বালকবেলার প্রতিবেশি বীনা, যে আমায় লোডসেডিংয়ের রাতে ছাদে ডেকে হাত নেড়ে নেড়ে আবৃত্তি শেখাতো-
Twinkle, twinkle, little star,
How I wonder, what you are!
Up above the world so high
Like a diamond in the sky!
কে জানে তার জন্য না-কি তার পোষা টিয়া পাখিটার জন্য আমার বুকটা আজও খা-খা করে ওঠে! বেড়ালের আঁচড়ে অসুস্থ পাখিটার মৃত্যু হলে, মনে আছে, অনেকদিন বীনাদের বাড়ির পথে হাঁটা হয়নি। তখনো লোডসেডিং হতো, ছাদে উঠে একলা একা বীনা হাত নেড়ে নেড়ে পাঠ নিত কি ওগো little star? আমি বীনার টানে না-কি পাখিটার টানে ছুটে যেতাম ওদের বাড়ি- তা বহুবার জানতে চেয়েও জানি নি। ফলে গুপ্ত আছে আজও সেই রহস্য কথা। শুধু বোঝা যায়, ওদের জন্য আমার কোথাও একান্ত ব্যক্তিগতবেদনা কিছু জমা পড়ে আছে। আমরা ব্যক্তিমাত্রই এরূপ ব্যক্তিগতবেদনা লালন করি। তারা আমাদের মাঝে বাসা বাঁধে, কলরব করে, বেড়ে ওঠে; আর কী আশ্চর্য, তারা কখনই আমাদের ছেড়ে যায় না! কতদিন তাড়াতে চেয়ে নির্দোষ দুপুর হত্যা করেছি, কতরাত- তবু পরক্ষণেই তাদের ডেকে আনতে হয়েছে আহ্লাদে, অভিমানে, স্নেহে, যত্নে। তবে কি একান্ত বলে এই বেদনা শব্দটি সারাজীবনের জন্য একান্তই থেকে যায়?
হয়তো কারো কারো থেকে যায়। কিন্তু যাঁরা আশ্চর্য প্রতিভাবান, তাঁরাই শুধু তাঁদের একান্তবেদনাকে অন্যের অনুভূতিতে প্রতিস্থাপন করতে পারেন। নিজস্ব বেদনাকে রূপ দিতে পারেন সার্বজনীনতায়। আর আমরা যারা অতিশয় সাধারণ মানুষ, তারা মহানদের সেসব বেদনাকে নিজের করে নিয়ে আর সব বেদনার সঙ্গী করে রাখি। তাদের সঙ্গে গড়ে চলি সুনিবিড় সখ্যতা।
মনে পড়ে কাজলা দিদির কথা? সেই কাজলা দিদি- যে আমাদের বাস্তবের কেউ নয়, কিছু নয়, যাকে চিনি না, দেখি নি; শুধু একবার পড়তে গিয়ে যার নামের সাথে পরিচয় হলো- এত বেদনা দিয়ে গেলো- তবু তাকে ভুলতে পারি না কেন? কেন তার জন্য আমার ভেতরটা যখন তখন হু হু করে ওঠে? সে আমার কে? তবে কি কাজলা দিদি আমাদের ছেলেবেলার সেই দিদি, যে বহুঝগড়ার সাথী, বহুঅভিমান-অনুরাগের সঙ্গী, মায়ের কাছে পাশাপাশি হাত পেতে অভিযোগের সুবিস্তর বর্ণনা? আর দিন শেষে বুবুর বুকে মাথা রেখে আদায় করে নেয়া দিনমান-দিনরাত্রীর স্নেহ! জানি না। শুধু জেনেছি, যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কাজলা দিদি কী করে যেন আমারও দিদি হয়ে গেলো। আঁচলভরা যার স্নেহ শুধু, ধূ ধূ বিরাণ পড়ে থাকে যার অনুপস্থিতিতে!
আসলে প্রাক্তণ বেদনা বলে কিছু নেই। কোন না কোনও উপলক্ষে সকল স্মৃতি-ই বর্তমানের অনুষঙ্গ। নইলে ছোটবেলার সেই আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে বেদনা পরম্পরায় কেন উঠে আসবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’র মার্গারিট ম্যাতিউর কথা? আত্মবিশ্বাসী, আপাত সুশ্রী, অভিমানী আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে মার্গারিট। সৎ আর সুন্দরমনা এই মেয়েটি নিজে শিল্পী বা কবি ছিলেন না; অথচ শিল্প-সাহিত্য-ধর্ম-দর্শন-ইতিহাস প্রভৃতির ওপর ছিল তার অগাধ ধারণা। আসলে সে নিজেই ছিল কবিতা, সে নিজেই ছিল শিল্প। অচেনা মানুষের উপকার করতে গিয়ে হঠাৎ তার হারিয়ে যাওয়া অথবা তার মৃত্যু- যা-ই ঘটুক না কেন- আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। কেন মার্গারিটরা এভাবে হারিয়ে যায় আর তাকে হারানোর বেদনা সুনীলের মাধ্যমে আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াবো? বইটি পড়তে পড়তে পড়া শেষ না করেই চন্দন চৌধুরী রেখে দেয় আর কখনই বইটিকে ছোঁবে না বলে। কেননা, যতটুকু পড়া হলো তার বেশি পড়া হলে জানা হবে মার্গারিট নেই! কেন এই একটিমাত্র বই পড়ে নির্লিপ্ত নয়ন কেঁদেছিল? কোথাকার কোন্ মার্গারিট, বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা নাম- মার্গারিট, তার জন্য আমাদের অন্তঃস্থ বেদনার এতটা দায় কেন?
মাকে নিয়ে লেখা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কিশোর কবিতা মাঝে মাঝেই আওড়াই-মা যে আমায় গান শোনাতো/ দোলনা ঠেলে ঠেলে/ মা যেতে যেতে কেবল/ গানটি গেছে ফেলে। মায়ের সেই গান টুংটাং করে আজও বেজে বেজে ওঠে। মনে হয়, বহুবছর পর আমি গাঁয়ে ফিরে আসি, মা-মা ডাকি। ভাবি, কোলবদলের দিনের স্বরলিপি গাইতে গাইতে হঠাৎ তুমুল আয়োজনে কেউ যদি একদৌড়ে এসে আমায় কোলে তুলে নিত! যদি আজ স্তনে মুখ রেখেই কান্না ভোলা যেত- মাকে আমার কখনই মনে পড়তো কি?
মাকে নিয়ে লেখা ইভান তুর্গেনিভের একটি গল্প পড়েছিলাম অনেকদিন আগে। সে গল্পটি দিয়েই আপাতত শেষ করছি এই লেখাটি-
এক কিশোর তার মাকে খুব ভালোবাসে। পৃথিবীতে তার মা ছাড়া প্রিয় কোনকিছু নেই। মায়ের জন্য এমন কোনও কাজ নেই যা সে করতে পারে না। তার কাছে পৃথিবীর সবচে সুন্দর, সবচে রূপসী তার মা।
একদিন সেই কিশোর বড় হলো। সে যৌবনে পদার্পন করলো। যৌবনে তার সঙ্গে পরিচয় হলো এক অনিন্দ্য রূপসী যুবতীর সঙ্গে। সে যুবতীকে প্রেম নিবেদন করলো। মেয়েটি জানতে চাইলো- তুমি আমার জন্য কী করতে পারো?
- সব, সব করতে পারি।
- সব পারো?
- হ্যাঁ, সব পারি? পৃথিবীতে এমন কোনও কাজ নেই যা আমি তোমার জন্য করতে পারি না।
-তবে যাও, তুমি আমার জন্য তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে আসো।
যুবক একথা শোনার পর মায়ের কাছে ছুটে যায়। সে তার প্রিয় মাকে হত্যা করে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে ছুটতে ছুটতে আসে মেয়েটির বাসার দিকে। দ্রুত যুবতীর দরজার কাছে আসতেই হঠাৎ আঁছাড় খেয়ে পড়ে যায় যুবক। আর তখনই তার হাতে থাকা মায়ের রক্তমাখা হৃৎপিণ্ডটা বলে ওঠে- খোকা তোর লাগেনি তো!
গল্পটি এখানেই শেষ, আর আমার বেদনার আর একপ্রস্থ শুরু। মায়েরা এমন হয় কেন?
বেদনা পরম্পরায় এভাবেই ক্রমাগত জাগতে থাকে আমার বেদনা সম্প্রদায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

