'আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুসলিম হিসেবে, কিন্তু আমি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী'
সমসাময়িক আফ্রিকান লেখকদের মধ্যে এ সময়ের সবচে আলোচিত নাম নুরুদ্দীন ফারাহ। সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পাবার বিষয়টি নুরুদ্দীন ফারাহ'র ক্ষেত্রে একাধিকবার আলোচিত হয়েছে। ১৯৪৫ সালে তৎকালীন ইতালি প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ সোমালিয়ার বাইডোয়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা পেশায় ছিলেন একজন গল্পকথক আর বাবা ব্যবসায়ী, যিনি পরবর্তীতে বৃটিশ সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। সোমালী, অ্যামাহরিক, ইংরেজী, ইতালিয়ান, আরবীয় পরিবেশে তিনি বেড়ে ওঠেন। ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে নুরুদ্দীন ফারাহ দর্শন, সাহিত্য ও সমাজবিদ্যায় লেখাপড়া করেন এবং পরে তিনি লন্ডন থিয়েটারে অধ্যায়ন করেন।
ফারাহ'র প্রথম উপন্যাস 'ফর্ম আ ক্রুকড্ রিব' প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। এরপর 'টেলো ওয়া টেলে মা' (১৯৭৪), 'ট্রিলজিকস্' (১৯৮০-৮৩), 'ব্লাড ইন দ্যা সান' (১৯৮৬-৯৯), 'ম্যাপস' এবং জুন ২০০৩-এ দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস 'লিংকস'। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র যে তার জন্মভূমি সোমালিয়া থেকে আগত, কুড়ি বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে আর শেষবারের মতো সে তার মায়ের সমাধিস্তম্ভ দেখতে গিয়েছে। রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দূরত্বের মধ্যে সেখানে সে কি খুঁজে পেলো? সোমালীয় এই লেখক ইউনেস্কো পুরস্কারসহ ইতালির 'প্রিমিও ক্যাভ্যুর', সুইডেনের 'কুর্ট টুচোলস্কি', ১৯৯৮ সালে 'জিম্বাবুয়ের সেরা উপন্যাস', 'নিউস্ট্যাড আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার' ও একই বছর তাঁর 'গিফট্' উপন্যাসের ফরাসী সংস্করণের জন্য পান 'সেন্ট মালো সাহিত্য উৎসব' পুরস্কার। নুরুদ্দীন ফারাহ্'র গ্রন্থগুলো বিশ্বের ১৭টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুটে ইলজা ব্রাউন’র সঙ্গে আলাপকালে ফারাহ তাঁর নতুন উপন্যাস 'লিংকস', গৃহযুদ্ধ এবং সোমালিয়া সম্পর্কে তাঁর স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাহমুদ শাওন
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জিবলাহ যখন সোমালিয়ায় ফিরে এলো, সে দেখলো এটা ঠিক করা খুব কঠিন যে কাকে সে বিশ্বাস করবে আর কাকে করবে না। সিদ্ধান্তটি তার জন্য এতো কঠিন হওয়ার কারণ কী?
ফারাহ: বেশ। কারণ সে দীর্ঘদিন যাবৎ দূরে ছিল আর ততদিনে খেলায় পরিবর্তন এসেছে। জীবনের শুরুতে যখন সে মোগাদিসুতে থাকতো তখনকার সেই দলগুলো ভেঙ্গে এখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল তৈরি হয়েছে। কিছু লোকের হাতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে যারা অন্যদের আলাদা দলে বিভক্ত করতে চায় যাতে নতুন পরিস্থিতির মধ্যে তারা দুঃসাহসিক কিছু করতে পারে। আর স্বাভাবিকভাবে নতুন এই পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, যা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে বাধ্য।
দীর্ঘদিন পশ্চিমে বসবাসের জন্য কি সে পাশ্চাত্য বা উত্তুরীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ছিল?
ফারাহ: না। এটা ঠিক যে নতুন খেলাটি সম্পর্কে সে অবগত নয়। নিয়ম পরিবর্তিত হয়েছে। এবং যদি সেই নতুন নিয়মগুলো না মানা হয় তবে জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে। গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এই নব বিস্ময়কর ঘটনার সঙ্গে পশ্চিমের কোনও সম্পর্ক নেই। কুড়ি বছর আগে গোত্রের রাজনৈতিক কোনও জোর ছিল না। সেই দিনগুলোতে রক্ত ছাড়া জনতার ঐক্যবদ্ধ হওয়া সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অনেক গোত্র-পরিবার মনে করলো প্রাক-ব্যবস্থায় অন্যান্য গোত্রের চেয়ে তাদের শক্তিমত্তা বেশি ছিল না। ফলে গোত্র-ব্যবসা সামনে এসে গেলো। আসলে পূর্বে গৃহযুদ্ধই মানুষের অস্তিত্বকে এমন ভাবনার মুখে ছুঁড়ে দিয়েছিল।
একটি গোত্র ও একটি পরিবারের মধ্যে পার্থক্য কি?
ফারাহ: গোত্র হচ্ছে একটি বৃহৎ পরিবার। সোমালিয়ায় তোমার ডাক নাম যদি ব্রাউন হয়, তবে যে সব মানুষ যাদের ডাক নাম ব্রাউন তারা সবাই তোমার গোত্রীয়। এবং তুমি যদি চাকুরিজীবী হও এবং কাউকে কাজ দিয়ে থাকো, তাদেরকে দেখার দায়িত্ব তোমার। তাদের ওপর তোমার আস্তা থাকবে, তাদেরকে তোমার বাসায় আমন্ত্রণ জানাবে, তারা তোমার সঙ্গে মিশবে। এখন যাদের ডাক নাম ব্রাউন তারা তোমার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তোমার কাজিন। তাহলে গোত্র কি: একটি বৃহৎ পরিবার, সংখ্যায় ধরো, ৫০ হাজার বা ১ ল মানুষ। স্বাভাবিকভাবে তারা একই এলাকায় বসবাস করে। তাই একটি গ্রামের সব মানুষ একই বংশের।
কিন্তু জিবলাহ কিছুটা এই চেতনা-বিরুদ্ধ ছিল
ফারাহ: সে আগেও এর বিরুদ্ধে ছিল এখনও আছে। কারণ আমি মনে করি, আত্মীয় হওয়ার কারণে তুমি তাদেরকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারো না। বরং তাদের মেধাকে অধিক মনোযোগের সঙ্গে তোমার মূল্যায়ন করা উচিৎ। যদি বিদেশ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে তোমার গ্রামের বা তোমার শহরের বা তোমার গোত্রের কাউকে চাকুরি দাও তবে তুমি তোমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছো না। কারণ আদর্শের মতো রক্ত কোনও ঐক্যবদ্ধ শক্তি নয়।
আপনার পূর্ববর্তী বইগুলোর চেয়ে 'লিংকস' এ রাজনীতির প্রসঙ্গটা জোরালো মনে হয়েছে। অন্তত শেষ তিনটি রচনার চেয়ে জোরালো।
ফারাহ: লেখার জন্য গৃহযুদ্ধ একটি ভীষণ দুরূহ বিষয়। যদি একশ জন মানুষ তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে তবে এটি জনগণের মধ্যে বিশৃঙ্খলার উদ্ভব ঘটাবে। এক এক করে চরিত্র শনাক্ত করা একজন ঔপন্যাসিকের জন্য একবারেই কঠিন। আর একটি গৃহযদ্ধের সঙ্গে ৯ মিলিয়ন মানুষ জড়িত। গল্প বলার জন্য একজন বা দু’জন বা বেশ ক’জন চরিত্র কিভাবে বাছাই করবে, যারা ব্যাখ্যা করবে কিভাবে গৃহযুদ্ধ শুরু হলো? তোমার দরকার পেছনের দৃশ্যপট। তুমি বলতে পারো না যে সোমালিয়ার ইতিহাসে এটাই প্রথম যেখানে আমরা একে অপরকে হত্যা করছি। এজন্য তোমাকে যেতে হবে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং আরো অন্যান্য বিষয়ের অভ্যন্তরে। এবং এই বইটি হচ্ছে শেষ তিনটি রচনার প্রথম অধ্যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ের ব্যাখ্যা নিস্প্রয়োজন।
বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ হচ্ছে সেই বিস্ময়কর শিশু, রাসতা, যে চারপাশে প্রশান্তির জাদু ছড়িয়ে দিচ্ছে ফলে মানুষ আগামীতে আর বর্তমানের সহিংসতা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না।
ফারাহ: হ্যাঁ। অন্তত মানুষের ভাবনা এটাই। তার মতো একজন ব্যক্তিকে জনতার প্রয়োজন। কারণ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তারা বিশৃঙ্খলার ভেতর নিপতিত। শিশুটি হলো আশা ও শান্তির প্রতীক যা মানুষকে আকর্ষণ করেছে তার কাছে আসতে ও আশ্রয় নিতে। এবং যদিও সে ছোট কিন্তু তার আচরণ একজন প্রাপ্ত বয়স্কের মতোই। সে হলো একজন রক্ষক।
এই চরিত্রটির ভিত্তি মূলত মিথ যা ইসলামীক ও আফ্রিকান সংস্কৃতিতে সচরাচর দেখা যায়। আপনি পূর্ব থেকে বিদ্যমান ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজের উদ্ভাবনের স্পষ্টত মিশ্রণ ঘটিয়েছেন।
ফারাহ: হ্যাঁ, কারণ এটি সবার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অতীতকে স্পর্শ রাখা, এটাই ঐতিহ্য; বর্তমান, যেখানে আমাদের দৈনন্দিন অবস্থান; এবং ভবিষ্যৎ, যেখানে আমরা যাচ্ছি বা যাবার আশা রাখছি।
উপন্যাসে দেখা যায়, রাসতা অপহৃত হয়েছিল এবং অপরাধীরা সেনাধ্যদের কাছে ভৃত্য হিসেবে সমবেত হয়েছে যাদের শান্তির ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই যা শিশুটি এনেছে। কারণ গৃহযুদ্ধ থেকে তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আপনি এই গল্পটিকে কি রাজনৈতিক রূপক হিসেবে বিবেচনা করেন?
ফারাহ: তুমি তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী পাঠ নিতে পারো। তুমি বলতে পারো গল্পটিতে রাসতার অপহৃত হওয়ার অর্থ হচ্ছে মানুষের স্বপ্নকে ছিনিয়ে নেওয়া, কারণ শিশুটি তাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। শিশুটি চলে যাবার সাথে সাথে স্বপ্নের ব্যপ্তিও কমে গেছে।
অনেকটা অলৌকিকভাবে উপন্যাসের শেষে জিবলাহ তার অতীত ফিরে পেল।
ফারাহ: এটি ভাগ্যের ব্যাপার এবং সে অলৌকিক শিশুটিকে খুঁজছিল আর শিশুটি চেয়েছিল জিবলাহ'র সঙ্গে দেখা করতে। এবং তুমি যদি স্বপ্নের কাছাকাছি যাওয়ার ইচ্ছে লালন করো এবং চিন্তা করো- তবে কখনও কখনও এটি সত্যি হতে পারে।
শৈশবেই আপনি সোমালিয়া ত্যাগ করেছেন এবং দীর্ঘদিন ফিরে যাননি। এখন অনেকটা নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন...
ফারাহ: না, আমি নির্বাসিত নই, আমি বাস করি আফ্রিকায়। আমি আফ্রিকায় আছি এবং কয়েক বছর ধরে তাই করে যাচ্ছি। নিজেকে কখনই আমি নির্বাসিত হিসেবে বিবেচনা করি না। হতে পারে আমি আমার নিজ দেশে থাকি না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বছরে দু' তিনবার সোমালিয়ায় যাই।
কিছু সময়ের জন্য সেখানে ফিরে যাবার কোন ইচ্ছে কি আপনার আছে?
ফারাহ: যদিও দেশটিতে শান্তি ফিরছে এবং দেশটি শুভ চিন্তার দিকে এগোচ্ছে। সেখানকার স্কুলগুলোতে আমাদের সন্তানদের পাঠাতে পারি। কিন্তু তারপরও আমি তো একা নই, পরিবার আছে। আমাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং আশাকরি এক সময় আমরা সোমালিয়ায় বসবাসের জন্য মতৈক্যে পৌঁছাবো। যদিও কয়েক বছরের মধ্যে এরকম ঘটনা ঘটার ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।
মোগাদিসুতে বসবাসের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রদত্ত সুযোগটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ফারাহ: মোগাদিসু শহরকে নিয়ন্ত্রণকারী সেনাধক্ষ্য গৃহযুদ্ধ থেকে সুবিধা নিয়েছে এবং যতক্ষণ পারে নেবে। যে কোনও প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রের চেয়ে মোগাদিসুর জীবনযাত্রাকে তারা কঠিন করে তুলবে। কিন্তু সব সময় তারা এটা পারবে না, কারণ অসংখ্য মানুষ শান্তি চায়, এবং প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ মানুষই কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন চায়। আমাদের একমাত্র দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে শহরে ইসলামী মৌলবাদীদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে উঠছে। সরকার বাধা না দিলে এটি বেড়ে যাবে। মোগাদিসু মৌলবাদীদের হাতে যাবার আগেই দ্রুত প্রদপে নিতে হবে।
এই মুহুর্তে সোমালিয়ায় কি মৌলবাদীদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে?
ফারাহ: এটি হবে কারণ কিছু মানুষ সেকুলার রাষ্ট্রের বিপরীতে কিছু নির্মাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমি আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুসলিম হিসেবে, কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে আমি বিশ্বাসী। আমি ধর্ম চাই তবে তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নয়। যদি মোগাদিসুতে মৌলবাদীরা খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে তবে সেটি রাজনৈতিকভাবে স্পষ্টত জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
যাহোক, আপনার উপন্যাসের শেষে, বরং আশাবাদী হই: মিরাকল শিশুটি শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে, যে অপহৃত হয়েছিল এবং তাকে খুঁজে পেল ও মুক্ত হলো।
ফারাহ: বেশ। ভীষণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আশাবাদী হওয়া ছাড়া তোমার আর কোনও পথ নেই। তুমি কেবল আশা করতে পারো আমরা একেবারে তলানীতে পৌঁছে গেছি এবং এখন আমাদের সামনে এগোতে হবে।
সাক্ষাৎকারটি দৈনিক আজকের কাগজের সুবর্ণরেখায় মুদ্রিত হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


