মাহমুদ শাওন
বিংশ শতকের ত্রিশ দশকে বিশ্বসাহিত্যে আবির্ভাব হয় কবি এমে সেজেয়ার-এর। এমে সেজেয়ার কবি, নাট্য রচয়িতা, প্রাবন্ধিক। জন্ম ১৯১৩ সালে মার্তিনিক-এ। সম্প্রতি (গত ১৭ এপ্রিল ২০০৮) ৮৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বহু আগে থেকেই আফ্রিকার ইতিহাস বলতে কেবল মিশর আর ইথিওপিয়া ছাড়া অন্য কোনও দেশের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য কিছু জানা যায় নি। অথচ আড়াই হাজার বছরের পুরনো এক সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল আফ্রিকার বেশ কয়েকটি অঞ্চলে। কিন্তু পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক প্রভুদের আচরণ ও তাদের লালিত-পালিত মিডিয়া আফ্রিকা সম্পর্কে বিশ্ববীক্ষায় ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, অরাজকতার ধারণাই দিয়েছে কেবল। সময় বদলেছে। নিজস্ব সংস্কৃতি ও সাহিত্যের যোগ্যতার বলে আফ্রিকার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যে তার নিজস্ব আসন করে নিয়েছে। আফ্রিকার সাহিত্য বিশ্বসাহিত্য ভাণ্ডারকে করছে আরও ঋদ্ধ, আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ।
আগেই উল্লেখ করেছি, এমে সেজেয়ার ছিলেন মার্তিনিকের অধিবাসী। মার্তিনিকের ইতিহাস সম্পর্কেও খুব বেশি কিছু জানা যায় না। এ্যান্টিল বা পশ্চিম ভারতীয় দীপপুঞ্জ মার্তিনিক। দেশটির মাতৃভাষা ক্রেয়ল। ১৬৩৫ সালে এখানে উপনিবেশ স্থাপিত হওয়ার পরের বছর ১৬৩৬ সালে 'আমেরিকান দীপপুঞ্জ কোম্পানি'র (ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো) ফরাসী প্রভুরা স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পূর্ণ নিধন-সাধনে রত হয়। এ সময় তারা কৃষ্ণ আফ্রিকার বেশকিছু দেশ থেকে পঞ্চাশ হাজার নিগ্রো দাস আমদানী করে মার্তিনিকে। সেই নিগ্রো, নিপীড়িত দাসের রক্ত আজও ছড়িয়ে আছে দেশটির সর্বত্রময়। ১৮৪৮ সালে আইন করে দাস প্রথার বিলুপ্তি ঘটানো হয়। বর্তমান মার্তিনিক কোনও স্বাধীন দেশ নয়, ফ্রান্সের একটি বিভাগ।
বিংশ শতকের ত্রিশ দশকে বিশ্বসাহিত্যে আবির্ভাব হয় কবি, নাট্যকার এমে সেজেয়ারের। মার্তিনিকের মাতৃভাষা ক্রেয়ল হলেও তিনি লিখতেন মূলত ফরাসি ভাষায়। লেখালেখির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষা বেছে নেয়ার পেছনে কী উদ্দেশ্য কাজ করেছিল- তা জানা না গেলেও, সেজেয়ারের পিতা-মাতার উচ্চবিলাসী স্বপ্ন-ই এক্ষেত্রে তাকে প্ররোচিত করেছিল তা অন্তত জানা যায় তার বিভিন্ন লেখনী থেকে। সাহিত্যের ছাত্র হয়ে যৌবনে সেজেয়ার প্যারিসে আসেন উচ্চশিক্ষার জন্য। প্যারিসে আসার পর পরই তার দৃষ্টির দুয়ার যেন খুলে যেতে থাকে। সেখানে পরিচয় হয় সেনেগাল থেকে আসা বয়সে তারচে কিছু বড় কবি লিওপল্ড সেদার সেঙ্ঘর (জন্ম ১৯০৬) ও ফেঞ্চ গুইয়েনা থেকে আসা প্রায় সমবয়সী কবি লিওন দামাস (জন্ম ১৯১২)-এর সঙ্গে। সেদার সেঙ্ঘরের সঙ্গে সেজেয়ারের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। সেঙ্ঘর ছিলেন 'নিগ্রো-আত্মা' (Negritude)- এর প্রবক্তা। সেজেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সেঙ্ঘর ১৯৩৪ সালে প্রায় লিটল ম্যাগাজিনের মতোই 'কৃষ্ণবর্ণের ছাত্র' নামে একটি পত্রিকা শুরু করেন, 'যাতে আফ্রিকান ও মার্তিনিকের লেখকরা মহাভারতের কর্ণ-সমান গ্রীক পুরাণের সেই হতভাগ্য অরফিউসের মতো মিলিত হতে পারেন তাঁদের দুপরে একই অতীত সম্পদের আবিষ্কারে। সাহিত্যের পাশাপাশি তারা নিজ নিজ দেশ ও জাতিকে ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ হন এবং নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেদার সেঙ্ঘরের নেতৃত্বে সেনেগাল স্বাধীনতা লাভ করে এবং সেঙ্ঘর হন সেনেগালের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আর সেজেয়ার? সেজেয়ার ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘসময় প্যারিসের বিধানসভার সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ বয়সে তিনি ছিলেন মার্তিনিকের প্রধান শহর ফর-দ্য-ফ্রাঁস-এর মেয়র।
এমে সেজেয়ারের অসামান্য কীর্তি আধুনিক মহাকবিতা 'দেশে ফেরার খাতা' সেই দুর্লভ, মহান গ্রন্থগুলোর একটি- যা পুরো বিংশ শতাব্দীর কাব্য ও দর্শনকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছিল। আজও এই ভুবনের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর আত্মআবিষ্কারের সূত্রমুখ হয়ে আছে 'দেশে ফেরার খাতা'। যুগ যুগ ধরে মানুষের প্রচলিত জীবনবোধ ও জীবন দর্শনকে নতুনভাবে ভাবতে প্রভাবিত করে তার এই অসামান্য রচনা। এই গ্রন্থের কবিতা সম্পর্কে সুররিয়ালিজমের প্রধান পুরোহিত আঁদ্রে ব্রেঁত মন্তব্য করেন, 'আমাদের সময়কার মহত্তম লিরিক স্তম্ভ'। এক্ষেত্রে বেলজিয়ান লিলিয়ান কেস্টেলুট-এর বিখ্যাত উক্তি, 'কৃষ্ণ মানুষের জাতীয় সঙ্গীত' পৃথিবীব্যপি এই গ্রন্থটির তাৎপর্যকে আরও গভীর ব্যঞ্জনা দেয়।
এমে সেজেয়ারের 'দেশে ফেরার খাতা' লেখা শুরু হয় প্যারিস থেকে মার্তিনিকে ফেরার মুহূর্তে, জাহাজে। ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে লেখাটি 'ভোলেন্তেস' পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরপরই 'কৃষ্ণ মানুষের জাতীয় সঙ্গীত' হয়ে উঠতে থাকে; যদিও বই আকারে প্রকাশিত হয় বেশ পরে, ১৯৪৭ সালে। প্রকাশ করেন নিউইয়র্কের ব্রেনতানো প্রকাশনা সংস্থা। একই বছর প্যারিসের 'বোগার্স' পাবলিকেশন্স থেকে বইটির ফরাসি সংস্করণ প্রকাশ পায়। এছাড়া ১৯৫৬ সালে 'প্রেজেঁস আফ্রিকেইন' ও ১৯৬৯ সালে 'পেঙ্গুইন বুকস্' বইটির অনুবাদ প্রকাশ করে। বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য 'দেশে ফেরার খাতা' অনুবাদ করেন দেবলীনা ঘোষ ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ভাষায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় পশ্চিবঙ্গের 'বর্ণনা প্রকাশ' কর্তৃক পৌষ ১৩৮৪ বঙ্গাব্দে। তার ২২ বছর পর ভাদ্র ১৪০৬ বঙ্গাব্দে (সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ খৃ.) বাংলাদেশের 'সাহিত্য প্রকাশ' থেকে বইটির ২য় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। ২য় মুদ্রণে বইটির একটি অসাধারণ ভূমিকা লেখেন কবি মোহাম্মদ রফিক। যাহোক, এমে সেজেয়ারের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জমি-জরিপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। তবে ১৯৬০ সাল থেকে তিনি নাট্য রচনায় অধিক মনযোগ দেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ- ‘উপনিবেশবাদ বিষয়ক আলোচনা’ (প্রবন্ধগ্রন্থ, প্রকাশকাল ১৯৫০), ‘রাজা ক্রিস্টোফারের ট্রাজেডি’ (নাট্য বিষয়ক, প্রকাশকাল ১৯৬৪), ‘কঙ্গোর এক ঋতু’ (নাট্য বিষয়ক, প্রকাশকাল ১৯৬৫), ‘একটি ঝড়’ (নাট্য বিষয়ক, প্রকাশকাল ১৯৬৯) ইত্যাদি।
মুক্তগদ্যের এই মহাকবিতাটির শুরু ‘যখন শেষ হ’য়ে আসে ভোর...’-এর মধ্য দিয়ে। যখন শেষ হয়ে আসে ভোর আর তখনই আলোকিত হতে থাকে গভীর গোপন অন্ধকারের বেদনাগুলো। এই অন্ধকার নিজের অস্তিত্বকে পুনঃপুন আবিষ্কারের মর্মবেদনার দলিল। কবি লেখেন-
'আর এই অসাড় শহরে এক কোলাহলমুখর ভিড়, আশ্চর্য এটাই যে নিজের চীৎকারও এখানে বেউ শুনতে পায় না, যেমন এই শহরও চিনতে পারে না তার নিজের নড়াচড়া, নিজের অর্থ; নিরুৎকণ্ঠ এক ভিড়, নিজের সত্যি চীৎকারটাকে অব্দি ডে অস্বীকার করে, অথচ শুধু সেই চীৎকারটাই তো শোনবার, কারণ সেটা যে তার নিজের চীৎকার, আর এটা তো জানা যে এই চীৎকার কোনো গভীর প্রচ্ছায়া আর অহমিকা থেকে উত্থিত, এই অসাড় শহরে এই ভিড় নিজের ক্ষুধা নিজের হাহাকার নিজের ক্ষোভ আর নিজের ঘৃণার চীৎকার শুদ্ধু শোনে না- এমনই আশ্চর্য এই ভিড়, চীৎকৃত কোলাহলমুখর, অথচ বোবা।'
বহুযুগ, বহুকাল ধরে নিস্পেষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর আত্মচিৎকার যখন প্রচণ্ড ভীড়ে, কোলাহলে একাকার হয়ে যায়, নিজের কানের কাছে আর পৌঁছে না সে শব্দ; ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভিযোগ-অনুযোগগুলো যখন শোনার কেউ নেই, কিছু নেই; কোলাহলমুখর আলোয় নিজেকে যখন বোবা ও বধির মনে হয়- ঠিক তখনই, হ্যাঁ, তখনই প্রয়োজন পড়ে নিজের অস্থিত্ব অনুসন্ধানের। আত্ম-আবিষ্কারের প্রশ্ন তখনই দেখা দেয়। আর তখনই কথা কয়ে ওঠে সেজেয়ারের 'দেশে ফেরার খাতা'।
বইটির ভূমিকায় কবি মোহাম্মদ রফিক লেখেন, 'একজন পরাধীন পরশাসিত দেশের কবি, যিনি প্রথম থেকেই প্রভুদের বা শাসকদের ভাষায় বন্দি এবং শেকড়হীন, নিপীড়ক ও শোষকের ভাষায়ই রচনা করেছেন নিজের এবং নিজ মানুষের ‘ঘরে ফেরার’ বা ‘শেকড় সন্ধানের’ বা ‘জাতীয় মুক্তির ও স্বাধীনতার’ মহাকবিতা, তাঁর কবিতা তাই হয়ে ওঠে কবিতার ভাষায় ঔপনিবেশিক বণিকসভ্যতার মুখোমুখি সব-হারানো মানুষের আত্মআবিষ্কারের দীর্ঘ অভিযান।'
তার কবিতা 'দেশে ফেরার খাতা' শুধু বিংশ শতকের মহাগাথা-ই নয়, শুধু কৃষ্ণ মানুষদেরই নয়; নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পেতে এবং নিজের অতীত ইতিহাসকে জানতে, যুগে যুগে পৃথিবীর সকল শেকড়হীন, নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীর আত্মার গান হয়ে থাকবে 'দেশে ফেরার খাতা'।
তথ্যসূত্র:
১. দেশে ফেরার খাতা- এমে সেজেয়ার, অনুবাদ: দেবলীনা ঘোষ ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ২য় মুদ্রণ, সাহিত্য প্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত, ঢাকা
২. আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহ- ১, আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহ- ২, সম্পাদক: শিবনারায়ণ রায় ও শামীম রেজা, কাগজ প্রকাশনী, ঢাকা
বি.দ্র: এই লেখাটি আজ (২৫ এপ্রিল, ০৮) দৈনিক ডেসটিনিতে প্রকাশিত হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


