মানুষের পর মানুষ। অজস্র মানুষ!
বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসছে তারা।
আমাদের মুখোমুখিই হেঁটে আসছে একঝাক সুখী মুখ।
আমাদের একটু ডান দিক দিয়ে তারা ঢুকে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শপিং মল বসুন্ধরা সিটি-র ভেতরে।
কেউ একটু থামছে না। কেউ একফোটা তাকাচ্ছেও না।
তেমন মনোযোগ দিয়ে শুনছে চাইছে না- আমরা আসলে কি বলতে চাচ্ছি। আমরা আসলে কার জন্য সাহায্য চাইছি।... সেটা বাস্তবিকই কতোটুকু প্রয়োজন। কতোটা জরুরী....। কেউ সেসব- জানতে চাচ্ছে না!
আশ্চর্য্য! সত্যিই আশ্চর্য!!
একটি উদাত্ত আহ্বানের বিপরীতে কী নিদারুণ নিস্পৃহতা !
একটি করুণ প্রার্থনার বিপরীতে কী প্রবল কঠোর প্রাপ্তি !
আমার গলার স্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে প্রায় থেমে যেতে বসেছে । আমি জোর করে তখনো শাশ্বতর পোষ্টারের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে করুণ স্বরে বলার চেষ্টা করছি-'' দয়া করে একটু শুনুন। একটু থামুন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র আজ ভয়াবহ পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। তাকে বাঁচাতে আপনার একটু সাহায্য প্রয়োজন। আপনার একটু সাহায্যই পারে তাকে নতুন করে জীবনের স্বপ্ন দেখাতে....''
কে শোনে কার কথা! বেশীর ভাগ মানুষই নিস্পৃহ আমাদের আহবানের প্রতি। বেশীর ভাগ মানুষই আমাদের কথায় কোন কর্ণপাত না করেই ঢুকে যাচ্ছে মার্কেটের ভেতরে। কোন কোন মানুষের চোখে আবার হালকা অবিশ্বাসের দোলা। তাদের চোখে মুখে বিরক্তির আভাযুক্ত হালকা অসন্তোষ। সাহায্যের নাম করে না জানি আমরা কী বিপুল সম্পদ হস্তগত করে নিচ্ছি তাদের কাছ থেকে- এমন একটা মনোভাব!
আমি এসব দেখে রীতিমতো থমকে গেলাম। চমকে গেলাম। একটি কষ্টের আয়না যেন মুহূর্তে খুলে গেল চোখের সামনে। আমি যেন দর্পনে দেখে চলেছি নিজের মুখ। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন লোক অসহায় আর্তনাদে তার মুমুর্ষ কোন আত্মীয়কে বাঁচানোর জন্য সাহায্য প্রাথর্না করছে আর আমি তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি....।
কতোবার.... ? কতোবার আমি এই জীবনে এমন করেছি- তা’ আজ আর সঠিক বলতে পারবোনা। তবে এটা স্পষ্ট মনে আছে যে, রাস্তা-ঘাট-লঞ্চ টার্মিনাল- এ জাতীয় পাবলিক প্লেসে পেশ করা এ ধরনের সাহায্যের আবেদনকে আমি চিরকাল সন্দেহের চোখেই দেখেছি।... আমি প্রায়শঃই এসব আবেদনকে মিথ্যে বা বানোয়াট ভেবে অবিশ্বাসে চুপচাপ এড়িয়ে গেছি!
তাহলে আজ? আজ কেন আমার মতোই সন্দেহযুক্ত মানুষেরা আমাকে বিশ্বাস করবে? আজ কেন তারা শুধু আমার কথা শুনেই বিশ্বাস করবে- আসলেই শাশ্বত নামের একজন যুদ্ধ করছে জীবনের সাথে?
ভাবতে ভাবতে আমার সমস্ত সত্তা কেঁপে উঠলো তীব্র অনুশোচনায়।
সত্যিইতো ! এই যে এতোদিন অনেক অনেক সাহায্যের প্রার্থনাকে যাচাই না করেই মিথ্যে ভেবে এড়িয়ে গেছি, সেটি কি যথার্থ হয়েছে? আমাদের অজান্তেই এমন যদি হয়ে যায় যে – একটি দুর্গত জীবন বাঁচানোর সত্যিকারের আবেদন-আমাদের অবিশ্বাস আর অবহেলার কারণে নিদারুণ বেদনায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে গেছে- এবং তার ফলে ঝরে গেছে একটি জীবন- তবে সেই অবিশ্বাসের লজ্জা নিয়ে আমরা কিভাবে আমাদের পরিচিত একজনের জীবন বাঁচাতে নগরীর মানুষের কাছে যাবো?
কিভাবে- কেমন করে আমাদের এতোদিনের নিস্পৃহতার লজ্জা ঢাকবো?
আমি ভেবে কোন কূল কিনারা পেলাম না। আমি সচেতনতার সাথেই উপলব্ধি করলাম- আমার বরাবর দেখে আসা দৃশ্যের সাথে আজকের দৃশ্যের কতো তফাৎ।
বরাবর আমি সাহায্য প্রার্থনাকারীদের দেখেছি, আর মনে মনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অবিশ্বাস করেছি। আর আজ? বসুন্ধরার গেটে দাড়িয়ে আমি আজ নিজেই দাড়িয়ে আছি ‘সাহায্য প্রার্থনাকারী’র ভুমিকায়।
আজ আমার নিজের কন্ঠেই ‘সাহায্য প্রার্থনাকারী’র সকরুণ আকুলতা ।
এবং সবচেয়ে আশ্চর্য্যের কথা হচ্ছে এই যে, আজ আমি মনে মনে চাচ্ছি বসুন্ধরায় প্রবেশ করতে আসা প্রতিটি লোকই আমার কথা শুনুক, আমার কথা বিশ্বাস করুক এবং তারা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু সাহায্য দিক!
সত্যিই! বিচিত্র মানুষের মন! বিচিত্র মানুষের চাওয়া!
আমি নিজে যা কখনো করিনি, আজ আমি সেটিই প্রত্যাশা করছি প্রবলভাবে।
অবিশ্বাসের আঘাতে কতো মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনার আকুল আবেদনকে আমি এতোকাল গুড়িয়ে দিয়েছি, আর আজ হঠাৎ আমি প্রবলভাবে চাইছি সবাই যেন প্রবল বিশ্বাসের সাথে সমস্যাটি উপলব্ধি করে এবং স্বেচ্ছায় বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত।....এটি কেমন করে হয়?
মানুষের ভাবনার সাথে বাস্তবতা অনেকক্ষেত্রেই মিলে না।
তাই দেখলাম একশ দুশো মানুষ নির্বিকারভাবে হেটে যাবার পর একজন হয়তো হঠাৎ থেমে গিয়ে আমাদের কথা শুনছে এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।....
মানুষের বিপদে মানুষের এই এতো অল্প সাড়া দেওয়ার বিষয়টা ততোক্ষণে আমাকে ভেতরে ভেতরে বেশ আহত করে ফেলেছে। আমি তাই হঠাৎ কালপুরুষদাকে বললাম-এখন আপনি একটু বলুন- আমি একটু ভেতর থেকে ঘুরে আসি।...
ঢুকে পড়লাম বসুন্ধরার ভেতর। আগেও অনেকবার ঢুকেছি। কিন্তু আজ যেন অন্যরকম লাগছে সব। আজ যেন সবকিছুই নতুন আঙ্গিকে দেখছি !
এতো সব মানুষ ভেতরে গিজ গিজ করছে।
এতো আলো ! এতো ঔজল্ব্য চারিদিকে! জীবনের এমন তীব্র মুখরতা! জীবনের এমন তীব্র রঙীণ অনুভব চারিদিকে! জীবনভর এইসব সুখী সমৃদ্ধ মানুষগুলো কতো ভোগই না করেছে- চাইবার আগেই তারা পেয়ে গেছে জীবনের সবকিছু-তাহলে শুধু শাশ্বত-র কষ্টের কথাটাই তারা বুঝতে পারবেনা ? শুধু শাশ্বত-র জন্য দশটি টাকা দিতে গিয়েই থেমে যাবে তাদের অপার আনন্দময় সুখী হাত...?
তা কি করে হয়? কেমন করে হয়?
বহু আগেই যে কবি লিখে গেছেন-
''মানুষ যাবে না কেন মানুষের দিকে?
দেখা হলে পার্কে-বিমানবন্দরে, কেন পরস্পর মেলাবেনা হাত?...''
যদি সত্যিই আজ মানুষ মানুষের কাছে না যায়, যদি একান্তই মানুষ মানুষের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়- তবে শত শত বৎসরের সব কবিতা গান আর বাণী মিথ্যে হয়ে যাবে!
হে মানুষ! তোমরা নিজেদের এতো নীচে নামিয়ে দিও না।
তোমাদের অনুভব, উদারতা আর মর্যাদা যেভাবে ধ্বনিত হয়েছে লেখায়, রেখায় আর অজস্র প্রশংসার বাক্যবাণে, আজ তোমরা তার এতোটুকু মর্যাদা রাখো!
একবার দাড়াও আবার মানুষের পাশে!
একটি করুণ মর্মস্পর্শী আবেদনের বিপরীতে একটি অবিশ্বাসের চোখ উপহার দিয়ে তোমরা আর তোমাদের মর্যাদাকে ধূলায় ভুলুণ্ঠিত করোনা!
...........................................
আমার প্রচন্ড পানি পিপাসা পেয়েছিল। কেমন যেন প্রচন্ড খিদেও। আমি একটু হেটে সামনে গিয়ে পেয়ে গেলাম স্ন্যাকসের দোকান। বসুন্ধরায় সবকিছুর দাম চড়া জেনেও খেয়ে ফেললাম একটা সিঙারা আর একটা কোল্ড ড্রিংকস। দাম দিতে হলো ত্রিশ টাকা।
দাম দেয়া শেষ হলো। আমি ফিরে আসছি আবার গেটে। আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল এক ভদ্রলোক শাশ্বতর বিষয়ে দশ পনের মিনিট দাড়িয়ে সব কিছু শুনে দেখে এবং যাচাই করে তারপর যাবার সময় সাহায্যের বাক্সে দশটি টাকা রেখে গিয়েছিলেন। সেই আমি জীবনে প্রথম জেনেছিলাম- দশটি টাকা সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রেও কতো কঠিন সব নিরীক্ষা আর প্রশ্নবাণের সম্মুখীন হতে হয়!
যদি তাই হয়, তবে আমি এ ভুলটি কিভাবে করলাম?
আমিতো আমার পিপাসা আর ক্ষুধাকে একটু ভুলে থাকতে পারলেই এই সদ্য খরচ করা ত্রিশটি টাকাও ঐ সাহায্যের বাক্সে রাখতে পারতাম।...
কথাটা মনে হতেই তীব্র এক অপরাধবোধ আমাকে পেয়ে বসলো। আমার খুব খারাপ লাগতে লাগলো। এই বসুন্ধরায় একবার বার্গার-কফি খেতে গিয়ে দুশো টাকা খরচ করেছি। একবার কি একটা অপ্রয়োজনীয় শো-পিস কিনতে গিয়ে গচ্চা দিয়েছি চারশো টাকা।....
হে শহর, তুমি কি আমাকে বলতে পারো-সেদিনও কি শহরে একজন অসুস্থ মানুষ শাশ্বত-র মতোই যন্ত্রনায় কাতরে মরছিলো? সেদিনও কি শহরের কোন বিপনীবিতানের সামনে দাড়িয়ে কিছু আকুল চেহারার মানুষ তাঁর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করেছিলো...?
হে শহর, বিশ্বাস কর, আমি সেদিন সে বিষয়টি আজকের মতো করে জানতে পারিনি। জানলে নিশ্চয়ই আমার বার্গার-কফি খাবার বিলাসিতা অনেকটাই থমকে যেত! জানলে নিশ্চয়ই শো-পিসের নিথর সৌন্দর্য্যের চেয়ে একটি টগবগে সুস্থ মানুষের জীবন্ত সৌন্দর্য্যকেই আমি অনেক বেশী মূল্য দিতাম!
হে শহর, তুমি আমাকে আজকের মতো এমন করে-এমন উপলব্ধি দিয়ে জানালেনা কেন? কেন জানালেনা জীবনভর আমি যা কিছু অপচয় করেছি তার সব কিছু দিয়ে অন্ততঃ একজন দুর্গত মানুষের মুখেও হাসি ফোটানো যেত!
শহর, তুমি হয়তো আসলে বুঝে ফেলেছিলে- আমি আর সবার মতোই শুধুই একজন সাধারণ মানুষ। সেই সেদিন যারা আমাদের সাহায্যপ্রার্থনার প্রতি বিন্দুমাত্র না তাকিয়ে হাসতে হাসতে একের পর এক বসুন্ধরায় প্রবেশ করেছিলো, তুমি নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছিলে-আমিও তাদের মতোই একজন।
আমিও তাদের মতোই আত্মকেন্দ্রিক, আত্মমগ্ন, সমৃদ্ধ সুখী মানুষ।
তুমি তাই দুর্যোগ দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কান্না আর কষ্ট খুব যত্ন করে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে।
কিন্তু হে শহর, তুমি হয়তো একবারও খেয়াল করোনি,
আগামীকালের সকালটি এখনো অজানা আমাদের।
কাল সুর্যোদয়ের অপরূপ ভোরে- আমি নিজেই যে আক্রান্ত হবোনা দুর্বিষহ কোন যন্ত্রনাময় রোগে-তার কোন নিশ্চয়তা-তুমি কি পারবে দিতে হে শহর?
তখনো কি আমার আত্মকেন্দ্রিকতা আর আত্মমগ্নতা-আমাকে বাঁচাতে পারবে হে শহর?
...........................................................
১৪ই জুন, শনিবার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

