তু হবে গরিব “সোয়াইন”রাই। তাদের বর্ষপুরাতন রোগের তালিকায় আরেকটা নাম যুক্ত হবে মাত্র। করপোরেটের ব্যবসাও চলমান থাকবে। গরিব খদ্দের ছাড়া বহুজাতিক করপোরেটের ব্যবসা তো অচল! সবই ঠিক আছে। পরিকল্পনামাফিক ঘটছে। কিন্তু আজ সকালে আমার আট বছর বয়সী সন্তান যখন ভয়ে নীল হয়ে টেলিফোনে আমাকে বলছে সোয়াইন ফ্লু হলে সে মারা যাবে কিনা, আমি তার মধ্যে এই অহেতু এবং অন্যায্য আতঙ্কের বিস্তার ঘটানোর জন্য কাকে দায়ী করবো? সোয়াইন ফ্লু-কে, নাকি এর বহনকারী ভাইরাস এইচ-ওয়ান এন-ওয়ানকে, নাকি এই ভাইরাসের আতঙ্কবাহী হুজুগে সংবাদমাধ্যমগুলোকে?


১৭ আগষ্ট ২০০৯ দৈনিক প্রথম আলো
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28998121 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28998121 2009-08-22 21:10:13
বিলবোর্ড-নিবাসিনী

চিরকাল দূরে থেকে-থেকে তুমি সুদূরের প্রণয়ভাগী হয়ে গেছো
চিত্রার্পিতা, বিলবোর্ড-নিবাসিনী, তোমার গমনোদ্যত পা
মুড়িয়ে দেয়ার জন্য আমি জমাচ্ছি আমার সকল অপরিণামদর্শিতা
সর্বব্যাপী প্রেমোক্র্যাসির ধোঁয়ায় তোমার যতোটুকু শ্বাসকষ্ট
আমি তার ততোধিক নীল নেবুলাইজার
তুমি আসছো মোরগের বিষ্ঠাভরা জংলা পার হয়ে
মিডিয়াগাছের ছায়াফাঁদ বাঁচিয়ে
আমার ডাকবাক্সের ধূলায়, আমার নিখিল বিজ্ঞাপনহীনতায়!

আমি তো তোমার অপলকময়তা দেখে-দেখে
কাঁথামুড়ি দিয়ে পাশ ফিরতাম
নয়তো তোমার গল্পঘরের বারান্দায় বসে দেখতাম
নৈশকোচগুলো গ্যারেজে ফিরছে একে-একে
ঠান্ডা চা আর পোঁতানো পপকর্ন গিলছে টহল পুলিশ --
একটা সিএনজি স্কুটার আরেকটাকে পেছনে-বেঁধে
চলে যাচ্ছে দূরে, কোনো সমকামী অভীপ্সার দিকে
এতসব দেখে-দেখে, তোমার নম্র উপেক্ষার ধ্যানে এ জীবন কাটিয়ে দিতাম
ফুটপাতে, শেষরাত্রির প্রিজনভ্যানে!

তোমার চুলে নিরুত্তাপ স্মরণসভার গন্ধ, যেন তুমি
কখনো মানুষ ছিলে, এখন কুঠুরি, দরজা-জানালা বন্ধ
কলতাবাজার কবরস্থান থেকে পালিয়ে আসা লম্বা-লম্বা সিপাহীদের ছায়া
তোমাকে পাহারা দেয়
তোমার বামচোখের ভেতর একটি ঘুরানো সিঁড়ি
উপরে উঠতে-উঠতে হারিয়ে গিয়েছে মহাশূন্যে
তোমার ডানচোখে অতীতকালের একটি চিৎকার জমে বরফ হয়ে আছে

আমি সেই রাত্রেই কসাইটুলি থেকে কুড়াল চুরি করে আনলাম
দেহপসারিনীদের ছেঁড়াখোঁড়া অভিলাষকে চিরদিনের মত বিদায় জানালাম
তখনো অনেক বাকি ভোর, মফস্বলগামী নিউজপেপার
স্তূপাকার হয়ে আছে জনশূন্য বাস টার্মিনালে
এদের ভাঁজে-ভাঁজে আমি বিছিয়ে দিলাম আমার না-লেখা প্রেমপত্রগুলোকে
একান্নবর্তী ছোট শহরগুলোর আলোবাতাসে ওরা বড় হয়ে উঠবে কোনোদিন!

এসে দেখি, তোমার গল্প থেকে এমন মোহময় সাবানের গন্ধ ছড়াচ্ছে
আর তা তন্ময় হয়ে গিলছে কয়েকটি নির্ঘুম কাক
তুমি কি ওদের সাথেই উড়বে নাকি, বিলবোর্ডবাসিনী!
ওরা কিন্তু সত্যি-সত্যি কাক নয় -- কর্পোরেট মেটাফিজিক্স --
তোমাকে তোমারই স্মৃতির ভেতর কয়েদ করতে এসেছে, তারপর
বাসি মেট্রোপলিটনের পিঁপড়াগুলোকে ছেড়ে দেবে ওরা
তোমার সবুজ শাকসবজির আকাঙ্ক্ষার ভেতর

তবু, কোনোদিন ভোরবেলা জেগে আমি অবাক দেখবো শাদা বিলবোর্ড
অচেনা রূপসী, নতুন কমোডিটি -- তোমার শ্রান্ত ডানাজোড়া আর খুঁজেও পাবো না
যাদের আমি চোখের জলে এতকাল লুকিয়ে রেখেছিলাম!


সিঙ্গাপুর ১২ জুন ২০০৯
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28971418 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28971418 2009-06-29 21:36:40
"বিদ্যাকূট"-এ বর্গী হামলা: কি করবো? আমার ব্যক্তিগত ব্লগস্পট বিদ্যাকূট মারাত্মকভাবে বর্গী-আক্রান্ত। চতুর সাইবারবর্গী তার নিপুণ কোদাল দিয়ে বিদ্যাকূটের আল কেটে দিয়েছে! ফলে নির্দিষ্ট ঐ ইউআরএল-এ গেলে আমি আমার ব্লগ দেখতে পাই, কিন্তু যেখানে সাইন-ইন করে প্রবেশ করতে হয়, সেই জায়গাটি দেখতে পাই না। ফলে এই ব্লগ মোটামুটি ব্যক্তিমালিকানাহীন এক বেওয়ারিশ ব্লগে পরিণত হয়েছে।

কিভাবে আমি আমার ব্লগ ফেরত পাবো?

বিজ্ঞ ওঝাবৃন্দের কাছে এর বিহিত চাই।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28951926 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28951926 2009-05-17 16:44:33
বিদায় বনশ্রী, স্বাগত বৈশাখ!!
পুরো একটা বছর একরকম নিঃসঙ্গভাবেই বনশ্রীতে কাটিয়ে দিলাম। যে বন্ধুদের প্ররোচনায় বনশ্রীতে আসা, তারা সব অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেলেন! কালেভদ্রে যতটুকু দেখা-মোলাকাত হয়েছে, হয় ব্লগে, না হয় বনশ্রীর বাইরে। মাঝেমধ্যে রিকশায় অমি রহমান পিয়ালকে দেখি। ভাবি, ডেকে দেখি, থামিয়ে চা পানের আবদার করি কোনো রেস্তোরাঁয়। কিন্তু ততক্ষণে সামহোয়্যারইন এর চারপর্ব পর্যন্ত লেখা হয়ে গেছে, নদীকুলের শ্মশান দেখা যাইতেছে, পিয়াল যদি ভাবেন, থামিয়া লাভ কি, পৃথিবীতে কে কাহার?

এরপর যখন ঢাকায় আসা হবে, তখন হয়তো আর বনশ্রী থাকা হবে না। বনশ্রী নিয়ে তেমন কোনো স্মৃতি জমে উঠল কিনা বুঝতে পারছি না এখনো। বনশ্রী বললে ঠা ঠা রৌদ্রে ধুলা উড়ানো রাস্তার কথাই হয়ত মনে হবে। নিকুঞ্জ বলতে যেমন এখন বুঝি ভাঙ্গা, বৃষ্টির পানি সরে-না-যাওয়া এবড়োথ্যাবড়ো রাস্তা!

নতুন বছর আমার জন্য কি নিয়ে আসছে এর বিন্দুবিসর্গও আঁচ করতে পারি না আজকাল। জীবনের গতিধারা অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, এটুকু বুঝি খালি। যেসব বন্ধুরা তাদের মাঝবয়সের মোরগের মত ব্যস্ত জীবনে বাকবাকুম করছে, তাদের পাশে আমার এই ছোট্ট ভঙুর শিক্ষানবিশ জীবন কতক্ষণই ধরে রাখা যায়! "সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে, আমি একা, হতেছি আলাদা!"

বিদায় বনশ্রী! স্বাগত বৈশাখ, তবুও!!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28937711 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28937711 2009-04-13 22:02:10
ঝিঁঝিট ও এর ইংরেজি অনুবাদ একদিন সত্যি তোমাকে বিদ্যাকুট বেড়াতে নিয়ে যাবো
চোখ কপালে তুলে দেবো অচেনা অনেক গাছের নাম করে
সিগারেট একদম খাবো না, জোড়া ঘড়িয়াল হয়ে ভেসে
ছুটোছুটি বাধিয়ে দেবো জেলেপাড়ায়, নিশ্চুপ হয়ে শুনবো
কেঁদোবাঘের লেজে আগুন দিল কারা, শুনবো আর হাসবো
ভরসন্ধ্যায় যতরাজ্যির ভুতের গল্প বানিয়ে বানিয়ে
তোমার বাহাদুরির বারোটা বাজিয়ে দেবো

চৌচালার উপর খুব ধীরে চেপে বসবে রাত
তোমাকেও হতে হবে নম্র শান্ত নিরুপায়, আমার-ঘোড়া

কী যে ভালো লাগবে আমার, দূরে, ভাঙ্গা ব্রীজে
চাঁদপুরগামী নৈশ লোকালের প্ররোচনা
কী যে আনন্দ হবে, কখনোই তুমি বুঝবে না
যা বলেছি মিথ্যে ছিল কি না



Jhijhit

Translation : Zifran Khaled


And, one day, I will take you there, to Bidyakut,
I will flood your senses with wonder by naming all
these unnamed trees, I promise
a single smoke of cigarette shall not leave my body,
and we, the floating twin alligators,
will draw a flowing mayhem in the fishermen’s homes,
in that solitude, in that silence,
we will listen to the parable of who has set fire on the
tail of the crying scared tiger,
we shall listen
and laugh
and listen again
and you too will be listening throughout
the grave evening to all my made-up horror stories
and be terrified beyond belief

then, languidly, the night will come and sit on the village rooftop
My mare, you must be calm and helplessly timid too

And imagine my delight when I will hear,
from afar,
the treacherous sound of the nightly Chandpur local
on that old broken bridge

Imagine my delight when you will never know
whether it has all been a lie ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28932451 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28932451 2009-04-02 00:56:56
মাতৃপুরাণ আদিপর্ব: পাহাড়ে

পাহাড়ের গায়ে লেগে-থাকা শৈবালেরও থাকে পাহাড়কে গিলে খাবার বাসনা। তাদের কোনো একজনের শৈশবের জুতাজোড়ার ভেতর আমার জন্ম। উল্লসিত ঊষাকাল থেকে প্রজ্ঞাশায়িত প্রদোষ অব্দি আমার আয়ুষ্কাল। এর মধ্যেই সকল রহস্য আমি জেনেছি, শুধু সেই বৃষ্টিকে ছাড়া যা আমার পায়ের পাতায় জমে বাতাসের সাহচর্যে উপত্যকায় ফুল ফোটায়।

কেবল স্বপ্নের সাথেই আমি বিবাহিত, পূর্বপার্শ্বের ‘যন্ত্রণা’ নামে যে হ্রদখানি আছে, তার কন্যা সে। আমাকে সে শিখিয়েছিল কিভাবে মাইলের পর মাইল সর্পিল ধূলিপথ পার হয়ে শান্তশিষ্ট একটি সন্ধ্যার হৃদয়ে প্রবেশ করতে হয়। আমাদের প্রথম সন্তান ‘মৃত্যু’।

মৃত্যুর সঙ্গী ছিল না, তাই ওকে জুটিয়ে দেয়া হল ‘ঈর্ষা’ নাম্নী পাহাড়ি ছাগলের সাথে। দুজনেই তাদের পিতামাতার সঙ্গমদৃশ্য লুকিয়ে দেখত। কিন্তু ঈর্ষা মূলত ছিল নিজের ছায়ারই বাগদত্তা, ফলে ওর হাতে অবিশ্বাসের যে সবুজ অঙ্গুরী, সেটা সে রেখে দিল পিতাপুত্র থেকে সমান দূরত্বে। হায় প্রদোষ, আমি কি জানতাম!

যে পাহাড়চূড়ায় ওরা আমাকে প্রোথিত করল, অনেক অনেকদিন পরে তারই কোনো খাঁজে স্বপ্ন আমার মা-কে প্রসব করেছিল।

সমতল পর্ব
মাতৃদেবীর সাথে মৃত্যুর সখ্যতা দীর্ঘ দীর্ঘ সময়ের। তাদের প্রথম সন্তান ‘প্রযুক্তি’ -- বিকলাঙ্গ এই শিশুটিকে ওরা নিক্ষেপ করে অদৃষ্ট নামক অন্ধগহ্বরে। ফেরার পথে তাড়া করে অপরাধবোধের বাদামি ষাঁড়টি। ফলে পাহাড় থেকে পালিয়ে সমতলে। প্রথম কুটির রচনা। পূনর্জন্ম হয় আমার, নাম রাখা হয় ‘অনিদ্রা’।

সুতরাং জন্ম থেকেই আমি হাসপাতালের মত নিরব আর দর্শনার্থীর মত উদ্বিগ্ন একটি দ্বৈততা। বেড়ে ওঠেছি পরিত্যক্ত রেল স্টেশনে, তালি বাজিয়েছি প্রেক্ষাগৃহের দৈনিক উল্লাসে, শুশুকের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সাঁতরে এসেছি কুমীরে-ভরা নদী। আমি কি জানতাম প্রতিটি রোমাঞ্চযাত্রার শেষে অবধারিত অশ্রুধারায় প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে আমার ফেলে-আসা পথরেখা!

তবু ভালো লাগত -- আখাউড়াগামী ট্রেন যখন স্লিপারগুলোর ঘুম ভাঙ্গাতে ভাঙ্গাতে যেত। আমার ছিল মৌন একখানা পাটখড়ির গাণ্ডীব, আর ধ্যানী একজোড়া ঘুড়ি। সকালসন্ধ্যা মৌমাছির চেয়েও ব্যস্ত, কিন্তু জিরাফের থেকেও নিরব। পথে বেরুত নিদ্রামাসি, আমাকে খুঁজে না-পেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত গোটা মধ্যাহ্নটিকেই।



ধাঁধা এবং প্রবাদ: যুদ্ধপর্ব
ধাঁধা ওর কুমারী মায়ের গর্ভপাতের ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়া সন্তান। প্রবাদের সাথেও সখ্যতা হয়নি, না-হওয়াটাই তখন প্রথা। সেই আমার প্রথম শরসন্ধান, অশ্বমেধের শুরু। তারপর রক্তক্ষয়ী কত যুদ্ধ, যুদ্ধবন্দী হয়ে এল ‘কল্পনা’ – ঘুমন্ত স্তনস্পর্শের শিহরণ থেকে ওর জন্ম। আমার ক্রোধের ওপর পোশাক খুলে রাখল সে, আমার দিগ্বিজয়ের বাসনাকে চেপে ধরল ঠোঁট দিয়ে। আমারও গাণ্ডীব নমিত হয়ে এল, পৃথিবীর মহান পরাজিত সেনাপতিদের মত।

আমি আর কল্পনা, ঘর বাঁধলাম রকমারি পার্বণে – কৃষিসভ্যতার শিরার ভিতর দিয়ে বিন্দু বিন্দু স্যালাইনের মত ঝরছিল ওরা। হাওয়া বইছিল পূব থেকে পশ্চিমে, কথা বলা শিখছিল মেঘনা, দিনে-দিনে আরো অপ্রতিভ হয়ে যাচ্ছিল ব্রহ্মপুত্র। উত্তর থেকে ঘাটে এসে ভিড়ছিল ধানবোঝাই নৌকা, ফিরে যাচ্ছিল আখের গুড়ের গন্ধে মাতাল হয়ে। তবুও বাণিজ্য হয় নি প্রবাদের সাথে, না-হওয়াটাই তখন প্রথা।

প্রথার ঘোড়াটি ছিল কৃষ্ণবর্ণের, আর হাতের চাবুকটিতে ছিল মৃত দাড়াশের হামবড়া ভাব। পূর্বপুরুষদের দর্পিত পোর্ট্রেটগুলোর মধ্যে বসে আলবোলা টানত সে। শেষবার ওকে যারা ঘরের বার করতে পেরেছে, আমার পিতা সেই অবশিষ্ট লাঠিয়ালদের একজন। আজ অনেকদিন পর যখন ওর দরজায় নিজের মাথা রক্তাক্ত করছি -- মর্মর উঠল বাঁশবনে। নির্বাসনপর্ব

মাতৃহাসিখানি আজো কাঠের পুরনো দোতলা বাড়ির মত। তার ঔজ্জ্বল্যের ছায়া ম্লান হয়ে পড়েছে আমার মুখমণ্ডলে। মৃত্যু উদ্ভিদ হয়ে জন্মেছে ওর নিজেরই উঠানে, শুধু বিচিত্র ফলের সম্ভারে সে আমার মাতৃমুখটিকে বন্দী করে রেখেছে। আমার পা জড়িয়ে আছে ওর শেকড়ে, সেই আর্তি আমি ছড়িয়ে দিচ্ছি ওরই ডালপালায়। ধাঁধাবিজিত প্রবাদে-বন্দী জীবন -- একবার মাত্র জীর্ণ কোনো কবরের উপর দিয়ে খুব নিচু হয়ে উড়ে যেতে পেরেছি। সেই প্রশান্তিটুকুই ফুটে আছে ঘাসে ঘাসে, ঝোপের অযত্নে, ঝোপের লাবণ্যে।

১৯৯৩]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28931254 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28931254 2009-03-30 14:05:08
রণজিৎ দাশ এবং সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদিত "বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা" নিয়ে আপত্তির কারণ কি? ফেসবুক নোটে এবং কবিতাকথা গুগুলগ্রুপে কিছু "বিস্ময়" উত্থাপন করেছেন। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ধরে আলোচনা হয়েছে খুব কমই, বরং নানান সংক্ষুব্ধজনকে দেখা গেল সংকলনের অন্যতম সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে এবং একে ফরহাদ মজহারীয় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখিয়ে রঙ বেরঙের তত্ত্ব প্রণয়ন করতে।

মুজিব মেহদী এবং পরবর্তীতে কোনো কোনো মন্তব্যকারীকে দেখা গেল উক্ত সংকলনে মিসিং পোয়েটদের তালিকা প্রণয়ন করছেন। সেখানে এক তালিকার সাথে অন্য তালিকার মিল খুব অল্পই। কোনো কোনো তালিকায় মিসিং পোয়েট হিসেবে আমার নামও এসেছে দেখা গেল। একেক জনের একেকরকম তালিকার যে বাহার তাতে মনে হল, সাজ্জাদ শরিফ কাজটা না করে অন্য যে কেউ করলেও একইরকম বিতর্ক উঠতে পারতো এবং এমনকি এ বিষয়ে একখানা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বয়ন করলেও কাউকে না কাউকে মিস করা অসম্ভব ছিল না।

ব্যক্তিগতভাবে এরকম একটি সংকলনে আমার থাকা না-থাকা নিয়ে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। বলাই হয়েছে এটি বাংলাদেশের "শ্রেষ্ঠ কবিতা", ফলে সংকলনের সম্পাদকের ব্যক্তিগত সাহিত্যরূচি অনুযায়ী এর সম্পাদনা হবে তা বলাই বাহুল্য। কেউ কোনো সংকলনে আমাকে গ্রহণ না করলে আমি তাঁর সাহিত্যরূচি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, বিষণ্ণ হতে পারি, কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে পারি, কিংবা আরো ভাল কবিতা লেখার নিয়ত করতে পারি, কিন্তু আমার কবিতা নেই বলে তাঁর ওপর মারখাপ্পা হতে পারি না। কারণ দর্শাও ইস্যু করতে পারি না। কারণ সাহিত্যবিচারের কোনো সার্বজনীন মানদণ্ড নেই।

সাজ্জাদ শরিফ-এর সংকলনকে ধরে মুজিব মেহদী যেসব প্রশ্ন তুলেছেন তার জবাবও এই দৃষ্টিকোণ থেকে খোঁজা সম্ভব। সারাজীবন ২২ টি কবিতা লিখে এর ৯টিই যদি সাজ্জাদ শরিফ তাঁর সম্পাদিত সংকলনে রাখেন তাতে আপত্তির কি আছে? তাঁর ২২টি কবিতার মধ্যে ৯ টিই "শ্রেষ্ঠ কবিতা" এটা তিনি মনে করতেই পারেন। আমি সারাজীবনে কবিতা লিখেছি ৪০টার মত। এরকম কোনো সংকলনে আমি আমার ৩০ টি কবিতাই দেখতে চাইতে পারি! আমার রূচি বলে কথা। এখানে কোন্ মানদণ্ডে মুজিব একে "রূচিবিগর্হিত" বলছেন তা আমার বোধগম্য নয়।
একইভাবে আবুল হাসানের চেয়ে ফরহাদ মজহারের কবিতা বেশি আসারও যুক্তি পেয়ে যাওয়া সম্ভব। আপনি আবুল হাসানকে বড় ভাবলে তার বিশটা কবিতা রাখুন, আমি ফরহাদের চল্লিশটা রাখব যেহেতু আমি তাঁকে বড় মনে করি। কোন্ মানদণ্ডে আপনি আমাকে বা আমি আপনাকে ঠেকাবো?

মুজিব মেহদীর এই নোটের সূত্র ধরে কেউ কেউ সাজ্জাদ শরিফকে যে ভাষায় আক্রমণ করছেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক, কাম্য তো নয়ই। আর সবচে নিদারুণ যে দশাটি দেখা যাচ্ছে, তাহল এসব উত্তপ্ত মন্তব্যবাণের বেশিরভাগই যুক্তিহীন, ফলত লক্ষ্যভ্রষ্ট। এসব বিক্ষোভের কারণ হয়ত পূর্ববিরাগ, হয়ত সংকলনটিই। সংকলনে অসঙ্গতির যে ডিসপ্লে মুজিব বা অন্যরা করেছেন তার কিছু কিছু সঠিক, কিন্তু এই পারসেপশনকে যুক্তির আকার না দিলে সেটা শিশুর বিরাগ হতে বাধ্য। সেটাই হয়েছে, গালাগালির বন্যায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে "বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা"কে।

অদ্ভূত বিষয় হল, বিরাগ এত তীব্র যে কেউই বোধ হয় সংকলনটি অভিনিবেশ নিয়ে দেখেন নি। এটা বরং কাম্য ছিল। মিসিং পোয়েটকুলের কবিতার উৎকর্ষ দিয়ে, বা সাজ্জাদ শরিফের সাহিত্যিক রাজনীতি দিয়ে বা ফরহাদ মজহারীয় ষড়যন্ত্রের সাইন্স ফিকশন দিয়ে "বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা"র বিরূদ্ধে আপত্তিগুলো চিহ্নিত করা যাবে না। আপনার আপত্তির জায়গা সনাক্ত করতে চাইলে সংকলনটিকেই দেখুন। ফেয়ার প্লে!

এই সংকলনটির সবচে বড় সমস্যা হল, এটি একইসঙ্গে দুইটা ভিন্ন নির্বাচনকৌশলকে অবলম্বন করেছে। সেলফ কনট্রাডিক্টরি। লক্ষ্য করে দেখুন, আশি দশকের আগ পর্যন্ত সম্পাদকীয় তরফে কবি নির্বাচনের ভূমিকা লিবারাল এবং ইনক্লুসিভ। কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা খুবই কনজারভেটিভ এবং এক্সক্লুসিভ। যে সংকলনটি আশি দশকের আগ পর্যন্ত মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কবি খুঁজে খুঁজে বার করে পরিবেশন করছে, সেই আবার আশি-নব্বইয়ের ক্ষেত্রে কানামাছি ভোঁ ভোঁ যারে পাবি তারে ছোঁ খেলছে!

কিন্তু ভূমিকা কি বলছে? সেখানে সাজ্জাদ শরিফ বলছেন আশিপূর্ব কবিতা "ইতিহাসের দায় মিটিয়েছে সত্য, কিন্তু কবিতার যথাযথ দায় মেটাতে পারেনি। আভিধানিক অর্থ থেকে শব্দের যে বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে কবিতার সূচনা ঘটে, কবিতাকে এবার তার সেই ভাষা-সংবেদনার কাছে নিয়ে যাওয়ার তাড়নায় এ সময়ের কবিরা ষড়যন্ত্রময়" (পৃষ্ঠা-৯)। এখানেই সাজ্জাদ শরিফের সম্পাদনানীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়: যেখানে "রাজনৈতিক বাস্তবতার" কবিতার ক্ষেত্রে এই সংকলন এত লিবারাল এবং ইনক্লুসিভ হতে পারল, সেখানে "কবিতার যথাযথ দায়" মেটাবার কালে এসে এই একই সংকলন এই এক্সক্লুসিভিটির কৌশল অবলম্বন করল কেন? এই প্রশ্নটির ফয়সালা ভূমিকার মধ্যেই হওয়া উচিৎ ছিল।

প‌্রশ্নটি রণজিৎ দাশের উপরও বর্তায়। পশ্চিমবঙ্গীয় কবি তিনি, বাংলাদেশের কবিতার খুঁটিনাটি না জেনেই স্রেফ ভালবাসার টানে সংকলন করতে নেমে গেলেন। তাঁর অজ্ঞতাকে মাফ করে দেয়া যায়। কিন্তু ভোঁতাপনাকে নয়। যেখানে সাজ্জাদ শরিফ-এর ভূমিকা বলছে আশি থেকে বাংলাদেশের কবিতা "কবিতার যথাযথ দায়" মেটাতে চেষ্টা করছে, সেখানেই তাঁর প্রশ্নমুখর হওয়া উচিৎ ছিল। কেন নতুন কবিতার এই বাঁকবদল এই সংকলনটি আরো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবে না, এটি তাঁর নিজের প্রশ্ন হওয়া উচিৎ ছিল। তাহলে হয়ত তিনি যে অজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশের কবিতাকে জানতে এসেছিলেন, সেই একই অজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যেতেন না!

আরেকটা সাধারণ পর্যবেক্ষণ শেয়ার না করলেই নয়। প্রায় সবসময়েই দেখা যায়, কবিতার অ্যানথলজিগুলো সমসাময়িককালের ক্ষেত্রে লিবারাল ভূমিকা নেয়, এবং পুরনোকালের ক্ষেত্রে সিলেক্টিভ (অর্থাৎ বর্তমান সংকলনের স্ট্র্যাটেজির ঠিক বিপরীত)। এর কারণ হল, পুরনো দিনের সাহিত্য অনেক আলাপ-আলোচনায় ইতোমধ্যে অনেকখানি থিতু হয়ে আসে, ভালমন্দ চিহ্ণিত হয়ে পড়ে। সমসাময়িককালের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে না। আর যেকোনো অ্যানথলজিই শেষবিচারে প্রমোশনাল, ফলে সমসাময়িককালের কবিতাকে বেশি প্রমোট করার মাধ্যমে অ্যানথলজি আসলে সাহিত্যের যাত্রায় সদর্থক ভূমিকাই রাখে। বর্তমান অ্যানথলজিটি সেই ভূমিকা রাখেনি। কিন্তু ইংরেজিভাষার কবিতার অ্যানথলজিগুলো দেখুন। দেখুন প্রতিটি অ্যানথলজি যে দশকে বেরয় কিভাবে দশক-বায়াজড হয়ে থাকে, পরবর্তী দশকে হয়ত সংকলন-ভূক্ত অনেককেই আর পাওয়া যায় না। এটা ইতিবাচক পক্ষপাত। পক্ষান্তরে দেখুন, বাংলাভাষার সংকলনসমূহ সম্পাদকের ব্যক্তিগত রূচির আস্ফালনের বাইরে যেতেই পারে না। সমসাময়িক কবিতাকে এভাবে নিগৃহিত করে দেখার একটা কারণ হয়ত আছে। এর উদ্ঘাটন অবশ্য সাহিত্য সমালোচকের কাজ নয়, মনস্তত্ত্ববিদ বা সমাজতাত্ত্বিকের কাজ। তাই আলোচনা এখানেই ক্ষান্ত দেয়া যায়।

আমি সাজ্জাদ শরিফ ও রণজিৎ দাশ সম্পাদিত "বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিতা"র প্রকাশকে অভিনন্দিত করি। এজন্য যে এই প্রকাশনাটিকে ঘিরে বাংলাভাষার সংকলন-সম্পাদনার এসব প্রবণতাকে চিহ্নিত করতে পারা গেছে এবং এই অনুধাবন সঠিক হলে ভবিষ্যতের সংকলন-প্রণেতারা এর থেকে নিজেদের পথ বাতলে নিতে পারবেন।

(লেখাটি একযোগে ফেসবুক নোটস, সামহোয়্যারইন ব্লগ এবং "কবিসভা" ইয়াহুগ্রুপ এবং "কবিতাকথা" গুগুলগ্রুপে প্রকাশিত)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28930690 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28930690 2009-03-29 01:19:22
সামহোয়্যারনামা ৫
সত্যকথনের (?) এই দুর্বহ বোঝা ঘাড় হৈতে নামানোর তরিকা কি?

আরো কিছু নৈতিক প্রপঞ্চ আসিয়া ভিড় জমাইতেছে মনে। আমি কি সুপ্ত হুতাশনকে চেতায়া দিতেছি? মর্গের মাটিতে নরমুন্ডু দিয়া বৌলিং খেলিতেছি? মডারেটরমহাশয়ের দিবানিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাইতেছি? আমি কি ভ্রুণহন্তারক, আরো কিছু নিকের আত্মাহুতির জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করিতেছি? আমাকে ধিক্কার দিতেছে যাহারা তাহারা কি জীবিত? নাকি প্রাগৈতিহাসিক অভিশাপ সামহোয়্যার-পিরামিডের গায়ে প্রতিধ্বনি তুলিতেছে? আর আমাকে বাহবা দিতেছে যাহারা তাহারা কি চুপিসারে আমার জন্য কুশপুত্তুলিকার অর্ডার দিয়া আসিয়াছে?

একবার ভাবিলাম, থাক কাজ নাই আর, পলায়া যাই বদরগঞ্জের হাটে। মজমার আড়ালে দাঁড়ায়া রথীমহারথীদের এইসব হাতসাফাই দেখি আর বাচ্চালোগ তালিয়া বাজাই! তাহারা তাহাদের আবহমান মাহাত্ম্য সম্বল করিয়া একে অপরে হোলি খেলিতে থাকুক! তাহাদিগের আত্মা বড় নাজুক, ফুলের টোকা সহে না। তাহারা দর্শক চাহে, দর্শকের তালিয়া চাহে, কিন্তু দর্শকের বাকস্ফূর্তি চাহে না। সেইরকম কিছু ঘটিলেই পামর-অর্থে "পোমো" গালিসহযোগে চাপ দিয়া বসায়া দেয়। নচেৎ সেই নটাভিলাষী দর্শককে ভরতনাট্যম নাচিবার আজ্ঞা দিয়া রামদা হাতে তাল গুণিতে আরম্ভ করে!

কিন্তু যে আগুন আমি জ্বালাইয়া ফেলিয়াছি, কিরূপে নামিব এই ইনফার্নোময় অট্টালিকা হৈতে? কোথা সে জলপাইরঙ হেলিকপ্টার যে আমাকে সারি সারি বেটাক্যাম আড়াল করিয়া এই অগ্নিকুণ্ড হৈতে নিরাপদে উড়ায়া লৈয়া যাইবে?

হায়! কেন যে দান্তে হৈতে আসিলাম এই মুখব্যাদান দন্তবিকাশকেন্দ্রে? মনে পড়িতেছে পুরনো দিনের একখানা সঙ্গীতের কথা:

"চারিদিকে স্টেনগান ব্রেনগান মেশিনগান
আমি কি গাইবো গান!!"
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28928766 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28928766 2009-03-24 13:06:05
সামহোয়্যারনামা ৪
ত্রিভুজ নেটওয়ার্ক বনাম এটিম যুদ্ধে মূলত তিনটি পন্থা অনুসৃত হয়। এক, ডিমোরালাইজেশন : নির্বিচার গালিগালাজ একে অন্যের বিরূদ্ধে প্রাণিবাচক এবং অন্যান্য অবমাননাকর শব্দব্যবহারের মাধ্যমে; দুই, ইমেজ ডাউনসাইজ করা: মূলত একে অপরের বিরূদ্ধে ভন্ডামির অভিযোগ রেজিস্টার করা এবং সেজন্য প্রয়োজনে ব্লগীয় বাস্তবতার বাইরের দৃষ্টান্ত ব্যবহার করার মাধ্যমে; তিন, গেরিলা ক্যামোফ্লেজ নিয়ে: রিভার্স সাইকোলজি এপ্লাই করার মাধ্যমে। যুদ্ধ যে পন্থাতেই হোক না কেন, তাতে পদাতিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে শহীদ হয় অসংখ্য নিক। উভয়পক্ষেরই রয়েছে দুর্ধর্ষ এবং আত্মঘাতী নিকস্কোয়াড।

ইডিওলজির জায়গা থেকে এ-টিম প্রো-প্রগ্রেসিভ, প্রো-লিবারেশন, সেক্যুলার এবং বিজ্ঞানমনস্ক। কিন্তু ব্লগীয় অ্যাকটিভিটির দিক থেকে তাদের রিঅ্যাকটিভ মনে হয়। আবার ত্রিভুজ যদিও হালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার অবস্থানকে ব্যক্ত করছেন, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তিনি এন্টি-লিবারেশন, প্রো-জামাত এবং প্রো-ইসলামী নেটওয়ার্কেই সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু এই গোষ্ঠী তাদের ব্লগীয় অ্যাকটিভিটির চরিত্র বিচারে প্রো-অ্যাকটিভ।

ডিমোরালাইজেশন বা নির্বিচার গালাগালিপন্থার কথা বলা যাক। জগতসংসারের হেন কোনো অবমাননা শব্দ নাই যা ব্লগীয় যুদ্ধে দেখা যায় না। এক্ষেত্রে এ-টিম একটা ক্ল্যাসিক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, সেটি ত্রিভুজকে একটা প্রাণিবাচক অভিধায় ক্রমাগত অভিহিত করার মধ্য দিয়ে। এই অভিধার প্রয়োগ এত সর্বব্যাপী যে, প্রথম আলো ব্লগ তার নীতিমালায় "কাউকে প্রাণিবাচক শব্দে ডাকা যাবেনা" শীর্ষক আইন প্রণয়ন পর্যন্ত করে! "ছাগু" শব্দটি ছড়িয়ে পড়ে ব্লগ থেকে ব্লগান্তরে, এমন কি ফ্লিকার, ইউটিউব এবং ই-স্নিপস এর আর্কাইভে। গান হয়েছে "ছাগু" নিয়ে, নানান টেম্পারড ফটোগ্রাফ এসেছে তার, কবিতা হয়েছে ব্লগে ব্লগে। এমনটা মনে হয়েছে যে, "ছাগু" ডিসকোর্সটি বহু ব্লগারের সৃজনশীলতার বিকাশে সহায়ক ছিল। তাদের কল্পনাপ্রতিভার সর্বোত্তম প্রকাশ দেখা গেছে রিলেটেড পোস্টগুলোতে। প্রসঙ্গত, প্রথম আলো ব্লগের শক্ত নীতিমালায় যেহেতু কাউকে প্রাণিবাচক শব্দে অভিহিত না-করার আইন আছে, তাই সেখানে "রামানুজান" নামে এক নিকের আবির্ভাব হল। রামানুজান কিছুই করেন না সেখানে, শুধু পশুপালনবিদ্যার বই ঘেঁটে ঘেঁটে ছাগল পালনবিদ্যা নিয়ে একটা একটা করে "সিরিয়াস" পোস্ট দিতে থাকেন। কোনো গালি নেই, কারো নাম নেয়া নেই, কিন্তু এই নিকটি ব্যান হয়েছে সেখানে। এতে বোঝা যায় "ছাগু" ব্রান্ডিং কোন্ উচ্চতায় উঠেছে বাংলা ব্লগে। একইভাবে, "গেলমান" নিয়েও একইরকমের আরেকটা ব্রান্ডিং এর প্রবণতা এ-টিম ব্লগারদের দেখা গেছে।

ত্রিভুজ নেটওয়ার্কেও গালির বিচ্ছুরণ কিছু দেখা গেছে। তবে সেগুলো অনেক কম সপ্রতিভ, নিরীহ গোছের গালিই, যতটুকু দেখেছি। দালাল টালাল জাতীয়। এর বাইরে কিছু থাকলে আমার চোখ এড়িয়ে গেছে। গালি দেয়ার চেয়ে এ-টিমকে গালির উপলক্ষ তৈরি করে দেয়াতেই তাদের তৎপর দেখা যায়। এ-টিমের তীব্র গালিগুলোকে ভোঁতাভাবে কনজিউম করা, বা অবজ্ঞা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজের ব্লগীয় ছন্দে অবিচল থাকা... মোটামুটি এরকমই ছিল ত্রিভুজ নেটওয়ার্কের ডিমোরালাইজেশন কৌশল। এটা সচেতন কি অনিচ্ছাকৃত জানি না। তবে এরকম ভোঁতা রিসেপশন এ-টিমকে আরো উত্তেজিত করত, সন্দেহ নেই। ফলে প্রথম দিকের "ক্রিয়েটিভ" গালিগালাজময় আক্রমণের স্তর থেকে তাদের নিচে নেমে আসতে হয়েছে অনেক।

ইমেজ ডাউনসাইজ করার ক্ষেত্রে ত্রিভুজ নেটওয়ার্ক রিলিজিয়াসলি সময় দিয়েছে। এটা মূলত এ-টিমের ব্লগারদের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের সত্যমিথ্যা ব্লগে প্রকাশ করে দেয়ার মাধ্যমে। এ-টিমও এই কাজ করেছে, তবে অতটা রিলিজিয়াসলি নয়। এর ফলে আমরা জানতে পারি কোন্ ব্লগার যৌবনযাত্রায় ব্লগান, কে মগবাজারের টাকা খান, কারা ভারতের এজেন্ট, কার ১০০০ নিক আছে, কোন নিকের মালিকানা কার, কে উইকিপিডিয়ায় কনট্রিবিউট করতে গিয়ে "ধরা" খেয়েছে, ইত্যাদি। ইমেজ ডাউনসাইজ করার কৌশল ত্রিভুজ-এটিম যুদ্ধ ছাড়িয়ে অন্যান্য ব্লগীয় ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

তবে এই দুই ফ্রন্টের যুদ্ধে এ-টিমের সম্মিলিত আক্রমণ ত্রিভুজকে কাহিল করেছে এমন মনে হয় নি। ত্রিভুজ আক্রান্ত হয়েছে সামহোয়ারে এবং অপরাপর কম্যুনিটি ব্লগগুলোতে, ব্যক্তিগত ব্লগস্পটগুলোতে আরো তীব্রভাবে। কিন্তু সেসব জায়গায় কাহিল না হলেও ত্রিভুজ কাহিল হয়েছে তৃতীয় ফ্রন্টে। এই পর্বে "অশ্রু" নামক এক নিকের আবির্ভাব হল যার প্রোফাইলে এক কামুক পুরুষের ছবি। এই "অশ্রু"র কাজ হল ত্রিভুজকে প্রশংসা করা, এবং তাকে নিয়ে প্রেমের কবিতা রচনা করা। অশ্রুর সেই কবিতাগুলো, তার নন-হেটেরোসেক্সুয়াল ভালবাসার পয়গাম ত্রিভুজকে কিছুমাত্রায় বেকায়দায় ফেলে দিত সন্দেহ নেই। অমি রহমান পিয়াল আমার আগের এক পোস্টের মন্তব্যে স্বীকার করেছেন যে রিভার্স সাইকলজি এপ্লাই করার এক সফল দৃষ্টান্ত "অশ্রু" নিকটি।

এছাড়াও রিভার্স সাইকলজি বা ক্যামোফ্ল্যাজ এটাকের আরো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ত্রিভুজ-এটিম যুদ্ধে। নারী নিক ব্যবহার করে বিপক্ষের পুরুষ ব্লগারের "চরিত্র হনন" করা এবং সেই "দুশ্চরিত্রতার" প্রমাণ দাখিল করে ঐ পুরুষ ব্লগারকে সামহোয়ারে ব্যান করার মত ঘটনাও ঘটেছে।

আমরা যারা দর্শক তাদের এটিম-ত্রিভুজ যুদ্ধ প্রভুত বিনোদন যেমন দিয়েছে, আবার বেদনাও কম দেয় নাই। বেদনা এজন্য যে, এই যুদ্ধে আমরা প্রচুর সম্ভাবনাময় এবং প্রতিভাবান নিককে হারিয়েছি। এই যুদ্ধ শুরুর আগে এ-টিমের ব্লগারদের নানারকমের প্রতিভার স্ফূরণ দেখেছি সামহোয়ারে, কিন্তু কালে কালে এর সামান্যই অবশিষ্ট আছে। একইভাবে ত্রিভুজকেও দেখা গেছে দীর্ঘদিন সামহোয়ারে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে। এখন এ-টিমের অনেকেই, আগেই বলেছি, একটা রিঅ্যাকটিভ পজিশন নেয়, একটা ওয়াচডগের মত কাজ করে। কোথাও কোনো রাজাকার মাথাচাড়া দিল কি না, কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কটুকাটব্য করল কিনা এসবই তাদের অনেকের ব্লগীয় কর্মকান্ড। এটা করতে গিয়ে তাদের নতুন করে বলবার কথাগুলো আর বলা হয় না, অন্তত এই ফোরামে। দৃষ্টান্ত হিসেবে হাসিব-এর নাম বলা যায়। সচলায়তনে হাসিবের লেখার স্বাদ পেয়েছিলাম যা ভুলবার নয়। কিন্তু সামহোয়ারে এসে দেখলাম হাসিব তার লেখকপ্রতিভার ওপর সুবিচার করছেন না। আর এখন তো তাকে ব্যান করাই হয়েছে সামহোয়ারে। কিন্তু এটা বোধ হয় এটিম-এর সব ব্লগার সম্পর্কে সমভাবে প্রযোজ্য নয়। কাউকে কাউকে প্রায়ই তাদের স্বমহিমায় দেখা যায়।

নিক ম্যানেজমেন্টে এ-টিম অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনার জন্ম দিয়েছে। তাদের টিমওয়ার্ক খুব প্রফেশনাল, দেখা যায় কোনো একটি নিক উদ্ভাবনের পর এ টিমের একাধিক ব্লগার সেই নিকটিকে অপারেট করছে। একেকটা নিকের একেক ধরনের চেহারা, আচার আচরণ, বাংলা লেখার ধরন, রেগে যাওয়ার ধরন, সতীর্থদের সাথে খাতিরএর নেটওয়ার্কিং, মুদ্রাদোষের ধরণ। সেইমত বুঝে শুনে একটা নিককে একাধিক লোকের পক্ষে ভ্রান্তিহীনভাবে অপারেট করতে পারা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের।

(চলিবেক)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28927486 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28927486 2009-03-21 16:52:42
হাড্ডি খিজিরনামা

হাড্ডি খিজিরের পায়ে পায়ে হেঁটেই উনসত্তরের ঢাকার উত্তাল রাজপথকে চিনেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে। নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরে ওসমান চিলেকোঠাবাসী, বামপন্থী আনোয়ার মার্কসীয় বিধিমোতাবেক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য গ্রাম বেছে নেয়। এদের বাদ দিলে উনসত্তরের ঢাকার বিক্ষোভ বোঝার জন্য ছাত্রনেতারা ছিলেন যাদের আমরা অনেক প্রগলভ দেখেছি জহির রায়হানের উপন্যাসে ও সিনেমায়, ইলিয়াস সেসব চরিত্র থেকে সতর্ক দূরত্বে হেঁটেছেন, যদিও ছেঁটে ফেলেন নি একেবারে। নিজে মার্কসবাদে দীক্ষিত ছিলেন, বামপন্থী আনোয়ারকে গ্রামে পাঠিয়েছেন এবং আনোয়ারের সমান্তরাল আখ্যানটি বিবরবাসী ওসমান গণিকে আদর্শবাদের আঁচ থেকে রক্ষা করতে পেরেছে অনেকদূর পর্যন্ত। কিন্তু নিঃসন্দেহে এরচে অনেক বড় কৃতিত্ব নগর গরিবের প্রতিনিধি হাড্ডি খিজিরকে শ্রেণিবিশ্লেষণের প্ররোচনার বাইরে রেখে স্বতঃস্ফুর্তভাবে বাড়তে দেয়া, চিলেকোঠার সেপাই যার অনাবিল প্রদর্শনী।

হাড্ডি খিজিরের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত ঢাকাই নিম্নবর্গ বাংলা উপন্যাসে এতো কেন্দ্রীয় এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রবেশ করেনি। বইয়ের ফ্ল্যাপের বিবরণ অনুসারে হাড্ডি খিজির “নিজের বাপের নাম জানে না, যে বড় হয়েছে রাস্তায় রাস্তায়, যার মা বৌ দুজনেই মহাজনের ভোগ্য এবং গণঅভ্যুত্থানের সদস্য হওয়ার অপরাধে মধ্যরাতে কারফ্যু-চাপা রাস্তায় যে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হয় মিলিটারির হাতে”। এই মহাজন রিকশাগ্যারেজের মহাজন যার ঘরে খিজিরের বৌ পরিচারিকার কাজ করে। খিজিরের বৌ আবার জুম্মনের মা, জুম্মনের বাবা যেখানে খিজির নয়, কামরুদ্দিন মিস্ত্রি। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঘৃণা বা বিবমিষার নয়, বরং সমঝোতার এবং সচেতন দূরত্বের। রহমতউল্লা মহাজনের রিকশাগ্যারেজের ইন-চার্জ খিজির বসবাস করে রহমতউল্লারই বস্তিতে, অর্থাৎ যিনি গ্যারেজমালিক তিনি বস্তিরও মালিক। সেখানে ঘর যে খুব বেশি আছে এমন না, পাশের ঘরের বজলু যে সিনেমা হলে টিকেট কালোবাজারি করে তাকে বাদ দিলে সেই বস্তির অধিবাসী হিসেবে গুটিকয় রিকশাঅলার কথা খুব হালকাভাবে জানা যায়। বর্তমানের ঢাকাই বস্তি অনেক জটিল সে তুলনায়, জায়গাটিকে বরং রহমতউল্লার কর্মচারিদের কলোনী বললেই ভাল শোনায়। তবে মনে রাখতে হবে, এভাবেই ষাটের দশক থেকে ঢাকা শহরে বস্তি গজিয়ে উঠেছে।

গজিয়ে ওঠা বস্তির সাথে অভিবাসী শ্রমিকদের যে সম্পর্ক, খিজিরের তা নয়। তার জন্ম ঢাকায়, হয়ত তার পূর্বপুরুষ গ্রাম থেকে এসেছিল। উল্টো, মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি ওসমানই বরং ঢাকায় অভিবাসিত। ফলে, ওসমানের ঢাকা-অভিযোজনে এবং রাজনীতির পর্যবেক্ষণে খিজিরই যে ভাষ্যকারের ভূমিকা নেবে এতে বিস্ময়ের কিছু নাই। খিজির যতটুকু ভাষ্যকার তার চে বেশি প্ররোচক। তার প্ররোচনা শুধু ওসমান চরিত্রটিকে পূর্ণতা দেয়ার জন্যই যে, তা না। মধ্যরাতের বেবিট্যাক্সি থেকে স্ত্রী ছিনতাই হয়ে গেলে খিজির স্বামীপ্রবরটিকেও একই রকম প্ররোচনা দিয়েছিল রূখে দাঁড়াবার, যদিও সেই স্বামীপ্রবর খাঁটি মধ্যবিত্তের মতই পেছিয়ে এসেছিল। বস্তুত, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতি এই করুণামিশ্রিত অবিদ্বেষ “অন্তজ শ্রেণীর” প্রতিনিধি খিজিরের চরিত্রের একটি বড় দিক, যা ইলিয়াস সম্ভবত তাঁর মার্কসীয় তত্ত্বঘনিষ্ঠতা দিয়ে উদ্ঘাটন করেন নি। খিজিরে শ্রেণিসংঘাত নাই, এমন কিন্তু না। রহমতউল্লার বিরূদ্ধে তার প্রতিরোধ জারি ছিল, কিন্তু সেটা রহমতউল্লা যখন মিছিলের জন্য রিকশা দিতে অস্বীকার করে তখনই। অদ্ভূত বিষয়: রহমতউল্লাকে খিজিরের বাপ বলে লোকে যে সন্দেহটা করে সেটা খিজির জানে, তার স্ত্রী অর্থাৎ জুম্মনের মার সাথে রহমতউল্লার লদকালদকির খোঁটা খিজির নিজেই বৌকে দেয়, এমন কি রহমতউল্লা ওকে বস্তি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বললে খিজির বেরিয়ে যায়ও, কিন্তু সেখানে বিদ্যমান স্ট্যাটাস ক্যু চ্যালেঞ্জ করে না সে। সেই একই খিজির পূর্ব বাঙলার স্বাধিকারের দাবিতে আপোষহীন, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে অবিচল। রহমতউল্লার ব্যাপারে তার প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে শ্রেণীসংঘাতের প্রশ্নে নয়, জাতীয়তাবাদী প্ররোচনায়। পূর্ববাঙলা মুক্ত হলে ব্যক্তি খিজিরের জীবনে শোষণমুক্তি ঘটবে কি না এই বোঝাপড়া খিজিরে নাই, থাকলেও উপন্যাসে অনুপস্থিত। বরং পূর্ববাঙলার টাকায় করাচি শহর তৈরি হচ্ছে এই ম্যাক্রোলেভেলের উচ্চবর্গীয় অনুভব চালিত করে তাকে। খিজির কি লুম্পেনপ্রলেতারিয়েত? খিজির কি দার্শনিক? নাকি ওসমান বা আনোয়ারের সাহচর্যে তার ভাবনাপদ্ধতি শ্রেণিসীমা ডিঙাচ্ছে? খিজির কি সত্যি সত্যি অস্তিত্বশীল ছিল ঢাকাই নিম্নবর্গের অনামা মুখছবির মাঝে? নাকি সে চিলেকোঠায় থাকা নিম্নমধ্যবিত্ত কেরাণি ওসমানের কাউন্টার-পার্সোনালিটি?

ইলিয়াসের বিশাল এথনোগ্রাফিক উন্মোচনের এই দক্ষযজ্ঞে এসব দার্শনিক প্রশ্ন হয়ত নেহাত মামুলি। এ কারণে যে, গোটা উপন্যাসের শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা বাদ দিলে সামান্য সময়ের জন্যও খিজিরকে তত্ত্বচালিত মনে হয় না, এবং খিজিরের ঐতিহাসিক অস্তিত্বশীলতার বিষয়ে ইলিয়াস পূর্ণ সচেতন এমনটাই লাগে। জীবিত খিজির ইউটোপিয়া নয়, সমাজতাত্ত্বিকভাবে তো নয়ই। খিজিরের পরিবার সত্য, তার বস্তি সত্য, জুম্মনের মার পেটের অনাগত সন্তানের প্রতি তার টান সত্য, তার জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনাও সত্য। উনসত্তরের অভ্যুত্থান থেকে এর ভুরি ভুরি সমর্থন মেলে। এতসব সত্যনিষ্ঠতার শরীরে কোথায় সেই কসমেটিক সার্জনের কারিগরি যা বোবা নগরগরিবের প্রতিনিধি এক সামান্য রিকশাঅলাকে হাড্ডি খিজির বানিয়ে তোলে?

মনে রাখতে হবে খিজির “মুঝিক” নয়, শহরে বড় হওয়া নিম্নবর্গের প্রতিনিধি যার বস্তুগত সম্পদ বলতে গ্যারেজ থেকে “চুরি” করে আনা একটা স্ক্রু ড্রাইভার আর একটা রিকশা চেন। তারই আরেক সহকর্মীকে বলতে শোনা যায় এসব ছোটখাট চুরি দোষের কিছু নয়, মালিকের বেশি ক্ষতি না করে এরকম হাতিয়ে নেয়ায় সমস্যা নেই। এই “হাতিয়ে নেয়া”কেই জেমস স্কট বলছেন “পিলফারিং” (pilfering), আবার মিশেল দ্য সার্তিয়্যু বলছেন “পোচিং” (poaching)। মোর‌্যাল ইকনমি অব দ্য পুউর! ইলিয়াস তাদের থেকে ধার করেন নি এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, যেহেতু প্রায় কাছাকাছি সময়েই প্রকাশিত হয়েছে এদের বইপত্রসমূহ। স্কট বা সার্তিয়্যু বলছেন, শ্রেণিসংঘাত প্রকাশ্য যেমন হয় আবার অপ্রকাশ্যে দীর্ঘদিন ছোট ছোট প্রতিরোধের আকারে চলমান থাকতে পারে। এসব অপ্রকাশ্য প্রতিরোধের সম্মিলনে বড় আকারের প্রকাশ্য প্রতিরোধ বা বিপ্লব সংঘটিত হবে, এমন নয়। প্রায়শই এসব প্রায়-অদৃশ্য প্রতিরোধ দৃশ্যমান হবার আগেই মিলিয়ে যায়, ক্ষেতের ইটা ক্ষেতে যেমন ভাঙ্গে। এই “চুরি” তেমনি একটা অদৃশ্য প্রতিরোধ যা বিদ্যমান স্ট্যাটাস ক্যু-কে চ্যালেঞ্জ না করে শোষিত শ্রেণি এক ধরনের “মোর‌্যাল” ম্যানেজমেন্ট করতে চেষ্টা করে, তাদের ওপর ঘটতে থাকা শোষণের বিপরীতে। ফলে খিজিরের মধ্যে সরল শ্রেণিবিদ্বেষ তৈরি না হওয়ার একটা ব্যাখ্যা এখানে মেলে: শ্রেণিসংঘাত এড়িয়ে তার আউটরাইট জাতীয়তাবাদী হয়ে যাওয়ার মানে দাঁড়ায়। হাড্ডি খিজির যেন পরবর্তীকালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ-না-নেয়া বামপন্থীদের একাংশের মতাদর্শিক অবস্থানের একটা উজ্জ্বল সমালোচনা: প্রলেতারিয়েত তার নিজস্ব শ্রেণিসংগ্রামে অপ্রকাশ্য এবং আপাত প্রণোদনাহীন থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে একটা “বুর্জোয়া” জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে অপরাপর শ্রেণীর সাথে কাঁধ মিলিয়ে। ইলিয়াসের রাজনৈতিক অবস্থান মনে রাখলে এটা এক অর্থে আত্মসমালোচনা বৈকি।

কিন্তু শুধুই কি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে? ইলিয়াস এই পর্বে আরো বিধ্বংসী, খিজিরকে তিনি স্থাপন করেন ওসমানের চলন-সম্ভাবনার পুরোভাগে। বিবরবাসী নার্সিসাস ওসমান, পুঁথিগত শ্রেণিসংগ্রামের খোঁজে ব্যাকুল আনোয়ার, স্বাধিকার-প্রত্যাশী আলাউদ্দিন সবার সংশয়ের সামনে দিয়ে খিজির নাঙা পতাকার মত ঘোরে উত্তাল উনসত্তরের ঢাকাই রাজপথে। খিজির একটা এক্সিট, এইসব তত্ত্বদীর্ণ মধ্যবিত্ত হৃদয়ের। আবার, চিলেকোঠার সেপাই এর প্লট থেকে খানিক দূরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এগার দফার যে আন্দোলন, শিক্ষিত মানুষের মিছিলে নানাবর্ণের প্ল্যাকার্ডে ফেস্টুনে আড়াল হয়ে-থাকা মিছিলের মুখও এই খিজির। ঐ মিছিলে সে অনামা, সহস্র স্ফুলিঙ্গের একটিমাত্র। মিশেল দ্য সার্তিয়্যু যেমন বলেন, “.... the common hero, an ubiquitous character, walking in countless thousands on the streets....This anonymous hero is very ancient. He is the murmuring voice of societies. In all ages, he comes before texts. He does not expect representations. He squats now at the center of our scientific stages.” সেই অনামা, ভিড়ের হৃদয় থেকে তুলে আনা এক স্ফুলিঙ্গকে খিজির নাম দিয়ে হাজির করেছেন ইলিয়াস। বা, সার্তিয়্যু যেমন বলছেন, খিজিরই চুপে চুপে হাজির হয়েছে ইলিয়াসের টাইপ রাইটারের আখরগুলোর সামনে। তিনি তাকে বহু থেকে ভিন্ন না করেই এক-এর জীবন দিয়েছেন।
মাঝে মাঝে ভাবি, খিজিরের মৃত্যু ওসমানকে অত আউলা করে দিল কেন? ওসমানের যাবতীয় অবদমন কেনই বা বাঁধভাঙা স্রোত হবার আকাক্সক্ষায় খিজিরের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করল? তাহলে কি খিজির সত্যি সত্যি ওসমানের কাউন্টার-পার্সোনালিটি? নয়তো কেন মরণোত্তর খিজিরের আত্মা ওসমানের ঘরে বসত করতে আসবে, আর কেনই বা তাকেই বেরিয়ে পড়ার প্ররোচনা দেবে? বিবরবাসী মধ্যবিত্তের আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান করছিলেন ইলিয়াস? করতেই পারেন, কিন্তু ঠিক এই জায়গায় খিজির ইউটোপিয়া হয়ে গেল! খিজির একটা মতাদর্শে পরিণত হল, একটা কৌশলের নামান্তর হয়ে দাঁড়াল। সান্ত্বনা এটাই, সাহিত্য শেষমেষ শিক্ষিত উচ্চবর্গেরই ভোগ্য। শহরের নিম্নবর্গ হাড্ডি খিজিরেরও তাই হল। জুম্মনের মার এবরশন হবে কি হবে না, সেটা আর অশরীরী খিজিরের কাছে বড় প্রশ্ন নয়, অর্থাৎ সে তার আকাক্সক্ষার সাশ্রয় করে আইডেন্টিটি ইস্যুর ফয়সালা করে নিয়েছে, এখন তার কাছে বিপন্ন ওসমানের আত্মার মুক্তিটাই যেন মোক্ষ! ভাবি, সাহিত্যিক চরিত্র হবার কারণেই কি খিজিরকে এই মহত্ত্বের দায়ভার নিতে হল? নাকি সকল জাতীয়তাবাদী প্রণোদনার ধর্মই এটা, শ্রেণিনির্বিশেষ হয়ে গিয়ে সমাজাভ্যন্তরীন টেনশনগুলোতে খানিক রিলিফ ঢেলে দিতে চায়?

সূত্র
১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ১৯৮৬, চিলেকোঠার সেপাই, ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
২. জেমস সি স্কট, ১৯৮৫, ওয়েপনস অব দ্য উইক: এভরিডে ফর্ম অব প্যাজান্ট রেজিস্ট্যান্স, লন্ডন: ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস
৩. মিশেল দ্য সার্তিয়্যু, ১৯৮৪, দ্য প্রাকটিস অব এভরিডে লাইফ, লন্ডন: ইউনিভার্সিটি অব কালিফোর্নিয়া প্রেস



* ২০ মার্চ ২০০৯ শুক্রবার দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত[/si
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28926990 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28926990 2009-03-20 14:06:49
আগুনের বিনোদন: দ্য সিটি ইজ অন ডিসপ্লে!! বসুন্ধরা সিটিতে আগুন। আধাবেলা সেই আগুন আমরা দেখলাম টেলিভিশনে। প্রায়-রিয়েল টাইমেই, মানে লাইভ টেলিকাস্ট। সেই অর্থে, আগুনের সূত্রপাত আমাদের চোখের সামনে না ঘটলেও, আগুন পোড়ালো আমাদের চোখের সামনে। আমরা খেতে খেতে দেখলাম আগুন, দিবানিদ্রা দিয়ে উঠে দেখলাম আগুন, অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম দারাপুত্রপরিবার বেশ জমিয়ে জমিয়ে টেলিভিশনে আগুনের বিনোদন দেখছে। জমিয়ে জমিয়ে না বলে "রসিয়ে রসিয়ে"ও বলা যেত, সংস্কারবশত বললাম না কারণ শত হলেও এটা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং এই আগুন পোড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচে বড় শপিং মলটাকে। এই আগুন পোড়াচ্ছে আমাদের অর্থনীতিকে, এবং কিছু হলেও আমাদের জাতীয়তাবাদী অহমকে।

ঘটনাচক্রে দেশের বেশিরভাগ প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেলের অফিস বসুন্ধরা সিটি থেকে কয়েকশ গজের মধ্যে। না হলেও সমস্যা ছিল না, সেটা আমরা পিলখানার বিডিআর তাণ্ডব কিংবা সিলেটের সূর্যদীঘল বাড়ি ইভেন্টের বেলায় দেখেছি। কিন্তু হাতের একেবারে নাগালে হওয়ায় বুভূক্ষু টেলিভিশন ঝাঁপিয়ে পড়ল এই মনোরম আগুনে। অগ্নিস্নাত হল আমাদের চোখ। দেখলাম উনিশতলার আগুনের উদ্দেশ্যে ছিটানো পানি পৌঁছাচ্ছে চৌদ্দতলায়, উড়ছে হেলিকপ্টার, ভবনের ছাদ থেকে জেমস বণ্ড কায়দায় সরাচ্ছে কোনো আটকা-পড়া শরনার্থীকে, উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে মরে যেতে দেখলাম এক ফায়ার-ফাইটারকে, দেখলাম উৎসুক জনতার ভিড়, মুহুর্মুহু নিউজ ফোরকাস্ট হতে থাকল সেসব নিয়ে, অজগরের মত আগুন একটু একটু করে গিলছে বসুন্ধরা সিটিকে, আর সেই দৃশ্য নিয়মিত অনুষ্ঠান বাতিল করে টেলিভিশন আমাদের গিলাচ্ছে!

এরচে দারুণ থ্রিলার কি হতে পারে আর? পুড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচে বড় শপিংমল, বাতাস পেয়ে পেয়ে লেলিহান হয়ে উঠছে আগুন, ৮০০ ডিগ্রি তাপে গলে গলে পড়ছে এর থাই-কাঁচের বেষ্টনী, দমকলের পানি নাগাল পাচ্ছে না এই লেলিহান শিখার, ধীরে ধীরে আগুন নামছে নিচে, অগ্নিনির্বাপনের সহজ সমীকরণ এখানে কার্যত অবসলিট, ফলে থ্রিল আরো ঘনীভূত, আশপাশের ভবনগুলোও খালি হয়ে পড়ছে, ইতোমধ্যেই আমরা টের পেতে শুরু করেছি এটা রীতিমত ফুল লেংথ মুভির চেয়ে বড় লেংথের বিনোদন, এবং একটা পারফেক্ট থ্রিলারের মতই এর উপসংহার ঝাপসা আর অজানা, কতখানি গিলতে পারবে আগুন এই বসুন্ধরা সিটিকে?

আমাদের চোখকে আরো আরাম দেয়ার জন্য টেলিভিশনগুলো তাদের নিজ নিজ ছাদ থেকে নেমে ঘটনাস্থলের আরো কাছে পৌঁছাল। এতে আমরা আগুনে হলকা আরো নিবিড়ভাবে টের পেলাম, সেইসাথে টের পেলাম টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কম্প‌ারেটিভ অ্যাডভান্টেজ! সচল হচ্ছে নাগরিকদের টেলিফোন:

: বাংলাভিশন বদলাও, ওরা তো ছাদ থেকে ক্যামেরা ধরছে, এটিএন-এ অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে!
: চ্যানেল আই একেবারে লাইভ!
: দিগন্ত টিভি দিয়া কী হবে, এনটিভি খোলো এনটিভি। মিস করতেসো!!

এভাবে আমরাও জড়িত হয়ে পড়ি এই যুদ্ধে, হাতে রিমোট কন্ট্রোলের মত একটা অস্ত্র নিয়ে। এই চ্যানেল থেকে ওই চ্যানেল, এরকম দারুণ দুর্যোগেও ভোক্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে! জমছে সন্ধ্যার আড্ডার রসদও, কোন্ চ্যানেলটি না দেখার কারণে কে কী জিনিস মিস করল, ইত্যাদি।

পারফেক্ট থ্রিলারের মতই আগুন হাজির করল তার নিজস্ব কনস্পিরেসি থিওরি। ছুটির দিন আগুন লাগল কিভাবে, কেনই বা বসুন্ধরা গ্রুপের অফিসগুলোতেই আগুন লাগল বেছে বেছে, বিশেষ করে এই আওয়ামী লীগ আমলে, এই আগুনের সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ কিভাবে, এটা কি "ন্যাশনাল প্রাইড"কে ধ্বংস করবার কোনো ভারতীয় ষড়যন্ত্র কি না, অগ্নিদগ্ধ কোনো একটি ফ্লোরে নাকি ভারতীয় পতাকা মিলেছে ... এসব কাহিনিতে সয়লাব হল ব্লগ। দিনভর চললো আলোচনা, বাদ বিসম্বাদ, তাতে ব্লগের পুরনো রাজনৈতিক মেরুকরণের হেরফের হল না বিশেষ। যে যার আদি অবস্থানে থেকেই নিজ নিজ থিওরি হাজির করতে পারলেন আগুনের উপাখ্যান নিয়ে। বিডিআর তাণ্ডবেও পেরেছিলেন। ব্লগে কনস্পিরেসি কাহিনির জন্য দুটোমাত্র ইডিওলজি চ্যানেল: আওয়ামি-ভারতীয় আর পাকি-জামাত। যাবতীয় ফেনোমেনা এই দুই চ্যানেলেই প্রবাহিত হয়। ফলে আগুন যতই সর্বগ্রাসী আর অভূতপূর্বরূপেই আসুক না কেন, তাকেও এই দুই চ্যানেল দিয়ে ব্লগে প্রবাহিত হতে হল।

এভাবে টেলিভিশন আমাদের একের পর এক রূদ্ধশ্বাস থ্রিলার উপহার দিয়ে চলছে। আর তার সাথে সমানতালে পাল্লা দিচ্ছে অনলাইন ব্লগ, নানারকম ভাব ভাষ্য পোলারাইজেশন আর কনস্পিরেসি কাহিনিসহকারে। এই দুই মিডিয়া মিলে ঢাকাশহরকে আমাদের ১৪ থেকে ২৪ ইঞ্চি স্ক্রীণে বন্দী করে ফেলছে অবলীলায়। দ্য সিটি ইজ অন ডিসপ্লে!! আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অনুপ্রাসের দোলায় উঠে বলেছিলেন, "এই মনোরম মনোটনাস শহরে"! ভিজুয়াল মিডিয়ার রিয়েল টাইম ব্রডকাস্ট আর ব্লগ মিডিয়ার ইনস্ট্যান্ট আখ্যানরচনার এই দক্ষযজ্ঞে আমাদের শহর আরো মনোরম হয়ে উঠছে দিনকে দিন, মনোটনাস তো একেবারেই নয়।

আজ সকালে পত্রিকা খুলে যখন দেখি বসুন্ধরার আগুন লিড নিউজ হয়েছে, কেমন বাসি বাসি লাগল। মনে মনে বললাম, এই আগুন তোমাকেই বরং মনোটনাস করে ফেললো হে নিউজপেপার, দ্য সিটি ইজ অন ডিসপ্লে!! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28924185 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28924185 2009-03-14 13:54:01
সামহোয়ারনামা ৪ এর বদলে সিঙ্গারের গল্প "আয়না" এক কিসিমের জাল আছে যেইটা মিথুসেলার মত আগিলা, মাকড়সার জালের মতন নরম ও ছ্যাঁদা-ছ্যাঁদা -- কিন্তু শক্তিসামর্থে কমতি নাই। কোনো শয়তান যখন অতীতকালের পিছে বা বাতাসকলের চক্করে ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হৈয়া পড়ে, তখন সে কোনো আয়নার ভিতর প্রবিষ্ট হৈয়া যায়। সেইখানে জাল বিছায়া সে মাকড়সার মতই বৈসা থাকে, মাছি ধরা পড়বেই। খোদা দুনিয়ার রমণীকূলে দিছেন অন্তঃসারশূন্যতা -- বিশেষত যেসব রমণী ধনী, সুন্দরী, বাচ্চাকাচ্চাহীন, যুবতী এবং যাদের খরচ করার মত সময় বিস্তর আছে, অথচ সঙ্গীসাথী নাই।

ক্রাশনিক গ্রামে আমি সেইরকম এক রমণীর সাক্ষাৎ পাই। ওর পিতা ছিল কাঠব্যবসায়ী, স্বামী ডানজিগে খেয়ার কাজ করত। আর ওর মায়ের কবরে কেবল ঘাস গজাইতে শুরু করছে। মেয়েটা থাকত পুরনো ধাঁচের একটা বাড়িতে -- ওককাঠের কাপবোর্ড, চামড়া-বাঁধান ক্যাশবাক্স আর সিল্ক দিয়ে মোড়ান নানান বইপত্রের মধ্যে। ওর চাকর ছিল দুইটা -- এর মধ্যে বুড়াটা কানে শুনত কম আর জোয়ানটা ঘুরত এক বেহালাবাদকের পিছে-পিছে । ক্রাশনিকের অন্য গৃহবধুরা জুতা পরত পুরুষের, মেশিনের চোঙ্গার মধ্যে গম ঢালত সপাসপ, পাখপালক ছাড়াইত হাঁসমুরগির, রান্ধত স্যুপ, পালত বাচ্চাকাচ্চা আর যাইত জানাজায়। বলা বাহুল্য, সুন্দরী এবং শিক্ষিতা জিরেল -- যে বড় হৈছে ক্র্যাকো শহরে -- এইসব গ্রাম্য প্রতিবেশীর সাথে কথা বলার মত বিষয়ই পাইত না। তারচে সে পছন্দ করত জার্মান গানের বই, বৈসা-বৈসা কাপড়ের মধ্যে এমব্রয়ডারি করত মুসা ও জিপোরা, আহসুইরাস ও রাণী এসথার, কিংবা দাউদ ও বাথশেবার ছবি। স্বামী ওর জন্য যেসব সুন্দর সুন্দর পোশাক আনত, সেগুলো ক্লজেটেই ঝুলত, মুক্তা ও হীরার অলংকার বাক্সবন্দী হৈয়াই থাকত। কেউ কোনোদিন ওর সিল্কের অন্তর্বাস, লেস-লাগানো পেটিকোট বা লাল পরচুলা দেখে নাই -- এমন কি ওর স্বামীও না। দেখবেই বা কখন? দিনের বেলায় তো প্রশ্নই ওঠে না, আর রাত্রে তো অন্ধকার।

জিরেলের ছিল একটা চিলেকোঠা, সেইখানে ছিল একখান আয়না যেটা ছিল ততটুকুই নীল -- পানি বরফ হৈবার আগে যতটুকু নীল হৈয়া ওঠে। আয়নার মাঝবরাবর ফাটা ছিল একটা, আর তার চারপাশে যে সোনালি ফ্রেম ছিল তাতে সাপ, দরজার নব, গোলাপ এসবের বাহারি নকশাখোদাই ছিল। আয়নার সামনের মেঝেতে বিছানো ছিল ভালুকের চামড়া আর লাগোয়া পিছনেই ছিল একখান চেয়ার যার হাতল আইভরির আর গদী নরম মখমলের। নগ্নাবস্থায় সেই চেয়ারে বৈসা ভালুকের চামড়ায় পা রাইখা নিজেরে নিবিষ্টভাবে দেখার চাইতে আনন্দের আর কী হৈতে পারে? জিরেলের শরীরে তাকায়া থাকার মত ঐশ্বর্যও ছিল যথেষ্ট। ওর চামড়া ছিল সাটিনের মত শাদা, দুধজোড়া ছিল ফোলা ফোলা, চুল ছিল কাঁধ-ছাড়ানো আর পা দুইটা ছিল মাদী হরিণের পায়ের মত চিকন লম্বা। আয়নার সামনে বৈসা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে নিজের রূপ উপভোগ করতে পারত। ছিটকিনি আর ভারি হুড়কো দিয়া আটকানো থাকত দরজা, আর সে ভাবত এই বুঝি খুইলা যাইতেছে দরজা, ঘরে ঢুকতেছে কোনো রাজকুমার, শিকারী বা কোনো কবি। কারণ যা কিছু গোপন তার প্রকাশ্য হওয়া লাগবে, প্রতিটা গহীন ভাবনার ব্যক্ত হওয়া দরকার, প্রতিটা প্রেমেই আছে প্রতারণার আকাক্সক্ষা, যা কিছু পবিত্র তারই মর্যাদাহানি হওয়া প্রয়োজন। দুনিয়া ও পরকালের চক্করে যেকোনো সুন্দর শুরুর-ই খারাপ ধরনের সমাপ্তি হৈয়া যাইতে পারে। যখনি আমি এই স্বাদের কথা জানলাম, ঠিক করলাম এই রমণীটারেই ফুসলাইতে হবে। দরকার খালি একটু ধৈর্য। এক গরমের দিনে, আয়নার সামনে বৈসা সে ওর বাম স্তনের বোঁটা দেখতেছিল, তখনি আয়নার ওপর ওর চোখ আটকায়া গেল। হ্যাঁ, আমিই ছিলাম সেইখানে -- আলকাৎরার মত কাল, বেলচার মত লম্বা, গাধার মত কান, ভেড়ার মত শিং, ব্যাঙের মত মুখ আর ছাগলের মত দাড়ি। আমার চোখ বলতে খালি দুইটা মনি। এত আশ্চর্য হৈছিল যে, ভয় পাওয়ার কথাই ভুলে গেল। কান্নার বদলে সে ভাইঙ্গা পড়ল বাঁধভাঙা হাসির চ্ছটায়।

“ও আল্লা, কী বিশ্রী দেখতে তুমি!” বলল সে।
“ও আল্লা, কী সুন্দর দেখতে তুমি!” জবাব দিলাম আমি।

আমার প্রশংসায় ওকে খুশি মনে হৈল। “কে তুমি গো?” জিগাইল সে।

“ভয় পাইও না” বললাম, “আমি একটা পিচ্চি শয়তান, বড়সড় শক্তিশালী শয়তান আমি না। আমার আঙুলে নোউখ নাই, মুখে দাঁত নাই, আমার হাত গুড়ের মত, আর শিং মোমের মত। আমার যত শক্তি আমার জবানে। পেশাগত দিক থিকা আমি একটা ভোদাই, আসছি তোমারে আনন্দ দিতে কারণ তুমি একলা।”

“আগে ছিলা কৈ?”

“তোমার শোবার ঘরের স্টোভের পিছনে, যেইখানে ঝিঁঝি ডাক পাড়ে আর ইন্দুরে হল্লা করে। সেইখানে একটা শুকায়া যাওয়া ফুলতোড়া আর উইলোর মরা ডালের মাঝখানে ছিলাম গো।”

“কী করতা সেখানে তুমি?”
“দেখতাম তোমারে।”
“কবে থিকা?”
“তোমার বাসর রাইত থিকা।”
“খাওয়া দাওয়া?”
“তোমার শরীরের সুবাস, চুলের জ্বিলা, চোখের আলো আর মুখের বিষাদ।”
“শালা তেলবাজ” সে চিৎকার করল, “কে তুমি? কী কর এখানে? কৈ ত্থিকা আসছ? যাইবা কৈ?”

গল্প বানাইলাম একটা। বললাম, আমার বাপ ছিল স্বর্ণকার আর মা ছিল একটা মাদী ছাগল। তারা মিলিত হৈছিল এক গুদামের ভিতর বাতিল দড়ির স্তূপের ওপর, আমি ছিলাম তাদের জারজ সন্তান। কিছুদিনের জন্য উঠছিলাম মাউন্ট সিয়েরের শয়তানদের বস্তিতে, থাকতাম একটা খচ্চরের গুহায়। কিন্তু যখন জানাজানি হৈল যে, আমার বাপ একজন মানুষ -- খেদায়া দিল আমারে। তখন থিকা আমি ঘরছাড়া। মাদী শয়তানগুলা আমারে এড়াইত কারণ, আমারে দেখলে নাকি ওদের আদমসন্তানের কথা মনে হৈত। আর মানবীরা আমারে দেইখ্যা ভাবত শয়তানের কথা। আমারে দেখলেই ঘেউ ঘেউ করত কুত্তাগুলান, মানুষের বাচ্চারা চেঁচাইত ভয়ে । কিন্তু কেন ভয় পাইত ওরা? আমি তো কারো ক্ষতি করি নাই। আমার একমাত্র শখ সুন্দরী নারী দেখা -- দেখা আর ওদের সাথে আলাপ সালাপ করা।

“আলাপ সালাপ করা ক্যান? সুন্দরী হৈলেই কি জ্ঞানী হৈয়া যায় নাকি?”

“বেহেশতে জ্ঞানীরা সুন্দরীদের পায়ের নিচের পাওদানি।”

“আমার শিক্ষক তো অন্যকথা কয়।”

“তোমার শিক্ষক হালায় কি জানে? যারা বই লেখে তাদের বুদ্ধি ছারপোকার সমান। তারা একজন অন্যজনরে অনুকরণ করে। যখনি তুমি কিছু জানতে চাও, আমারে জিগাইও। জ্ঞান কখনই পয়লা বেহেশতের নিচে নামে নাই। আর পয়লা বেহেশতের পর জ্ঞান বৈলা যা আছে তার সবই হৈল লালসা। তুমি কি এও জান না যে, ফেরেশতারা সব মাথামোটা? গেরাসিম ফেরেশতা বালুর মধ্যে খেলাধুলা করে পোলাপানের মত, চেরুবিমটা তো গোনাগুনতিই পারে না, আর আরালিমটা ফেলনা জিনিস চিবায় খালি। খোদা নিজে সময় কাটান হাঙ্গরের লেজ টাইন্যা টাইন্যা, আর জংলী ষাঁড়ে তার পা চাটে। তিনি কাতুকুতু দেন শেখিনারে যাতে সে প্রতিদিন অনেক অনেক ডিম পাড়তে পারে; এই ডিমগুলারেই তোমরা আকাশের তারা কও।”

“বুঝলাম তুমি আমার সাথে মশকরা করতেছ।”

“এইগুলা মশকরা হৈলে আমার নাকের ওপরে হাড্ডি গজাক। আমার মিছাকথার কোটা আমি অনেক আগেই শেষ কৈরা ফালাইছি। এখন সত্য বলা ছাড়া আমার বিকল্প নাই।”

“আচ্ছা, তুমি কি বাচ্চা পয়দা করতে পার?”

“না গো আমার জান। খচ্চরের মতই অক্ষম আমি। কিন্তু তাতে আমার কামনা দমে নাই। শুধুমাত্র বিবাহিতাদের সাথে শুই আমি, দুর্দান্ত অ্যাকশনই আমার পাপ, আমার প্রার্থনা হৈল খোদা-কুৎসা, বিদ্বেষ আমার রুটি, ক্রোধ আমার মদ, ফুটানি আমার হাড্ডিমজ্জায়। বকবকানি ছাড়া এই একটা জিনিসেই ওস্তাদ আমি।”

আমার কথায় হাসি পাইল ওর। বলল, “শয়তানের বেশ্যা হৈতে জন্ম দেয় নাই আমারে আমার মা। যাঃ ফুট, নাইলে ওঝা ডাকুম কিন্তু।”

“উত্তেজিত হৈবার কিছু নাই”, বললাম আমি, “যাইতেছি। কারো ওপর জোর করি না আমি”।

তারপর মিলায়া গেলাম কুয়াশার মত।



২.
পরের সাতদিন জিরেল ওর আয়নাঘরে যাওয়া থিকা বিরত রাখল নিজেরে। আয়নার ভিতর আমি হালকা হালকা ঘুমাইলাম। জাল ছড়ান হৈছে; ভিকটিম রেডি। ওর মারাত্মক কৌতুহলের কথা জানতাম আমি। তাই এখন আমার কাজ হৈল খালি হাই তোলা। একজন খোদার বান্দারে এইরকম পটান কি উচিত আমার? উচিত কি নববধুরে তার পুরুষের সঙ্গ থিকা বঞ্চিত করা? সিনাগগের চিমনিতে আগুন দেয়া? সাবাথের মদকে ভিনেগার বানায়া দেয়া? কুমারীর জন্য বামনসোয়ামী উপহার দেয়া? বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ভেড়ার শিং ঢুকায়া দেয়া? তেলাওয়াতের সুরের মধ্যে অসুর ঢুকায়া দেয়া? পিচ্চি শয়তানের এরকম কাজকামের অভাব তো নাই, বিশেষত আতংকদিবসগুলাতে, যখন পানির মধ্যে মাছগুলাও ভয়ে কাঁপতে থাকে। এমনি এক দিন আমি বৈসা বৈসা মুন জুস আর টার্কি সীডস-এর খোয়াব দেখতেছিলাম -- তখনি ঢুকল সে। তাকাইল আমার দিকে, কিন্তু দেখতে পাইল না। আয়নার সামনেই বসল, আমি দেখা দিলাম না।

“নিশ্চয় আমি আগডুম বাগডুম ভাবতেছি”, ফিসফিস করতেছিল জিরেল, “ঐটা অবশ্যই গাঁজাখুরি স্বপ্ন ছিল আমার।”

নাইটগাউন খুইল্যা উদাম হৈয়া দাঁড়াইল সে ঐখানে। জানতাম ওর স্বামী শহরে গেছে এবং গতরাত্রে স্ত্রীর সঙ্গে শুইছে, যদিও জিরেল এখনও গোসল কৈরা পুতপবিত্র হয় নাই। অথচ তালমুদ শরীফে আছে, কোনো স্ত্রীলোকের পবিত্র হৈতে দশখান শর্ত পূরণ করা লাগে, আর বেলেল্লা হৈতে যে কোন একটা শর্তের অপমানই যথেষ্ট। রয়েজি গ্লাইনের কন্যা জিরেল আসলে আমাকেই খুঁজতেছিল এবং ওকে বিষণ্ণ লাগতেছিল খুব। সে আমার, আমার, আমি ভাবলাম। আজরাইল তার বল্লমসহ তৈরি, হিংসুটে এক পিচ্চি শয়তান দোযখের মধ্যে মেয়েটার জন্য কড়াই বসাইতেছে, আরেক পাপী হতভাগির জন্য খড়িকাঠ টুকাইতেছে। সব তৈয়ার -- বরফের চাঁই আর জীবন্ত কয়লা, ওর জিহ্বার জন্য আংটা, স্তনের জন্য প্লায়ার্স, ওর যকৃত খাওয়ার জন্য ইঁদুরের পাল, আর পাকস্থলিতে কামড় বসানোর জন্য কৃমি। কিন্তু আমার ছোট্ট শিকার এসবের কিছুই টের পাইল না। সে নিজের বাম স্তনে হাত বুলায়া নিল, তারপর ডান স্তনে। তলপেট দেখল, তারপর পায়ের পাতা। সে কি এখন বই পড়বে? নখে পালিশ লাগাবে? চুল আঁচড়াবে? স্বামীর আনা আতরের গন্ধ বাইর হচ্ছে ওর গা থিকা, ভুর ভুর গোলাপগন্ধ। স্বামী ওকে প্রবালের যে নেকলেসটা উপহার দিছিল, সেইটাই পরে আছে সে। কিন্তু সর্প না থাকলে হাওয়াবিবি কেমনে হয়? শয়তান না থাকলে খোদার মাহাত্ম্য কি? জিরেল ছিল কামনায় একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ। বেশ্যার মত আতিপাতি কৈরা খুঁজতেছিল আমারে। কাঁপা-কাঁপা ঠোঁটে আবৃত্তি করল:

হাওয়ার মতন বেগে
গহীন পাতাল থেকে
কালো বিড়াল তুমি
নাগালে আসো, চুমি!
সিংহ বিক্রমে
মাছের বোবা প্রেমে
স্তব্ধ দেশের দেশী
নাও, তোমার ফুলরাশি!

শেষ শব্দটা আউড়ানমাত্র দেখা দিলাম আমি। আমারে দেখামাত্র ওর মুখ উজ্জ্বল হৈয়া উঠল।

“ও। তুমি এখানে?”

“চলে গেছিলাম”, বললাম, “কিন্তু ফিরা আসলাম।”

“কৈ ছিলা এই কয়দিন?”

“ছিলাম, যেখানে কোনো স্থান নাই সেইখানে। ছিলাম আসমোদিউসের দুর্গের কাছে, যে জঙ্গলটায় সোনার পাখি থাকে তার কাছে একটা বেশ্যাদের প্রাসাদ আছে সেইখানে।”

“এত দূরে?”

“আমার কথা একিন না হৈলে আসো আমার সাথে। পিঠে চাইপ্যা বস, শিং চাইপ্যা ধর, তোমারে লৈয়া পতপত ডানা ছড়াই আকাশে। দুইজনায় পাহাড়পর্বত ডিঙায়া উইড়া যামু সেইখানে।”

“কিন্তু আমার পরনে তো কিছুই নাই।”

“সেইখানে কেউ কাপড় পরে না।”

“আমার স্বামী জানবে না কোথায় গেছি আমি?”

“যা জানার তাড়াতাড়িই জানবে সে।”

“লাগবে কতক্ষণ যাইতে?”

“সেকেন্ডেরও কম।”

“ফিরব কখন?”

“সেইখানে গেলে কেউই ফিরতে চায় না।”

“কি করব আমি সেইখানে?”

“আসমোদিউসের কোলে বৈসা উনার দাড়ি দিয়া বেনী বানাইবা। আলমন্ড আর পোর্টার খাইবা। সন্ধ্যা হৈলে উনার সামনে নাচবা। তোমার গোড়ালিতে ঘণ্টি বাঁধা থাকবে, আর সব শয়তান নাচবে তোমারে ঘিরা।”

“তারপর?”

“আমার প্রভু খুশি হৈলে তুমি তারই হৈবা। আর না হৈলে উনার সাঙ্গপাঙ্গদের কেউ তোমার দায়িত্ব নিবে।”

“সকাল হৈলে?”

“সেইখানে সকাল নাই।”
“তুমি কি থাকবা আমার সঙ্গে?”

“তোমাকে নিতে পারলে আমার পুরস্কার জুটবে চূষার জন্য একখান হাড্ডি।”

“হায় রে অভাগা শয়তান, মায়া লাগতেছে তোর জন্য, কিন্তু আমি যাব না। আমার সোয়ামি আছে, পিতা আছে। সোনারূপা আছে, পোশাক আছে, ওল আছে। আমার জুতার হিল ক্রাশনিকে সবচে উঁচা।”

“ঠিক আছে। তাইলে বিদায়।”

“দাঁড়াও দাঁড়াও। এত তাড়াহুড়া ক্যান গো? কী করা লাগবে কও।”

“এইত লক্ষ্মী মেয়ের মত কথা। মন দিয়া শোন, সবচে শাদা যে ময়দা তার কাঁই বানাও প্রথম। তাতে মিশাও মধু, ঋতুস্রাব, নষ্ট ডিম, শুয়োরের চর্বি, ষাঁড়ের অন্ডকোষের চর্বি এক চামচ, এক কাপ মদ। সাবাথের দিন কয়লার আগুনে এইটা সিদ্ধ কর। তারপর স্বামীরে লৈয়া বিছানায় যাও এবং এইটা খাইতে দাও। মিছা কথা বৈলা বৈলা জাগায়া রাখ তারে, তারপর খোদা-না-খাস্তা কথা বৈলা ঘুম পাড়াও। যখন সে নাক ডাকতে শুরু করবে, তার অর্ধেক দাড়ি আর একটা কানের লতি কাইট্যা লও। লও যা সোনাদানা আছে, দেনমোহরের কাগজটা পুড়ায়া দাও, আর কাবিননামা ছিঁড়া ফালাও। সোনাদানা ফালায়া দাও কসাইটুলির জানলার নিচে, বাড়ি ছাড়ার আগে প্রার্থনার বই ডাস্টবিনে ফালায়া দাও, মেথুরা শরীফে থুথু ছিটাও, বিশেষত যেখানে যেখানে ‘শাদাই’ লেখা আছে সেই স্থানগুলায়। তারপর সোজা আস আমার কাছে। আমি তোমারে পিঠে নিয়া উড়ব ক্র্যাশনিক থিকা মরুভূমিতে। আমরা উড়ব ব্যাঙের বিষ্ঠাভরা মাঠের ওপর দিয়া, নেকড়েভরা জংলার ওপর দিয়া, সমকামীদের আখড়া ডিঙায়া -- যেখানে সাপ হৈল পন্ডিত, হায়েনা হৈল শিল্পী, কাক হৈল মৌলভী, চোরে দেখাশুনা করে খয়রাতির টাকা। সেইখানে সকল অসুন্দর হৈল সুন্দর, বাঁকা হৈল সোজা, নির্যাতন হৈল আরামদায়ক, ব্যঙ্গ হৈল অতি উচ্চ প্রশংসা। তাড়াতাড়ি কর, সময় খুব কম।”

“ভয় লাগতেছে পিচ্চি শয়তান, আমার খুউব ভয় লাগতেছে।”

“আমাদের সাথে গেলে প্রথম প্রথম সবারই লাগে।”

আরো কিছু জিগাইবার ইচ্ছা ছিল জিরেলের, হয়ত আমার বক্তব্যের স্ববিরোধ ধরার জন্য, কিন্তু পালাইলাম আমি। সে ওর ঠোঁট চাইপ্যা ধরল আয়নার মধ্যে, কিন্তু আমার লেজের একটুখানি নাগাল পাইল খালি।


৩.
ওর বাবা কাঁদল। স্বামী মাথার চুল ছিঁড়ল। চাকরবাকরেরা ওরে খুঁজল সেলারে আর বাড়ি-লাগোয়া উঠানে। ওর শাশুড়ি বেলচা দিয়া চিমনীর ভিতরটা পর্যন্ত খুচায়া দেখল। গরুর গাড়ির গাড়িয়াল আর কসাইরা ওরে তন্ন তন্ন কৈরা খুঁজল জঙ্গলে। রাতে টর্চ জ্বলল এখানে ওখানে আর তালাশকারীদের গলা ইকো হয়: “জিরেল, কোথায় তুমি? জিরেল! জিরেল!” সন্দেহ হৈল যে, সে কনভেন্টে পালায়া গিয়া থাকতে পারে। কিন্তু প্রিস্ট মশায় ক্রুশ ধৈরা কসম কাটল, জিরেলরে সে দেখে নাই। খোঁজাখুঁজির জন্য পাঠানো হৈল এক হাতসাফাইকারীকে, তারপর পাঠানো হৈল এক জাদুকর মহিলাকে যে কারো আদলে অবিকল মোমের মূর্তি বানাইতে পারে, শেষে পাঠানো হৈল আরেকজনকে যে জাদুর আয়না দিয়া মৃত বা নিখোঁজ মানুষের সন্ধান করতে পারে। কিন্তু যখন আমি আমার শিকার হাতে পাইয়া যাই, তখন দুনিয়ার কারো সাধ্য থাকে না তাকে ফিরায়া নিবার। ডানা ছড়াইলাম ওকে পিঠে নিয়া। জিরেল আমারে অনেক প্রশ্ন করল, কিন্তু জবাব দিলাম না। সোডম-এ পৌঁছার পর লট শালার বৌ-এর কাছে থামলাম একপলক। তিনটা বলদে তখন ঐ বেটির নাক চুষতে ছিল। লট শালা শুইছিল গুহায় ওর মাইয়াগুলার সাথে, বরাবরের মতই মাতাল।

ছায়ার এই জগতে সবকিছুই পরিবর্তনশীল, কিন্তু আমাদের জগতে সময় একেবারে স্থির। এইখানে বাবা আদম এখনও ল্যাংটা, হাওয়াকে এখনও সাপে ফুসলাইতেছে। হাবিল মারতেছে কাবিলকে, রক্তচোষা নীলমাছি শুইতেছে হাতির সাথে, বেহেশত থিকা নামতেছে ঝর্ণাধারা, মিশর দেশে হাতে কাদা ঠেলতেছে ইহুদীরা, শরীর চুলকাইতেছে জব। যতক্ষণ সময় প্রবাহিত হয়, চুলকাইতেই থাকবে সে, কিন্তু আরাম পাইবে না সে কোনোদিন।

জিরেল কী যেন কথা কৈতে চাইছিল, কিন্তু পাখা ঝাপটায়া আমি লাপাত্তা হৈয়া গেলাম। আমার কাজ শেষ। গিয়া প্রাসাদের অনেক উঁচু কার্ণিশে বাদুড়ের মত ঝুলতে থাকলাম, চোখ খোলা কিন্তু দৃষ্টি নাই চোখে। দুনিয়া হৈল বাদামি আর বেহেশত হৈল হলুদ। বৃত্তাকারে দাঁড়ায়া শয়তানগুলা লেজ নাচাইতেছিল। দুইটা কাছিম ছিল টাইট জড়াজড়ি অবস্থায়, একটা পুরুষ পাথর উপগত একটা নারীপাথরের ওপর। শাব্রিরি আর বারিরি উপস্থিত হৈল। শাব্রিরির জন্ম হৈছে একটা বর্গক্ষেত্রের আকার থিকা। তার মাথায় টুপি, হাতে বাঁকা তলোয়ার। তার পা-গুলা হাঁসের, কিন্তু ছাগলের মত দাড়ি আছে মুখে। নাকের ওপরে জোড়া চশমা আছে তার, কথা বলে জর্মন উচ্চারণে। আর বারিরি একইসঙ্গে বানর, টিয়া, ইঁদুর এবং বাদুড়। শাব্রিরি আর বারিরি মাথা নোয়াইল একটু, তারপর শুরু করল বিদূষক স্টাইলে:

আর্গিন মার্গিন
সস্তায় বেছে নিন
কিউট এক দোয়েল
নাম তার জিরেল
(তার) খোলা দরজা
(তাই) প্রেমে খুব মজা!

শাব্রিরি যখন জিরেলকে বাহু বাঁধনে ধরতে গেল, চেঁচাইল বারিরি, “ ওরে তোর শরীরে হাত দিতে দিবি না মাগি! মাথায় খুঁজলি-প্যাঁচড়া আছে ওর, পায়ের মধ্যে ঘা, মেয়েমানুষরে মজা দিবার ক্ষমতা নাই ওর। মুখে ফটফট, খাসি করা মোরগও ওর থেইকা ভাল। এরকম ওর বাপেও ছিল, দাদাও। তার চাইতে আয়, প্রেম করবি আমার সাথে, আমি মিথ্যারাজের নাতি। তাছাড়া আমার মেলা টাকাপয়সা আছে, ফ্যামিলিও ভাল। আমার দাদী ছিল নামা-র কন্যা ম্যাকলাথের সখী। আসমোদিউসের পা ধোয়াইয়া দিত আমার মা। আমার বাবা, চির দোযখনসীব হোক তার, বইত শয়তানের নস্যির বাক্স।”

এইভাবে শাব্রিরি আর বারিরি জিরেলের চুল ধৈরা টানাটানি করতে আরম্ভ করল, প্রতিবার টানের সাথে তারা জিরেলের গোছা গোছা চুল উপড়ায়া ফেলতে লাগল। তখনি জিরেল তার অবস্থাটা পুরাপুরি বুঝল এবং ‘ছাইড়া দেও ছাইড়া দেও’ বলে চিৎকার করতে লাগল।

“কী নিয়া লোফালুফি চলতেছে?” কেটেভ মারিরি জিগায়।
“ক্রাশনিকের একটা ছিনাল।”
“ভাল কিছু পাওয়া গেল না?”
“নাহ। ঐটাই ঐখানে ভাল।”
“আনল কে?”
“একটা পিচ্চি শয়তান।”
“ঠিক আছে। আবার শুরু কর।”
“বাঁচাও বাঁচাও।” জিরেল গোঙ্গাইতে থাকল।
“ঝুলায়া দাও ঐটারে”, ক্রোধের পুত্র র‌্যাথ চেঁচাইল, “কাইন্দা কোনো লাভ নাই মাগী। এইখানে সময় লড়েচড়ে না। যা বলা হৈছে কর, তুই এখানে জোয়ানও না, বুড়িও না।”

জিরেল কান্নায় ভাইঙ্গা পড়ল। ওর হিক্কা আর বিলাপের শব্দে লিলিথের ঘুম চটকায়া গেল। আসমোদিউসের দাড়ির ভিতর থিকা মুখ বাইর করল সে, ওর মাথার প্রতিটা চুল হৈতেছে একেকটা কিলবিল-করা সাপ।

“মাগিটার সমস্যা কি?” জিগাইল লিলিথ, “চেঁচাইতেছে ক্যান?”
“ওরা শুরু করছে ওর ওপর।”
“আরো একটু লবণ মিশায়া নিতে ক”
“আর আগে চর্বি ছাড়ায়া নিতে ক”

এই মশকরা চলল হাজার হাজার বছর ধৈরা, তারপরেও প্রেতচক্রের ক্লান্তি নাই। প্রতিটা শয়তান তার তার করণীয় সারল, প্রতিটা পিচ্চি শয়তান তার তার মত মজা নিল। ওরা টানল, ছিঁড়ল, কামড়াইল আর চিমটাইল। পুরুষ শয়তানগুলা এত খারাপ না, মাদী শয়তানগুলা হৈতেছে ভয়ানক Ñ আদেশ দিল: খালি হাতে স্যুপ বানাবি! আঙুল ছাড়া বিনুনী করবি! পানি ছাড়া ধোয়ামোছা করবি! গরম বালুর মধ্যে মাছ ধরবি! না ভিজ্যা গোসল করবি! বাড়িতে থাকবি এবং রাস্তায় হাঁটবি! পাথর দিয়া মাখন তৈয়ার করবি! বোতল ভাঙ্গবি কিন্তু মদ ফেলতে পারবি না!!

খোদা বৈলা কি কেউ আছেন? তিনি কি আসলেই দয়াশীল? জিরেল কি কোনোদিন মুক্তি পাবে? সৃষ্টির গোড়াতেই কি সাপের সাথে অশুভের যোগ ছিল? আমি কেমনে বলি? আমি তো ছোট্ট একটা শয়তানমাত্র। পিচ্চি শয়তানদের পদোন্নতি হয় না খুব একটা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে যায়, এক জিরেলের পর আরেক জিরেল, অযুত অযুত প্রতিচ্ছবির উস্কানি, অযুত অযুত আয়নার ভিতর।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28923559 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28923559 2009-03-13 01:09:24
সামহোয়ারনামা ৩
যেসব নিকের কথা এর আগের পোস্টে বলেছি, যাদের গালির তুবড়ি ফুটেছে আমার আগের পোস্টেও, এরা বড় দুঃখী। এদের আয়ু সীমিত। জননাঙ্গ নেই, শুধু দুধদাঁত দিয়ে এখানে ওখানে কামড় দিতে পারে। কখনো কখনো বাদুড়ের মত সন্ধ্যার আকাশে খানিক উড়াউড়ি করে। এতেই আনন্দ এদের। মাঝে মাঝে, বেশি বিরক্ত হলে আমি তাদের চিমটা দিয়ে ধরে মডারেশন প‌্যানেলে রেখে দিই। ছটফট করতে থাকে তারা, শ্বাস নিতে পারে না। নিজেকে তখন শিশুনির্যাতক মনে হয়। ছেড়ে দিই কাউকে কাউকে। কিন্তু ততক্ষণে আয়ু ফুরিয়ে এসেছে তার, কর্তৃপক্ষের সমন এসেছে ঘরে। ডানা কেটে দেয়া হয়েছে শিশুনিকের। ফলে ঐ বাধ্য শিশুভ্যাম্পায়ারকে মুক্ত করে দেয় ড্রাকুলা। আছর করে অন্য কোনো নিকে। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া ঐ নিকগুলোকে কেউ মনে রাখে না। আলাদা করে মনে রাখবার মত কোনো বৈশিষ্ট্যও থাকে না এদের।

পুরাকালে মিথিলা নামে একটা নিক ছিল। ঐ নারীনিকটির মৃত্যুতে শোকের তুফান উঠেছিল সামহোয়ারে। সেসময় আমি ছিলাম না এই ঘরে। শোকের মাতমের শব্দ কিছু শুনেছি সচলায়তনে বসে বসে।

নিক নিয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটান কৌশিক। তিনি একবার কৌশিক নামে তার আইডিটাকে ওপেন করে দেন। এর অর্থ যে কোনো ব্লগার "কৌশিক" নিক নিয়ে মন্তব্য বা পোস্ট লিখতে পারবে। হলও তাই। কৌশিক নিকটি হয়ে উঠল একটা জ্বলজ্যান্ত পরস্পরবিরোধিতা, একটা অ্যাবসলিউট নন-ইউনিফর্মিটি! কখনো কৌশিক বলছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, কখনো বলছে জামাতের পক্ষে! কম্যুনিটি ব্লগে, যেখানে গোষ্ঠী মতাদর্শই ব্যক্তিপরিচয়ের স্মারক, সেখানে "কৌশিক" নিকটি কিছুদিনের জন্য হলেও একটা এনার্কি তৈরি করেছিল।

আলিফ দেওয়ান নিকটি এসেছিল মূলত আমাকে, মামো-কে এবং রাইসুকে উত্যক্ত করার জন্য। কিন্তু অন্যান্য নিক থেকে বিশিষ্ট হয়ে উঠে সে কিছুদিনের মধ্যেই। একটি বিশেষ ভাষাব্যবস্থা এবং আদব লেহাজের প্রচলন ঘটানোর কারণে। অনুসারী তৈরি হতে থাকে তার। অনুমান করি, এই শিশুভ্যাম্পায়ারটি যে পরিচয় অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল তা হয়ত তার প্রভু ড্রাকুলার বিশেষ পছন্দ হয় নাই। বা আলিফ দেওয়ান তার প্রভু ড্রাকুলার মধ্যেও হয়তো পরিচয়-সংকট তৈরি করেছিল। এখন তাকে দেখা যায় না আর, কিন্তু ব্যান না-হয়ে থাকলে এই পোস্ট পড়ার পর আরেকবার উঁকি দেবে সে, মনে হয়।

সেই বিচারে লোকালটক নিকের প্রভু ড্রাকুলাটি অনেক বেশি লিবারাল। বাড়তে দিয়েছে সে এই নিকটিকে যথেচ্ছমত। অনুমান করি, লোকালটকের প্রভু নিজ নামে সামহোয়ারে নিশ্চয়ই ব্লগান, কিন্তু লোকালটককে দাঁড় করাতে গিয়ে তিনি নিজের আসল পাতায় হয়তো নিজের অনেক বৈশিষ্ট্য এবং কর্মকান্ডই হাজির রাখেন না। নিকের জন্য এতখানি "স্যাক্রিফাইস" অন্য প্রভুদের করতে দেখা যায় না। আমরা অনেক নিককে চিনি তাদের প্রভুদের পরিচয়ে, যেমন অপ বাক মানে রাসেল (.....), চোর মানে অচ্ছুৎ বলাই ইত্যাদি। মনোগ্যামাস তারা। একমুখে দুইকথা বলতে শিখেন নাই। কিন্তু লোকালটকের প্রভু সেটা ভালভাবেই পারেন। এভাবে শিশু ভ্যাম্পায়ার থেকে নিজেই ড্রাকুলা হয়ে উঠে এই নিকটি। এমন কি আছর করতে শুরু করে পরিচয় গোপন না-করা ব্লগারদের ওপর। যেমন কৌশিককে ভর করে লোকালটক "অপরবাস্তব" সম্পাদনা করেছে গত বইমেলায়। ভার্চুয়াল আইডেন্টিটি হিসাবে লোকালটককে তার পূর্ববর্তী নিক-ট্র্যাডিশন থেকে একটা পরিষ্কার ডিপার্চার মনে হয়েছে।


সামহোয়ারনামা ১
সামহোয়ারনামা ২ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28921927 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28921927 2009-03-09 14:18:18
সামহোয়ারনামা ২
ব্রাত্য রাইসুর ক্ষেত্রে ঘটেছে তাই। মাহবুব মোর্শেদের ক্ষেত্রেও। "রাইসু এক্সপ্রেস" ছুটেছে খানাখন্দ ডোবাজংলা দিয়ে একেবেঁকে, যেসব ষ্টেশন আন্তঃনগর ট্রেনের অবজ্ঞা নিয়ে দীর্ঘদিন সাপের মত রেললাইন পাহারা দেয়, রাইসু থেমেছে সেসব ষ্টেশনে। গোপন উত্তেজনা নিয়ে আমরা তাই রাইসুর বয়ান শুনেছি.... মরিচা-ধরা অকশনে-ওঠা লোহাকে শাণ দিয়ে দিয়ে সে ঝা চকচকে রেলবগি করে হাজির করেছে আমাদের সামনে। ফলে অপরাহ্নের ছোট্ট গঙ্গাসাগর রেলষ্টেশন ক্ষণিকের জন্য হলেও তার দৃশ্যমূল্যের বাইরে গন্তব্যমূল্য দাবি করতে শুরু করেছে। তার সাহসকে সম্বল করেই আমরা চেন টেনে নেমে পড়েছি ট্রেন থেকে, প্রায়ান্ধকার গঙ্গাসাগরে, কোন কোন অপরূপ মুহূর্তে।

পলেমিকসের এই অচলিত প্রয়োগ কখনই স্বস্তি দেয়নি আমাদের দুইমাত্রার নিকসমাজকে। চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার হয়েছে রাইসুর, মাহবুব মোর্শেদেরও। মাহবুব তবু কিছুদিন সমানে সমানে লড়েছে, রাইসু স্রেফ গালি খেয়েই গেছে বোধ হয়। গালি খেয়েছে, জুতা খেয়েছে, সেই জুতা যখন সে শিরোধার্য করল, তখনই হবুচন্দ্র রাজার ঘুম ভাঙল। রাষ্ট্রনীতির অপমান খুঁজে পেল রাজা! টাইমিং বটে!

আজ রাইসুর পাতায় যখন যাই, সেখানে হেমন্ত ঋতু, ধান-কাটা ধু ধু মাঠের উপরে নিঃস্ব রিক্ত চাঁদ। মাহবুব মোর্শেদের পাতায় দেখছিলাম লেখা আছে "এইখানে ব্লগিং বন্ধ। জরুরি স্থানান্তর চলছে"। আজ দেখলাম সেই মাঠও খালি, শুধু এপিটাফসদৃশ "গুডবাই সামহোয়ারইন"! রাইসু এখন ফেসবুকে, মাহবুব মোর্শেদ "মডারেশন" হয়ে গেলেন!

এরা হয়তো আর সামহোয়ারইনে লিখবেন না। আমি মিস করবো এদের। অনেকেই করবেন হয়তো। এদের ব্লগিং এর ইতিহাস তাই বলে।

কিন্তু পোস্টমডার্ন মিডিয়া বলে কথা! ফ্র্যাগমেন্টেশন হতে থাকে আমাদের স্মৃতির ভেতর। মিডিয়া এবং মতাদর্শের প্রপাগান্ডা আমাদের স্মৃতিহরণ করতে থাকে, আমরা মুহূর্তের ভেতর বাঁচি, স্বল্পস্থায়ী এবং ভাঙা ভাঙা এপিসোড দিয়ে দিয়ে আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে থাকে। ব্লগমিডিয়ার অভিধানে "অমরত্ব" বলে কিছু নেই, তুমি ততদিনই বর্তমান যতদিন তুমি প্রথম পাতায়, তুমি ততদিনই অমর যতদিন তুমি স্টিকি! পিংকি পিংকি, হীরা জ্বলছে অনিদ্রার!!

সামহোয়ারনামা ১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28921712 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28921712 2009-03-09 02:39:45
স্লামডগ মিলিয়নিয়ার: পরিবেশন ও গ্রহণের রাজনীতি

এবারের অস্কার পাওয়া ছবি স্লামডগ মিলিওনিয়ার এর কাহিনী ভারতের মুম্বাই শহরের ধারাবি বস্তির প্রেক্ষাপটে দুই ভাই সেলিম আর জামালের বেড়ে ওঠার কাহিনী। ভারতের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো “কৌন বনেগা ক্রোড়পতি”তে অংশ নিয়ে বস্তির ছেলে তরুণ চা-ওয়ালা জামাল কীভাবে বিশ মিলিয়ন রূপি জিতে যায়, তার ওপর ভিত্তি করেই এই ছবি। ক্রোড়পতি অনুষ্ঠানে জামাল যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, সেসবের জবাব সে তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দিয়ে দেয়। আর এই জবাবগুলো সাজিয়ে তোলে জামাল নামের এক স্লামডগের মিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠার কাহিনী।
স্লামডগ মিলিয়নিয়ার য়ুরোপ-আমেরিকায় প্রশংসিত হলেও দারুণভাবে সমালোচিত হয়েছে ভারতে। বিশেষত বস্তিবাসীর মাঝে। তারা এই ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে মিছিল করেছে, হাতে “আমরা স্লামডগ নই” প্ল্যাকার্ড নিয়ে। তাদের মতে, স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিতে বস্তির যে জীবন দেখানো হয়েছে তা অত্যন্ত একতরফা এবং অসত্য। অবমাননাকরও বটে। আবার বলিউডের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা বলছেন এই ছবি আসলে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ভারতের ওপর তৈরি হয়েছে মাত্র। এই ছবির কাহিনীক্রম বাস্তবানূগ নয়। এমনকি সালমান রূশদীও বলেন যে এই ছবির গল্পে অনেক ফাঁক রয়েছে এবং “it piles impossibilities on impossibilities” অর্থাৎ এক অসম্ভবের ইটের ওপর আরেক অসম্ভবের ইট সাজিয়ে বানানো হয়েছে স্লামডগের দালান। এই দালান পশ্চিমাদের। তারা যেভাবে ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়াকে দেখতে চায়, এই ছবি তারই মূর্ত চেহারা।

অবাক লাগে, সালমান রূশদীর মত ঔপন্যাসিক কেন বাস্তবের সাথে পাই পাই করে মিলিয়ে এই ছবির রস গ্রহণ করতে ব্রতী হলেন? স্লামডগ তো ডকুমেন্টারি ছবি নয়, একটা ফিকশনমাত্র। আর এই ফিকশনটি যিনি লিখেছেন, সেই বিকাশ স্বরূপ নিজেও একজন ভারতীয়। তাঁর উপন্যাসটি যখন কমনওয়েলথ পুরষ্কারের শর্টলিস্টে ছিল তখন কিন্তু এর কাহিনী নিয়ে কোনো বিতর্ক উঠেনি। বিকাশ স্বরূপ তাঁর উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে শরণ নিয়েছেন সত্তর দশকের ব্লকবাস্টার “দিওয়ার” ছবির কাছে। স্লামডগ মিলিওনিয়ার বানাতে এসে ডেভিড বয়েল যশ চোপড়ার “দিওয়ার” দেখেছেন, রাম গোপাল ভার্মার “সত্য” দেখেছেন, মীরা নায়ারের “সালাম বোম্বে” দেখেছেন। এসব ছবির অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ভারতের বস্তি জিনিসটা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

সত্তর দশকের হিন্দি ছবির ইতিহাস অমিতাভ বচ্চনের স্লামহিরো হয়ে ওঠার ইতিহাস প্রায় সমার্থক। “দিওয়ার” থেকে “কুলি” পর্যন্ত অমিতাভের যে ইমেজ জনমানসে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা আসলে স্লামহিরোর ইমেজ। এসব ছবিতে দেখা যায়, বস্তি মানেই মাদক, নারীব্যবসা এবং অন্যান্য অপরাধের আখড়া। যাবতীয় অন্যায় অবিচার সেখানে গরিব মানুষেরা যুগের পর যুগ নীরবে সহ্য করে, যতক্ষণ না একজন অমিতাভ বচ্চন তাদের মাঝ থেকে রূখে দাঁড়ায়। এটি এমন একটি জনপ্রিয় ফর্মূলা হয়ে গেছিল, যার কারণে আশীষ নন্দী বলতে বাধ্য হন যে, ভারতের চলচ্চিত্র হল ভারতের বস্তির বাইপ্রডাক্ট, একইভাবে ভারতের বস্তি ভারতীয় চলচ্চিত্র থেকে উদ্ভূত। কুটনীতিক লেখক বিকাশ স্বরূপ তাঁর বস্তি ধার করেছেন “দিওয়ার” ছবি থেকে, পরিচালক ড্যানি বয়েল তাঁর বস্তি ধার করেছেন বিকাশ স্বরূপের উপন্যাস থেকে, এভাবে ২০০৯ সালের স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিটি যে বস্তিকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে তা কমপক্ষে চল্লিশ বছরের পুরনো। হ্যাঁ, স্লামডগের বস্তি সত্তর দশকেরই বস্তি। বস্তির এই চেহারাটাই রূপালি পর্দার ফিতায় এযাবতকাল বন্দী, সে আপনি “দিওয়ার”ই বলুন, কিংবা “সিটি অব জয়”ই বলুন।

এটাই মূলত স্লামডগ মিলিয়নিয়ার নিয়ে যাবতীয় অসন্তোষের মূল কারণ। ছবির কাহিনী মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তির (যদিও শুটিং হয়েছে জুহু নামক বস্তিতে) যেটি এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৫ লাখ মানুষ অধ্যুষিত ধারাবি বস্তিতে জীবন এ ধরনের অনিশ্চয়তা আর সহিংসতায় ভরা নয়। কথায় কথায় উচ্ছেদ, আগুন আর দাঙ্গা ধারাবি বস্তিতে রীতিমত অসম্ভব, বস্তিবাসী সেখানে অনেক সংগঠিত। দক্ষিণ এশিয়ার যে কোন বড় বস্তির ক্ষেত্রেই কমবেশি এ কথা খাটে, সেটা মুম্বাইয়ের ধারাবী হোক কিংবা ঢাকার কড়াইলই হোক। নানান রকমের সংগঠন আছে সেখানে, আছে হাজার রকমের এনজিও আর তাদের কার্যক্রম। তাছাড়া ভিতর থেকে হোক বা বাইরে থেকেই হোক, এসব বস্তির ওপরে আছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নিবিড় পরিবীক্ষণ। ফলে, স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিতে শিশু সেলিম ও জামাল যেভাবে মাতৃহারা ও গৃহহারা হল সেটা অবিশ্বাস্য ঠেকে।

এখন কথা হল, চলচ্চিত্রকে কি বিশ্বাস্য হতেই হবে? অন্যান্য প্রেক্ষাপটে বানানো চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আমরা বিশ্বাস অবিশ্বাসের দাড়িপাল্লা সামনে এতটা রাখি না। কিন্তু নগর গরিবের কাছে বস্তি শুধু একটা থাকার জায়গা নয়, একটা মতাদর্শও বটে। শহরের জীবনে প্রবেশ করার সাথে সাথেই এই মতাদর্শের মালা তার গলায় পরিয়ে দেয়া হয়। উচ্চবর্গের যাবতীয় সন্দেহ, তাচ্ছিল্য আর শোষণের বিপরীতে বস্তিবাসীর মূল সংগ্রামটাই আসলে ব্যক্তিগত মর্যাদাবোধ পুনরুদ্ধারের, ইরানী তাত্ত্বিক আসেফ বায়াত যেমন বলেন। যে কারণে দেখা যায় বস্তিতে মাদক কিংবা নারীব্যবসার হোতারা কেউ বস্তিবাসী নন, খোদ বস্তিবাসীরা এসব থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু আমরা আমাদের স্বভাবজাত তাচ্ছিল্য থেকে এসবই বস্তির ঘটনা বলে ধরে নিই। এই প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রের বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার দাবি জোরালো নিশ্চয়ই, যেহেতু বস্তি স্রেফ কোনো স্থান নয়, একটা মতাদর্শও। স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিতে বস্তির যে জীবন তা মতাদর্শ হিসেবে বস্তিকে অবমাননা করে।

আগেই বলেছি, স্লামডগ মিলিয়নিয়ার পশ্চিমকে বেশ দ্রুতই তৃপ্ত করেছে। বস্তি, দারিদ্র, নারীব্যবসা, শিশুনির্যাতন মিলিয়ে ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার যে ছবিটা পশ্চিমের মনে এতকাল গাঁথা, এই ছবি তাতে ষোল আনা তাল দিয়েছে। একই সঙ্গে এই ছবি বলিউডি ছবির দুর্দান্ত দাপটকে সমীহ করার এবং একটা অংশীদারীর ভিত্তিতে ব্যবসা করার নতুন একটা রোডম্যাপ হাজির করেছে। মনে রাখতে হবে, আশি’র দশকে হলিউডি ছবি ভারতের বাজারে এসে যাচ্ছেতাই মার খেয়েছিল। এবার কিন্তু এরকম হয় নি। প্রতিবাদ হয়েছে, ছবি ফ্লপ হয়নি। তাই এবারের অস্কার সম্মাননা মূলত ভারতীয় ছবির বাজারকে সঠিকভাবে অনুধাবন করবার স্বীকৃতি। এর অর্থ এই নয় যে স্লামডগ মিলিয়নিয়ার একটা কপিক্যাট ছবি। নতুনত্ব আছে এখানে। আর সেটি হল, সম্ভবত এই প্রথম একটা রিয়েলিটি শো-র ফর্ম্যাটে টেলিভিশন মিডিয়াটি চলচ্চিত্রের ওপর খুব অর্থপূর্ণভাবে দাপট দেখিয়ে গেল গোটা ছবি জুড়ে। রিয়েলিটি শো-গুলো টেলিভিশনকে অনেক বেশি মিথষ্ক্রিয়ামূলক করে ফেলেছে সা¤প্রতিককালে। সেটাকেই স্বীকৃতি দিল চলচ্চিত্র, যার ফলে কলসেন্টারের চা-ওয়ালা জামালের কোটিপতি হবার যাত্রায় আমরাও রূদ্ধশ্বাস সামিল হয়ে পড়ি।

*৭ মার্চ ২০০৯ প্রথম আলো-য় প্রকাশিত]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28920982 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28920982 2009-03-07 12:41:44
সামহোয়ারনামা ১
কালের চক্কর বড় সাংঘাতিক! সচলায়তন থেকে সরে এসে আমি আমার সামহোয়ারের পুরনো অ্যাকাউন্ট ঝেড়েমুছে আবার শুরু করলাম। এ যাত্রা আমার সারথী হলেন কৌশিক। সামহোয়ারে এসে পুরনো সচল-বান্ধবদের অনেককেই পেলাম। তারা যে সবাই আমায় সাদরে নিলেন এমন নয়। কিন্তু রাইসু আছেন, আছেন মাহবুব মোর্শেদ, কৌশিক এবং আরো অনেক পরিচিত মুখ। বিশাল বিশাল সব জাহাজ, তাদের পাশে আমার ছোট্ট ডিঙাখানা ভাসালাম আবার "বদর বদর" বলে।

ভেসে দেখলাম, বাহ! হারাচ্ছি না তো এই বদরগঞ্জের হাটে!! সামহোয়ার বিশাল গ্রাম, কিন্তু ছোট ছোট অনেক পাড়া আছে সেখানে। পাড়ায় পাড়ায় মাসুতুতো ভাই নয়, কিন্তু পাড়ার ভেতর পাড়াতুতো ভাই অনেক। আমি সামহোয়ারের নানান ছোট ছোট পাড়ায় ঘুরে বেড়াই। ছোট ছোট সমাজব্যবস্থা দেখি। দেখি তারা নিজেরা নিজেদের সমাজে কত ফূর্তি নিয়ে আছে। এক পাড়ার লোকের অন্য পাড়ায় খুব যাওয়া পড়ে না। কাঁঠালবাগানের লিটুর প্রিয় লেখক কাঁঠালবাগানের জিতু! পোস্টমডার্নিটি!

কিছু কিছু পাড়া আছে, বড়। এসব পাড়ায় আনপাড়ার লোকজন আসে, নানান ফন্দি নিয়ে। পাড়ায় পাড়ায় গ্যাঞ্জাম থাকে, লেঠেলবাজি চলে। আছে নানান রকমের অস্ত্র, নানান বর্ণের নিক। এই নিকসকল দিনরাতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। পাড়া ছাড়িয়ে এমন কি গ্রামে গ্রামান্তরে, সামহোয়ার, আমারব্লগ, সচলায়তন, ফেসবুক.... আরো নানান ঠিকানায়। তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনিয়ে শুনিয়ে ছোট ছোট পাড়ার শিশু ব্লগারদের ঘুম পাড়ায় ব্লগজননী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28920702 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28920702 2009-03-06 15:42:42
বিডিআর বিদ্রোহ থেকে আর্মি ম্যাসাকার: দুলছে মিডিয়া-পেন্ডুলাম!
শুরুর দিকে, ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় এই ঘটনাটি ছিল বিডিআর বিদ্রোহ। একে সাম্প্রতিক কালের আনসার বিদ্রোহ এমনকি ক্ল্যাসিক সিপাহী বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় ফোকাস করার চেষ্টা হয়েছে। করেছে কে? মিডিয়া। তাদের সুবাদে দেখলাম পিলখানার গেটের কাছে জড়ো হওয়া আম-পাবলিকও যেন এই বিদ্রোহে মনে মনে সামিল! এটা "সিপাহী" বিদ্রোহ হলেও এর অভিমুখ যেন "সিপাহী-জনতা" অভ্যুত্থানের দিকে। অন্তত মোরাল সাপোর্ট বিডিআর পেয়ে গেছে, প্রথমদিন এমনটাই ইংগিত দিয়েছে আমাদের মিডিয়া।

আমরা ভাবতে শুরু করেছি, এটা শ্রেণীসংগ্রাম। "নির্যাতিত" শ্রেণী তার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভুর বিরূদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। শ্রেণীসংগ্রামের আদলে ভাবলে বিষয়টার রক্তারক্তি ভুলে গিয়ে একে একটা ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য দিয়ে দেয়া যায়! খুব করে বলা হল, বিডিআর কিভাবে নির্যাতিত হয়েছে। অপারেশন ডালভাত কিভাবে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। কিভাবে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। টেলিভিশন তাদের সমব্যথী, নিউজ এজেন্সিগুলোও তাই, আর তার মূর্ত চেহারা আমরা দেখলাম ব্লগে। ব্যক্তিগত কথোপকথনে। বিডিআর যেন নির্যাতিত জনগণের একটা অংশ, তাই তাদের বিদ্রোহ ঐতিহাসিক।

লক্ষ্য রাখতে হবে, যে সময়টা আমরা বিডিআর সম্পর্কে মিডিয়ার এই ভাষ্য শুনছি এবং ইন্টার্নালাইজ করছি, সেই সময়টাতেই তারা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করছে তাদের অফিসারদের ওপর, গণকবর দিচ্ছে, বা ম্যানহোলে ফেলে দিচ্ছে ডেডবডি। হামলা করছে বাড়িঘরে, শ্লীলতাহানি করছে, শিশুহত্যাও করছে, আবার তাদের এলোপাথাড়ি গুলিতে মারা যাচ্ছে নিরীহ রিক্সাঅলা, পথচারী।

আবার, যখনি কিনা এই "বিদ্রোহ"এর ভবিতব্য স্পষ্ট হয়ে এল, বাইরে পজিশন নেয়া আর্মি-র লং-রেঞ্জ অস্ত্রের নিশানায় তাদেরও লাশ পড়তে লাগল, অস্ত্র সমর্পণ করল বিডিআর, পালাতে গিয়ে লাশ হতে লাগল তারা, গ্রেফতার হয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, মিডিয়ার কল্যাণে আমরা তখনি দেখতে শুরু করলাম নিহত আর্মি অফিসারদের শোকাকূল আত্মীয়স্বজনের চেহারা, জানতে শুরু করলাম তাদের মেধা ও প্রতিভার কথা, পিলখানার দখল নিয়ে নিল পুলিশ, কিন্তু আত্ম-সমর্পণকারী বিডিআর সদস্যদের ধরে নিয়ে যেতে লাগল আর্মি এবং র্যাব, তখন, যারা বিডিআর-সমব্যথী হয়ে উঠেছিলাম, এতক্ষণে আমরা তাদের কাপুরুষতার পরিচয় পেতে শুরু করেছি, তাদের নৃশংসতায় আমাদের গা শিউরে উঠছে, তারা যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার অযোগ্য এ বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় আর নেই।

গত দুইদিনে এভাবেই আমাদের দুলিয়েছে মিডিয়া-পেন্ডুলাম। ঢাকায় থেকেও আমরা ঘটনার সাথে রিয়েল-টাইমে রিঅ্যাক্ট করতে পারছি না, রিঅ্যাক্ট করছি মিডিয়া-টাইমে। অর্থাৎ আমার রিঅ্যাকশনের মুহূর্তগুলো তৈরি করছে মিডিয়া। ফলে এটা আমার কাছে অনেকখানিই মিডিয়া-ইভেন্ট, এমনকি বাতাসে বারূদের গন্ধ পাবার পরেও।

হয়তো এই ঘটনার পেছনে জাতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কোনোদিন উদ্ঘাটিত হবে। হয়তো হবে না। হয়তো ষড়যন্ত্রের হদিস পাওয়া গেলেও আমরা সেটা জানবো না। ধরা-পড়া বিডিআর সদস্যদের অনেকেই হয়তো ফায়ারিং স্কোয়াডে যাবে, কিন্তু তাদের লাশ ঘিরে তাদের স্বজনদের গুমড়ানো কান্না আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে মিডিয়া সেখানে যাবে না। আমরা এই নিহতদেরকেই মনে রাখবো, আর্মি অফিসারদের স্বজনদের আহাজারিতেই বহুদিন আমাদের মন ভারি হয়ে থাকবে, শেষ পর্যন্ত এটা আর্মি ম্যাসাকার ট্রাজেডি হয়েই থাকবে।

মনে পড়ছে, টেলিভিশনে প্রথম দিন বিডিআর-এর মাইকিং দেখছিলাম। আর্মি অফিসারদের মেরে কেটে গণকবর দিয়ে এসে জনতার সমর্থন পাবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। সেই সমর্থন কিভাবে তৈরি হয় তাদের সেই ধারণা ছিল না। তারা জানতো না সেটা বায়বীয়, আর্টিকুলেটেড। একটা পেন্ডুলাম, এদিক থেকে ওদিক দোলাই তার নিয়তি। এই রশি টানাটানির খেলায় শক্তিমানেরই জয় হয়েছে।

সব শ্রেণীসংঘাতই মহৎ নয়। অর্থবহ নয়। কারণ, দুটো শ্রেণী লড়ছে আর বাকি সব ভেরিয়েবল স্থির হয়ে বসে আছে এমন তো নয়। ক্রুদ্ধতা এবং নৃশংসতা দিয়ে হয়তো শ্রেণীসংগ্রাম হয়, কিন্তু মুর্খতা দিয়ে হয় না। শুধু ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়েই বিডিআর এই মুর্খতার মূল্য দেবে এমনটা নয়, মূল্য দেবে সে ইতিহাসের পাতায় খলনায়ক হয়ে থেকে গিয়ে। যে শ্রেণীশোষণের এমন নৃশংস প্রতিবাদ তারা করেছে, শুধু প্রতিবাদের ধরনটির কারণেই তারা নিজেদের ওপর শোষণ আরো পাকাপোক্ত করল। তারা খুন করল তাদের কমান্ডিং অফিসারদের, সেই সাথে তারা খুন করল তাদের শোষণমুক্তির সম্ভাবনাকেও।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28917657 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28917657 2009-02-27 21:44:24
আজকে আমার ভাগ্যে যা যা ঘটতে যাচ্ছে " style="border:0;" />

প্রথম আলো পত্রিকার জ্যোতিষী এসব কথা লিখেছেন।

জ্যোতিষশাস্ত্রে আমার স্ট্র্যাটেজিক আস্থা আছে। সেটা ২০০১ সালের কথা। সরকারি কলেজে চাকরি, এক মফস্বলের কলেজে পোস্টিং। বৌ-এর ঢাকায় চাকরি, বাচ্চা ছোট, ফলে আমাকে ঢাকা-মফস্বল যাওয়া-আসা করতে হয়। চার ঘণ্টার জার্নি, যাওয়া-আসা মিলিয়ে আট ঘণ্টা। প্রতিদিন দুটা করে ক্লাস থাকে। সপ্তায় চারদিন। বাকি তিনদিন ক্লাস নেই। সেই তিনদিন বাসায় বসে চারদিনের লাগাতার ভ্রমণের ক্ষত সারানোর চেষ্টা করি। ক্ষত কিন্তু বেড়েই চলে, পিঠের নিচের অংশে চিরস্থায়ী এক ব্যথা। সোজা হয়ে শুতে পারি না।

যাহোক, এমনি সময়ে কলেজে নতুন এক অধ্যক্ষ বদলি হয়ে এলেন। এসেই সমন জারি করলেন, প্রতিদিন ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কর্মস্থলে থাকতে হবে। এমনকি শুক্রবারও স্ট্যান্ডবাই থাকা আবশ্যক। আমি তাঁকে গিয়ে বিনীতভাবে বললাম, আমার সমস্যার কথা। তিনি অনড়। সরকারি বিধিবিধান দেখালেন। তাঁর যুক্তি মেনে নেয়া ছাড়া কী করার আছে? আমি তখন ততোধিক বিনীতভাবে আমার বদলির আবেদনটি তাঁর হাতে তুলে দিলাম। অগ্রায়ন করে দেয়ার জন্য। প্রতিদিন ঢাকা থেকে আসা সম্ভব না। এখানে থেকে-যাওয়াও সম্ভব না, যেহেতু স্ত্রী ঢাকায় অ-বদলিযোগ্য চাকরি করেন। আবার, বাচ্চা ছোট তাই তাকে সময় দেয়ারও মামলা আছে। আমার বদলি হয়ে যাওয়াই ভাল। বদলি করে দিন।

অধ্যক্ষ সেই আবেদনে সাড়া দিলেন না। বললেন, বদলির আবেদন তিনি রিকমেন্ড করবেন না। আমি তখন বিধিবিধান দেখালাম। বললাম যে, আমার বাস্তবতায় বদলির অধিকার আমি সংরক্ষণ করি রীতিমত। কিন্তু তিনি অনড়।

শেষে কী আর করা। বললাম, বিধান মানলে সবটা মানেন। আপনি আধা মানলে আমিও আধা মানবো। অর্থাৎ আমার ক্লাশের দিনগুলো ছাড়া আমাকে কলেজে পাবেন না।

প্রমাদ গুণলেন অধ্যক্ষ। জীবনে বহু অবাধ্য প্রভাষককে সোজা করেছেন, এমনটা বললেন সহকর্মীদের। ফলে আমাকেও "সোজা" করে ছাড়বেন এতে আর সন্দেহ কি?

কিন্তু আমার তো অন্য অপশন নাই।

এমনি সময়ে কলেজে বার্ষিক মিলাদ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য এই মিলাদে দোয়াপ্রার্থনা হয়। সেদিন আমার ক্লাশ নেই। এমনিতেও মিলাদে আমার আগ্রহ নেই। ফলে গেলাম না। মওকা পেয়ে গেলেন অধ্যক্ষ। তিনি লম্বা একটা শো-কজ দিলেন। রীতিমত লাভ-লেটার! কেন আমি কর্মস্থলে মিলাদের মত একটা ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে অনুপস্থিত? এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইলেন। একে তো অ্যাবসেন্স, তার উপরে মিলাদে অ্যাবসেন্স! চারদলীয় জোট তখন ক্ষমতায়, আমিনী হলেন মন্ত্রী! সেই চিঠির কপি দিলেন শিক্ষা অধিদপ্তরে, এমন কি মন্ত্রণালয়ে পর্যন্ত। আর অন্যদের বললেন আমাকে তিনি এবার চাকরিশূন্য করে ছাড়বেন।

যথারীতি সেই চিঠির উত্তর আমি দিয়েছিলাম। কপি দিয়েছিলাম অধিদপ্তরে এবং মন্ত্রণালয়ে। চিঠিটা লিখেছিলাম সাধুভাষায়। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করি:

"মহাত্মন,
উক্ত দিবসটিতে আমি কর্মস্থল হইতে কিঞ্চিৎ দূরে অবস্থান করিতেছিলাম। প্রত্যুষে উঠিয়া কর্মস্থলে আসিবার আয়োজন শুরু করিবার প্রাক্কালে অকস্মাৎ পত্রিকায় দেখি আমার রাশিফলে "যাত্রা নাস্তি" লিখিত আছে। আমি রাশিফল বিশ্বাসী হওয়ায় এবং আমার যাত্রা "নাস্তি" থাকায় সেদিন আমার পক্ষে ঐ দূরত্বটুকু অতিক্রম করিয়া কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া সম্ভবপর হইয়া উঠে নাই।"

এই হল আমার রাশিফলে স্ট্র্যাটেজিক আস্থার বৃত্তান্ত। আজকের রাশিফল নিয়ে ভাবছি। মোটামুটিভাবে সারাদিন বাসাতেই থাকবো, ফলে অর্থপ্রাপ্তি কিভাবে ঘটবে বুঝতে পারছি না। মাঝেমধ্যে বইপত্রের ভাঁজে খোঁজাখুঁজি করছি। একটু আগে ফ্রিজের তলাও দেখে এলাম। বৌ জ্বরাক্রান্ত, ফলে প্রেমের ক্ষেত্রে ভয়ংকর নেতিবাচক সাড়া আসারই সম্ভাবনা।<img src=" style="border:0;" />

কিছু একটা মিরাকল ঘটতে পারে এই ভাবনায় অর্ধেক দিন পার করে দিলাম। বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে এখনো আশা ছাড়ি নাই।

জীবনে টাকা দরকার। প্রেমও দরকার। প্রচুর।<img src=" style="border:0;" />
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28913795 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28913795 2009-02-20 13:43:00
আমিই লোকালটক!!

বইমেলা থেকে নির্জন সেগুনবাগিচা ধরে ফিরছিলাম। হাতে "অপরবাস্তব-৩" সেখানে আবার আমার একখান গল্পজাতীয় জিনিসও আছে। মনে তাই বেদম ফূর্তি। রাত দশটার ঢাকা রাজপথগুলোতে দিনের মতই সরগরম হলেও পাড়ার রাস্তাগুলোর বেশ ঝিমানো দশা। রিক্সাঅলা খালি রাস্তা পেয়ে ভাটিয়ালি ধরল একটা। গানের গলা ভালো। জিজ্ঞেস করতে যাবো "তিন চাকার তারকা"য় নাম দিয়েছিল কিনা, অমনি গলির ভেতর থেকে একটা কালো পাজেরো এসে হার্ডব্রেক করল রিক্সার ঠিক সামনে। ঝটপট নামল জনাচারেক লোক। আমি ভয় পাবার আগেই আমাকে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে ভরে ফেলল।

দশাসই দুজন লোক আমার দুপাশে। সামনে আরো দুজন। প্রত্যেকের চোখে সানগ্লাস, কানে কর্ডলেস ইয়ারফোন, হাতে ওয়াকিটকি জাতীয় কিছু। আমি খাবি খাইলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কে?

উত্তর নেই। চোখ বেঁধে ফেলা হল আমার।

আবার শুধালাম, আপনারা কি ভিনগ্রহের অজ্ঞান পার্টি নাকি?

দিল না উত্তর।

গাড়ি থামল এক পুরানা দোতলা বাড়ির সামনে। আমাকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হল ভিতরে একটা ঘরে। একটা টেবিল সেই ঘরে, আর দুপাশে দুটা বেঞ্চ। মাথার উপরে একশ পাওয়ারের একটা বাল্ব। বেশ খানিকটা নিচে।

"বসুন"।

বসলাম।

"আপনাকে আমরা বইমেলা থেকেই ফলো করছিলাম"।

"কেন বলুন তো?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"কারণ আপনার হাতে", একজন আমার হাতের "অপরবাস্তব" বইটা দেখিয়ে দিল।

"এটার সাথে আমাকে ফলো করার সম্পর্ক কি"? আমি বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম।

"আছে আছে", সবজান্তার ভঙিতে একজন বললেন. "আছে বলেই তো আপনি এখানে, মি: লোকালটক!"

"লোকালটক? কে লোকালটক? কি বলছেন এসব?" আমি রীতিমত বিমূঢ়!

আরেকটা ঘরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে দেখলাম আমার পরিচিত কয়েকজন ব্লগারকে। পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে কৌশিককে। শওকত হোসেন মাসুমের ডান চোখ অস্বাভাবিক রকম ফোলা। সিমু নাসের-এর সম্ভবত জ্ঞান নেই। একপাশে ব্লগার প্রত্যুৎপন্নমতি, পরিধেয় কাপড় প্রায়-শতচ্ছিন্ন। দূরে, জানলার পাশে ব্রাত্য রাইসু এবং আহমাদ মোস্তফা কামালকে দেখা যাচ্ছে।

"এবার বলেন তো দেখি, এদের মধ্যে কে লোকালটক? সত্যি কথা বললে আমরা আপনাকে ছেড়ে দেবো। লোকালটক ছাড়া বাদবাকিদেরও সসম্মানে ছেড়ে দেবো।"

"লোকালটকের কি হবে?" জানতে চাইলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ।

"তাকে নিয়ে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা আছে। সে আপনার না জানলেও চলবে। যত কম জানা যায় ততই ভাল। ভেবে দেখুন, আপনি কম জানলে এতক্ষণে বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। বেশি জানার কারণে আজ এখানে"।

বললাম, আপনারা লোকালটককে চাচ্ছেন তো? ঠিকাছে, ছেড়ে দেন এদের সবাইকে।

একথা শুনে ব্লগাররা সবাই আমার মুখের দিকে তাকাল।

"ছেড়ে দেব? নিশ্চয়ই! আগে বলেন কে লোকালটক?"

এবার চালকের আসনে আমি।

"লোকালটক হচ্ছে ব্রিগেড সিক্সটিন"।

"ব্রিগেড সিক্সটিনটা কে?"

"ফিউশন ফাইভ"।

"ফাজলামির আর জায়গা পাস না! লোকটাকে চিনাতে হবে তোকে......র বাচ্চা! য়ু আর ইন আ রিয়েল ডেঞ্জার বেইবে! এইটা তোগো সামহোয়ার ব্লগ না, এইটা গুয়াতানামো ব্লক। য়ু হ্যাভ অনলি টেন সেকেন্ডস, বল লোকালটক কে?"

আমি একে একে আমার সহব্লগারদের দিকে তাকালাম। ব্যথাক্লিষ্ট সব মুখ। আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

"হক মৌলা, আনাল হক!" আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

"কি হল?" রিভলভারের কক করার শব্দটি যেন কানে এল, মনে হল।

"আমিই লোকালটক"!





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28912063 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28912063 2009-02-16 16:39:34
বিদায়, ভিস্তাসুন্দরী!
নতুন ল্যাপটপ এল ঘরে। ভ্রমর, গুনগুনিয়ে। আমার বর্ষপুরাতন অতি বিশ্বস্ত ভার্যা, এইচপি-কম্প্যাক এনসি-৬০০০, ওকে ফেলে আসলাম নষ্ট প্রসেসর আর বধির র‌্যামের গুমোট গুদামে, কীবোর্ডটা কেবলি ফোঁপাচ্ছিল, কিন্তু আমার ডান হাতে তখন এইচপি প্যাভেলিয়ন, তার মধ্যে মৌরাণীর মত ভিস্তা দ্য অরিজিনাল, আর ওর মনমাতানো সব ফিচার, চারপাশে এত সব চিয়ারলেডি!

মলিনা এক্সপির কথা আর কে মনে রাখে!

ঘরে নিয়ে এসে দেখি, ভিস্তাদেবীর নানারকম গুমোর! আমার রিকো ক্যামেরার সফটওয়্যার দিলাম, উগড়ে ফেলে দিল। ভয়েস রেকর্ডার এর সফটওয়্যারকে তো চিনলই না। আত্মীয়স্বজনের এই অবমাননায় আমি নিশ্চূপ হয়ে থাকি। কে না জানে, সুন্দরীদের নানারকম বায়না থাকে, শ্বশুড়বাড়ির আত্মীয়দের ব্যাপারে তাদের থাকে অনমনীয় মনোভাব!

ভিস্তাসুন্দরীকে নিয়ে এখানে ওখানে যাই, একে ওকে দেখাই। সবাই ওর প্রেমে পাল্টি খায়, সব সুন্দরীদের মত সেও আত্মপ্রেমে বুঁদ।

আমি পাড়ার বন্ধুদের এড়িয়ে চলতে শুরু করি। এরা আমার বাল্যসখা, কখনো ক্রিটিক্যালি দেখিনি এদের। এখন ভিস্তা বলছে কারো চোখ খারাপ মানে ড্রাইভার অচেনা, কেউ সামাজিক না মানে ইনকম্প্যাটিবল, কারো সংক্রামক ব্যাধি, কেউ বা স্রেফ দুই নম্বর মানে পাইরেটেড। আমি কি বলবো, একে তো ভিস্তা তার ওপর অরিজিনালের ঠাট!

গেলাম বাংলাবাজারে। সেখানে নানারকম বিজয়, বিজয় ২০০৩, বিজয় ক্ল্যাসিক প্রো, বিজয় একুশে। একের পর এক সাধলাম ভিস্তাদেবীকে। নিলেন না তিনি। বললেন, এরা দুই নম্বর।

দোকানদার বলল, একনম্বরী বিজয় কিনলে পাঁচ হাজার লাগবে।

আমার পকেট কাহিল। অনুনয় করলাম, ডার্লিং এটা বর্ণমালার মাস। একটু দয়া করো!

ভিস্তা অনড়। ওর কর্পোরেট অনমনীয়তা।

আর পারলাম না অবশেষে। এক সপ্তার দাম্পত্য, হানিমুন, সব ভুলে গেলাম। চিৎকার করে বললাম, থাক তুই তোর শুদ্ধি নিয়ে। আমি শালা জনমের বাঞ্চোৎ, আগাপাশতলা পাইরেটেড মাল, ভাইরাসে-ভরা, আমার সাথে তোর ঘর করা লাগবে না। ভাগ্!

ফর্ম্যাট দিলাম মেশিন।

.............................
পোস্ট স্ক্রিপ্টাম: মলিনার কাছে ফিরে এসেছি। এক্সপি সে, আবেদন নাই, তবু সাধ্যমত নিজেকে হাজির করে। আমার ক্যামেরা খুশি, ভয়েস রেকর্ডার খুশি, বিজয় তো মহাখুশি। নিজেকে বলি এইতো বেশ আছি, তবু খুঁটিনাটি ঝামেলা পেলেই ক্ষেপে উঠি। ভিস্তার কথা মনে পড়ে। বলি না কিছু। রিকভারি সিডিগুলোয় হাত বুলাই। এখানটায় ভিস্তাসুন্দরী চিরকালের মত মমি হয়ে আছে। ভাবি কোনোদিন, সময় করে ওকে সিডি থেকে চালাব। দেখবো আরেক নজর।





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28909398 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28909398 2009-02-11 00:19:39
সামহোয়ার কি "একমত একমত" মার্কা ব্লগ হতে চাইছে?
রিফাত হাসানের একটা পোস্ট দেখেছিলাম যুদ্ধাপরাধী এবং গাজায় নির্বিচার ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ নিয়ে। তার বক্তব্য বিষয়ে আমি একমত ছিলাম না, কিন্তু তিনি একটি যুক্তির অবতারণা করেছিলেন সেখানে। অবসিন কিংবা বিদ্বেষমূলক কিছু লিখেছিলেন বলে মনে হয় নি আমার। পরে মোহাম্মদ আরজুর একটা পোস্ট পড়ে জানতে পারলাম রিফাতের ঐ পোস্ট মুছে দেয়া হয়েছে এবং তাকে "সাধারণ ব্লগার" পদে অবনমন দেয়া হয়েছে। বিষয়টা উদ্বেগজনক।

রিফাত হাসানের সাথে নানান ব্লগপোস্টে আমার তর্ক হয়েছে। তার মতাদর্শের অনুসারী আমি সম্ভবত নই। কিন্তু সন্দেহ নেই তিনি তার মতামতকে যথেষ্ট যৌক্তিকভাবে এবং মার্জিত ভঙ্গিতে প্রকাশ করে থাকেন। ফলে একটা স্বাস্থ্যকর তর্ক করার পরিস্থিতি থাকে।

যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে নানান মত আছে সমাজে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর বিচার দেখতে চাই। এ নিয়ে আমার নিজের শক্তিশালী যৌক্তিক অবস্থান আছে। এখন যারা এ বিষয়ে ক্রিটিক্যাল তাদের যুক্তিগুলো আমি শুনতেই চাই, কারণ তাদের যুক্তি মোকাবেলা করতে করতে আমার অবস্থান আরো সুসংহত হয়ে উঠবে। প্রতিপক্ষের মুখে রুমাল চেপে নিজের বিজয় ঘোষণা করা কাপুরুষতা, বাঙালি জাতি ঐতিহাসিকভাবে এই কাপুরুষতার চর্চা করে নি।

রিফাত কেন "সাধারণ" হয়েছেন আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি না। তিনি ভালো লেখক, পীড়াদায়ক ব্লগিং করেছেন বলে মনে পড়ে না। তিনি আমার সাথে একমত হন না বলে আমার ক্ষোভ হতে পারে, কিন্তু এই ধরনের ডায়ালজিক্যাল সম্পর্ক এই ব্লগটির বৈচিত্র্য বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। আর ব্লগ যারা চালান তাদের জন্য এই ধরনের তর্কমূলক সম্পর্ক এবং বৈচিত্র্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা। হওয়ার কথা।

কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বৈচিত্র্য নয়, যেন "একমত একমত" শ্লোগানে মুখরিত একটা প্লাটফর্ম হতে চায় সামহোয়ার। রিফাত হাসানের ঐ পোস্টকে ধরে কর্তৃপক্ষীয় আচরণ আমাকে সেরকমই ভাবাচ্ছে।

সামহোয়ারে ব্রুটাল মেজরিটি পেয়ে গেলেই যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়ে যাবে এমনটা ভাবি না আমি। আবার এই বিচারসম্পর্কিত ক্রিটিক্যাল বক্তব্যগুলো কানে এলেই লোকে দলে দলে সেই মতের গুণগ্রাহী হয়ে পড়বে এমনও নয়। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির আত্মত্যাগকে যেন আমরা এত ঠুনকো না ভাবি। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি জোরালো করবার জন্য কারো মুখে রুমাল চেপে ধরবার দরকার নেই।

রিফাত হাসানকে তার পূর্ববর্তী স্ট্যাটাস ফিরিয়ে দেয়া হোক।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28897646 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28897646 2009-01-15 00:34:58
বয়স আমার বাড়ে না
আমাগো বস্তির নাম কালাপানি। ভদ্রলোকেরা কয়, বেগুনটিলা। সরকারের খাতায়ও এই নাম। আমাগো সমিতিঘরের সাইনবোর্ডেও লেখা, বেগুনটিলা ভূমিহীন সমবায় সমিতি। কিন্তু আমরা ডাকি কালাপানি। বেগুনটিলা নাম শুনলে হাসি লাগে। কিসের বেগুন, আর কিসের টিলা? শেলটেক কম্পানি গাজীপুর থিকা ট্রাক ট্রাক লালমাটি আইন্যা সব টিলাটক্কর সমান কৈরা ফেলাইছে কবে! এইখানে এপার্টমেন্ট হবে, হাসপাতাল হবে, খেলার মাঠ হবে, ব্যাকাত্যাড়া একখান লেকও নাকি হবে। জায়গায় জায়গায় এই সাইনবোর্ড ওই সাইনবোর্ড, এইখান দিয়া হাঁটবেন না, এইখানে খাড়ায়া পেশাব করবেন না, এই জায়গার মালিক অমুক ব্যাংকের কাছ থিকা ট্যাকা নিছে, কত আগড়ম বাগড়ম! আর এইসব বড়লোকী হুমকিধামকির মাঝখানে হাবাহাবলার মত আমাগো একখান কালাপানি বস্তি! কুদ্দুছ চাচায় কয়, দুনিয়ার লীলা বোঝা কঠিন। গেরাম থিকা ঢাকায় আসছিলাম রেলগাড়ি দিয়া, অথচ ঢাকা থিকা ঢাকার মধ্যেই কালাপানি বস্তিতে আসতে হৈল নৌকায় কৈরা! তখন কালাপানি বলতে নাকি আছিল জলে-ভাসা একটা টিলা। সেই টিলার মধ্যে, ছপছপ পানির উপরে আমাগো ভোদাই বাপচাচারা বিছাইছিল সংসারের চৌকি। সেই চৌকি থিকা ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ করতে গিয়া ময়লা কালাপানির মধ্যে টপাশ টপাশ পটল তুলছে কত্ত পোলাপাইন, সাপেখোপে কাটছে আরো কত্তগুলারে! শুকনা মাটি যেটুক আছিল, কবর দিতে দিতেই শেষ! তখন এইখানে না-ছিল গভমেন্ট, না-আছিল শেলটেক কম্পানি। এখন তো যেদিকে চোখ যায় সবই শেলটেক কম্পানির মাটি। সেই চাপাতিও নাই, শামসুও নাই। কালাপানি নামটাই খালি আছে।

এত যে উলট পালট, জলে-ভাসা কালাপানি সেই কবে ভদ্রলোকের বেগুনটিলা হৈয়া গেল, তবু বয়স আমার বাড়ে না। চাক্কা জ্যাম। আমারো, ইয়ামিনেরও। তিনকুলে ওর কেউ নাই, আর আমার তো বাপ থাইক্যাও নাই। ল্যাংড়া ফরুরে খামোখাই বাপ ডাকছি আমি। ব্যাবাক পিটাইত হালায় আমারে, সকালবিকাল পিটাইত আর বলত, কোকিলের বাচ্চা দুধকলা দিয়া পালতেছি, তুই আমার পয়দা না! শেষে একদিন আমিও হালারে পিটায়া তবে ঘর ছাড়ছি। এরপর থিকা আর বাপের মুখ দেখি না, ইয়ামিন আর কানাফজলের সাথে সমিতিঘরে ঘুমাই। কানাফজল কিন্তু কানা না, মানে সে চোখে ঠিকই দেখে, তবে একটু ট্যাগড়া বৈলা আদর কৈরা আমরা ওরে “কানা” ডাকি। যাউক, আমরা তিনজন সমিতিঘরের মাটিতে মাদুরের ওপরে ঘুমাই। যেদিন আমার ঘুম আসে না, অনেক রাইতে ঠকাঠক শব্দ আইসা জানলার কাছে থামে। আমার ল্যাংড়া বাপের গলায় আস্তে আস্তে ডাক শুনি, ভুট্টো, অ ভুট্টো, ঘুমাইছস? জবাব না-দিয়া মটকা মাইরা থাকি। কে জানে, বাপও হৈতে পারে, জ্বিনভুতও হৈতে পারে। একটু পর ঠকাঠক শব্দ আবার দূরে মিলায়া যায়। তবে এইটা কি স্বপ্ন, না বাস্তব ঠাহর পাই না। রাইতে খুব বাস্তব লাগলেও সকালে উইঠা মনে হয় স্বপ্নই দেখছিলাম। বাপের ঘরে আর ফেরত যাই না। সমিতিঘরে ঘুমাইবার ব্যবস্থা অনেক ভালো, কারেন্টের ভোল্টেজ কম থাকলেও একটু-একটু কৈরা ফ্যান তো ঘোরে। আর বাপের হোটেল ছাড়াও আরো কত কত খাইবার ব্যবস্থা আছে খোদার দুনিয়ায়! বাপের হোটেল যেদিন থিকা বন্ধ হৈয়া গেল, সেইদিন থিকা খোদার হোটেলগুলাতে ঘুইরা ঘুইরা খাই। লিস্টি দেই খাড়ান:

শনিবার ......................গুরুদুয়ারা শিখমন্দির
রবিবার .......................রামকৃষ্ণ মিশন
সোমবার ......................শাহআলীর মাজার
মঙ্গলবার ......................হোসেন আলী পীরের দরগা
বুধবার ........................বেনারস পল্লীর কারিতাস অফিস
বিষ্যুদবার......................শাহআলীর মাজার
শুক্রবার ........................পল্লবী জামে মসজিদ এতিমখানা

তো, এইভাবে খোদার খাসি হৈয়া কতদিন! কাঁহাতক ভাল্লাগে? আমার অবশ্য ইয়ামিনের মত মলম পার্টির ধান্দা নাই। আরো বড় ধান্দা আমার। উছিলা পাইলেই যাই আমাগো ওয়ার্ড কমিশনারের অফিসে। সেইখানে কত রঙবেরঙের বড়ভাইরা! রড শাহীন, কুত্তা শিরু, চাপাতি হীরা, বিচি বাছির। কাউরে কিছু কই না, খালি ঘরের কোনায় খাড়ায়া থাকি। কমিশনার আমারে চিনে। সেইবার যখন পল্লবী সুপার মার্কেটের জোবেদ আলীর জুয়েলারি দোকান চুরি হৈল, পুলিশ আইসা খামোখাই আমাগো তিনজনারে লক-আপে নিয়া গেল, তখন কমিশনার নিজে থানায় গিয়া আমাগো ছাড়ায়া আনছিল। সেই থিকা মনে-মনে তার সাকরেদ হৈয়া গেছি। আমারে ইশারায় সামনে আসতে কয় সে একদিন।

: জোবেদ আলীর সোনার দোকান ভাঙছিল কেডা রে?
: জানি না ভাইজান। আমরা তো ভাঙি নাই।
: লকআপে গেছিলি ক্যান তাইলে?

আমি কথা কই না। খাড়ায়া থাকি।

: আরে খানকির পোলা, চুরি করলি না, কিন্তু লকআপে তোগোরে ঢুকাইছিল ক্যান?
: না-কৈরাই ভুলটা হৈছে। করলে আর লকআপে যাওয়া লাগত না।

কী মনে হৈল, আমি ধুস কৈরা বৈলা ফেললাম। জবাব শুইন্যা কমিশনার থ।

: তোর মাথায় তো অনেক বুদ্ধি! ঐ শুনছস তোরা?

শুনছে সবাই। গালে ঠোনা খাইলাম বেশ কয়েকটা। পিঠে চাপড়ও পড়ল মনে হৈল।

: ভাইজান, একটা কাম দেন না আমারে!

তোতলাইতে তোতলাইতে কৈয়া ফেললাম। এইবার দাপায়া হাসে কমিশনার।

: কাম দিমু তোরে? আচ্ছা দিমুনে। তোগোরেই তো দিমু, তোরাই তো আমাগো ভবিষ্যত। সময় হোক, দিমু। এখন গিয়া খেলাধুলা কর যা। তোর তো এখন হৈ হল্লা করনের দিন।

হৈ হল্লা করনের দিন? কয় কি উস্তাদে? সেই দিন আর নাই গো নাতি, খাবলা খাবলা ছাতু খাতি! কেমনে বোঝাই?

কয়দিন পর আবার কমিশনারের সাথে দেখা। খুব ক্ষেইপ্যা আছিল সে।

: ঐ পিচ্চি... কী যেন নাম তোর?

পিচ্চি? এইবার বুকটা সত্যি সত্যি ফাইট্টা যায় আমার!

: ভুট্টো।
: শোন্ .... ঐ সদরুদ্দিন খানকির পোলা সমিতি অফিসে যদি ঢোকে, ওর হোগার মধ্যে দুইটা ক্ষুরপোচ লাগাইতে পারবি?

উত্তেজনায় কাঁপাকাঁপি দশা আমার। সদরুদ্দিন আমাগো সমিতির সভাপতি আছিল। শেলটেক কম্পানির বিরূদ্ধে অনেক আন্দোলন করছে। সবাই কয়, ওর হল্লাচিল্লার কারণেই নাকি এই বস্তি এখনও কেউ গিলতে পারে নাই। ইলেকশনের সময় অন্য দল করছিল, তাই ইলেকশনের পর কমিশনার আইসা ওরে খেদায়া দিছে। এখন বাইরে কৈ জানি থাকে। তবে মাঝে মাঝে চামেচিকনে সমিতিঘরে আসে। সদরুদ্দিন মানুষটা অন্যরকম। গাবতলী টার্মিনালে ভ্যান চালায়, আবার ওর নিজের ভ্যানের ওপর খাড়ায়া গরম গরম বক্তৃতা দেয়। আইনকানুন খুব বোঝে, কলিজাও বড়। একবার রাজউকের বুলডোজারের সামনে শুইয়া পড়ছিল বস্তি বাঁচাইবার জন্য।

: খুব পারুম।

আমি কমিশনারের কথার জবাবে বলি। কারে কী করন লাগব সেইটা পরে। আগে কাম পাওয়া দিয়া কথা। কী যেন ভাবে কমিশনার।

: ঠিকাছে, তোর কিছু করা লাগবে না। তুই খালি খবরটা দিবি, ওরে দেখলে।

আমার ভিতরটা হায় হোসেন হায় হোসেন কৈরা ওঠে।

: আমি পোচাইতে পারুম তো ভাইজান। আপনে দিয়া দ্যাহেন। এমুন পোচ পোচামু খানকির পোলা জিন্দেগিতে আর চেয়ারের মধ্যে পুটকি লাগাইতে পারব না।

কমিশনার আবার হাসে।

: এখন না। এখন শুধু খেয়াল রাখিস। বয়স হোক আগে, সবই হবে।

মরণের আগে আমাগো বয়স কি কোনোদিন একবার হবে? ছাপড়াঘরের চিপায় বৈসা আমি আর ইয়ামিন এইসমস্ত আলাপসালাপ করি। এইখানে দিন পার করনের দুইটা সুবিধা। এক, সমিতিঘরের দরজাটা এইখান থিকা স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে, আমাগো চোখ ফাঁকি দিয়া সদরুদ্দিনের আব্বারও সমিতিঘরে ঢুকবার মতা নাই। দুই, কালাপানি থিকা দূরের দেশবাংলা গার্মেন্টস বরাবর একসারা লম্বা যে রাস্তাটা গেছে, এই চিপা থিকা পুরাটা রাস্তাটাই দেখা যায়। খুব সক্কালবেলা, আমরা যখন সমিতিঘরের ভিতর ঘুমায়া থাকি, তখন এই রাস্তা ধৈরা হানুফা গার্মেন্টসে যায়। যখন দুপুরে খাইতে আসে, বা সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফেরত আসে, তখন ওরে দেখতে পাই কোনো কোনোদিন। মনে পড়ে, এই হানুফার সাথে আমি ছোট্টবেলায় কত জামাইবৌ খেলছি, একসাথে সিনেমা দেখছি! গার্মেন্টসে ভর্তি হৈয়া সে তড়বড়ায়া বড় হৈয়া গেল। ছয়মাস আগে ধারকর্জ কৈরা ওরে আবার সিনেমা দেখাইতে চাইলাম। কী কমু দুঃখের কথা, শালী এখন তাকায়া থাকে আমার মাথা থিকা কম কৈরা আধাহাত উপরে! আমার কথা শুইন্যা কী সাংঘাতিক মিষ্টি কৈরা হাইসা উল্টা-হাঁটা দিল, অথচ পরের মাসেই টেম্পু ড্রাইভার শাহালমের সাথে পর্বত সিনেমা হলের সামনে ওরে দাঁড়ায়া থাকতে দেখলাম। আমারে দেইখ্যা একটু ভড়কাইল অবশ্য। শাহালমের কানে কানে কী যেন কৈল, শাহালম এদিকে তাকায়া ইশারা দিয়া আমারে ডাকল। ওই বেটার আদুইর‌্যা হাসি দেইখ্যা পিত্তি জ্বইল্যা যায়! গেলাম না, ইজ্জত বিলায়া দেওনের জায়গা আরো আছে দুনিয়ায়। এইবার শাহালম নিজেই আগায়া আসল।

: কিরে ভুট্টো, ছবি দেখবি নাকি ভাই?
: না।
আমি ঘাড় গোঁজ কৈরা থাকি।
: তাইলে এইখানে কী করস?
: কী করুম? খাড়ায়া আছি।

সবচে ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল তারপরে। শাহালম পকেট থিকা দুইটা টাকা বাইর কৈরা আমারে দিল।

: নে। লজেন্স খাইস।

মাথার ওপরে যেন ঠাডা পড়ল হঠাৎ! যেন মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করের মাঝখানে পরনের লুঙ্গি খুইল্যা তলা উদাম হৈয়া গেছে আমার! কী করুম বুঝতে পারি না। সিনেমার পোস্টারের দিকে তাকায়া থাকি। ডিপজলের বগলের চিপায় মান্নার মাথা।

: আমি লজেন্স খাই না।

কোনোরকমে কৈতে পারলাম। তাও হানুফার দিকে তাকায়া।

: তাইলে ঝালমুড়ি খাইও। নেও না! এখন খাইতে ইচ্ছা না-করলে পরে খাইও!

এইবার হানুফা, গলায় মিনতি! এই প্রথম কেউ আমারে মিনতি করল। এই প্রথম আমার বয়সের জ্যাম চাক্কাও একটু নৈড়াচৈড়া উঠল যেন। লজেন্স থিকা ঝালমুড়ি! নিলাম টাকাটা। নিয়া পিছন ফিরা হাঁটা দিলাম। মোড় ঘুরবার পর কি যেন হৈল আমার, দৌড় দিলাম একটা। দৌড়াইতে দৌড়াইতেই মনে হৈল, আহা, সিনেমার নায়কদের মত দৌড়াইতে দৌড়াইতেই যদি বড় হৈয়া যাইতে পারতাম! গার্মেন্টসের সেলাইয়ের পয়সায় তো মা-ভাইবইনের সংসার চলবার কথা না। চোদ্দ-পনের বছরের হানুফার লাগব চল্লিশ বছর বয়সের একখান বেটামানুষ, বাপ কি ভাতার সেইটা পরের প্রশ্ন। আমার মত লাফাঙ্গার সাথে সিনেমা দেইখ্যা কী করবে সে? আমি কি টেম্পু চালাই? আমি কি গার্মেন্টস কম্পানির সুপারভাইজার? আমার কি ছাদে মাল আছে?

না। আমার ছাদে মাল নাই। আবার শালার বয়সের চাক্কাও আটকায়া গেছে। রাতে ওয়াসার চোরাই পানির কলের সিরিয়ালে গিয়া খাড়াই সবার আগে। একটাই পানির লাইন সারা কালাপানি বস্তিতে, কিন্তু সেইটাতে পানি আসে চব্বিশ ঘণ্টায় একবার: রাত বারটা থিকা ভোর চারটার মধ্যে কোন একটা সময়ে। সাড়ে এগারটা থিকা পানির সিরিয়ালে খাড়ায়া-খাড়ায়া গুলতানি আর মশা মারা শুরু হয় মানুষের। পাতলা একখান ঝোপ, কিন্তু ঝোপের মধ্যে বেদম মশা! হানুফার কামে যাওন লাগে আটটায়, তবু পানির সিরিয়ালে ওরই খাড়ান লাগে। ওর মা শোয়া থিকা উঠতেই পারে না, আর ভাইবোন দুইটা ঘুমায়া পড়ে উজান রাতেই। পাইপে পানি আসবার আগে-আগে যখন শোঁ শোঁ ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ করতে থাকে, তখন হানুফা আইসা খাড়ায় সবার পিছে। কিন্তু ওর সিরিয়াল আসতে আসতে প্রায়-দিনই পানি ফুরায়া যায়। আমার তখন জামাইবৌ খেলার টাইম:

: হানুফা, নেও এই পানিটা ঢাইল্যা লৈয়া যাও।
: তুমি কি করবা? তোমার পানি কৈ?
: ইয়ামিন আর কানা পানি নিয়া গেছে। আমার পানি লাগে না, নিয়া যাও।
: লাগে না তো পানি নিতে খাড়াইছিলা ক্যান?
: তুমি দেরি কৈরা আসো যে, তাই আগে-আগে খাড়াইছি তোমার পানির লাইগ্যা।

আমার এক কান্ধের ফেরেশতা আরেক কান্ধের ফেরেশতার সাথে এই খেলা খেলে। বাস্তবের হানুফার সাথে আমার কোনো কথাই হয় না। পানি নিতে খাড়ায়াই বেড়ার মধ্যে ঠেস দিয়া ঘুমায়া পড়ে সে। কখনো বৈসা বৈসাও ঘুমায়। বারো ঘণ্টার চাকরি চালায়া যাইবার জন্য চার ঘণ্টার ঘুম তো লাগে, নাকি? ডায়ালগ-ছাড়া বোবাসিনেমার মত আস্তে কৈরা আমার পানিটুকু ঢাইল্যা দেই ওর বালতির মধ্যে। হানুফা কিছুই টের পায় না, ঘুম ভাঙলে দেখে বালতির মধ্যে পানি। অবাক হয় না সে, পানি তো বালতির মধ্যেই থাকবে, নাকি? ঘুমে-হাঁটা মানুষের মত ভরা-বালতি নিয়া ঘরের দিকে হাঁটা দেয়। অন্যদিকে তাকায়া তাকায়া এই জিনিস ঘটতে দেখি, আর ভাবি কে বেশি ভোদাই? আমি? না ওমর সানি? কোনটা বেশি ভাল? খালি বালতি? না ভরা বালতি?

একদিন চুইংগাম চিবাইতে চিবাইতে র‌্যাবের লোক আইসা হাজির। ওরা প্রজেক্টের ভিতর খুব ঘেরাও টেরাও দিয়া একটা ক্রসফায়ার করল, তারপর লাশটার ফটো তুলল, ভিডিও করল। তাদের ফোন পাইয়া সাংবাদিকরা আসল, পিছন পিছন আমরাও গিয়া দেখি, খোদার দুনিয়ায় এত লোক থাকতে লাশটা টেম্পু ড্রাইভার শাহালমের! অথচ টেলিভিশনের খবরে কৈল এইটা নাকি কালা জাহাঙ্গীরের লাশ, সে নাকি বিরাট সন্ত্রাসী! সবাই কৈতেছিল শাহালম নাকি একটা পিঁপড়াও মারে নাই জীবনে, ফুলের টোকাও দেয় নাই কারো গায়ে। এরপর রাতের পর রাত বস্তিতে রেইড দিতে থাকল র‌্যাবের লোকেরা, কালা জাহাঙ্গীরের নেটওয়ার্ক বাইর করার লাইগ্যা। ভয়ে সব বোবা হৈয়া গেল। বিলাপ গিলতে গিলতে হানুফা খালি হিক্কা তুলতে লাগল। হিক্কা তুলতে তুলতে ফর্সা চামড়া লাল হৈয়া যায় হানুফার, কী যে সুন্দর লাগে, মনে হয় একটা হিক্কার জন্য সাতবার মরণ হৈলেও ভাল। র‌্যাবের লোকের আশপাশ দিয়া ঘুরাঘুরি করি, কেউ জিগায়াও দেখে না কিছু। বয়স আমার বাড়ে না, ক্রসফায়ারের মরণ আমার কপালে নাই।

সমিতিঘরে বুক ফুলায়া আসা-যাওয়া করা শুরু করে সদরুদ্দিন। সবাইর ঘরে-ঘরে গিয়া শোনায়, শেলটেক কম্পানি নাকি রাজউকের সাথে ভাইল কৈরা ফেলাইছে। দিনকয়েকের মধ্যেই বুলডোজার নামায়া দিবে কালাপানিতে। সবাইরে একজোট থাকা লাগবে, এইবার ঠেকাইবার কেউ নাই। দিন বদলায়া গেছে, গুলশান-বনানীর দালানকোঠা ফালায়া বড় বড় মুরুব্বিরা এখন চোদ্দশিকের ভিতর বৈসা হাওয়া খায় এখন! দিনকয়েক ধৈরা অচেনা মানুষ দেখি কালাপানিতে। ঘুরাঘুরি করে, নানান মাপজোখ করে। পুলিশ না সিআইডি না ক্যাডার কেউ জানে না, কেউ কিছু জিগায়ও না। একের পর এক আগুন লাগতেছে কড়াইল, ভাষানটেক, খিলতে, বেড়িবাঁধ বস্তিতে। পালা কৈরা রাত জাগে সবাই, বস্তি পাহারা দেয়।

আমাগো কমিশনার আর নড়েচড়ে না। সদরুদ্দিনরে ক্ষুর দিয়া পোচায়া দিমু নাকি, জিগাই তারে গিয়া। হা হা কৈরা ওঠে সে, বলে, চুপ কৈরা থাক শুওরের বাচ্চা, দেখস না দেশে আর্মি নামছে র‌্যাব নামছে? সাঙ্গপাঙ্গহীন অবস্থায় তারে কেমন পঙ্গু পঙ্গু লাগে। সে ফিসফিস কৈরা কয়, সদরুদ্দিন ভালা কাম করতেছে। করুক। ওর লগে আমার হিসাব পরে চুকামু। আমার খানকির পোলা ক্যাডাররা তো সব ভাগুর্তা হৈয়া গেছে। যাক, আর কোনোদিন জায়গা দিমু না অগোরে, খোদার কসম। দিন আসুক, তোগো দিয়া একটা পিচ্চি বাহিনী বানামু। তোরাই তো ভবিষ্যত।

কমিশনারের ভয়ে-শাদা মুখের দিকে তাকায়া-তাকায়া আমি আমার ভুত-ভবিষ্যত দেখি। নানান হিসাব নিকাশ করি। র‌্যাব-আর্মি ডরায়া আমার কি ফায়দা? ক্রসফায়ারের মরণ তো আমার কপালে নাই। যে হানুফার চোখ আগে আমার মাথার আধাহাতের মধ্যে আছিল, শাহালম মরার পর সেইটা কোনাকুনি সাত আসমান বরাবর উইঠা গেছে। এখন কারো দিকেই সে আর চাইয়া দেখে না, পানিও নিতে আর আসে না। ওর ছোট ভাইটা মাঝে মাঝে আইসা সিরিয়ালে কলসিটা রাইখ্যা যায়, সেই কলসি সকাল পর্যন্ত সেইখানেই পৈড়া থাকে। সমিতিঘরও আজকাল সাংঘাতিক গরম, টিভিতে খবর শুরু হৈলে লোক উপচায়া ওঠে। খোদার লীলা বোঝা কঠিন, কুদ্দুছ চাচায় যেমন কয়। সদরুদ্দিন আইসা আবার কালাপানি চাঙা কৈরা দিল, আর আমাগো কমিশনার কেমন বাসি মুড়ির মত পোতায়া গেল! ভাবতেছি, এই কমিশনার হালারেই একদিন যত্ন কৈরা পোচায়া দিমু। অচল নোটের মত দশা, সকালবিকাল আল্লাবিল্লা করে, আর কয়দিন পরপর হাসপাতালে এডমিশন লৈয়া ঘুমাইতে যায়। দেখলেই হাসি লাগে। দিই একদিন পোচায়া, কী কন?




আগস্ট ২০০৭






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28897354 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28897354 2009-01-14 13:29:20
ডায়াবেটিক প্রেমের কবিতা ফেরার পথে রিকশা থামিয়ে চটপট কিনেছি তেলাপোকা মারার বিষ
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা টপকালেই বাড়ির দারোয়ান
চন্দন কাঠের চৌকিতে শুয়ে এমন মরণঘুম দেবে আর আমি
ভ্যাবলাকান্ত লেটলতিফ বাকি রাতটুকু ওর সিঁথান-পৈথান করতে থাকবো
সোনার কাঠি রূপার কাঠিসমেত। এমন সময় তুমি, আহা প্রেম,
যেন দমকল বাহিনীর আগুন নেভানোর সন্ত্রাস
সাইরেন হয়ে বাজলে আমার পকেটে

আমার বিচ্ছেদকামী বিবাহিত পুরুষবন্ধুরা
আমার উকিল-অভিসারিনী বিবাহিত নারীবন্ধুরা
সেই কবে থেকে দু-দুটো বদ ভাইরাস লেলিয়ে রেখেছে আমার পেছন পেছন
এদের টিকটিকিপনায় আমার প্রাইভেসি ঝুরঝুরে পাতলা রুটি হয়ে গেছে
সামান্য হাঁচিতেই আজ এন্টিবায়োটিক চাই
প্রেমের গল্প লিখতে গেলেও রক্তে সুগার বেড়ে যায়
আহা প্রেম, আহা ঝকমারি, বিলাপে ভেজা হাওয়া
ঘনিষ্ঠ হয়ো না, চামড়ায় কালশিটে পড়ে যাবে
চুম্বনের ক্ষত আর শুকাবে না এই নশ্বর জীবনে!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28889117 http://www.somewhereinblog.net/blog/sumonrahmanblog/28889117 2008-12-28 12:18:01