somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভোর- এই প্রজন্মের অদেখা প্রহর...

১৮ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১০:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'ভোরের আবার সৌন্দর্য্য কি?'- অবাক হয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করলো রূপা।

রূপা আমার মেজো বোনের মেয়ে। আমার ১৫ বছরের প্রিয় ভাগ্নি। ওর সঙ্গে কথা হচ্ছিলো ভোর নিয়ে। ওর মা আমাকে প্রায়ই ও'র বিষয়ে একটা কমপ্লেইন করে। ও নাকি কখনোই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারে না। কখনোই স্নিগ্ধ ভোরের অপরূপ সৌন্দর্য্য ওর দেখা হয়নি। ভোরের সৌন্দর্য্য বলে যে একটি বিষয় প্রকৃতিতে আছে, রূপার তা একেবারেই অজানা।

আর শুধুই কি রূপা?
রুবেলেরও একই অবস্থা। রুবেল আমার বড় বোনের ছেলে। পড়ে নর্থ সাউথে। সেও কোনদিন ভোরের সৌন্দর্য্য দেখেনি। অন্ধকারের দীর্ঘ রাত্রি শেষে ভোরের প্রথম সূর্যোদয়- যে পবিত্র 'অপরূপ রূপের আভায়' আকাশ রাঙিয়ে তোলে- তা' কোনদিন তাদের দেখা হয়নি। দেথা হয়নি ভোরের শিশির, ভোরের ঘাস। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন দূরের বৃক্ষ।

শোনা হয়নি পাখীর কাকলী। বৃক্ষের শাখায় শাখায় চড়ুইয়ের চঞ্চলতা। রৌদ্রের ঝিকমিকে আলোয় ছোট্ট প্রাণের বিচিত্র সব কিচির মিচির অনুরাগ।
এমন অন্যরকম এক অপরূপ আনন্দ সকাল । আহা ! কোনদিন স্পর্শ করা হলোনা তাদের !

রূপা কিংবা রুবেল এর মতো এ প্রজন্মের অনেকেরই আজ একই অবস্থা। সকাল দশটা অবধি পড়ে পড়ে ঘুমানো যেন খুব স্বাভাবিক এক ব্যাপার। ওরা ভোর কি জিনিষ তা জানে না। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল, ভোরের শিউলি কিংবা সবুজ দুর্বা ঘাসের উপর জমে থাকা শিশিরের কণা –একেবারেই অনুপস্থিত, ওদের জীবনে।

ভোরের গল্প, ভোরের গান, ভোরের অপরূপ সুরের সুধা- ক্রমশঃই হারিয়ে যাচ্ছে ওদের জীবন থেকে।
দিবসের একটি অসাধারন প্রহর এভাবে জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়াতে কার্যত ওদের তেমন কোন আফসোস নেই।
নিত্য রাতের টিভি সিরিজ, পার্টি-অনুষ্ঠান, ভিসিডি, ইন্টারনেট –ইত্যাদি নানা আনন্দের ঔজ্জল্য-অনুভব শেষে প্রায় মাঝ রাত্রিরও পরে ওরা যখন ঘুমাতে যায়, ভোরের আলোর আহ্বান ওদের কাছে তখন খুব ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

একটি সুন্দর সুরভিত ভোরের ডাক- তখন কেবলই তুচ্ছ এক ডাক । যে ডাকে সাড়া না দিলে তেমন কোন ক্ষতি নেই। সকাল দশটা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমানোর চেয়ে জীবনে অধিকতর আনন্দের আর কি আছে?

আমি তাই ভোরের সৌন্দর্য্যের কথা কোনদিন ওদের বোঝাতে পারিনি। কথায় নয়- কবিতায় নয়, উপমাতেও নয়। অপরূপ স্নিগ্ধ প্রকৃতির হৃদয়ছোঁয়া কোন বর্ণনাতেও নয়।

ঘুরে ফিরে ওদের সেই একই প্রশ্ন- ভোরের আবার সৌন্দর্য্য কি? ভোর-তো ভোরই। তার আবার বিশেষ ভরত্ব কি?

আমি ওদের জন্য অনেক গুলো কথা গুছিয়ে রাখি।
অনেকগুলো ভাবনাও।
ভাবি একদিন খুব ভোরে ওদেরকে পুরনো ঢাকায় নিয়ে যাবো।
একদিন খুব ভোরে ওদেরকে অন্য রকম এক জীবনের গল্প দেখাবো।
সেই যে নারিন্দার মোড়ে এক বৃদ্ধ অপূর্ব স্বাদের মাঠা বানিয়ে সবাইকে খাওযাতে থাকে, সেই দৃশ্যের মুখোমুখি নিয়ে যাবো।
ওরা দেখুক কেমন কাকডাকা ভোরে ওখানে স্পন্দন শুরু হয়ে যায়- কষ্টার্জিত জীবনের।
কিভাবে শহর জেগে ওঠে, সাত-তাড়াতাড়ি -ভোরের স্বচ্ছ আলো-ফুরোতে না ফুরোতেই...।

আচ্ছা, ওরা কি অবাক হবে- কাকডাকা ভোরের সাথে-ফেরীওয়ালাদের নানা স্বাদের বিচিত্র সব চীৎকার শুনে?

ওরা কি অবাক হবে ঐ অতো ভোরে অক্সি-এসিটিলিন শিখার তীব্র ঔজ্জল্যে ঝলসে ওঠা লৌহ-কাড়িগরের কর্মোদ্যত দুহাত দেখে?

ওরা কি অবাক হবে সংবাদপত্র নিয়ে ছুটোছুটিরত হকারদের অদেখা চঞ্চলতায়?

নাকি ওরা শুধুই হোটেলগুলোর তেহারীর মজায় জমে যাবে?
অথবা একবার ফেলতে চাইবে পা বলধা গার্ডেনের সবুজ ভুবনে?

পাশেই থমকে থাকা খীষ্টান কবরস্থানের অপরূপ বেদনাময় এপিটাফগুলোর কান্নাভেজা লেখা- ভোরের আলোর সাথে মিশে –নতুন কি কোন উপলব্ধি আনবে ওদের জীবনে?

একবারও কি ওদের মনে হবে- আর কিছু না হোক-অন্ততঃ সুস্থতার জন্য হলেও ভোরকে প্রত্যক্ষ করতে হবে প্রতিদিন !
ওদের কি একবারও মনে হবে -দীর্ঘ কাজের জন্যই -দীর্ঘ সৃষ্টিশীলতার জন্যই -দীর্ঘ জীবনটি বড়ো জরুরী !
সেই সাথে জরুরী- স্বচ্ছ আদরমাখা ভোরের বাতাস। প্রয়োজন-ভোরের অনবদ্য দিগন্ত ছুঁয়ে অবিরাম হাঁটা...।

কখনো ভাবি ওদের খুব ভোরে কমলাপুর ষ্টেশনে নিয়ে কোন এক ট্রেনে ওঠাবো। আমাদের সময়ে আমরা আরকিছু না হোক-অন্ততঃ দূরে কোথাও ট্রেন জার্নির সময়ে হলেও ভোরের পৃথিবীকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেতাম। কিভাবে কেমন করে যেন অধিকাংশ ট্রেনজার্নির স্টার্টিং সময়টা হতো ভোর পাঁচটা অথবা ছটা। ঐ অতো সকালে ট্রেনের জানালা গলে একের পর দ্রুত ছুটে যাওয়া কুয়াশাচ্ছন্ন বাঁশবন, শিশিরসিক্ত লাউয়ের মাচা, বহুদূর বিস্তৃত হলুদ শর্ষে ক্ষেত দেখতে দেখতে আমাদের সকাল হয়ে উঠতো অনবদ্য অনুভূতির প্রিয়তম এক প্রহর।

আজকের প্রজন্মের যেন সেই সুযোগও নেই। আমি রূপাকে জিজ্ঞেস করলাম- 'কেন, তোরা কখনো ভোরের ট্রেনে চড়ে চিটাগাং কিংবা অন্য কোন শহরে যাসনি? তখন দেখিসনি- ভোরের সৌন্দর্য্য কি অপরূপ এক ব্যাপার?'

'-কী যে বলোনা তুমি মামা- আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারিনা বলেই তো আব্বু সবসময় কোথাও যাবার সময় কেবল দুপুর বা বিকেলের ট্রেনের টিকেট কাটে' !

মোক্ষম জবাব । শুনে আমি আর কিছু বলতে পারিনা। আমার সব বলা ফুরিয়ে যায়।

দিন ও রাত্রির নগরীকে ভালবেসে, দিন ও রাত্রির নাগরিক সব ব্যস্ততাকে অতিশয় মূল্য দিয়ে -এবং ক্ষেত্রবিশেষে রাত্রির সকল বিনোদনকে 'শেষরাত অবধি' প্রলম্বিত করে- অপরূপ ভোরের অনবদ্য স্নিগ্ধতাকে আমরা নিষ্ঠুরের মতো বিসর্জন দিয়েছি- জীবন থেকে।

ভোরের শিউলি থেকে যেন রাতের রজনীগন্ধাই আজ আমাদের কাছে বেশী প্রিয়।
ভোরের পাখির কলতান ভুলে রাত্রির ক্ল্যারিওনেট ছুঁয়ে আমরা সবাই আজ অদ্ভুত নিদ্রাহীন এক জীবন গড়েছি।
গড়েছি রাতজাগা আয়ু-অসচেতন পরিশ্রমবিমুখ আয়েশী প্রজন্ম।

আজকের প্রজন্মের কাছে স্বভাবতঃই তাই-'ভোর' এক অদেখা প্রহর।
ভোরের সুর- এক অচিন রাগিনীর না শোনা প্রাণদোলা।
ভোরের পাখী- এক অজানা চঞ্চলতার না দেখা গতিময়তা ।

ভোরের প্রস্ফুটিত যতো আলো- প্রজন্মের প্রত্যাশা, পরিমন্ডল আর প্রিয় তালিকা থেকে-আজ তাই খুব দূরে।

আমার কেন যেন কেবলই মনে হয়- 'ভোর'কে বিসর্জন দিয়েছি বলেই আমরা সবাই আজ যে কোন বিভেদে একে অপরের প্রতি খুব বেশী 'এগ্রেসিভ' হয়ে যাচ্ছি। একে অপরকে ক্ষমা করতে আমরা যেন খুব বেশী অপারগ হয়ে যাচ্ছি । 'ভোরের আকাশ' প্রত্যক্ষ্য করিনা বলেই আমাদের সকল উদারতা আজ যেন বিপুল বেগে দূরগামী...।

হয়তোবা একারণেই একদিন এক কবিতায় লিখেছিলাম-

" মেঘ তোমাকে মনে করাবে- বিভেদ গুলোই বারবার-
বৃষ্টি মনে করাবে সেই কষ্ট, অহেতুক দিয়েছি যা জীবনভর –

তুমি তাই করতে চাইলে ক্ষমা-
শুধু ভোরের আকাশের কাছে যেও-

একটি অপরূপ অন্যরকম হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ভোর-
তোমাকে নিশ্চয়ই নতুন করে ভাবতে শেখাবে-

সবটুকু ভুল- হয়তো কারোরই শুধু- একা’র ছিলোনা-

সাবলীল ক্ষমা করা যায় তাই,
এইভাবে অনাবিল
ভোরের শুভ্রতা ভালবেসে ! "



সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৩:০৫
২২টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×