কয়েকবছর আগে আমরা চঞ্চল চৌধুরীকে আবিষ্কার করি গ্রামীনফোনের একটা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। বিজ্ঞাপনটি মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর করা। এর পর আমি কয়েকটি সাক্ষাৎকারও পড়েছি তার, মোটামোটিভাবে ধরে নেয়া যায় আমাদের অনেকের এই প্রিয় অভিনেতাকে উপহার দিয়েছেন ফারুকী। অবশ্য ফারুকী আরো অনেক কিছু করেছেন। তবে বিজ্ঞাপন বিষয়ে তার একটা চমৎকার উক্তি একবার শুনেছিলাম এক অনুষ্ঠানে, অপি করিমের উপস্থাপনায়, ওখানে অমিতাভ রেজাও ছিলেন। এক প্রসঙ্গে ফারুকী বলে উঠেন, “বিজ্ঞাপণ একটা শিল্প।” তখন আমার মনে আসল সেই চিরাচরিত প্রশ্ন, “art is for art’s sake” কথাটা সত্য কিনা। আমাদের দেশে এখনো অবশ্য বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রক কোনো আইন হয়নি। তাহলে ফারুকী কি বলতেন আমি জানি না। তবে commodity fetishism এর এই যুগে বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের কান্ডজ্ঞান থাকা উচিত বিশেষত যদি তারা সমাজের শিল্পনির্মানের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন, যেটা আবার ফারুকী প্রায়ই দাবি করেন। সে ক্ষেত্রে শিল্পনির্মাতার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানের সুস্পষ্টতা আবার আমাদের সবার কাম্য, আর তা শিল্পের শুধুমাত্র সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে নয়, নন্দনতাত্ত্বিক জায়গা থেকেও।
হিন্দুপুরাণ মতে যখন ভগবান বিষ্ণু শিবের তান্ডব থামানোর লক্ষ্যে সতীর দেহকে একান্ন অংশে ছিন্ন করলেন, তখন তার দেহের বিভিন্ন টুকরো এই ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। আমাদের বাংলাদেশের লাঙ্গলবন্ধ(নারায়ণগঞ্জ) এবং সীতাকুন্ডে(চন্দ্রনাথ-চট্টগ্রাম) পড়ে দুই টুকরো। প্রত্যেকটা জায়গায় হিন্দুদের একটা করে তীর্থস্থান তৈরী হয়েছে। আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থটির নাম “হিংলাজ তীর্থ”। এটি বর্তমানের পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত, করাচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। হিংলাজ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে দশভূজার মস্তকের অংশটি হিংলাজে পড়েছিলো বলে হিন্দুদের বিশ্বাস। আরো একটি উদাহরণ পাওয়া যায় হিন্দু পুরাণে হিংলাজ তীর্থের মাহাত্ম্য নিয়ে। সেটি অবশ্য রামায়ণে।
রাজা রাম লঙ্কাপতি রাবণকে হত্যার পর ব্রাহ্মহত্যার পাপমোচনের জন্য হিংলাজে অধিষ্ঠিতা দেবীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এ থেকে আসলে হিংলাজ তীর্থটি হিন্দুদের কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায়। ভৌগোলিকভাবে এই তীর্থটি আরবসাগর উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও এর প্রাচীনতম যাতায়াত পথ খুব সহজ ছিলো না। দেবী দুর্গার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই পীঠস্থান তাই তীর্থযাত্রীদের কাছে সবসময় দুর্গম এবং কাঙ্ক্ষিত। এটি বেলুচ মরুভুমিতে বলে এর আরেকনাম “মরুতীর্থ হিংলাজ”। ঠিক একই নামে একটি বাংলা ছবি হয় পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫৫ সালে যাতে অভিনয় করেন উত্তম কুমার, বিকাশ রায় প্রমুখ। একদিন ডি ডি-৭ চ্যানেলে আমি প্রথম এই ছবিটি প্রদর্শিত হতে দেখি।
এই ছবির সংগীত পরিচালনা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মূলত এই ছবির প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো হিংলাজ তীর্থযাত্রীদের মরুপথে তীব্র সংগ্রাম এবং দেবীর সান্নিধ্য লাভে তাদের মুক্তির মাহাত্ম্য বর্ণনা। ডি ডি-৭ এ টিউন করা মাত্রই আমি দেখলাম, মরুভূমিতে একদল তীর্থযাত্রী তীব্র কষ্টের মধ্যে দেবীকে শরণ করছে আর গান ধরেছে, “পথের ক্লান্তি ভুলে, স্নেহ ভরা কোলে তব মা গো বল কবে শীতল হব, কতদূর আর কতদূর...বল মা।” এই মা আসলে কোনো মানুষী মা নয়, সিংহ বাহন দেবী মা। এই পথের ক্লান্তিও দেবী মাকে পাবার জন্য, আবার শীতল হওয়াটাও দেবী মায়ের কোলেই। ফারুকী যেভাবে গানটাকে গ্রামীনফোনের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছেন, আমি অবশ্যই প্রথমে এটাকে একটা improvisation বলব। তবে এটাই কি শেষ কথা? শিল্পনির্মানের দায়িত্ব নেয়া ফারুকী কি নির্মান করছেন সেটার জন্য তো তার দায়বদ্ধ থাকার কথা।
একজন বস্তুবাদী কম্যুনিস্ট বা একেশ্বরবাদী মুসলমান কখনো পৌত্তলিক হবেন না। এটা যে তাদের জ্ঞান কাঠামোর মধ্যেই নেই(জ্ঞানকাঠামো থেকেই একমাত্র আমি এরকম আধিবিদ্যক শ্রেণীতে তাদের ফেলতে চাই)। আবার রবীন্দ্রনাথের গান যে মুসলমান বাঙালীর ভালো লাগে তা কি শুধু তার কথার জন্য? ভাববাদের চরমে পৌছানো বিশ্বকবির গানগুলো অনেক সময় অনেক যান্ত্রিক বস্তুবাদীরও প্রাণে দোলা দেয়। আমাদের দেশের বর্তমানে জীবিত বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী সলিমুল্লাহ খানের মতে এটা ঘটে শব্দসমূহ সম্বন্ধে অস্পষ্ট ধারণা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক অপুষ্টতার কারণে, ফলে একজন নাস্তিকের কাছেও মনে হয় “সকাতরে ঐ কাদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা” বা “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” তার প্রাণের কথা। জন লেনন গাইছেন:
Imagine there's no heaven
It's easy if you try
No hell below us
Above us only sky
Imagine all the people
Living for today...
Imagine there's no countries
It isn't hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion too
Imagine all the people
Living life in peace...
Imagine no possessions
I wonder if you can
No need for greed or hunger
A brotherhood of man
Imagine all the people
Sharing all the world...
অনেকে লেননের এই উচ্চারণের ফলে তাকে টট্রস্কিস্ট এমনকি কিয়স্থলে কম্যুনিস্ট বলেও আখ্যায়িত করেন। কিন্তু সোভিয়েট বুদ্ধিজীবী বা সমাজতাত্ত্বিকেরা এই বুর্জোয়া শিল্পীর এই উচ্চারণকে উত্তরণ বললেও কোনোভাবেই তাকে সর্বাঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন নি। অবশ্য তার মৃত্যুর বিশ বছর যাবার পর কিউবাতে ফিদেল ক্যাস্ট্রো তার ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপণ করে তাকে সম্মানিত করেছেন। ভারতীয় মুসলমানের পক্ষে বঙ্কিমের “বন্দে মাতরম” গানটিকে মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি কেন? কারণ বঙ্কিমের হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্বরূপ স্পষ্ট গানটিতে। এখন আজকে এসে এ আর রহমান যখন সুরারোপ করছেন তখন আমরা মুগ্ধ হচ্ছি, কিন্তু ভুলে যাচ্ছি এই গানটিকে নিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষের বিরাগ। যাই হোক আরেকটা উদাহরণ দেই, গত রোজার মাসে মসজিদের সামনে তারাবীর নামাজ পড়ে বের হওয়া ছেলেদের মুখে শোনা গেছে “হরে রাম হরে রাম, হরে কৃষ্ণ হরে রাম।” এটি হিন্দি ছবির একটি গানের কলি এবং এটিকেও আমাদের উচ্ছন্নে যাওয়া প্রজন্মটির বালখিল্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০২০ বিকাল ৪:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


