নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আন্তরাষ্ট্রিয় সম্পর্কের সমীকরণ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি
আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা সহযোগিতা’ এমন এক অগ্রগণ্য বিষয়, যার উপর ভিত্তি করে মৈত্রী সম্পর্ক রচনার মাধ্যমে প্রভূত ছাড় এবং সুবিধা আদায় করে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো, এমন ভুরিভুরি উদহরণ আছে। নিরাপত্তা চাহিদার কাছে আয়তনে ছোট-বড়, একে অপরকে পছন্দ-অপছন্দের বিশেষ কোন মূল্য নাই; এটা আবেগের জায়গা নায়, ফলে সময়ে স্বার্থহানি কিংবা অসংগত আচরণও প্রয়োজনীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে থাকে না। সবাই চাইবে সর্বোচ্চটা আদায় করে নিতে, তাই বলে সবটাই দিয়ে দেয় না কেউ। সবটা না দিয়েও, খুব অল্পতেই অনেক জোরালো সম্পর্ক স্থাপনের উদহরণও ইতিহাসে আছে। ‘নিক্সনে’র সাথে ‘মাও জে দং’ খুব বেশি কিছুর বিনিময় করেননি, তথাপি তারা যুগান্তকারী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। ইদানিং বাংলাদেশ ইনডিয়ার সম্পর্ক ‘এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে পৈাঁছেছে’, ‘এক নতুনতর উচ্চতায়’ নিয়ে যাবার জন্য কাজ চলছে - এমন প্রচার গণমাধ্যমগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এবং এটি যে অতিরঞ্জন নয় তার আভাসও পাওয়া যাবে ‘আনন্দবাজারে’র ০৬-০৭-২০১১ সংখ্যায়, পত্রিকাটি বলছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক কৈাশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকাকে দিল্লির প্রয়োজন ষোলো আনার উপর আঠারো আনা”। ইঙ্গিতটি গুরুত্বপূর্ণ।
সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি পাল্টাচ্ছে দ্রুতগতিতে। একদিকে চায়নার উত্থানই নয়, পাকিস্তানের বিপর্যস্ত দশা, ভারতের সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি; অন্যদিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের উদ্যোগ; এই পরবর্তী পরিস্থিতির মূল্যায়নের ওপর নির্ধারিত হবে এই অঞ্চলের জিওপলিটিক্যাল হিসাব-নিকাশের সূত্র-সমীকরণ। যে যার প্রস্তুতি ও পররাষ্ট্রনীতি গুছিয়ে নিচ্ছে এই সমীকরণ মাথায় রেখে। অবস্থা দৃষ্টে একমাত্র বাংলাদেশকেই মনে হচ্ছে অবশিষ্ট এবং দিকচিহ্নহীন। বরাবরের মত, নতুন এই পরিস্থিতির মাঝে অনির্ধারিতই রয়েছে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য, নিরাপত্তা দর্শন এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা। যে উপযুক্ত সম্ভাবনা বাংলাদেশের ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তি ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষত্রে, তা কাজেই লাগানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টাও শাষক শ্রেণীর মাঝে দেখা গেল না; আগেও দেখা যায় নাই। ভূ-রাজনীতির নতুন নতুন পরিস্থিতি ও পরিবর্তিত বাস্তবতা থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন ঘটনার আলোকে নিজেদের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনার সদ্বব্যবহার, নিজেদের হাতে থাকা সুবিধা ও সবলতার পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট অপরাপর রাষ্ট্রের দূর্বলতার মূল্যায়ন এবং অন্যদের প্রয়োজন কাজে লাগিয়ে নিজেদের হাতে থাকা কৈাশলগত সুবিধাকে সর্বোচ্চমাত্রায় ব্যবহার করার প্রচেষ্টা আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে অনুপস্থিত।
দক্ষিণ এশিয়ার পলিটিক্যাল সমীকরণ এবং ভারতীয় প্রবনতা
গত ১০-১২ বছরের বিশ্ব পরিস্থিতিতে এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা আগের চাইতে বিস্তৃত হয়েছে, এবং বলা যায় ‘মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তি’র কারণে ইনডিয়ার স্বার্থই এখন মার্কিন স্বার্থে রুপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে ৯/১১ পরর্বতি বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কতৃক ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র ডাক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিজের উপযোগী নিরাপত্তা সহযোগী খুজে নিতে তৎপর। পুজিবাদী অর্থব্যাবস্থায় এই যুদ্ধের প্রভাব গত এক দশক ধরেই বিদ্যমান। ইনডিয়া স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম ২০ বছর দুই ব্লকের বাইরে ‘জোট নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতি, পরবর্তী ৩০ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় ‘সোভিয়েতের নিরাপত্তা সহযোগী’র ভূমিকায় এবং এই পুরো ৫০ বছর পিছনে ফেলে ২০০০ সালের দিকে এসে ইউএসএ’র সাথে গাটঁছড়া বেধে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনিদের প্রধান মিত্র উঠে। বিল ক্লিনটনের সফর ইনডিয়া-ইউএসএ সম্পর্কের চরিত্র বদলে দেয়। ইনডিয়ার প্রভাবশালী পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা তাত্ত্বিক ‘রাজা মোহান’ উল্লেখ্য করেন, অবশিষ্ট যে প্রথাগত দ্বিধা এবং স্নায়ুযুদ্ধজাত অবিশ্বাসের রেশ তারা বয়ে বেড়াচ্ছিল ভুত তাড়ানির মতো, ২০০১ এসে তা দূর হয়ে যায়। একে অপরকে ‘প্রাকৃতিক মিত্র’ বলে ঘোষণা করে। উল্লেখ করতে হয় ইউএসএ ইতোমধ্যেই প্রাণান্তকর চেষ্ঠা করেছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক দশকের নাস্তানাবুদ যুদ্ধকে দ্বিতীয় ধাপে নামিয়ে এনে প্রধান ফোকাসটা সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দী বিশ্ব শক্তি হবার দাবিদার ‘চায়না’র দিকে সরিয়ে আনতে।
ইতোমধ্যে শ্রীলংকার পররাষ্ট্রনীতি ইনডিয়া থেকে বহুদূরে সরে গেছে। এবং বল যায় হামবানটাটা বন্দর চায়নাকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে বদলে দিয়েছে ব্লু-ওয়াটার সমীকরণ। নেপালে মাওবাদীরা সশস্ত্র সংগ্রামের পন্থা থেকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে রাষ্ট্র ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তনে সহ ইনডিয়া-নেপাল সর্ম্পকের ঐতিহাসিক মোড় যথাসম্ভব ঘুরিয়ে দিয়েছে। এদিকে মায়ানমার খুব দৃঢ়ভাবে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চায়না বলয়ের মধ্যে থেকে নিজেদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে অবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে রাখার নীতি অনুসরণ করছে। যদিও চেষ্টা চলেছে তবুও পাকিস্তানের সাথে ব্যাপক ও নানাবিধ বিরোধের মীমাংশা অতি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভবনা নাই। আর এইখানেই ইনডিয়ার কাছে বাংলাদেশের গুরত্ব অপরিসীম। কারণ হলো, ইনডিয়ার চারপাশে তাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত কোন মিত্র নাই। এ অঞ্চলে বাংলাদেশ তাদের জন্য কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অপরিহার্য। নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য উপায়হীন ভাবেই বাংলাদেশের কাছে তাদের আসতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে তারা প্রায় নিরুপায়।
ভৈাগলিক অবস্থান এবং ইনডিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
বর্তমান ইনডিয়ার একটি অংশের অবস্থা ভৈাগোলিক ভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মত। অবশ্য সাত রাজ্যের সঙ্গে দিল্লির অবস্থাটা সেই মাত্রায় বিপজ্জনক না হলেও নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিবেচনায় যোগাযোগের একটা বড় সমস্যা তাদের জন্মাবধি রয়েছে। বর্তমান অবস্থায় শিলিগুড়ির কথিত চিকেন নেক অংশটি কোন কারণে কাটা পড়লে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাত রাজ্য দিল্লি থেকে সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের মতোই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পরবে। তাছাড়া বর্তমান অবস্থাতেও বিদ্রোহ কবলিত সাত রাজ্যের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক এবং সামরিক কৈাশলগত বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভেঙে দুটো আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতের শাসকশ্রেণী তাদের গুরুতর এই সমস্যার সমাধানে নানারকম কৈাশল প্রয়োগ করে চলেছে। এই প্রকিৃয়ায় ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পরে। ‘ভারত বাংলাদেশের মিত্র’ - কথাটা এই কারণেই আমাদের এইখানে বহুল প্রচারিত। কথাটা হয়তো শুনতে ভালো, কিন্তু এর অর্থ কি? ভারতের শাষক শ্রেনী আর তার জনগণ যে এক নয় - বরং ‘ভারত আমাদের বন্ধু’ অতিশয় অপরিচ্ছন্ন কায়দায় এই কথাটা বলে শুধু আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী নয়, ভারতের সাম্রাজ্যবাদী প্রবনতাও আড়াল করে আমদের এইখানে ভারতীয় শাসক শ্রনীর আধিপত্য কায়েমের শর্ত তৈরি করা হয়। এই আধিপত্য শুধু সাংস্কৃতিক নয়, এটা অর্থনৈতিক এবং সীমান্তে কাটাতারের বেড়া নির্মাণ, বিএসএফ কতৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, পুশ-ইন প্রচেষ্টা, যৌথ জরিপের নামে সিলেট সীমান্তে ভূমি দখলেসহ ইত্যাদি নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে সামরিকও বটে।
রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিখাদ রাজনৈতিক। আমাদের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা ভারতীয় শাসক শ্রেনীর কাছে ছিল ভবিষ্যত আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও সম্প্রসারণের জন্য দরকারি। বর্তমান পুজিতান্ত্রিক গ্লোবালইজেশনের যুগে ভারতীয় অর্থনীতির পুজিতান্ত্রিক রূপান্তর রাষ্ট্র ও পুজিপতি শ্রেনী স্বার্থের অভিন্ন সর্ম্পক গড়ে তুলেছে। ফলে বাংলাদেশে যারা বন্ধুত্বের এমন ঘোষণা দেয়, তারা ভারতীয় জনগণ নয়, শাসক শ্রেনীর সাথে বন্ধুত্বের কথাই বলে। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারতের শাসক শ্রেনীর সাধারণ নীতি হলো আঞ্চলিক অধিপতির। পাকিস্তান ভাঙুক এবং নিজের সীমান্তের চারপাশে কতিপয় দুর্বল ও মেরুন্ডহীন দাসমূলক রাষ্ট্র থাকুক - এটা ভারত তার নিরাপত্তার জন্যই জরুরী মনে করে। এছাড়াও ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যকে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আচরণ দিয়ে বিচার করলেই চলবে না, তার নিজের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অব্যাহত দমন, পীড়ন, লড়াই এবং সামরিক দখলদারিত্বকেও হিসেবে রাখতে হবে। এই দমন, পীড়ন ও সামরিক আগ্রসন মজবুত করার জন্য এবং বাংলাদেশকে তাতে ব্যাবহার করা জন্য ‘ট্রানজিট’ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোন জাতীয় আলোচন ও ঐক্যমত ছাড়াই, কাউকে কিছু না জানিয়ে, জনগণকে প্রায় অন্ধাকারে রেখে, বর্তমান আওয়ামী লিগ সরকার কৈাশলগত হিশাবনিকাশের নির্ধারক এতবড় সম্পদটি ইনডিয়ার হাতে তুলে দিচ্ছে। বিনিময়ে তারা ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা পেয়েছেন মনে হতে পারে, কিন্তু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে।
‘ট্রানজিট’ সুবিধার মধ্য দিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে ১২ থেকে ৮০ ভাগ পর্যন্ত খরচ কমাতে পারবে বলে বাংলাদেশের ট্যারিফ কমিশনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ তার যে প্রতিবেশীকে এত বড় দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতি সে কতটা বন্ধুভাবাপন্ন। এক্ষেত্রে কেবল সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দুটি আলাদা রাষ্ট্র হলেও পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম সীমান্তে স্থানীয় জনপদের হাজার হাজার পরিবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও দু-পাড়ে কৃত্রিমভাবে বিভক্ত। এসব বিবেচনা সত্ত্বেও ১৯৮৬ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশের চারিদিকে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার প্রকল্প নেয় এবং এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন সম্পন্ন করেছে। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বরে এ সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশটি বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ফেলার জন্য ৫২০৫.৪৫ কোটি রুপি অর্থ বরাদ্দ করেছে এবং সর্বমোট ৩৪৩৬. ৫৯ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। কোন ধরনের আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নয়, স্রেফ প্রশাসনিক উদ্যোগে ভারত বাংলাদেশকে ঘেরাও করে ফেলার এইরূপ একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে, যার সঙ্গে কেবল তুলনা চলে ইসরায়েল কর্তৃক প্যালেস্টাইনী অঞ্চলের চারিদিকে দেয়াল নির্মাণের।
এছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। মানবাধীকার সংগঠন ‘অধীকারে’র “বার্ষিক মানবাধীকার রিপোর্ট ২০১০”-এর তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে বিএসএফ-এর হাতে ৮৪৮ জন বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হয়েছে।
পেছন ফিরে দেখা বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট
পণ্য চলাচলে ভৈাগোলিক সহযোগিতার তিনটি রূপ রয়েছে - ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট এবং করিডর। এই তিন ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। ‘ট্রানজিট’ বলতে নির্দিষ্ট একটি ভূমি বা জলপথ দিয়ে সুনির্দিষ্ট চুক্তি ও নিয়ম-নীতির ভিত্তিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যাত্রী এবং মালপত্র পরিবহন বোঝায়। আপাতদৃষ্টিতে ‘ট্রানজিট’ শব্দটি প্রয়োগ করা হলেও ভারতকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ যে সুবিধা দিচ্ছে তা সরাসরি বা স্থায়ী করিডর না হলেও পণ্য চলাচলের সমধর্মী সুবিধা। ট্রানজিটের মালামাল বা যানবাহন চলাচলকালে যদি বাংলাদেশী যানের চলাচল স্থগিত রাখতে হয় তবে তাকে ‘করিডর’ ধর্মী সুবিধাই বলতে হবে। সম্প্রতি আশুগঞ্জ দিয়ে ভারতীয় বিদ্যুতকেন্দ্রের মালামাল পরিবহন কালে সেটাই ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক পরিসরে এরূপ ‘করিড’র সুবিধা সচরাচর কোন ‘ল্যান্ডলক কান্ট্রি’ পেয়ে থাকে। কিন্তু ভারত মোটেই ‘ল্যান্ডলাক কান্ট্রি’ নয়।
অন্যদিকে, সচরাচর ‘করিডর’ বলতে নির্দিষ্ট কোন ভূ-খন্ডের নিয়ন্ত্রণ অধিকারসহ তা অপর একটি দেশকে দেয়া বোঝায় এবং ভারতকে এ মুহূর্তে বিশেষ ভূ-খন্ডের নিয়ন্ত্রণ দেয়া না হলেও তা একতরফা ভাবে ব্যবহারের সুবিধা। আবার যেহেতু ভারত নিজ উদ্যোগে পণ্য পরিবহন করবে সেহেতু তাকে ‘ট্রানশিপমেন্ট’ বলারও সুযোগ নেই। সোজাসুজি বললে, বাংলাদেশের জল ও স্থল পথ ব্যবহার করে ভারত তার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেভাবে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাচ্ছে তাকে কোনভাবেই ‘ট্রানজিট’ বলা যাবে না।
বাংলাদেশের স্বধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ নৌ-যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৪ সালে ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে উভয় দেশই একমত হয়। ১৯৮০ সালে চুক্তিটি নবায়ন করা হয়, যার ৭নং ধারাটি ছিল ১৯৭২ সালের বাণিজ্য চুক্তির পুনরুল্লেখ মাত্র। ঢাকায় ১৯৯৩ সালে ‘সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে’ স্বাক্ষরিত ‘সাফ’টা চুক্তিতেও অনুরূপ কথা ছিল। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে ‘ট্রানজিটে’র বিনিময়ে ভারত ২৫ ক্যাটাগরির পণ্য শুল্কমুক্তের ঘোষণাও দেয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই বছরের ২৮ জুলাই মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ভারতকে ‘ট্রানশিপমেন্ট’ সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ-ভারত সচিব পর্যায়ে ২০০০ সালে দিল্লিতে বাণিজ্য আলোচনায় ভারতের পক্ষ থেকে ‘ট্রানজিটে’র প্রস্তাব রাখা হয়। ভারতের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জয়রাম রমেশ ২০০৭ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ট্রানজিটে’র ব্যাপারে জোর আবেদন জানান বাংলাদেশের কাছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ২০০৮ সালের ১০ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদের সঙ্গে দেখা করে ভারতকে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ভারত-বাংলাদেশ ‘ট্রানজিট’ দেওয়ার ব্যাপারে যৌথ ইশতেহারে স্বাক্ষর করেন।
ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট কিংবা করিডরের জন্য বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত
ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট কিংবা করিডার - যে সুবিধাই দেয়া হোক না কেন, এর জন্য বাংলাদেশের সড়ক ও রেল অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত? প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানি, বাংলাদেশের বর্তমান সড়ক অবকাঠামো নিজস্ব পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এমন অবস্থায় প্রতিদিন নতুন করে শত শত ভারতীয় পরিবহন একই অবকাঠামোয় প্রবেশ ফলাফল হবে ভয়াবহ। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা গেছে, প্রতিদিন কমবেশি প্রায় ১৫ শত ট্রাক (প্রতিটি কমবেশি ১৫ টন) ‘ট্রানজিট’ বা ‘করিডর’ সুবিধা পেলে বাংলাদেশ অতিক্রম করবে। ‘ট্রানজিটে’র জন্য যেসব রুটের প্রস্তাব করা হয়েছে সেখানে এখন গড়ে চলাচলকারী বাংলাদেশি পণ্যবাহী যানের সংখ্যা দৈনিক প্রায় ৭৫০টি; অর্থাৎ ‘ট্রানজিটে’র পর নির্দিষ্ট রুটে দৈনিক গড়ে পণ্যবাহী যানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ২৫০টির মত; যা বর্তমান পরিমাণের চেয়ে তিনগুণ বেশি।
‘ট্রানজিট’ বা ‘করিডরে’র সম্ভাব্য ৮ টি রুট নিয়ে ভাবনা-চিন্তা হচ্ছে বলে জানা যায়। বাংলাবান্ধা-তামাবিল এবং বাংলাবান্ধা-আখাউড়া ছাড়াও ‘ট্রানজিট’ বা ‘করিডরে’র বাকি ছয়টি প্রস্তাবিত রুটের মধ্যে ঢাকাও অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে এবং বিশেষভাবে ঢাকায় আমাদের বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামো উপরোক্ত বাড়তি পণ্যবাহী যান চলাচলের জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। ‘ট্রানজিট’ সুবিধার আওতায় ভারত যেসব হেভি মেশিনারী পরিবহন করবে, তা সাধারণ ট্রাকের পরিবর্তে অনেক বড় বড় কনটেইনার ক্যারিয়ারে পরিবহন করা হবে। যেগুলোর মোড় পরিবর্তনেরও সুযোগ নেই বাংলাদেশের অনেক সড়কে এবং এগুলো যখন চলাচল করবে তখন পুরো সড়কে স্থানীয় যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। সম্প্রতি আশুগঞ্জের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির ভারতীয় কনটেইনার ক্যারিয়ার যেহেতু বাংলাদেশের রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী সেকারণে বিপুল কৃষিজমি নষ্ট করে রাস্তাকে ‘উপযোগী’ করা হয়েছে। এমন সব জায়গা দিয়ে নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে যার কোন নিজেস্ব প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কেবল ভারতীয় প্রয়োজনেই সেখানে স্থানীয় মানুষরা কৃষি জমি হাড়িয়েছেন।
‘ট্রানজিট’ অবকাঠামোর ব্যয়ভার আমাদের অর্থনীতির জন্য চাপ হয়ে উঠবে
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবকাঠামো স্বীয় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে অপর্যাপ্ত। এক্ষেত্রে ভারতীয় পণ্য চলাচলের জন্য একটি বিকল্প হতে পারে ‘সময় সমন্বয়’; অর্থাৎ আমাদের যানের যখন চাপ কম থাকবে তখন তাদের যান চলতে দেয়া। সেক্ষেত্রেও দীর্ঘ রাস্তার অন্তত্য কয়েকটি স্থানে ভারতীয় যানের জন্য বিশাল জায়গা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পাকিং সুবিধা থাকা আবশ্যক হবে। এরূপ স্থাপনাগুলো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর নিরাপত্তা কাঠামো পরিচালনার সঙ্গে বিপুল ব্যয়ভারের প্রশ্ন জড়িত। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে এরূপ বিশাল পাকিং স্থাপনা নির্মাণের বাস্তবতা কতটুকু? ভারতীয় যানবাহন বাংলাদেশ ভূখন্ড দিয়ে যাওয়ার সময় নিশ্চিত ভাবেই জ্বালানির প্রয়োজন পরবে। এদেশীয় যানবাহনগুলো যেসব জ্বালানী ব্যবহার করে তাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। ভারতীয় যানবাহনগুলোও সেই ভর্তুকি প্রাপ্ত জ্বালানীই ব্যবহার না করলেও যদি জ্বালানী সরবরাহ করতে হয় তবে বিপুল পরিমাণ বাড়তি জ্বালানীর প্রয়োজন হবে। আমরা জানি বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জ্বালানীর সংকটে ভুগছে।
সরকার ট্রানজিট বিষয় পর্যালোচনার জন্য যে ‘কোর কমিটি’ গঠন করেছে তার অভিমত হলো, ভারতীয়দের প্রত্যাশা মত পণ্য চলাচলের সুবিধা দিতে হলে বাংলাদেশকে জল, স্থল ও রেলপথের অবকাঠামো উন্নয়নে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এর মধ্যে রেলপথের জন্য ব্যয় হবে ১৭ হাজার কোটি টাকা, সড়কপথের জন্য প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা, নৌপথে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা, চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা, মংলা বন্দর উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য স্থল বন্দর উন্নয়নে প্রায় ৫ শত কোটি টাকা।
গত কয়েক দশক ধরে ভারত তীব্রভাবে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা চাইলেও ভারতীয় তরফ থেকে এ দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন কোন সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, যেমনটি পাওয়া গেছে চীনের কাছ থেকে। সরাসরি কোন যোগাযোগ স্বার্থ না থাকা সত্ত্বেও চীন এ পর্যন্ত ৭-৮টি বৃহৎ ব্রিজ তৈরি করে দিয়েছে। ভারতের তরফ থেকে তেমন একটি দৃষ্টান্তও নেই বরং ২০১০ সালের আগস্টে ভারত ‘ট্রানজিটে’র উপরোক্ত কাজে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে বিরাট অংকের এক ঋণের বোঝা গছিয়ে দিয়েছে। ভারতের ‘এক্সিম ব্যাংক’ থেকে বাংলাদেশ এই ঋণ নিয়েছে। এক বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ দিয়ে বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্য পরিবহণের অবকাঠামো তৈরি করে দেবে, অথচ এই ঋণের সুদ-আসল সবই পরিশোধ করবে বাংলাদেশ! উপরন্তু ঋণের শর্ত হলো, অবকাঠামো নির্মাণ কাজে বাংলাদেশ যত ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয় করবে সবই ভারতে কাছ থেকে নিতে হবে। বাংলাদেশ ভারত থেকে যখন এই ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে ওই সময়ই ‘দৈনিক কালের কন্ঠে’র ১ ডিসেম্বর ২০১০, খবর প্রকাশিত হয় যে, অব্যবহৃত পড়ে থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে ১৭৫ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করছে বিশ্ব ব্যাংক।
‘ট্রানজিটে’র অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ভারত থেকে এক শত কোটি টাকা ঋণ নিলেও দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছিলো, উপরোক্ত এক বিলিয়ন ডলারে ভারত ‘সহায়তা’ হিসেবে দিবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পরপরই দেখা গেল এটা আসলে ‘ঋণ সহায়তা’ এবং তা এমন ঋণ যা দিয়ে কথিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের তাবৎ উপকরণও ঋণ দাতার কাছ থেকেই ক্রয় করতে হবে, অর্থাৎ এটা হলো ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট’। এই ঋণে আবার ‘কমিটমেন্ট ফি’ বলে এমন একটি ফি ধার্য আছে যার তাৎপর্য হলো নির্ধারিত সময়ে (এক বছর) এই ঋণ ব্যবহার না করলে তার জন্যও বাড়তি সুদ গুনতে হবে। যার কারণে এটাকে ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট’ ছাড়াও ‘টাইড লোন’ হিসেবেও অভিহিত করা যায়।
নোট: আগমী পর্বে সমাপ্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



