somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কয় উদাসী মকদ্দসে, হৃদয় খুঁজিয়া দেখো বন্ধুয়া আছে

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৬:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কয় উদাসী মকদ্দসে, হৃদয় খুঁজিয়া দেখো বন্ধুয়া আছে
চ্যবন দাশ


মকদ্দস আলম উদাসীর কথা প্রথম কোথায় শুনেছিলাম সেটা অনেক চেষ্টার পরও স্মরণ করতে পারলাম না। তবে বিস্তারিত জানতে পারি কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের কাছে। ততদিনে মোস্তাক আহমাদ দীন ও শুভেন্দু ইমামের সম্পাদনায় লোকচিহ্ন থেকে বের হওয়া উদাসীর পরার জমিন বইখানিও আমার হস্তগত হয়েছে। পেপারব্যাকে ছাপানো ৩২ পৃষ্ঠার এই বইখানির শুরুতেই ভূমিকা হিসেবে কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের একটি গদ্য ছাপা হয় মকদ্দস আলম উদাসী ও তার গান নামে। সেখান থেকে আমরা জানতে পারি উদাসীর জন্ম বাংলা ১৩৫৪ সনে ছাতক থানার চরবাড়া গ্রামে। পিতা মুজেফর আলী , মাতা সুখীর মা খাতুন।

যার নাম সুখীর মা খাতুন, তার ছেলের কিন্তু জন্মের পর থেকে দুঃখের অন্ত ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর জন্মভিটে ছাড়েন, যার দুঃখে মকদ্দস লিখেছেন- চরবাড়ায় মোর থাকা হল না বিধির লিখারে...। পরবর্তী সময়ের মুর্শিদ সুকুর আলী চিশতীর আদেশে দিরাইয়ের কর্ণগাঁয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। বিয়ে করে সেখানেই থেকে যান। দারিদ্রতা আরো বেড়ে যায়-আর তা ঘোচাতে কয়েকবার বিভিন্ন জায়গায় হেকিমী ফার্মেসী খুলেছেন, তাতে যদিওবা কখনো-সখনো পসার মিলেছে তবু নিরন্তর ঘোর-তাড়িত উদাসী কোথাও মন বসাতে পারেননি। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন, পরিচিত বলয়ে কখনো যন্ত্রশিক্ষা দিয়ে থাকেন আর গান বাঁধেন। মাঝে-মধ্যে ভক্ত সুহৃদরা ভালোবেসে এখানে-সেখানে নিয়ে যান। বয়স হয়েছে। বায়না-টায়না তেমন নেই; এখন আর সেই দিনও নেই, সেই মানুষও নেই, মকদ্দস আলম উদাসীর কথায়- একসময় কত গান যে কত জায়গায় গেয়েছি তার হিসাব করা যাবে না। নিয়মিত গান বাঁধেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান সব সময় হয় না, যখন ভাব আসে তখন লিখেন। প্রায়শ উদাসীকে এখানে-সেখানে নিরিবিলি হাঁটতে দেখা যায়, তখন হয়তো দুপুর অথবা বিকেল কিংবা সন্ধে।

মোল্লার ছেলে গান গায় এ নিয়ে গ্রামে প্রায়ই কানাঘুষা চলতো। মকদ্দস তাতেও নির্বিকার থাকতেন। এসব কানাঘুষা-তাকে স্পর্শ করতো না, কিন্তু গান চলতে থাকে, সেই সব গানের ভাব আর তত্ত্বসমূহ তাকে বিচিত্র রকমের ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়, আচ্ছন্ন করে ফেলে; এরকম আচ্ছন্নতার মধ্যে একসময় নিজে গান বাঁধতে শুরু করেন। এসব ৬৮ বাঙলার কিছু পরের কথা। বেরিয়ে পড়েন পথে-প্রান্তরে; তখন কী যে হয় তার, শ্মশানের মধ্যে রাতের পর রাত কাটাতে শুরু করেন। ঐ সময় অনেকগুলি গান তিনি বাঁধেন; ঐ সময়কার গানগুলির দিকে নজর দিলে শ্মশানের অনুষঙ্গ এবং প্রধানত মৃত্যুচেতনা চোখে পড়ে।

তো সেই উদাসীর সাথে আমার দেখা হয়ে যায়২০০২ সালের সেপ্টেম্বরের এক দুপুরে বইপত্রে। মোস্তাক আহমাদ দীন ও শুভেন্দু ইমামের মালিকানাধীন এই লাইব্রেরীটি সিলেটের লিটলম্যাগ কর্মীদের একমাত্র নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। আমার অফিস থেকে লাইব্রেরীটি খুব কাছে থাকায় প্রায়ই দুপুরের খাবারটা লাইব্রেরীর পাশের রেস্টুরেন্টে সেরে বাকি সময়টা এই লাইব্রেরীতে বসে আড্ডা দেই মোস্তাক ভাইয়ের সাথে। ঐ দিনও যথারীতি আমি দুপুরে গিয়ে হাজির হই, মোস্তাক ভাইয়ের সাথে কথার ফাঁকে-ফাঁকে আমার বার-বার চোখ যাচ্ছিল বাম পাশে বইয়ের স্তুপের আড়ালে প্রায় ঢেকে যাওয়া মুখের ছোটখাটো মানুষটির দিকে। আমি শুধু তার বামদিকের একটা চোখ আর কপালের কিছু অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। ঢেউখেলা চুলের লোকটির চোখে আশ্চর্য একধরনের নির্লিপ্ততা। কপালজুড়ে অগুনতি ভাঁজ। খুবই নিচুস্বরে কথা বলছিলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে না শুনলে কথা প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না।

মোস্তাক ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি উদাসী। মকদ্দস আলম উদাসী। আমি করমর্দন করতে উঠে দাঁড়ালে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন। ছোটখাটো মানুষটি লম্বায় আমার কান ছুই-ছুই। হাঁটু পর্যন্ত পাঞ্জাবীর সাথে লুঙ্গি, পায়ে প্লাস্টিকের সস্তা সেন্ডেল। তাতে কাদার দাগ স্পষ্ট। আমি হাত বাড়াতেই তিনি বুকে টেনে নিলেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত, কোলাকুলি করে অভ্যস্ত নই। ততক্ষণে তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে হাসছেন। খেয়াল করলাম আশ্চর্য একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো তার চোখে মুখে। তাতে শিশুর সারল্য।

এই যে উদাসী। টাকা না থাকায় জগন্নাথপুর থেকে টানা ৪৫/৫০ কিলোমিটার হেঁটে সিলেটে চলে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ানো ক্লান্ত উদাসী কিংবা বিনা চিকিৎসায়/অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যাওয়া সন্তানের ব্যর্থ পিতা উদাসী কিংবা ভরণপোষণ দিতে না পেরে স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত কুচকে যাওয়া উদাসী, কেমন ছিলেন তার গানে, জানার জন্যে প্রথম দেখারও ৬ বছর পর ২০০৮ এর নভেম্বরের এক পড়ন্ত বিকেলে আমরা হাজির হলাম তার জগন্নাথপুরের বাড়িতে।



_______________________________চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ ভোর ৬:৫৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×