somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অর্থনীতির সাদামাটা হিসেবের আড়ালে ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের তাৎপর্য (শেষ পর্ব)

২৩ শে আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৪:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রথম পর্ব

‘ট্রানজিটে’ ভারত ও বাংলাদেশের লাভক্ষতির খতিয়ান

যেসব অঞ্চলের জন্য ভারত প্রধানত ‘ট্রানজিট’ চাচ্ছে - শিলিগুড়ি করিডর দিয়ে; বর্তমানে পণ্য পরিবহনে ভারতের খরচ হচ্ছে বছরে প্রায় একশত বিলিয়ন ডলার। ‘ট্রানজিট’ সুবিধা পেলে পণ্য পরিবহনে ভারতের খরচ সাশ্রয় হবে সর্বোচ্চ ৭৬ থেকে সর্বনিম্ন ১২ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহনে ভারতের বাড়তি খরচ লাঘব হলেও বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রায় কিছুই পাচ্ছে না; এইটা বাংলাদেশের তরফ থেকে মোটামুটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বর্তমানে আসামের চা প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলকাতা বন্দরে এসে বহির্বিশ্বে রফতানি হয়; একই স্থান থেকে কোন যান ত্রিপুরা পৌঁছুতে পেরোতে হয় প্রায় ১৬৫০ কিলোমিটার। ‘ট্রানজিট’ সুবিধা পেলে আসাম ও ত্রিপুরার যানগুলো মাত্র ৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। ভারতের অর্থনীতির জন্য এ এক বড় প্রাপ্তি। এতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতীয় পুজির আধিপত্য আরো ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী হবে। বিপরীতে বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের অবস্থান ‘ট্রানজিটে’র বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে যে কোন ধরণের ন্যায্য ফি আদায়ের বিপক্ষে। গত জুনে এনবিআর ‘ট্রানজিটে’র এক ধরনের ফি নির্ধারণ করে এসআরও জারি করার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ওই এসআরও-তে এনবিআর প্রতি কনটেইনার পণ্যের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং খোলা পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতি টনে ১ হাজার টাকা ফি ধার্য করেছিল। ভারতের বর্তমান মূল ভূখন্ড থেকে উত্তর-পূর্বে পণ্য পরিবহনে যে খরচ তার চেয়ে এনবিআর নির্ধারিত ফি অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের শক্তিশালী একটি অংশ এরূপ ফি আদায়ে বিরোধীতা করে। এমন বিরোধিতার কারণেই নদী পথে ভারত বর্তমানে যে ট্রানজিট সুবিধা নিচ্ছে তার ফি বাড়ানোর চেষ্টাও স্থগিত হয়ে আছে দীর্ঘদিন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১০ সালের ২ নভেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রানজিটের ওপর কোন শুল্ক ফি আরোপ করা হবে না।’ তাঁর এই মন্তব্য বিস্ময়কর এ কারণে যে, গত এক যুগ ধরে একটি মহল গণমাধ্যমে ‘ট্রানজিটে’র বিনিময়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয়ের গালগল্প শুনিয়ে আসছিলো।

পৃথিবীর যেসব দেশে ‘ট্রানজিট’ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে ‘ট্রানজিটে’র আয় সব সময়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিসরের সুয়েজ খালকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। মিসর ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করে। এরপর থেকেই সুয়েজ খালের আয় দেশের প্রভূত উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। সুয়েজ খালে কোন জাহাজ প্রবেশ করলে, তার ওপর বেশ কয়েক ধরনের ট্যাক্স ও ট্রানজিট ফি ধরা হয়। যেমন ১০০০ টনের একটি জাহাজের জন্য খাল কর্তৃপক্ষকে প্রদান করতে হয় সব মিলিয়ে ৪০০০ মার্কিন ডলার। এই খরচের সঙ্গে বীমা খরচ যুক্ত করলে সুয়েজ খাল অতিক্রমে আরো বেশি মার্কিন ডলার গুনতে হয়। জাহাজের টনের পরিমাণের বৃদ্ধির সাথে সাথে ফির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। প্রসঙ্গক্রমে ‘সুয়েজ চ্যানেল অথরিটি’র এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শুধু মাত্র জুলাই মাসে ১৫৫৪টি জাহাজ চলাচলের বিপরীতে ৪০৬.২ মিলিয়ন ডলার রেভিনিউ আদায় করেছে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। অথচো প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান ভারতকে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা প্রদান থেকে কোন ধরণের ফি বা মাশুল আদায়ের ঘোরতর বিরোধী। তিনি এও বলেছেন, ‘ট্রানজিটে’র বিনিময়ে কোন ধরণের অর্থ চাওয়া এক ধরণের অসভ্যতা হবে। অপরদিকে ট্যারিফি কমিশন বলেছিলো, ‘ট্রানজিটে’র বিনিময়ে বাংলাদেশ অন্তত্য ১১ ধরণের মাশুল দাবি করতে পারে।

‘ট্রানজিট’-এর অন্যান্য ক্ষয়-ক্ষতি এবং ঝুঁকিসমূহ

পরিবেশগত ক্ষতি: বাংলাদেশ ঘণবসতিপূর্ণ একটি দেশ এবং এখানকার পরিবেশ বিবিধ কারণে ইতিমধ্যে বিপন্ন। এর উপর ‘ট্রানজিট’ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এখানে বাড়তি পরিবেশগত জটিলতা তৈরি হবে। ইউরোপে ‘সুইজারল্যান্ড’ পার্শ্ববর্তী দেশসমূহকে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ক্ষতি মূল্যায়নে তাদের ‘আল্পাস পার্বতে’র কেমন ক্ষতি হবে সেটাও শুল্ক নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ বাংলাদেশ দেশের ৮-১০টি রুট দিয়ে ভারতকে ‘ট্রানজিট’ দিচ্ছে পরিবেশগত বিষয়গুলোতে সুনিদৃষ্ট স্টাডি ছাড়াই।

বলাবাহুল্য, ‘ট্রানজিটে’র কারণে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতি লাঘবের জন্য কিংবা তার পুনর্বাসনের জন্য ভারত কোন ভূমিকা রাখবে কি না তা ‘ট্রানজিট’ প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখার ক্ষত্রে ভবিষ্যতের এক বড় প্রশ্ন। কারণ যতই দিন যাবে জনগণের মাঝে এর পরিবেশগত ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যেমন, আশুগঞ্জের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সেখান থেকে আখাউড়া হয়ে ভারতের আগরতলায় হেভি মেশিনারী পরিবহনে (যা ওডিসি বা ওভার ডাইমেনশনাল কনসাইনমেন্ট নামে পরিচিত) সড়ক সম্প্রসারণের জন্য ঠিকাদারী পাওয়া ভারতীয় কোম্পানি ‘এবিসি কনসট্রাকশন’ এমনভাবে তাড়াহুড়ো করে ৪৯ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ করেছে, যার ফলে পার্শ্ববর্তী একটি খাল চিরতরে ভরাটসহ পানি নিস্কাষণ ব্যাবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে এবং এর মধ্যদিয়ে ঐ এলাকায় ইতিমধ্যে স্বায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও অতিরিক্ত যান চলাচলের কারণে কার্বণ নির্গমনের উপর এর নতুন প্রভাব পরবে। একইভাবে বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও ‘ট্রানজিটে’র স্বার্থে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে রেললাইন বসানো এবং মংলা বন্দরকে ব্যবহার করে ঐ রেললাইন দিয়ে ভারতীয় পণ্য ব্যবহারের কথাও প্রস্তাব আকারে উত্থাপিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি: ইউরোপ, মধ্য এশিয়া এবং বিশেষ করে আফ্রিকার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ‘ট্রানজিট’ কার্যক্রমের অনুষঙ্গ হিসেবে নতুন করে ব্যাপক স্বাস্থ্য সমস্যার আবির্ভাব ঘটে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিদিন যদি নতুন করে শত শত যানবাহন চলাচলের তার ফল হিসেবে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার আবির্ভাব প্রায় অনিবার্য। এক্ষেত্রে অবধারিতভাবে এইডস সমস্যার কথা চলে আসে। ভারতে ইতিমধ্যে ছয় মিলিয়ন এইডস রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ সংখ্যা বিশ্বের যে কোন দেশের চেয়ে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতে সবচেয়ে এইডস উপদ্রুত তিন প্রদেশই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে - মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড। ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যে ট্রানজিট সুবিধা চাচ্ছে তার এক দিকেই রয়েছে উপরোক্ত তিনটি প্রদেশ। আরো বিপদের ব্যাপার হলো ট্রানজিটের প্রধান যে উপাদান ট্রাক - তার চালকরাই ভারতে সবচেয়ে বেশি এইডস বহন করে চলেছে।

চোরাচালান ও মাদক সমস্যা: ইউরোপ, মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকার ‘ট্রানজিট’ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতায় এটি স্পস্ট, এরূপ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে চোরাচালান ও মাদকের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। ভারতের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইতিমধ্যে চোরাচালান কবলিত। ‘ট্রানজিট’ সেক্ষেত্রে আরো বাড়তি সমস্যা তৈরি করবে। এবং তার মোকাবেলায় কিরূপ পদক্ষেপ নেয়া হবে সে সম্পর্কেও কোন বক্তব্য নাই। এ প্রসঙ্গে উলেখ্য, ভারত থেকে ফেনসিডিল পাচার রোধ বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ফেনসিডিল বাণিজ্যকে ভারতীয়রা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্ত-সংলগ্ন গ্রামগুলোয় এ পর্যন্ত ১৩২টি ফেনসিডিল কারখানা শনাক্ত করা গেছে। এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর তরফ থেকে ইতিমধ্যে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। ফেনসিডিল কারখানাগুলোর মধ্যে কেবল পশ্চিমবঙ্গেই আছে ৫২টি। ‘ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনাল নামক সংস্থা’র স্টাডি অনুযায়ী বাংলাদেশে কেবল মাদক পাচারের মাধ্যমে ভারতীয়দের আয় ৩৪৭ কোটি রুপি। অন্তত ৩২ ধরনের মাদক ৫১২টি পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে এ দেশে ঢুকছে। এ ধরনের সমস্যার মোকাবেলায় সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে যে স্ক্যানিং অবকাঠামো রয়েছে তা অতি অপ্রতুল। ‘ট্রানজিট’ শুরু হলে বাড়তি স্ক্যানিং অবকাঠামো স্থাপিত হবে কি না এবং স্ক্যানিং স্থলগুলো কোথায়, কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে সে বিষয়েও এখনো কোন সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানা যায়নি।

বহু দ্বিপক্ষীয় সমস্যা অমীমাংসিত রেখে আলোচনার টেবিলে ‘ট্রানজিট’

ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট কিংবা করিডর - যে সুবিধাই দেয়া হোক না কেন, তার ভিত্তি অবস্যই হতে হবে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা। ‘ট্রানজিট’রূপী সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশও সমমানের কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে - এমনটিই প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বাড়তি প্রবেশের ব্যাপার যেমন আছে তেমনি আছে নেপাল, ভূটান, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে বাংলাদেশি পণ্য পরিবহনের সুবিধাপ্রাপ্তির প্রশ্ন। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অন্যান্য সমস্যা যেমন সমুদ্রসীমা নির্দিষ্টকরণ, স্থল সীমানা চিহ্নতকরণ, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশীদের হত্যা, আন্তঃদেশীয় নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া, ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধের প্রতিক্রিয়াও বাংলাদেশের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যিক ব্যবধানের বিষয়টি উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে ২০১০-১১ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানি তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩৩৮ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য যার বিপরীতে রপ্তানি করে ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। এ সময় বাণিজ্য ঘটতি দাঁড়ায় ৩০২ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য যার বিপরীতে রপ্তানি করে ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩২১ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের পণ্য, যার বিপরীতে রপ্তানি করে ৩০ কোটি ৪৬ লাখ ডলার সমমূল্যের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ২৯০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। সর্বশেষ প্রাপ্ত হিসাবে গত (২০১০-১১) অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করেছে ৯৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য। বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য। দুই দেশের মাঝে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কোন্নয়নের পথে অন্যতম অন্তরায় হয়ে আছে। আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সঙ্গে চোরাই পথে আসা পণ্যের হিসাব করলে ঘাটতির পরিমাণ আরও অনেক বেড়ে যাবে। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ভারত থেকে আসা ৮৩ শতাংশ পণ্য আসে চোরাই পথে। এর পরিমাণ ৬৩১ মিলিয়ন ডলার। মূলত ভারতে রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির কারণে ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে।

বলা হচ্ছে, ‘ট্রানজিট’ স্রেফ একটি অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ, এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনাগুলো যুক্ত করা অনুচিত হবে। কিন্তু বিশ্ব পরিসরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্বের বাস্তব পটভূমি ছাড়া এবং দেয়া-নেয়ার মনোভাব ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা খুব বেশি এগোয় না। দীর্ঘদিনের পুরানো দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর মীমাংসা স্থগিত করে এবং আড়ালে রেখে ‘ট্রানজিট’ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের দিক থেকে জাতীয় স্বার্থসম্মত নয়। কোনরূপ দরকষাকষি ও অর্থনৈতিক বিবেচনাকে বাদ দিয়ে ভারতে ‘ট্রানজিট’ বা ‘করিডর’ সুবিধা দিয়ে দেয়ার পক্ষে যারা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের একটি ‘যুক্তি’ দেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধি বিধানে’র আলোকেই ভারতের এইরূপ সুবিধা প্রাপ্য। এক্ষেত্রে আসলে সত্য-মিথ্যার মিশেল ঘটানো হচ্ছে। প্রথমত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কথিত বিধি (অ্যার্টিক্যাল ৫) অনুযায়ী কেবল ‘ল্যান্ড-লক’ (অন্যদেশ দ্বারা বেষ্টিত, বন্দরহীন) দেশগুলোর জন্যই প্রতিবেশী কর্তৃক ‘ট্রানজিট’ সুবিধা দেয়ার সুপারিশ রয়েছে এবং এই বিধানও এখনো চূড়ান্ত ভাবে অনুমোদিত হয়নি। অর্থাৎ বিধানটি অনুমোদিত হলেও ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না। কারণ ভারত কোন ‘ল্যান্ড-লক’ দেশ নয়। উপরন্তু ভারত নিজে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘ল্যান্ড-লক’ দেশ নেপালকে কখনো ট্রানজিট সুবিধা দেয়নি। যে কারণে নেপাল বহুপূর্বে বাংলাদেশের কাছ থেকে ‘ট্রানজিট’ সুবিধার নীতিগত সম্মতি পেলেও ভারতের বৈরিতায় তা আজো কার্যকর করতে পারেনি।

উপরোক্ত ধাঁচে সত্য-মিথ্যার ধূম্ররজাল সৃষ্টি করেই নব্বুয়ের দশকের শেষার্ধে তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে এবং জনগণকে অন্ধকারে রেখে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির হিস্যা নিয়ে একটি চুক্তি করেছিল ভারতের সাথে। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগ শেষে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেক্ষেত্রে চুক্তিতে কথিত পানি পায়নি। ভারত-বাংলাদেশ অতীতের সকল দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অভিজ্ঞতাই এ রকম হতাশাজনক। এরকম নানান বিষয় অমীমাংসিত রেখেই ট্রানজিট প্রদানের ফয়সালার মাধ্যমে শাসক শ্রেনীর নতজানু অবস্থান জনগণের কাছে পরিস্কার।

অর্থনীতির সাদামাটা হিসেবের আড়ালে ‘ট্রানজিটে’র তাৎপর্য

এটা পরিস্কার, দুইহাজার দশ সালে এসে ইনডিয়া ‘ট্রানজিটে’র আদলে যে ‘করিডর’ চাইছে তার ধরণ, প্রকৃতি ও প্রয়োজন আগের যে কোন সময়ের চাইতেই আলাদা। অর্থনীতির সাদামাটা হিশাব আমলে নিয়েও বলা যায় তা প্রধানত তাদের উত্তরপূর্বাঞ্চলের ভূ-খন্ড টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্র তৈরির আবশ্যিক চাহিদা। দশকের পর দশক প্রবল সামরিক উপস্থিতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ সংহতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বিদ্রোহী দলগুলার উপর রাজনৈতিক-সামরিক চাপ প্রয়োগ ও সমঝোতায়া বাধ্য করার নীতিতে বাংলাদেশকে কাছে পাওয়া তাদের জন্য একান্তই দরকার। বিরোধ মীমাংসাসহ রাজনৈতিক ফয়সালায় বাংলাদেশ সংযমী এবং দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে পারত। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী না হয়ে শাসক শ্রেনীর কৈাশল হয়ে গেল অন্যের হয়ে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ইনডিয়ার নিরাপত্তা রক্ষীদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গ্রেফতার এবং অপহরণের অবাধ সুযোগ দেওয়া। উত্তরপূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত দলগুলোর প্রতি ইনডিয়ার নতুন মনোভাব এবং করণীয়ও ঠিক হয়েছে এই পরিপ্রেক্ষিতকে সামনে রেখে। বাংলাদেশকে তাদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করটা মূলত এই দিকটা সামলানোর জন্য। কিন্তু আড়াল হিশাবে সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলার তৎপরতা এবং ট্রানজিটকে খুব সুচারুভাবে সামনে আনা হয়েছে।

এরফলে অবস্থা কি রুপ হবে তা মোটামুটি অনুমান করা যায়। সেই সাথে উইকিলিকসের উদ্ধার করা বার্তা ছাড়াই প্রকাশ্যে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মুখনিঃসৃত বাণী থেকেই আমরা বুঝতাম, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনভাব। তার উপর পাওয়া গেল সরাসরি ইনডিয়ান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বক্তব্য। “তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অন্তত ২৫ শতাংশ বাংলাদেশি জামায়াতে-ইসলামির সমর্থক এবং তারা তীব্র ভারতবিরোধী” - এই মন্তব্যে বাংলাদেশের কতভাগ লোক ইনডিয়া বিরোধী, অতএব মৈালবাদী সেই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেবনিকেশ নিয়ে আলোচনার পর মন্তব্যটি সরিয়ে নেওয়া হলেও, হিসেবে রাখা প্রয়োজন এটি প্রত্যাহার করা হয়নি। নিজ দেশের সম্পাদকদের কাছে তিনি বাংলাদেশের প্রতি ইনডিয়ার মনোভাবই নয় বরং সম্পর্কের ধরণ এবং ইনডিয়ার অবস্থানও ব্যাখা করেছেন। নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক স্বার্থের জন্য বিনিয়োগকৃত এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তাকেই আখ্যা দিয়েছেন অভূতপূর্ব উদারতা আর সদয় আচরণের পরাকাষ্ঠা হিশাবে। শুধু তাই না, একমাত্র যে প্রতিশ্রুতিটুকু গত দেড়বছর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর খাতায় বারবার দেখানো হয়েছে, সেই তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি বিষয়ে মনমোহনের মন্তব্য, এরকম কিছু একতরফা ছাড় দেয়া যায় কিনা ভাবছেন তারা। অভিন্ন নদীতে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত পানি পাবার ন্যায্য অধিকারকে ইনডিয়া বলছে তাদের পক্ষ থেকে দয়া প্রদর্শন। প্রাকৃতিক উৎসের উপর আমাদের প্রাপ্য অধিকারটাকে বহুদিন থেকে তারা কূটনৈতিক দেনদরবার এবং দরকষাকষির বিষয়বস্তু বানিয়ে রেখেছে।

গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে

আহমদ ছফা বহু আগেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে শাসক শ্রেনীর ভূমিকাকে ‘স্বাভাবিকের চাইতে একটু অধিক যেতে বাধ্য হয়েছিলো’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, নেতৃবৃন্দ কখনো স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন নি যে বাংলাদেশে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রসত্তার জন্ম হতে চলেছে এবং তারা সে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর এই ভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পায়ে হেটে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করতে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। শাসক শ্রেনীর মেরুদন্ডহীনতায় সেই ভিক্ষাবৃত্তি থেকে জনগণ আজো বেড় হয়ে আসতে পারলোনা। জাতীয় সম্পদ বহুজাতিকের হাতে তুলে দেওয়া, ভারতকে ট্রানজিট প্রদানসহ ইত্যাদি পরিস্থিতি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক জানগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখোমুখি করেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের নিয়তি কোন দিকে? আহমদ ছফাই সেই নিয়তির নির্দেশ করেছেন, “...বাংলাদেশকে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হতে হবে, যা অনিবার্যভাবেই ভারতীয় বৃহৎ ধনিকশ্রেণীর শোষণ থেকে ভারতের শোষিত এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীসমূহকে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আর্থিক দাবির প্রতি সজাগ করে তুলবে। সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে ভারতের নির্যাতিত জাতিসত্তাসমূহের সামনে বাংলাদেশকেই সর্বপ্রথম প্রেরণার দৃষ্টান্ত সরবরাহ করতে হবে। এটাই বাংলাদেশের নিয়তি।” ফলে শাসক গোষ্টির ক্রমাগত ব্যার্থতা এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে নতুন রাজনৈতিক দিশা হাজির করবে। জনগণের সঙ্গে জনগণের মৈত্রীর প্রশ্নে দৃঢ় ও আন্তরিক থেকে বাংলাদেশের জনগণই উপমহাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।


সহায়ক গ্রন্থ ও রচনা সূত্র:
০১. বেহাত বিপ্লব ১৯৭১; সম্পাদক: সলিমুল্লাহ খান। ফেব্র“য়ারী ২০০৭, অন্বেষা প্রকাশন।
০২. গণপ্রতিরক্ষা; লেখক: ফরহাদ মজহার। ফেব্র“য়ারি ২০০৬, ঐতিহ্য।
০৩. ইনডিয়া-বাংলাদেশ সর্ম্পক: মনমোহনের সফরে ম্যাজিক অসম্ভব। লেখক: মুসতাইন জহির।
০৪. ট্রানজিট: বহু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সম্পাদনায়: ট্রানজিট স্টাডি গ্রুপ।


নোট: লেখাটি পর্যালোচনা পত্রিকা 'বিবিধ' এর আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত।



সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ১১:৩৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×