ষাট বছরে কতগুলো দিন হয়? তারচেয়ে ও বেশী সময় ধরে বিশ্বের প্রতিটি পত্রিকায় প্রতিটি দিন যে জনপদটি শিরোনাম হয়ে আসছে, তার নাম ফিলিস্তীন- একটি মৃত্যু উপত্যকার নাম! যে প্রজন্মে তাদেরকে পরাধীনতার শৃংখল পরানো হয়েছিলো, তারপর আরো দু-দু'টি প্রজন্ম অতিক্রান্ত হতে চলেছে! পশ্চিম তীর, গাজা, রামাল্লা- আজ বিশ্ববাসীর কাছে অতিপরিচিত নাম। অথচ, মনে হয় এইসব স্থান যেন ঠিক এই পৃথিবীর নয়, অন্য কোথাও তাদের অবস্থান, পাতালপুরীতে- নরকের খুব কাছাকাছি! নয়তো কেন সেখানে চলেনা সভ্য জগতের কোন আইন? কেন সেখানে বারেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে অন্ধ মানবতা?
হ্যাঁ, ফিলিস্তীন, সবার চেয়ে আলাদা।
মানব-মানবীর ভালবাসা সেখানেও স্বর্গীয় আবেশে দুলে ওঠে, কেবল পূর্ণতা পাবার আগেই ট্যাঙ্কের আঘাতে সে ভালোবাসা গুড়ো গুড়ো হয়ে যায়। সেখানেও শিশু জন্মায়, সুতীব্র চিৎকারে নিজের অস্তিত্ব জাহির করবার আগেই তার কানে পৌঁছে যায় কোন নিকটাত্মীয়ের চিরবিদায়ের আহাজারি। মায়েদের ঘুমপাড়ানি গান সেখানে মেশিনগানের অবিশ্রান্ত রবের নিচে চাপা পড়ে। ঠিক মত হাঁটতে শেখার আগেই সে পাথর ছোঁড়া শিখে ফেলে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে জীবনের প্রথম খেলনা হিসেবে তুলে নেয় প্রথম একে-৪৭! যতদিন যায় ততই তার খেলার সাথী কমে যায়। ভাগ্যবিড়ম্বিতরা যায় নির্বাসনে-কারা অন্তরালে, আর ভাগ্যবানেরা চলে যায় চিরঘুমের দেশে! যৌবনে তার সময় কাটে মিছিলে; বন্ধুদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দিয়ে; আর কাঁটাতারের বেড়া এপার-ওপার করে। শেষ জীবনটা যদি কারা অন্তরালের বাইরে কাটে তবে, পরবর্তী প্রজন্মের অন্তরে সে জ্বালিয়ে দিয়ে যায় বিদ্রোহের বীজমন্ত্র।
তাই বলছি, ফিলিস্তীন, সবার চেয়ে আলাদা।
কসভো, পূর্ব তিমুর আরো কত কত দেশ স্বাধীন হয়ে গেল! শুধু ফিলিস্তীনই পারলো না!
আসলেই কী পারে নি? পৃথিবীর আর ক’টা জাতি পেরেছে এভাবে তিন-তিনটা প্রজন্মকে স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করে দিতে।
আর সব বাদ। আমরা কী পারতাম? '৭১-এর পরের প্রজন্মেই আমরা স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলে গেছি- মুক্তিযুদ্ধটা একটু লম্বা হলে যে কী হোত, ভাবতেই গা শিরশির করে!
তাই আবার বলতে হচ্ছে, ফিলিস্তীন, সবার চেয়ে আলাদা।
ছোট্ট একটা টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সারাদিন অনলাইনে থাকার সুবাদে দুনিয়াদারির খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। যতই দেখি-শুনি ততই নিজের উপর হতে বিশ্বাস উঠে যায়। এও কি সম্ভব?
গ্রাহক তাঁর মোবাইল ফোনে ভালভাবে কথা বলবেন সে চেষ্টায় যখন উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যাই, তখন পৃথিবীর ঐ প্রান্তে ফিলিস্তীনী আমার বয়সীরা দু'দন্ড বসবার জন্য একটুকরা জমিও খুঁজে পায় না । দুপুরের অবসরে যখন আমি যখন সবার সাথে আড্ডাতে মশগুল, তখন ওরা হেঁটে চলে বধ্যভুমির দিকে- কাঁধে ওঠে প্রিয়জনের শবদেহ! সন্ধ্যার পর যখন রিমোট হাতে নিয়ে এমটিভি - সনি উপভোগ করবার ফাঁকে ফাঁকে ওদের খবর দেখি আর একটু আহা-উহু করে ঘুমোবার প্রস্তুতি নিই, তখন ওরা আসন্ন আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনায় বিভোর। প্রেয়সীর মুখখানা ভেবে ভেবে যখন আমার দু'চোখে ঘুমের আবেশ, তখনো ওরা নিদ্রাহীন; পরিবার-পরিজন হতে বিদায় নেবার ফাঁকে একটু অশ্রু সজল হয়ে ওঠে কী দু'চোখ? আগামীকালের সুর্য দেখার ভাগ্য হয়তো অনেকেরই হবে না।
সেজন্যেই বলছি, ফিলিস্তীন, সবার চেয়ে আলাদা।
ফিলিস্তীন কাপুরুষতায় আমায় লজ্জা দেয়, বিদ্রোহে যোগায় সাহস। বুকের গহীন প্রদেশে স্বাধীনতার স্বপ্নকে লালন করতে শেখায়; নাড়া দেয় অস্তিত্বের অনেক গভীরে। ফিলিস্তীন আমাকে দেয় নির্ঘুম রজনী; অসহ্য যন্ত্রনার অষ্টপ্রহর! ফিলিস্তীন, তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার বেদীমূলে ছিটিয়ে দেয় ঘৃনাভরা এক দলা থুথু।
তাই, ফিলিস্তীন, সবার চেয়ে আলাদা।
ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


