আজকের প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই লেখাটা পড়ে দেখুনঃ
দাহকালের কথা
মাহমুদুজ্জামান বাবু
লাথি
"...বাংকার থেকে আমাকে যখন ভারতীয় বাহিনীর এক সদস্য অর্ধউলঙ্গ এবং অর্ধমৃত অবস্থায় টেনে তোলে, তখন আশপাশের দেশবাসীর চোখেমুখে যে ঘৃণা ও বঞ্চনা আমি দেখেছিলাম, তাতে দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলতে পারিনি৷ জঘন্য ভাষায় যেসব মন্তব্য আমার দিকে তারা ছুড়ে দিচ্ছিল, ভাগ্যিস বিদেশিরা আমাদের সহজ বুলি বুঝতে পারেনি৷ “…ওদের সহায়তায় জিপে উঠলাম৷ আমি ভালো করে পা ফেলতে পারছিলাম না, পা টলছিল, মাথাও ঘুরছিল৷ ওরা দ্রুত আমাকে আরও তিনজনের সঙ্গে গাড়িতে তুলে নিল৷ ওদের কথায় বুঝলাম, আমরা ঢাকা যাচ্ছি৷ ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমি জীবিত না মৃত৷ এমন পরিণাম কখনো তো ভাবিনি৷ ভেবেছিলাম একদিন বাংকারে মরে পড়ে থাকব, আর প্রয়োজনে না লাগলে ওরাই মেরে ফেলে দেবে৷ লোকসমাজে বেরুব, এত ঘৃণা-ধিক্কার দেশের লোকের কাছ থেকে পাব, তা তো কল্পনাও করিনি৷
‘ভবেছিলাম যদি মুক্তিবাহিনী আমাদের কখনো পায়, মা-বোনের আদরে মাথায় তুলে নেবে৷ কারণ আমরা তো স্বেচ্ছায় এ পথে আসিনি৷ ওরা আমাদের বাড়িতে একা ফেলে রেখে দেশের কাজে গিয়েছিল এ কথা সত্যি, কিন্তু আমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল কার ওপর? একবারও কি আমাদের পরিণামের কথা ভাবেনি? আমরা কেমন করে নিজেকে বাঁচাব, যুদ্ধের উন্মাদনায় আমাদের কথা তো কেউ মনে রাখেনি৷ পেছনে পড়েছিল গর্ভবতী স্ত্রী, বিধবা মা, যুবতী ভগ্নি৷ কারও কথাই সেদিন মনে হয়নি৷ অথচ তাদের আত্মরক্ষার তো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না৷…” (নীলিমা ইব্রাহিম: আমি বীরাঙ্গনা বলছি)
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পযন্ত বাংলাদেশ ছিল একটি বন্দিশালা৷ দেশের ভেতরে, বন্দিশালায়, নিযাতিত ও নিহত বাঙালি পুরুষদের চেয়ে বাঙালি তরুণী ও যুবতীরা খানিকটা আয়ু বাড়তি পেয়েছিলেন৷ কারণ নারী বলে তাঁরা ছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর লালসার খোরাক৷ হানাদারদের পাশবিকতার শিকার অসংখ্য বাঙালি নারীর একজন, রীনা, তাঁর কথা এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত করেছি এ কারণে যে সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সেদিনের পাকিস্তান-প্রেমিক জামায়াত-শিবির চক্র জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ নামের একটি ছদ্মবেশী সংগঠন তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার কোমরে যে আনুষ্ঠানিক লাথিটা মারল এবং তা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র ও জনমানসে যে কোনো ব্যথা বোধ হলো না, সেই ব্যথাহীন চোখ-মুখ ও চেতনার দরজায় যদি ঘাই লাগে একটুও৷
ঘাই লাগে৷ লাগবে না কেন? যখন জানা হয়ে যায় এই মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের জন্ম হয়েছে এ বছরের ২৬ জানুয়ারি৷ প্রথম কাযালয় ছিল শ্যামলীতে৷ এখন সেটা নয়া পল্টনে৷ নয়া পল্টনের ওই ভবনটিতে জামায়াতের পল্টন থানা শাখার সাবেক আমির এ টি এম সিরাজুল হকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আছে৷ মানব শিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের একটি কক্ষ সাবলেট নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদটি যে বাস্তবে জামায়াত-শিবির চক্রের আর একটি নীলনকশা, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকছে না৷ সেদিনের অনুষ্ঠানে ওই সংগঠনের নেতা ও আলোচকদের মূল দাবিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে৷ কেউ বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইছেন, তাই তাঁদের চরম শাস্তি দিতে হবে৷ কেউ বলেছে, ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন সময়ের দাবি৷ প্রিয় পাঠক, কথাগুলো শুনে হাসি পাচ্ছে? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? মোটেও না৷ ওরা ১৯৭১ সালেও, যখন আমাদের তরুণ যুবকেরা নিজের মা-বোন-স্ত্রীকে অরক্ষিত রেখে নিজের বাঁচামরার তোয়াক্কা না করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন এই জামায়াত একই কথা বলেছে৷ সাইদুজ্জামান রওশনের সংকলিত ১৯৭১−ঘাতক দালালদের বক্তৃতা বিবৃতি বইটির পাতায় পাতায় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে৷
আলবদর হাইকমান্ডের প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী৷ স্বাধীন বাংলাদেশে এখন তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির৷ ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নিজামী বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার নাম দিয়ে ব্রাহ্মণ্য সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা হিন্দুস্তান অন্তর্ভুক্তি আন্দোলন শুরু করেছিল৷’ বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ কি তা-ই ছিল? আর এক যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফরিদপুরের এক সমাবেশে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ বলেছিলেন, ‘ঘৃণ্য শত্রু ভারতকে দখল করার প্রাথমিক পযায়ে আমাদের আসাম দখল করতে হবে৷’ এই যে কথায় কথায় ‘ভারত আমাদের দখল করবে’, ‘ওরা হিন্দু’−সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় তাবৎ মিথ্যাাচার ও অপপ্রচারের পরও ৩০ লাখ মানুষের শহীদি আত্মবলিদানে স্বাধীন এই বাংলাদেশে মতিউর রহমান নিজামী থাকেন না কেন পাকিস্তানে গিয়ে? ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রাম-এর উপসম্পাদকীয়তে নিজামী মন্তব্য করেছিলেন, ‘খোদাবী বিধান বাস্তবায়নে সেই পবিত্র ভূমি পাকিস্তান আল্লাহর ঘর৷ আল্লাহর এই পূতপবিত্র ঘরে আঘাত হেনেছে খোদাদ্রোহী কাপুরুষের দল৷’ ভাবুন একবার! পাকিস্তান নাকি আল্লাহর ঘর ছিল৷ এটা তো ইসলাম ধর্মবিরোধী কথা৷
বাঙালিকে হত্যা করতে সেদিন ধর্ম ব্যবহার করা হয়েছিল৷ ঘর দরকার ছিল জামায়াতের৷ পাকিস্তানে তাদের জায়গা হবে না, তাই তারা নির্লজ্জের মতো এই রক্তস্নাত বাংলাদেশেই আছে৷ পাকিস্তান রক্ষার জন্য ধর্মের নামে ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে বাঙালি জাতিকে মেধাশূণ্য করা হয়েছিল৷ পরিকল্পনাটা ছিল সুদূরপাসারিত৷ একটি জাতি স্বাধীন হলেই সব হয় না৷ দেশপ্রেম লাগে৷ দেশাত্মবোধ থাকতে হয়৷ বুদ্ধি ও বিবেকবান হতে হয়৷ আমাদের তো এখন সেই সব নেই৷ তাই তো ওরা লাথি মারে৷
http://www.prothom-alo.com/mcat.news.details.php?nid=MTA4OTE4&mid=Mw==

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

