এই যেমন বইমেলার কথাই ধরুন না! মহান ভাষার মাসের এক অনন্য সংযোজন এ মেলা; বাংলাভাষাভাষী সংস্কৃতিমনা মানুষের প্রানের মেলা। অথচ, ঢাকা ছাড়া আর ক’টা শহরেই আয়োজিত হয়? যাও হয়, তাও প্রায় অনুল্লেখযোগ্য।
যাই হোক, প্রতি বছরই চেষ্টা করি অন্ততঃ একবারের জন্য হলেও বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনের এই প্রানের মেলা ঘুরে আসতে। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে অফিস ও অন্যান্য ব্যস্ততা থাকেই। তার ভেতর দিয়েও কেমন কেমন করে যেন ব্যবস্থা একটা হয়েই যায়। গতবছর তো এক্কেবারে মেলার শেষ দিন সন্ধ্যায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম!
কিন্তু, এবার বিধি বাম। কোনভাবেই ঢাকা যাওয়া হলো না। এদিক-ওদিক করে মনে করেছিলাম, এবারেও শেষ দু’দিনের ট্যুর মেরে দেব। এমনসময়, এক কলিগের বিয়ের অনুষ্ঠান পড়ে গেল! দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়ে আমার ফাঁকি দেবার সুযোগ শেষ করে দিলেন। এমন একটা ব্যাপার যে, তাঁকে তো আর বলা যায় না, “ভাই, বিয়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহে করেন, মাত্র এক সপ্তাহেরই তো ব্যাপার!” অতএব, মনে দুঃখ মনেই চেপে রাখতে হলো।
শেষে, গত পরশু বহুদিন পরে চিটাগাঙের বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারলাম। এখানে, বলে রাখা ভাল সারা বছরই বই কেনা হয় বলে বইমেলার জন্য কোন বিশেষ বাজেট থাকে না। অনেকের সাথে দেখা হয়, আড্ডা হয়, সাথে কিছু কম পরিচিত প্রকাশনীর ভাল কিছু বই পাওয়া যায়(বইমেলার পরে যেগুলো উধাও হয়ে যায়)-এ কারনেই বইমেলায় যাওয়া। কিন্তু, গত নভেম্বরে অনেক কষ্টে ধার-কর্জ করে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা অপব্য্যে একটি ল্যাপ্পী কিনে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। ভয়ে বইয়ের দোকান মাড়াই না এ ক’মাস। সেইসাথে বইমেলায় গিয়ে তো কিছু কিনবোই এই স্বান্তনা নিয়ে বছর শেষ করেছি। হায়! মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক।
বাদ দিই সব প্যাঁচাল। বই কেনার গল্প বলে দুঃখ ভুলি। প্রথমে গেলাম ‘কারেন্ট বুক হাউস’। চিটাগাঙের অত্যন্ত পুরানো আর ঐতিহ্যবাহী এ দোকানের সংগ্রহ খুব ভাল।বিশেষ করে, লিটল ম্যাগ থেকে রাজ্যের ম্যাগাজিন-সাময়িকীর সমারোহ, সাথে অন্যান্য বই তো আছেই। তবে, দাম একটু বেশী। এখান থেকে, কিনলাম বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত “নারী প্রশ্ন প্রসঙ্গে”। বইটা মূলতঃ ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকার ১৯৯৭ সালের নারী সংখ্যাটি, যা বই আকারে এখন বাজারে এনেছে শ্রাবন প্রকাশনী। এঙ্গেলসের family, সিম দ্য ব্যুভুয়ার The Second Sex থেকে শুরু করে বদরুদ্দীন উমরের নিজের আর আনু মুহাম্মদের সহ মোট এগারটি ভিন্ন ভিন্ন প্রবন্ধের সমন্বয়ে দারুন একটি সংগ্রহ। দাম নিয়েছে ১১৫ টাকা। ওখানেই ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’-এর এক পরিচিত সেলস্ম্যানের সাথে সাথে দেখা হলো। পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে তাঁদের প্রকাশনীর নতুন আসা বইয়ের খবর দিয়ে যেতে বললেন। যাব, কথা দিয়ে বের হয়ে এলাম।
চলে গেলাম, নূপুর মার্কেটস্থ পুরানো বইয়ের দোকানগুলোতে। আমি আজ দশ বছরের উপরে এই সব দোকানের নিয়মিত ক্রেতা। তবে, ‘অমর বই ঘর’-এ এখন পারতপক্ষে যাই না। মালিক বদলেছে বোধ করি। বইয়ের প্রতি তাদের যে ভালবাসা টের পেতাম আগে, এখন সেটা পাই না। যাই হোক, অন্য একটা দোকান থেকে দু’টো বই কিনলাম।
ড. শুভাগত চৌধুরীর ‘ক্যান্সার’ আর আহসান হাবীবের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। ’৮৫-’৮৬ তে ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা সিরিজের অধীনে বাংলা একাডেমী থেকে অনেকগুলো ছোট ছোট কিন্তু খুবই কাজের কতগুলো বই বের করা হয়েছিল, যার কয়েকটি ইতিমধ্যেই আমার শেল্ফের শোভাবর্ধন করছে। ‘ক্যান্সার’ বইটাও ঐ সিরিজের। দেখে ভালই মনে হলো। বররমানে কবিতা তেমন একটা পড়া না হলেও এককালে কম পড়ি নি। এরমাঝেও কীভাবে যেন, আহসান হাবীব বাদ পরে গিয়েছিলেন! তাই, চোখের সামনে পেয়ে কিনে ফেললাম অনন্যা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ঐ বইটি। এ দু’টো কিনতে খরচ হলো মাত্র ১০০ টাকা।
আহসান হাবীব : কবির প্রতিকৃতি
ওখান থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেলাম, ‘প্রমা’ তে। সুবিখ্যাত দোস্ত বিল্ডিঙের নীচ তলার এই দোকানটিতে গেলেই মন ভাল হয়ে যায়। লেখকের নাম ধরে আলাদা আলাদা করে বই সাজানো থাকে। সংগ্রহও ভাল। তার উপর, দোকানের মালিক প্রাক্তন কলেজ শিক্ষক, বইপত্রের প্রতি তাঁর আলাদা টান কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক দিন পরে গিয়েছি। এটাওটা বলতে বলতে কখন যে, চার-চারটা বই হাতে নিয়ে ফেলেছি টেরও পাই নি! প্রথমেই আহমদ ছফার বিখ্যাত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। শিরোনামের প্রবন্ধটি প্রকাশের পর থেকেই প্রচন্ডভাবে আলোচিত-সমালোচিত। এছাড়া এখানে আরো এগারটি প্রবন্ধ রয়েছে দেখলাম। বইটার রিভিউ পাবেন এখানে। এরপরে একই লেখকের ‘যদ্যপি আমার গুরু’। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক (১৯১৪-১৯৯৯) ছিলেন অসাধারন জ্ঞানী একজন মানুষ। জীবনে এত এত পড়েছেন; অথচ, তেমন কিছুই লিখেন নি। অন্যদিকে, শত শত ছাত্রের মননে ফেলেছেন অমোচনীয় প্রভাব। আহমদ ছফা তাঁদেরই একজন। সুদীর্ঘ দুই দশকের সাহচার্যে গুরুর যাপিত-জীবন, ভাবনা-দর্শন ও অন্যান্য মতামতের চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। মহান দার্শনিক সক্রেটিসের দুরশন যেমন করে শিষ্য প্লেটোর ‘ডায়ালগস্’-এ বিধৃত হয়েছে, উত্তরকালে এই বইটিও তেমনি বিবেচিত হয় কীনা আমার জানা নেই। তবে, এটিও বেশ আলোচিত বই। এক সামহ্যোয়ারইনেই দুইটি রিভিউ পেলাম।
১. যদ্যপি আমার গুরু:বুক রিভিউ.......বর্ণচোরা
২. অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক: যাঁর চিন্তায় বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব ছিল অনিবার্য-ইমন জুবায়ের
প্রথম আলো ব্লগ
বইটির ডাউনলোড লিংক।
তৃতীয় বইটি নাম ‘যে গল্পের শেষ নেই’। ভারতবর্ষের অন্যতম নামকরা মার্কস্বাদী তাত্ত্বিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই বিখ্যাত বইটা কিনি কিনি করেও কেনা হচ্ছিল না অনেক দিন ধরে। পৃথিবীর জন্ম থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির দৃষ্টিকোন থেকে মানুষের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এই বইয়ে বর্ণিত হয়েছে বলে শুনেছি।
সবশেষে, যেটি কিনলাম সেটি হাসান আজিজুল হকের ‘সক্রেটিস্’। মহান দার্শনিক সক্রেটিসের জীবন ও দর্শনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা সিরিজের অধীনে বাংলা একাডেমী থেকে এই বইটিও তখন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে, আমার কেনা বইটি জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত। চারটি বইয়ের দাম পড়লো ৩১৫ টাকা।
ওখান থেকে বের হয়ে প্রবল অর্থ সংকটের এই নিদারুন সময়ে আর অপচয় না করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। ফলাফল, কথা দিয়েও আন্দরকিল্লা ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’-এ যাওয়া হলো না। চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে ‘বাতিঘর’-এ যাব ভেবেছিলাম। সে চিন্তাও বাদ দিয়ে চকবাজার চলে গেলাম, আড্ডাবাজি করতে। ওখানে গেলে শাহেনশাহ্ মার্কেটে মানিক ভাইয়ের ‘অজন্তা লাইব্রেরী’তে একবার যেতেই হয়। জটিল সংগ্রহ এখানে। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে কিনতে হলো, ‘মুখোমুখি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ’। নিরবে-নিভৃতে মিডিয়ার স্পটলাইট থেকে দূরে থেকেও বিগত চার দশকে এদেশে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়া এই আলোকিত মানুষটি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। তাই, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, ব্যক্তিগত জীবনের উপর বিভিন্ন সময়ে গৃহীত সাক্ষাৎকারের এই সংগ্রহটা না কিনে পারলাম না। শুভ কিবরিয়া সম্পাদিত বইটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। দাম দিয়েছি ১১০ টাকা। অবশেষে, সেদিনের মত ক্ষান্ত দিলাম।
স্যারের আরো কয়েকটি সাক্ষাৎকার পাবেন এখানে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কর্তৃক ব্যবচ্ছেদ 'জনপ্রিয় লেখকরা কি অলেখক?'- লীনা দিলরুবা
এবার, মনে খুব ইচ্ছে ছিল, সারাদিন বইমেলা ঘুরে ফিরে একটা জবরদস্ত দিনলিপি লিখব। সে যখন আর হলোই না, তখন নিজের শহরের বইয়ের দোকানগুলো জনগনকে চিনিয়ে দিলাম। দুধের স্বাদ ঘোলে কতটুকু মিটলো জানি না; তবে, আরো একটা দুঃখ রয়ে গেল। বই না পড়তে পারার দুঃখ।
একসময়, মানুষের কাছ থেকে ধার এনেও কুলোতে পারতাম না; পড়ার চাহিদা মিটতো না! এখন, হাতের কাছে বই পড়ে থাকে, পড়তে পারি না। ২০০৭ সালের বই মেলা থেকে কেনা শহীদুল্লাহ কায়সারের বিখ্যাত ‘সংসপ্তক’ আজো পড়ে উঠতে পারি নি। গত বছরের বই মেলা থেকে কেনা রাহুল সংকৃত্যায়নের ‘ভোল্গা থেকে গঙ্গা’ পড়ে ফেলেছি অথচ, একইসাথে কেনা শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’-এর একটা অধ্যায়ও পুরো শেষ করতে পারি নি। সারা বছর ধরে কেনা আরো অর্ধশত বই তো শেলফে পড়ে পড়ে পঁচছেই। আজকাল মাঝে মাঝে বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’ গল্পটা মনে পড়ে যায়। তবে, আশার কথা সদ্য কেনা ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গতকাল একটানেই পড়ে ফেলেছি। সবশেষে, প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কিনে কেউ দেউলে হয় না’, একথার সাথে আংশিক যোগ করি। বই কিনে টাকা পয়সার তানাটানিতে পড়াটা বিচিত্র কিছু নয়। তবে, বইটা পড়ার পরে যে আনন্দটুকু হৃদয়ে ধারন করি, বড় বড় সম্রাটের রাজকোষেও সে সম্পদ মেলে না। সুতরাং, বই পড়ুন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০১০ রাত ১২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


