মাত্র বছরখানেক আগের কথা। চরম ঘুমকাতুরে এই আমার তখনো মাঝে মাঝে ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতো
গত ১৯শে ডিসেম্বরের ‘স্বঘোষিত’ ব্লগ দিবসের অনুষ্ঠান হতে জানা গেল প্রায় ৩৮,০০০ নিক নিয়ে সামহ্যোয়ারইনব্লগ এখন অন্য সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে অবস্থান করছে। ইদানিং যে হারে ‘আমি সেইফ হলাম’ টাইপ পোষ্ট আসছে প্রথম পাতায়, তাতে এ সংখ্যা এতদিনে ৫০,০০০ এর কাছাকাছি গিয়েছে নিশ্চয়ই। এটি নিঃসন্দেহে ব্লগের লেখক ও ডেভেলপার সবার মিলিত প্রয়াসের ফলাফল। অভিনন্দন!
আমরা যারা ছা-পোষা মানুষ, যাদের অনেক কিছু বলার আছে, দেশ নিয়ে, সমাজ-সভ্যতা নিয়ে একটু-আধটু ভাবি, কিন্তু অন্যকে সে কথা শোনানোর কিংবা ভাবনাগুলোকে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেবার সামর্থ নেই- তাদের জন্য ব্লগ এবং ব্লগিং এক অনন্য সাধারণ মুক্তির বার্তা। আমরা আজ নিজেদের কথা বলতে পারি সহজেই। অর্থ লোলুপতার ফাঁদে 'এথিক্স' নামের আরাধ্য শব্দটিকে বিসর্জন দিয়ে আমাদের মিডিয়া যেভাবে আমাদের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রভাব বিস্তার করছিল, ব্লগিং আমাদের সেখান হতে বের করে এনেছে।
কিন্তু, এত সবের পরেও কিছু কথা থেকেই যায়। অন্য ব্লগগুলো এখনো জনপ্রিয়তায় সামহ্যোয়ারইনের ধারেকাছে আসতে পারেনি বলে তাদের কথা তুলছি না। বলছি, সামহ্যোয়ারইনকে নিয়েই।
৪ বছরের কিছু বেশী এই ব্লগের বয়স। একজন ব্লগার তার কথা পোষ্ট আকারে তুলে ধরবেন আর সহব্লগারেরা সেই পোষ্টের উপর মন্তব্য করবেন, ভাল লাগা-মন্দ লাগা জানাবেন- একটা মনোমুগ্ধকর আলোচনার ভিত্তিতে সুন্দর নির্যাস বেরিয়ে আসবে এবং সর্বোপরি ব্লগিঙের মাধ্যমে ভার্চুয়াল সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে- এই মূলনীতির উপরেই (যদি আমার বুঝতে ভুল না হয়) ব্লগ দাঁড়িয়ে আছে এতদিন ধরে। কতটা পেরেছি আমরা? একই ভাষাভাষী এক অনুন্নত জাতির বৃহদাংশের তুলনায় সামান্য বেশী সুবিধাভোগী অংশের একজন সদস্য হিসেবে আমরা সুবিধাটুকুর কতটা সদ্ব্যবহার করতে পেরেছি?
সন্দেহ নেই, অনেক ভাল কিছু উপহার দিয়েছি। অসুস্থ-অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়েছি প্রবল আবেগে। দারুন কিছু লেখক তৈরী হয়েছে। কিন্তু, দিনশেষে ব্যক্তিআক্রমন, গালিগালাজ, অনর্থক সমালোচনা ইত্যাকার বিষয় গুলো আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেয় নি। ব্লগের জন্মলগ্ন থেকেই যুদ্ধাপরাধী, জাফর ইকবাল, নাস্তিকতা, লুল, রেসিডেন্ট ইত্যাদি প্রসঙ্গে আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থ আলোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছি। এসব নিয়ে ক্যাঁচাল পোষ্টে (ক্ষেত্রবিশেষে) নিজের মতের বিপরীত মতাদর্শ ব্যক্তি মাত্রই বিনা যুক্তিতে আশালীন আক্রমন-প্রতিআক্রমনের শিকার হয়েছেন। এবং কেউ কেউ এসব পোষ্টের বাইরে অন্য পোষ্টে যেতে অনীহাও বোধ করেন। এমন কেন হবে!
এরপরে, আসি ডেভেলপারদের ব্যাপারে। এই যে, হাজার হাজার ব্লগারের বিনিদ্র রজনীর পোষ্ট ও মন্তব্য মিলে দিনের পর দিন এই ব্লগকে জমজমাট করে রাখল, তার প্রতিদান হিসেবে তাঁরা কতটুকু পেলেন? বিগত দুই বছরে এই সাইটের লক্ষ্যনীয় কতটা পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে? নতুন ক’টা টেম্পলেট যুক্ত হয়েছে?
আর মডারেটদের কথা যত কমে বলতে পারা যায়, ততই ভাল। ছোট বেলায় টিভিতে একটা পত্রিকার অ্যাড দেখতাম যেখানে একটা স্লোগান ছিল মোটামুটি এইরকম, “আমাদের হাত বাঁধা নেই, আমাদের চোখ খোলা, আমরা বলতে পারি।” এখানে এসে এর উল্টোটাই মনে হয়। আমরা বলতে পারিনা! যতদুর মনে পড়ে, একরকম ব্লগারদের জোরালো দাবীর ভিত্তিতেই এখানে মডারেশন চালু হয়, যার অসহায় বলি হন শেষমেষ নিরীহ ব্লগাররাই। ব্লগ জুড়ে মাঝেমাঝে সৃষ্ট অস্থিরতাকে সামাল দিতে যে মডারেশনের জন্ম, এখন সেটিই ব্লগে এযাবতকালের সবচেয়ে বেশী অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। সবকিছুর সমাধান হিসেবে “ব্যান ও ডিলিট” পদ্ধতির উদ্ভাবন এই ব্লগকে কতগুলো ভাল লেখক ও লেখা হতে বঞ্চিত করেছে, একজন পুরাতন ব্লগার মাত্রই জানেন।
কেউ কেউ বলেন, আজকাল আগের মত ভাল লেখা পাই না। আমি বলি, পাবেন কোত্থেকে? ভাল লেখকদের তো আমরাই কাজিয়া-ক্যাঁচাল করে সসম্মানে বিদায় করে দিয়েছি। গত কয়েকদিনের কথা ভাবুন। ক’টা লেখা পেয়েছেন প্রিয়তে নেবার মত? শ’খানেক ব্লগার থাকেন অনলাইনে। অথচ, ঘন্টায় একশটি মন্তব্যও পড়ে বলে মনে হয় না।
যাই হোক, মডারেশনের কথায় ফিরে আসি। অবস্থা এমন হয়েছে, দোষী-নির্দোষ একই কাঁচিতে কাটা পড়েছেন। ধানী জমির আগাছা বাছতে গিয়ে ধান গাছগুলোকে ও কেটে ফেলেছেন তাঁরা। এ অন্যায় নিয়ে যৌক্তিক কোন পোষ্ট দিলেও সেটাও ব্যান সহ বাতিল হয়ে গিয়েছে। এখন, ব্লগারদের মডারেশন নীতিমালার দোহাই দেয়া আর ‘বাঙালীকে হাইকোর্ট দেখানো’ এখন সমধর্মী ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
যাই হোক, বাঙালীর বড় গুন অন্যের খুটিনাটি ব্যাপারেও সমালোচনা করা আর বড় দোষ নিজের সমালোচনা না করা এবং সমালোচনাকারীকে সহ্য করতে না পারা। আমি এই বিশাল সমালোচনার অবতারনা করার সময় নিজেকেও এর ভেতরে শামিল করেছি। (বিগত আড়াই বছরের সম্পর্কের খাতিরে নিজেকে এ ব্লগের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করতেই পারি)। কতটুকু বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় দিতে পেরেছি, সে বিবেচনার ভার সহব্লগারদের হাতে। কেউ ব্যক্তিগতভাবে আঘাত পেয়ে থাকলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
শেষ করছি, আরেকটা আশংকা দিয়ে। যে হারে নতুন নতুন ব্লগার আসছেন, সে হারে পোষ্টগুলোর মন্তব্য কিন্তু, বাড়ছে না। কারো কারো অবস্থা দেখে মনে হয়, তিনি ব্লগে নিজের লেখা অন্যকে পড়াতে এসেছেন, অন্যের লেখা পড়তে নয়! আবার কিছু কিছু নিক সক্রিয় হয়েছে, যাদের কোন পোষ্ট নেই, আছে কেবল নির্দিষ্ট ঘরানার কিছু পোষ্টে আজেবাজে মন্তব্য –যেন কোন বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই এখানে আসা (কিছুটা পলিটিক্যাল ভাষ্য হয়ে গেল- দুঃখিত)। মডারেটররা কি এসব ব্যাপারে সবসময়ের মতই উদাসীন থেকে যাবেন?
মাস দুয়েক আগে ব্লগার ব্যান সংক্রান্ত জটিলতায় সৃষ্ট অস্থিরতাকালে আমি একটা শেষাত্মক পোষ্ট দিয়েছিলাম। দুই ঘন্টার মধ্যেই সেটা ডিলিট হয়ে যায় আর সেইসাথে আসে ব্যান করে দেবার হুমকি! সেটা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। দুঃখ হল এই যে, সেই পোষ্টের শেষদিকে তাঁদের কাছে আমার একটা বিনীত জিজ্ঞাস্য ছিল অনেকটা এই রকম,
“ব্যানকৃত ব্লগারের প্রায় সবাই আমার পোষ্টের নিয়মিত কমেন্টার। তাদের অবর্তমানে এখন কে আমার পোষ্টে কমেণ্ট করবে? বাকিদের কথা জানি না। আমি ব্লগে লিখি অন্যেদের কমেন্ট পাওয়ার জন্য।”
নিতান্তই, মজা করে বলা এ কথাগুলো এখন বড় সত্য মনে হচ্ছে। আমরা আবার কবে থেকে ভাল পোষ্ট আর মন্তব্যে ভরপুর প্রানবন্ত একটা ব্লগ পাবো যেখানে অসুস্থ মারামারি থাকবে না!
সবশেষে, কেউ বলতে পারেন, ব্লগিং ব্যাপারটাকে এত সিরিয়াসলি নেবার কিছু নেই। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই, সত্য কথা। অনেককে আমি নিজেই উপযাচক হয়ে এ উপদেশ দিয়েছই। কিন্তু, আমি যখন সামনের দিকে তাকাই, দিব্যদৃষ্টিতে যেন দেখতে পাই (পীর-ফকির কেউ নই আমি), পূঁজিবাদ, সম্রাজ্যবাদ আর ক্ষমতালিপ্সার লেজুড়বৃত্তি করে করে আমাদের মিডিয়াগুলো পংকিলতার সর্বনিন্মস্তরে চলে গেলে, সাধারণ বঞ্চিত মানুষগুলোর কথা বলার জন্য, শোনার জন্য ব্লগিং ছাড়া আর সব দুয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। এখন হতেই যদি একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরীতে আমরা ব্যর্থ হই, পরবর্তী প্রজন্মের যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
মডারেটরদের সুদৃষ্টিতে পড়লে এ পোষ্টের ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না...........সে পর্যন্ত বিদায়।
আমার কথাগুলোকে টেকনিক্যাল দিক হতে বিশ্লেষন করে লিখেছেন কূঁড়ের বাদশা। সামুর ভবিষ্যৎ কি ? (সামুর ডেভেলপারদের প্রতি) না, না! ভুল বললাম! তাঁর কথাগুলোই আমার মত করে লিখেছে আমি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

