প্রিয় ব্লগার বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই ? আমি ভালো।
আপনাদের সাথে আমার অতি দুঃখ ও কষ্টের একটি স্মৃতি শেয়ার করার জন্যই এ পোষ্ট।
জানিনা আমার এ লেখা আপনাদের মনকে একটুও স্পর্শ করতে পারবে কিনা।
_________________________________________
সেই ১৯৯৬ সালের কথা। ছাত্র জীবন। আমার অনেক ক্লাশ মেট তখন জাবি, ঢাবি, বুয়েট ও ঢাকা কলেজে পড়তো। আমি থাকতাম ঝালকাঠী। আমি মাঝে মাঝে ঢাকা যেতাম। একেক সময় একেক হলে থাকতাম। প্রায়ই চারুকলায় আড্ডা দিতাম। এ সময় চারুকলায় ভর্তিচ্ছুক কয়েকজনের সাথে আলপ হয়। এক সময় ঘনিষ্ঠতা। তাদেরই মাঝে একজনের নাম ছিল কাজল। ওর সাথে ঘনিষ্ঠতা একটু বেশী হয়। ওর বাড়ি ছিল মেহেরপুর। একদিন কাজলকে বললাম যে, চল, আমাদের ঝালকাঠী ঘুরে আসবি। ও কখনো ঝালকাঠী যায়নি, তাই রাজী হয়ে গেল। আমরা ২ দিন পরেই ঝালকাঠী রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমার রুমেই ওকে থাকতে দিলাম (আমি এস এস সি পরীক্ষার পরই একটা রুম বরাদ্দ পেয়েছিলাম)।
কাজল ঝালকাঠীতে এসে মহা খুশী। সারাদিন আড্ডা, ঘোরাফেরা। শুধু খাওয়ার সময়ে বাসায় আসা। আবার আড্ডা। এভাবে ২/৩ দিন যাবার পর কাজল বললো, সে চলে যাবে। আমি অমত করলাম না। কারন এই ২/৩ দিনের মধ্যে কাজলকে আমি মোটামুটি সব জায়গাতেই ঘুড়িয়েছি। ঝালকাঠীর প্রসিদ্ধ খাবারও ওকে খাইয়েছি।
আমি বাসায় এসে মাকে বললাম, ''মা'' আমার বন্ধু কাজলতো কাল সকালে চলে যাবে, ওকে একটু ভাল-মন্দ খাওয়ানো লাগেনা ? জবাবে মা বললো, ঠিক আছে। তো, দুপুরে আমরা ভাল-মন্দ খেলাম। বিকালে আবার আড্ডা, ঘোরা ফেরা। রাতে বাসায় খেতে আসলাম, মা বললো যে, রান্না করা খাবার সব বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। আমি ডিম রান্না করে দিই, তোরা সেইটা খা। মায়ের এই কথা শুনেতো আমার মাথা ফোরটি নাইন হয়ে গেল। আমি তখন মায়ের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করলাম, যা বলার মতো না। রাগ করে কাজলকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। ওকে নিয়ে হোটেলে খেলাম। ও যদিও খেতে চায়নি। রাতে বাসায় ফিরিনি। কাজলকে নিয়ে অন্য এক বন্ধুর বাসায় ছিলাম। সকালে ওকে বরিশাল নিয়ে মেহেরপুরের বাসে তুলে দিয়ে আসব।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে কাজলকে নিয়ে বাসায় আসলাম ওর ব্যাগ নিতে। বাসায় এসে শুনি যে আমার মা স্ট্রোক করেছে, তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আমার মা খুবই ধার্মীক ছিলেন। ৫ ওয়াক্ত নামায রোজা করতেন। প্রতিদিন ভোরে ফজরের নামাযের পর কোরআন শরীফ পড়তেন। ঘটনার দিনও মা নামায পড়ে জায়নামাজে বসে কোরআন শরীফ পড়ছেন। এবং এই কোরআন শরীফ পড়া আবস্থাতেই স্ট্রোক করেন। আমার মায়ের ডায়বেটিস ও প্রেসার ছিল। গত রাতে হয়তো আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করেছে। হয়তো সে জন্যই এ অবস্থা।
বাসায় এই খবরটা শোনার পর আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আমি আমার অন্য এক বন্ধুকে বললাম কাজলকে বাসে উঠিয়ে দিতে। আমি সাথে সাথে বরিশাল হাসপাতালে চলে গেলাম। মাকে মহিলা ওয়ার্ডে পেয়িং বেডে রাখা হয়েছে। ডাক্তার বলেছে যে, ৭২ ঘন্টা না গেলে কিছু বলা যাবে না। আমি মায়ের কাছে গেলাম। তার কোলের পাশে বসলাম। মায়ের হাত ধরে আমি কাঁদতে লাগলাম। মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মা স্ট্রোক করার ফলে বাক শক্তি হাড়িয়ে ফেলেছে। আমি সারাদিন মায়ের পাশেই বসে ছিলাম। রাতে মহিলা ওয়ার্ডে পুরুষ লোক থাকতে দেয়না। আমি হাসপাতালের বাড়ান্দায় একটা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। সাথে আমার বন্ধু কবির ছিল। ও সন্ধ্যার সময় এসেছে। সকালে উঠে আবার মায়ের পাশে। এভাবেই ৭২ ঘন্টা কেটে যায়। মায়ের অবস্থা ভালোও না আবার খারাপও না। ডাক্তার বললো, আপনারা যদি রোগীকে ঢাকা নিয়ে যেতে চান, তবে যেতে পারেন। এটা জাষ্ট সান্তনা।
আমরা মাকে ঢাকা নিয়ে যাবার জন্য মনস্থির করলাম। সন্ধ্যায় লঞ্চ যোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সাথে একজন ইনটার্নি ডাক্তার রাখলাম। আমি , আমার বাবা, আমার ছোট একটা বোন, আমার এক ফুপু, সবাই সাথে ছিলাম। আমার বাবা তার এক বন্ধুকে আগে থেকেই ঢাকা সদরঘাটে এম্বুলেন্স নিয়ে রেডী থাকতে বলেছে। রাতে লঞ্চে তেমন কোন সমস্যা হলো না।
আমরা সকাল ৬ টায় ঢাকা সদরঘাট পৌছলাম। লঞ্চ থেকে নেমে আমার মাকে এম্বুলেন্স যোগে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তখন সকাল ৬:৩০। প্রথমে মাকে জেনারেল বেডে রাখা হলো। হাসপাতালে ভর্তির যাবতীয় নিয়ম কানুন শেষ করে মায়ের কাছে আসলাম। ৭ টায় ডাক্তার আসলো, তিনি মায়ের সিটি স্ক্যান করার উপদেশ দিল। ঢাকায় তখন সিটি স্ক্যান শুধু বারডেমেই ছিল (আমি যতদুর জেনেছি)। ওখানের ডাক্তার তার প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট শুরু করলো। এবং দুপুরের দিকে সিটি স্ক্যান করতে বললো। আমি ও আমার বাবার বন্ধু, সাড়ে এগারটার দিকে একাউন্টস সেকশনে গিয়ে সিটি স্ক্যানের জন্য ১০,১৫০/= টাকা জমা দিয়ে রশিদ গ্রহন করে দুপুর ১২ টা ২০ এ আমাদের বেডে আসলাম। এসেই শুনলাম যে, আমার মা ১২:১৫ মিঃ ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজিউন)। খবরটা শোনার সাথে সাথে আমি অচেতন হয়ে যাই। পরে শুনেছি যে, আমি নাকি ২ ঘন্টা অচেতন ছিলাম।
আমি চেতনা ফিরে পাবার পর, আমার বাবার বন্ধুকে নিয়ে মায়ের মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করলাম। এর পর একটা এম্বুলেন্স ঠিক করলাম, মায়ের মরদেহ ঝালকাঠী নিয়ে যাবা জন্য। হাসপাতালের যাবতীয় ফর্মালিটি শেষ করে বিকাল ৩:৩০ এ আমরা ঝলকাঠীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সারাটা পথ যে কি কষ্টে কেটেছে। মায়ের মরদেহের পাশে বসে আছি। আমি কাঁদতে পারছিনা, পাশে আমার ছোট বোনটাকে সান্তনা দিচ্ছি। এদিকে কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।
রাত ৯:৩০ এ আমরা ঝালকাঠী পৌছলাম। আমাদের বাসায় তখন হাজারো মানুষের ভীর। মনে হয় ঝালকাঠী শহর যেন একটা শোকের শহরে পরিণত হয়েছে।আমি আর ঘরের মধ্যে যেতে পারিনি। আমি ঘরের সামনে রাস্তার পাশেই বসে পড়লাম। আমার বন্ধুরা সবাই আমাকে সান্তনা দিচ্ছে। এর পরের কথা আমি আর ভাবতে পারছিনা। পরের দিন বাদ জোহর মায়ের নামাজে জানাজা শেষে ঝালকাঠী পৌর কবরস্থানে মায়ের মরদেহ দাফন করা হয়।
এর পর থেকেই নিজেকে শুধু অপরাধী মনে হয়। মনে হয়, আমি যদি ঐ দিন মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার না করতাম, মাকে যদি কষ্ট না দিতাম, তাহলে হয়তো এমন নাও হতে পারতো। আমার মা কি আমাকে ক্ষমা করবে ? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবে ? আমার বিবেক কি আমাকে ক্ষমা করবে ?
জনশ্রুতি আছে যে, যাহারা হজ্জ করে, তাহারা নাকি হজ্জের পর ৪১ দিন পর্য্যন্ত নিঃষ্পাপ থাকে। এটা আল্লাহই ভালো জানেন। আমার মা ও বাবা এক সাথে হজ্জ করেছিল। আমার মা সব সময়ই বলতেন যে, ''আল্লাহ তুমিতো আমাকে মৃত্যু দিবাই, তো আমাকে এই ৪১ দিনের আগেই মৃত্যু দিও''। আল্লাহ আমার মায়ের মনের কথা ফেলতে পারেনি। ঐ ৪১ দিন শেষ হবার আগেই আমার মা মৃত্যু বরণ করেন।
আল্লাহ তাকে বেহেশত্ নসিব করুন।
প্রিয় বন্ধুরা, আপনারা সবাই আমার মায়ের জন্য দোয়া করবেন। আমার মা যেন পরকালে শান্তিতে থাকেন। আর সবার কাছে একটাই অনুরোধ, আপনারা কখনো মা বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। ''মা'' কি জিনিস আমি তা আমি এই সাড়ে চৌদ্দ বছর যাবৎ উপলব্ধি করছি। মা নেই যার, এই দুনীয়ায় তার চেয়ে বড় কপাল পোড়া আর কেউ নাই।
''যখন রাত্রি নিঝুম, নেই চোখে ঘুম, একলা শুন্য ঘরে। তোমায় মনে পড়ে মাগো তোমায় মনে পড়ে''
_________________________________________
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


