গদ্য
জল ভেঙে পড়ে, চাপা আওয়াজে
সৈয়দ আফসার
বিনয়ে জল ভেঙে দাঁড়াই— আমাকে উদাস রেখে জলরঙ ওড়নায় ফোটে, চোখে ফুল হয়ে দাঁড়াও, চাপা কৌশল নীল কোর্তা পরে ছুঁড়ে দাও নিবিড়তা! কার চোখে কত জল, কার চোখে পরাও শুকনো জল ও কাজল? জলফুল একাকি, ফোটে দূরসম্পর্কে তুমি ধরে রাখো শূন্যতা, শিকড়চ্যুত হই অকল্যাণে…
ফোটার প্রয়োজন আর স্পর্শের তাগিদ বিরক্ত করো না প্লীজ! পিপাসাঘ্রাণ তুমি চুমু খাও সভ্যতার গালে, মানুষের ভেতর যে অ-মানুষ পাঠ হয় আমি তাকে কবিতার ঘোরে বশ বানাই। কিন্তু পারি না। দল গুছাতে ওরা পরচর্চা মত্ত থাকে; কিছু বলি না, শুনিও না কিছু... এখন ওদের পরচর্চা শুনলে আমার শুধু পেচ্ছাব আসে…
জল আমাকে টানে, সারাক্ষণ লেগে থাকে দশাঙুলির প্যাঁচে; অথচ কোন শব্দ নেই, শব্দের কোনো ভেক-বাক নেই, প্রতীক্ষা পোড়ো না জিভে। আগলে রেখো চাপাহৃদয়ে। এতো নীরবতা আর কতদূর যাবে— লজ্জাবতী পাতা, গোপনে কও কথা… সত্তায় ধরে রাখো কি জ্বালা? চলো তবে শুরু হউক নতুন চলা আদরে আব্দারে…
সম্পর্কে বাঁধি না হারাবার ভয়ে, লাজ-শরম তুমি একাই রাগান্বিত হলে আমি রাগি না, কান্নাকে পরিপাটী করে মোমের মতো গলি, চেটেপুটে খাই বিন্দু-বিন্দু নাকজল, তীব্র আকাঙ্খা! কেনো যে কবি বলো— পরিচিত প্রীতির শিকলে
এক জীবনে কি পাবার থাকে? সুখ,দুঃখ,স্বপ্ন, কল্পনার সাথে কিছু রহস্য!সব প্রাপ্তি কি একসাথে মিলে? অবশ্যই মিলে না। সুতরাং জীবনের সমস্ত রহস্য কীভাবে যে জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে থাকে সেও এক বিষ্ময়! জনম্যাকি বলেছেন— ‘বেঁচে থাকা একটা আর্ট, যার জন্য সাধনা প্রয়োজন’।' এই যে ‘বেঁচে থাকা’ অপারমহিমায়; মানুষ বেঁচে থাকে আশায়, আমিও… তার জন্য রুটি-রোজগারের প্রয়োজন। কাজের সন্ধানে যে কত শহর ঘুরেছি। কত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। কাজ খোঁজা, কাজ করা আর শিখা, সেও অদৃশ্য দেবতা! আমার মতো যাঁরা ফেরারি, তাঁদের নির্বাসনকাল…
যে শহরের আলো-বাতাসে মিশে আছি বছর পাঁচেক ধরে, পরবাসে আসার আগে মনে-মনে ভাবতাম শহরটি কি আমার কল্পনার মতো, শীতটা কি বরফের ভেতর রোদ গলে যায়? ঢালুপাহাড়ের চূড়া শীত কি খাড়া হয়ে থাকে? নাকি সমতলেও অনুভব হয়…। আর ‘সাধনা’ তাও কি রহস্য নয়? যদি রহস্যে হয় তবে এতেও তিনটি চূড়া আছে—‘প্রকৃতি, নারী ও মৃত্যু’ এই যা… প্রকৃতি, নারী ও মৃত্যু, এই তিনই সময়ান্তরে মাতোয়ারা করে, রহস্যময়তায় দাঁড়ায়; এই তিনের ঘোরে আবদ্ধ থাকে কবিতা।
কবিতা কামুক, কবিতা ভাবুক, কবিতা মায়া-রহস্যভরা স্বপ্নভ্রমে ডোবা চূড়ান্ত অনুভূতি-অভিলিখন আর অনুভবেব চূড়ান্তসেতু। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা কথা। এই যে শব্দের ভেতর যার শুরু, শব্দের ভেতর শেষ, সেও কি নয় কবির এক নিরন্তর খেলা?… কবি যখন কবিতা লিখেন বা লিখতে বসেন, তখন কোন পাঠক তার সামনে বসে থাকেন না, এক অদৃশ্য যন্ত্রণা থেকে লিখতে থাকেন, তখন কি তিনি বিবেচনায় রাখেন কারা তাঁর কবিতার পাঠক। পাঠক যখন সে কবিতাটি পড়েন, তখন কিন্তু কবিও পাঠকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন না! তাই কবিতা হচ্ছে ‘পরম্পরিত শিল্প’…
সৌভাগ্যবান, পাঠ করার ধৈর্য্য দীর্ঘ ক্ষণ নিজের ভেতর জমে থাকার কিয়ৎ জোগায়। পাঠ কেনো কিয়ৎ জোগায় সেবিষয়বস্তু সমাধান খুঁজলেই সোজাসুজি প্রশ্নবোধক চিহ্নই দেখি! পাঠ না করলে হয়ত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাঠান্ধ থেকে যেত আত্না…। আর নেপথ্য কথা নৈঃশব্দিক স্পর্শ বেয়ে বেড়ে ওঠা স্বপ্নসৃষ্টি, সমষ্টি তবে পাঠ কি শুধু গদ্য-গণ্প-কবিতা। বিনয় মজুমদার তাঁর ‘এ জীবন’ কবিতাটি শুরু করেছেন এভাবে—‘পৃথিবীর ঘাস,মাটি,মানুষ,পশু ও পাখি— সবার জীবনী লেখা হলে আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা না হলেও চ’লে যেত বেশ।’
পাঠ বিষয়ে আরো অনেক কিছু আছে যা দৈনন্দিন জীবনের পাঠ, কারণ নদী,নিসর্গ,ঘাস,গাছ,খেলার মাঠ,পশু-পাখি আলাদা হলেও ভাবনা কিংবা পাঠ আলাদা নয়, সব সৃষ্টিই ভেতরে জেগে ওঠা, সকল রহস্যের ভেতর থাকে সুখ-ব্যথা। পৃথিবী আমাকে পাঠ করছে, না আমি পৃথিবী থেকে পাঠ নিচ্ছি কেননা আমার চারপাশ জুড়ে আলোর ঝলকানি গাছপালা-লতাপাতা…
পৃথিবী তার অক্ষরেখায় ঘুরে, শেষ রাতের কোলে ভোর হাসছে, কাক ডাকছে, পাখি নীড় ছেড়ে আকাশে উড়ছে, মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে, দূর্বাঘাসে জলফুল হাসছে, গাড়ির হর্রণ বাজছে, কৃষক মাঠে যাচ্ছে, যুবারা স্নান করছে, আশা-কাঙ্ক্ষা নিয়ে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা, রাতদীর্ঘ হচ্ছে এরকম কথা গুলো মনে আসে যায়।
অনেককথা আমাকে চুম্বকের মতো টানে, কথার ভেতর নিজের পাঠ অভিজ্ঞতা উঠানামা করে, আকর্ষণ আসে তা কিন্তু ভাষাহীন নয়; বিগত পাঁচ বছর ধরে যে আমাকে পাঠ শেখাচ্ছে, সে আমার অতি পরিচিত করাত!... আর করাত পাশাপাশি টুকরো করে মাংস-মাছ ড্রীপফ্রিজে সাজানো মাছের কথা ভাবলেই মনে পড়ে কাঠ চেরায়ের শব্দ, স্মৃতিগাছ স্মরণে আসে, আসে কুড়াল; তার কথা মনে হলে দূরপানে তাকাই, বিকল্প ভাবলে কাঠের বিকল্প কাঠ। তাও তো পাঠ, কারণ করাত আমারকে জীবিকা, চেরায়ের শব্দ আত্নার খোরাক। পাতা ঝরে গেলে গাছেরও সতীত্ব হারায়, হারায় পরিবেশের ভারসম্য, নতুন পাতাও গজায়, আশায় নিজেকে দাঁড় করায়।
কিন্তু ঘুরে ফেরে যে বিষয়টি আমাদের মনের অগোচরে দোলা দেয় তা কিন্তু কবিতা!... কবিতাই আমাকে জড়িয়ে-প্যাঁচিয়ে রাখে, কবিতাই বোতলের ছিপি খুলে ঝাঁকুনি মারে, যে ঝাঁকুনিতে মিশে আছি আমি— প্রকৃতি, নারী ও মৃত্যুর সাথে
___________________________________________
ঘন্টাখানিক আগের লেখা একটি গদ্যের খসড়া, পড়ে আরো এডিট হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১০ দুপুর ২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



