ধন্যবাদ কৌশিকদাকে তার ব্লগস্টোরি ২০৩৬ লেখার জন্য। আজকের লেখাটা পড়ে আমি লেখার জন্য উৎসাহিত বোধ করলামঃ
শিরোনাম হল, "সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যঃ তেল, জল, আলো..."। প্রথমে, সাম্রাজ্যবাদ কি জিনিস? তাত্ত্বিকভাবে পুঁজিবাদ তার একচেটিয়া অবস্থায় পৌছানোর আগেই এই অবস্থায় পৌছানোর কথা। সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক সমরবাদ। গত একশত বছর ধরে ব্রিটিশ নৌবাহিনী আর মার্কিন সেনাদের যত্রতত্র ঢুকে পড়া, সারা পৃথিবীকে নিজের মনে করার আগ্রাসী মনোভাবে সাম্রাজ্যবাদ না হোক সমরবাদ কি জিনিস টের পাওয়া যায়। কিন্তু কি চায় এই সাম্রাজ্যবাদ? সাম্রাজ্যবাদ আসলে সবকিছু চায়। পুঁজিবাদ যেমন সবকিছুকেই পণ্য করে ফেলতে চায় তেমনি সাম্রাজ্যবাদ চায় না এমন কিছু নাই, আর সামরিক শক্তির সুবিধা নিয়ে সে যা চায় তার প্রায় সবকিছুই করায়ত্ত করে ফেলে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। ২ টা বিশ্বযুদ্ধ কারা করল? কেন হ্ল? ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী গুটিকয়েক দেশ, জাপান আর নব্য আমেরিকার জ্বালায় ঘুম নষ্ট হয় এশিয়া, আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার বেশিরভাগ শান্তিকামী মানুষের। একবার চাইলো তো মিশরের কাছ থেকে "সুয়েজ খাল" নিয়ে নিতে, আরেকবার জোর করে "ইসরায়েল" বানালো, যখন তখন একে ওকে হুমকি, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া আক্রমণ, তেলের জন্য ইরান, ইরাকে বহু চক্রান্ত, ইত্যাদি ইত্যাদি। বরাবরের আক্রমণের লক্ষ্য কিন্তু হয় এশিয়া নয় আফ্রিকা নয় ল্যাটিন আমেরিকা। সমরাস্ত্রের ব্যবসার জন্য দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধাতেও বাধে না এদের। মনে করে দেখুন ইরাক-ইরান যুদ্ধের কথা, অথবা আফ্রিকার দেশগুলিতে সবগুলি গৃহযুদ্ধ।
২০০০ সালের কথা। বলিভিয়াতে ঘটে এক অভিনব ঘটনা। লা পাজ থেকে ৪০০ কিমি দক্ষিণপূর্বের কোচাবাম্বা উপত্যকার রাজধানীতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উচুতে থাকায় সেখানে জলের পাম্পগুলিতে তেমন চাপ ছিলনা, ফলে জলের সরবরাহে বেশ সমস্যা হত। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ও আই এম এফ এর পরামর্শে নয় লক্ষাধিক জন অধ্যুষিত ঐ শহরে জল সরবরাহের দায়িত্ব ঔপনিবেশিক কায়দায় চালিত সরকার দিয়ে দেয় একটি প্রাইভেট কোম্পানীকে। মজার শুরু ওখান থেকেই। দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমেরিকা, ইতালি আর স্পেনের তিন কোম্পানীর যৌথ মালিকানাধীন আগাস ডেল টুনারি নামের এক কোম্পানিকে। সে প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পাবার সাথে সাথেই স্থানীয় সকল প্রকার জলের উৎসের উপর খবরদারি করা শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে। জলের দামের বৃদ্ধি করা হয় এবং একেকটা পরিবায়ের মোট ব্যায়ের এক তৃতীয়াংশের মত খরচ হতে থাকে জলের পিছনে।
একেবারে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা হয় ভয়াবহ। এমনকি মহল্লাগুলির মধ্যে স্থানীয়ভাবে অধিবাসীরা যেসব কুয়া/ ইদাঁরা স্থাপন করেছিলো সেগুলির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। সবচেয়ে হাস্যকর ও নির্মম অধ্যাদেশ ছিলো, ওখানে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ফলাফল আর কি? জলের অপর নাম জীবন, আর তাই জীবনের জন্য যুদ্ধ বা বিদ্রোহ। বলিভিয়ানরা এটার নাম দিয়েছিলো "water war"। যতই যুক্তিসঙ্গত আন্দোলন হোক আর কর্তৃপক্ষ বা জনগনের বিপক্ষের সরকারের দাবি যতই ভুয়া হোক, এসব আন্দোলন এত সহজে সফল হয় না। আর কিছু মানুষকে এগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েও বোঝানো যায় না। আর্মি গুলিও ছুড়েছিল ঐ আন্দোলনে। শেষে অবশ্য সরকার বাধ্য হয় ঐ কোম্পানীর সাথে চুক্তি বাতিল করতে। আই এম এফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক যে দরিদ্র দেশের কোন ভালো চায় না এ ব্যাপারটা নিশ্চিত।
গত কয়েকমাস ধরেই আমাদের দেশে এক বিজ্ঞানীর কথা শুনে আসছি যিনি বিনা খরচে বিদ্যুত উৎপাদনে করবে এমন এক যন্ত্রের উদ্ভাবন করেছেন। অভিনন্দন তাকে। আমাদের দেশের মত দরিদ্র দেশের জন্য সামনের দিনে জ্বালানী ও অন্যান্য মাধ্যমে শক্তির সংকট দেখা দিবে এটা নিশ্চিত, এ ধরণের আবিষ্কার তাই আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের খবর। আরো বছর খানেক আগে প্রথম আলোতে আমাদের দেশের এক তরুন বিজ্ঞানী শাহরিয়ারের খবর পাই যিনি জার্মানীতে সৌর শক্তির উপর গবেষণা করেন এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। আমাদের দেশের জন্য এবং ভবিষ্যতে সমগ্র পৃথিবীর শক্তির উৎস হতে পারে সরাসরিভাবে এই সূর্যালোক।
ব্লগার কৌশিকের ব্লগে ব্লগস্টোরি ২০৩৬ পড়ছিলাম। মনে হল ততদিনে নিশ্চয়ই আমাদের সারা দেশ সৌর শক্তির রূপান্তরের মাধ্যমে শক্তির চাহিদা মেটাবে। সাথে সাথেই একটা ভয় ঢুকে গেল। প্রযুক্তির সব কিছুই তো সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলির হাতে। সে ক্ষেত্রে আমাদের মতো দরিদ্রদেশগুলি কি সৌরশক্তিও ঠিক ভাবে পাবো? হয়ত দেখা যবে আকাশের একটা অংশের উপর কব্জা বসাচ্ছে আমেরিকা বা তখনকার সাম্রাজ্যবাদের অধিপতিরা। আকাশকে প্রয়োজনে এরা ঢেকে দিতে পারে, এদের উপর বিশ্বাস নেই। তখনও হয়ত একদল বলবে, ঠিকই তো আছে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মেনেই করা হচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমাদের সাবধান হবার সময় এখনো শেষ হয়ে যায় নি। শুনেছি আমাদের সমুদ্রও কেড়ে নেবার একটা পায়তার করছে সাম্রাজ্যবাদীরা, আর এটার সাথে আমাদের প্রতিবেশী ও তথাকথিত বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের হাতও আছে। সাম্রাজ্যবাদ আর কি কি নিবে? তেল, জল, আকাশ, সমুদ্র, আর কি? হয়ত একদিন বলবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার জন্যও টাকা লাগবে। সে দিন যাতে আমরা না দেখি, সে কামনায় রইলাম।
ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

