আমার একটা একেবারে ব্যক্তিগত নোটবুক আছে যেখানে আমি ২০০১ সাল হতেই লিখে আসছি। এমন কোন উচ্চমার্গীয় কিছু নয়! কোথাও কিছু পড়ে ভাল লেগেছে লিখে রেখে দিই; কারো কথায় মুগ্ধ হয়েছি, তাও লিখে রাখি। মাথায় কোন একটা চিন্তা ভর করেছে, নোটবুকটার উপর ঝেড়ে দিই! মজার ব্যাপার হলো, ওটাতে প্রথম যে কথাটা লেখা হয়েছে তা হল, "একজন বিখ্যাত মানুষ দিয়ে কী হয়- কিছুই হয় না। কিন্তু, একশজন খাঁটি মানুষ একটি দেশ বদলে দিতে পারে"। যারা জানেন, তাঁদের আবারো জানাচ্ছি এটা ড. জাফর ইকবালের "দুষ্টু ছেলের দল" কিশোর উপন্যাসের একটা বিখ্যাত উক্তি।
আরো কয়েক বছর পেছনে যাই? তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। স্কুল লাইব্রেরী থেকে নিয়ে ‘টুকুনজিল’ নামে একটা খুব মজার উপন্যাস পড়লাম আর এভাবেই লেখক জাফর ইকবালের সাথে পরিচয় হয়ে গেল। এরপর একে একে কত বই- 'হাকারবিন', 'স্কুলের নাম পথচারী', 'কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ', 'আমার বন্ধু রাশেদ'- গোগ্রাসে গিলেছি। তবে, তখনো নামের বাইরে লেখকের সাথে আর কোন পরিচয় নেই। আমার ধারনা আমার প্রজন্মের প্রায় সব কিশোরেরই জাফর ইকবালের সাথে এভাবেই পরিচয়!
যাই হোক, এর কিছুদিন পরেই হলের নামকরণ নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল নটঘট বেঁধে যায়; পত্রিকার প্রথম পাতায় আসতে থাকে এর নাম। সেই সূত্রে জাফর স্যারের নামও আসে আর যতদুর মনে পড়ে, সেভাবেই প্রথম জানতে পারি, আমার এই প্রিয় লেখক ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। ধীরে ধীরে বড়ভাই হুমায়ুন আহমেদ আর তাঁর নিজের লেখা বিভিন্ন আত্মজীবনীমূলক লেখা থেকে জানতে পারলাম, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পিতা হারানোর বেদনা, সংগ্রামমুখর ছাত্রজীবন, আমেরিকার প্রবাস জীবন, বেল (AT&T Bell) ল্যাবরেটরীতে কাজ। তখন অবাক হয়ে ভাবতাম, আমেরিকায় গেলে কেউ এমনি এমনি ফেরে নাকি?
সে সময় একুশে টেলিভিশনে অভিনেতা আলী জাকেরের উপস্থাপনায় একটা টক শো হোত (নাম মনে নেই), যেখানে একবার জাফর ইকবাল এসেছিলেন। অনেক কথা বলেছিলেন; কিছুই মনে নেই, কেবল একটা কথা ছাড়া! উপস্থাপক আমেরিকা হতে তাঁর ফিরে আসার কারন জানতে চাইলে তিনি যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হল, সেখানে বহুদিন থাকার পর একদিন তাঁর মনে হলো তিনি এদেশের বর্ষাকাল মিস করছেন, বর্ষাকালের ব্যাঙের ডাক তিনি শোনেন না বহুদিন। তাই তিনি ফিরে এসেছেন। আজ প্রায় দশ বছর পর এ কথাগুলো শুনতে গাঁজাখুরি মনে হলে ও বিশ্বাস করুন, সেদিন সেই কথাগুলো বলার সময় তাঁর যে আশ্চর্য সরলতা আমি দেখেছিলাম তাই আমাকে কথাগুলো বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে।
এর পর তো দিন কেটে গেল। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই ডিপার্টমেন্টে ভর্তির সুযোগ পেয়েও আমি রয়ে গেলাম চিটাগাঙ আর ব্লগার আহমেদ রাকিব চলে গেল সেখানে। এর ফাঁকে দেশে গণিত অলিম্পিয়াড হয়, প্রোগ্রামিং কন্টেষ্ট হয়, দেশে মুখস্থবিদ্যা বিরোধী আন্দোলন জেগে ওঠে, শিশু-কিশোরেরা তন্ময় হয়ে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনে। এ সব কাজেই তাঁকে দেখি সামনের সারিতে- কাজ করে চলেছেন নিরলস। আমি ভাবি এই তো চাই! একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তাঁর জ্ঞানকে, তাঁর উদ্দীপনাকে কেন শুধু ক্লাসরুমে ফেলে রাখবেন? ক্লাসে তিনি কেমন পড়ান, আদৌ পড়ান কীনা- সে আমি জানি না এবং তা নিয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যাথা ও নেই। আন্তর্জাতিক জার্নালে কটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে তা দিয়ে আমার কী কাজ! জ্ঞান তো ছড়িয়ে দেবার জিনিস আর জাফর ইকবাল তাই করে চলেছেন।
উপরের কথাগুলো পড়ে অনেকেই আমাকে তাঁর অন্ধ ভক্ত ভেবে নিতে পারেন; মনে করতে পারেন আমি তাঁকে মহাপুরুষ মনে করি। কিন্তু, কারো প্রতি অন্ধবিশ্বাস আমার কখনোই ছিল না; জীবনে যা ভাল লেগেছে তা নিজের জন্য গ্রহন করেছি, যা ভাল লাগে নি তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি।
ব্যক্তি জাফর ইকবালের দিকে যদি তাকাই তাহলে আমি দেখি তিনি একজন সেক্যুলার মানুষ, যা আমার দুই চোখের বিষ। রাজনৈতিক মতাদর্শগত দিক থেকে তিনি আওয়ামী ঘরানার, যে দলকে আমার কখনোই পছন্দ হয় না! ব্যক্তি জাফর ইকবালের প্রতি যাদের চরম বিতৃষ্ণা, তাদের বেশীরভাগেরই আপত্তির শুরুটা কিন্তু এ জায়গা থেকেই হয়। অথচ, ব্যক্তিগত জীবন বিশ্বাসের বিপ্রতীপ বৃত্তে দাঁড়িয়েও আমি ঠিক সেভাবে অপছন্দ করতে পারি না, কেননা ঐ ব্যক্তিটির দেশপ্রেমের উপর, মানুষের প্রতি ভালবাসার উপর আমার পুরোপুরিই আস্থা রয়েছে, হতে পারে তাঁর মত আমার মতের বিপরীত!
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জাফর ইকবাল পুরো পরিবারসহ এক কঠিন সময় পার করেছেন। পিতা ফয়েজুর রহমানকে হারিয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে কেটেছে '৭১ এর দিনগুলো। এজন্য পূর্ণাঙ্গ সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও যখনি আমার মনে হয় এক টগবগে যুবক দেশমাতৃকার নিদারুন প্রয়োজনের সময় শুধুমাত্র নিজের পরিবারের সাথে থাকাকেই বেছে নিয়েছে, তখনি কেমন একটা নিরব অভিমান ভর করে আমার ভেতরে। তারঁ বয়সি যুবকেরা তখন দলে দলে যুদ্ধে গিয়েছে; প্রান দিয়েছে-প্রান নিয়েছে। জানি না, আসল সত্য কী, তবে পরবর্তী চার দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারন করে তিনি যেভাবে পথ চলেছেন, অন্যদের পথ চলে শিখিয়েছেন, তা অনেক সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধাই পারেন নি! বিশেষ করে, "মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস" বইয়ের মাধ্যমে একটি অনন্য কাজ করেছেন তিনি। তবে, '৭১ এর ঋণ এভাবে শোধ হয়েছে কীনা তার বিচার করবে ইতিহাস- আমি নই।
"মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোন" এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের সাথে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় করিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা আমার খুবই পছন্দের। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, এ গল্প শোনার মধ্য দিয়ে ঐ ৮-১৫ বছরের বাচ্চাগুলোর মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি তৈরী হয় এক সুতীব্র ঘৃনা। বিগত নির্বাচনে এর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
এবার, একটা একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর ঢাকা পল্টনে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের পাঁচ জন ছেলে মারা যায়। সংগঠনটি কিংবা এর মুরুব্বীরা যতই বিতর্কিত-ঘৃণিতই হোক না কেন যে নৃশংসতা, যে বীভৎসতায় তাদের মারা হয়েছিল তা বিবেককে নাড়া দেবেই। আমার জন্য ব্যক্তিগত কষ্টের ব্যাপার হল এদের মধ্যে দুজন আমার অনেকদিনের পরিচিত। যাই হোক, এ সময় অনেকেই অনেক কিছু বলেছেন, লিখেছেন- আমি অনেকদিন ধরেই আশায় ছিলাম জাফর স্যার তার সাধাসিধা কথায় দূর্ভাগা ছেলেগুলোর জন্য দু'লাইন শোকগাঁথা লিখবেন। কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় তাঁর চোখ এড়ায় না, এরা বাদ পড়ে গেল? হয়তো, স্বাভাবিক এটাই। ব্যক্তিগত হারানোর কষ্টে আমি বুঝতে পারি নি! এর কিছুদিন পরেই ছেলেগুলোর ছবিওলা পোষ্টারে ঢেকে যায় সারাদেশ।
কলা ভবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হচ্ছি। হঠাৎ কানে এলো, "এগুলারে এইভাবে পিটায়া মেরে ফেলা উচিৎ"। তাকিয়ে দেখি, এরকম একটা পোষ্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ক'জন ছেলেমেয়ে। একজন কথাগুলো বলছে আর অন্যেরা সমর্থন করছে। আমি স্তম্ভিত হয়ে ভাবলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ছাত্র-ছাত্রীরা ওদের জন্য কী পরিমাণ ঘৃণাই না বুকে পুষে রেখেছে। এ ঘৃণা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? বড় মানুষদের ভুলগুলো কি বড়ই হয়?
অনেক কথা বলা হয়ে গেল। আলেকজান্ডার ডেনড্রাইটের সেই কুখ্যাত পোষ্টটা দিয়ে শেষ করি। সাড়ে ছয়শ এর উপরে মাইনাস নিয়ে এখনো সগৌরবে(!) এগিয়ে চলেছে! তবে, পোষ্টটির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এই পোষ্ট পড়েই সামহোয়্যারইনের দিকে আমার ঝোঁকা শুরু। এর পরে জাফর স্যারকে নিয়ে কত পোষ্ট, কত যুক্তি-পালটা যুক্তি! আমি কখনোই সে সবে অংশ নিই নি। ভাবতাম, শুধু শুধু ক্যাঁচাল করে লাভ কী? সবশেষে গত সপ্তাহে বন্ধুবর রোহানের পোষ্টের মধ্য দিয়ে আমার মনে হয়েছে এ ব্যাপারে সব অপকথার অবসান হয়েছে। তাই এবার সাহস করে পোষ্টের আকারে নিজের কথাগুলো ঝেড়ে দিলাম। কারো পছন্দ হতে পারে, কারো নাও হতে পারে; কেউ কেউ হয়ত না পড়েই মাইনাস দেবেন। কিচ্ছু এসে যায় না! কথাগুলো বলেই শান্তি; বোঝা নেমে গেলো যেন।
শেষকালে, ড. জাফর ইকবালের দু'টি উক্তি দিয়ে বিদায় নিচ্ছি।
১. একজন বিখ্যাত মানুষ দিয়ে কী হয়- কিছুই হয় না। কিন্তু, একশজন খাঁটি মানুষ একটি দেশ বদলে দিতে পারে।
২. একটা ছুঁচো যখন মাথা খারাপ করে একটা দেয়ালে আছড়ে পড়ে তখন ছুঁচোটি ছাড়া আর কারোই ক্ষতি হয় না। কিন্তু একটি বিশাল ট্রাক যখন ব্রেক ফেল করে সেই দেয়ালে গিয়ে পড়ে, তখন সেটা অনেক ধ্বংসের কারন হয়।
ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


