বাদ দিন; লাইনে আসি। গত সপ্তাহের শেষে জ্বরে পড়েছিলাম। আমার জ্বর আবার একটু অন্য ধাঁচের। পড়লেই ১০২-১০৩ ডিগ্রি। মাথাব্যাথা, সর্দি-কাশি আর মাঝে মাঝে বমি। কিছুক্ষনের জন্য জ্বর নেমে যায়, আবার যেই কে সেই। এভাবেই তিন-চারদিন কেটে গেলে তারপরেই জ্বর বাবাজি কিছুটা পোষ মানেন। এবারো, এর ব্যতিক্রম কিছু হয় নি।
যে সময়টুকুতে জ্বর থাকে না, সে সময় আমি বই-টই পড়ে কাটাই, বিশেষ করে যে সব বই যেগুলো অনেক দিন ধরে চেষ্টা করেও পড়তে পারি নি । যেমন- এবার শেষ করলাম মারিয়ো পুজোর 'গডফাদার'; অবশ্য মূল বই নয়, সেবার অনুবাদটি। ইংরেজী বই হতে রস আস্বাদনের মত কলিজার জোর এখনো অর্জন করতে পারি নি, বিশেষ করে জ্বরের ঘোরে তো নয়ই।
যাই হোক, যে সময়টাতে প্রবল জ্বর থাকে, তখন অন্য রকম একটা ব্যাপার ঘটে। আশ্চর্য্য একটা ঝিম ধরা অনুভূতি। প্রচন্ড তাপে পুরো মাথাটাই যেন হালকা হয়ে যায়। সে সময় ক্ষিধে-তৃষ্ণার মত ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে কোন চিন্তাই থাকে না। খুব উপরের লেভেলের চিন্তা ভাবনা মাথায় খেলা করতে থাকে। যেমন- এবার ছিল মৃত্যুচিন্তা। তিন দিন ধরে ঘুরেফিরে মাথার ভেতরে শুধু একই ব্যাপার। এমন নয় যে, প্রবল অসুখে কিংবা অধূনা জনপ্রিয় টার্ম 'সোয়াইন ফ্লু'য়ের আশংকায় দূর্বল হয়ে মৃত্যুভয়ে এসব চিন্তা; বরং কেমন যেন একটা আধ্যাত্মিক ব্যাপার। ছোটবেলায় আমি বেশ ক'বার মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। সে সব স্মৃতিই বারেবার মনে আসছিল।
দুটোর কথা বলি।
এক.
তখন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ছোট চাচার বিয়েতে সবাই মিলে বাড়ী গিয়েছি। চাচা-ফুফুদের ঐ জেনারেশনের শেষ প্রতিনিধিটির বিয়ে, সে হিসেবে গোটা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। আনুপাতিক হারে আমার বয়সী বাচ্চা-কাচ্চা তো এক দঙ্গল। ততদিনে দুষ্টুমি-চঞ্চলতায় আমি বেশ নাম কামিয়ে ফেলেছি। গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ছি; অসমবয়সী কাজিনদের সাথে মারামারি বাঁধিয়ে দিচ্ছি। সে কারনে এত লোকজনের ভীড়েও আম্মু সব সময়ই আমায় চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু, কীভাবে যেন ঠিক হাতছাড়া হয়ে আমি সবার আড়ালে পুকুরের পাড়ে একাই লাফালাফি শুরু করলাম আর ফলাফল সোজা পানিতে। সাঁতার জানি না তখনো। পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। এদিকে ভয়ে চিৎকার ও করতে পারছি না। হাত-পা ছুঁড়তেও ভুলে গেছি। প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি সে সময় কিভাবে যেন এক ফুফাত বোনের চোখে পড়ে গেলাম আর সাথে সাথে উদ্ধার। সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। এর দু'বছর পরেই আমার আরেক ফুফাত বোন পুকুরে ডুবে মারা যায়। ও কিন্তু ভাল সাঁতার জানত! একেই কী নিয়তি বলে?
দুই.
এ ঘটনার মাস দশেক পর। আমরা এখন যে কলোনীতে থাকি সেখানে মাত্র আগের দিনই এসেছি। কলোনী মানেই তো বিশাল মাঠ আর সমবয়সী এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। কিন্তু, প্রথম দিন বলে আম্মু নামতে দিচ্ছেন না। সর্বোচ্চ দোতলার ল্যান্ডিঙে বসে বাচ্চা-কাচ্চাদের লাফালাফি দেখার অনুমতি পাওয়া গেল। ওখানে ল্যান্ডিঙের পাশেই ছিল একটা ল্যাম্পপোষ্ট আর কী একটা ঝুঁকে দেখতে গিয়ে আমি সেই ল্যাম্পপোষ্টটা ধরেই একটু ভর দিতে গেলাম। ঐ ল্যাম্পপোষ্টটা দু’দিন ধরে যে সর্ট সার্কিট হয়ে আছে কেউ জানত না। আমার তো জানার প্রশ্নই ওঠে না। মূহুর্তেই ২২০ ভোল্টের কারেন্ট শরীরে এমন এক কম্পনের সৃষ্টি করল যার তুলনা দেয়া সম্ভব নয়। দুই কি তিন সেকেন্ড- আমি প্রায় নির্জীব হয়ে গেছি এমন সময় আমাদের সে সময়ের কাজের ছেলেটা কিছু না বুঝেই আমাকে একটা ধাক্কা দিল আর সে ধাক্কাতেই বোধ হয় বেঁচে গেলাম! তবে ঐ দূর্ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন রূপে আমার ডানহাতের তালুতে একটা দৃষ্টিনন্দন পোড়া দাগ আমি বহন করে চলেছি গত বিশ বছর। আর আমাদের ঐ কাজের ছেলেটি (পরবর্তীতে যার নিজের সংসার হয়েছিল এবং আরো পরে মস্তিষ্কবিকৃতি দেখা দিয়েছিল), বছরদুয়েক আগে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। কেউ বাঁচাতে আসে নি।
পরবর্তী জীবনে ছাত্র রাজনীতির সময়ও এমন একটা-দু'টো অভিজ্ঞতা আছে; ও না জানালেই ভাল হবে।
এর মাঝেই শুক্রবার রাতে দশ মিনিটের জন্য ব্লগে এলাম আর নাহিদার কথাটা শুনে আরো বিমর্ষতায় আক্রান্ত হলাম। এত মানুষের ভালবাসা, নিঃস্বার্থ পরিশ্রম আর সাহায্য- কোন কিছুই মেয়েটার অমোঘ নিয়তিকে আটকে দিতে পারল না! সেদিন রাতেই যখন প্রচন্ড জ্বর আর মাথাব্যাথায় অস্থির হয়ে আম্মুকে ডাকছিলাম, (নিজেকে ভাল মানের আস্তিক দাবী করা সত্ত্বেও ব্যাথা-বেদনায় আমি কেন যেন মুখ ফুটে সবার আগে মা'কেই ডাকি!) তখনি হঠাৎ, এসব ছাপিয়ে আমার মনে হল, ভারতের অত্যাধুনিক ডাক্তারী যন্ত্রপাতির আবরনে শুয়ে থেকে ঐ দূর্ভাগা মেয়েটা শেষসময়ে তার আপনজনের স্পর্শ পেয়েছিল কি? মৃত্যু যখন সবদিক আঁধার করে মেয়েটিকে ঘিরে ধরেছিল, তখন কি সে অন্তত মা'কে সাথে পায় নি? জানি না আর কোনদিন জানতে পারব কীনা তাও জানি না! তবে, সেই মূহুর্তে আমার মাথাব্যাথা কমে গিয়ে এক অব্যক্ত হাহাকারে বুকটা শূণ্য হয়ে উঠেছিল।
বহুদিন ধরে পুষে রাখা, মৃত্যু নিয়ে নিজের একটা ফ্যান্টাসীর কথা বলে শেষ করি।
মৃত্যুযন্ত্রনায় নীল হয়ে আসা আমার শিথিল হয়ে আসা মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে কোন এক মায়াময়ী (যার নাম-চেহারা কিছুই আমার কাছে স্পষ্ট নয়)। শেষ মূহুর্তে যখন সে কাঁদতে শুরু করবে তখনি ঝুম বৃষ্টির ছাঁট এসে আমাদের দু'জনকেই ভিজিয়ে দেবে। কান্নামাখা বৃষ্টি অথবা বৃষ্টিমাখা কান্নায় ভিজে ভিজে আমি পাড়ি দেব অকূল দরিয়া! এর ক'বছর পরেই এনরিক ইগ্লেসিয়াসের (Enrique Iglesias) একটি গানে এরকমই একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। স্বপ্ন দেখার উপর কপিরাইট আইন থাকলে ঠিকই মামলা করে দিতাম!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

