লোকটার সাথে যখন আমার পরিচয় হয়েছিল, তখনো আমি দুধের শিশু। আব্বুর একটা চাবির রিঙে লোকটার একটা স্কেচ দেখেছিলাম, নীচে লেখা Mexico ’86। কতই বা বয়স তখন আমার সাড়ে চার-পাঁচ? নাম জানতাম না, শুধু ছবিটা মাথায় গেঁথে গিয়েছিল।
পরের বছর বাসায় টিভি এল, সাথে করে নিয়ে এলো বিশ্বকাপ ফুটবল। ITALIA ‘90। ক্লাস টু তে পড়ি। সে সময়ে, বাসায় আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় এক ফুফাতো ভাই থাকতেন, কড়া ব্রাজিলিয়ান সমর্থক। আমি তো তখনো খেলার দলাদলি বোঝার বয়সে পৌঁছাই নি। তাই, প্রবল আগ্রহে প্রথম খেলাটা দেখতে বসলাম। আর্জেন্টিনা - ক্যামেরুন। একটুক্ষন যেতেই দেখি-আরে! ঐতো চাবির রিঙের মানুষটা। কী সুন্দর করে সবাইকে কাটাচ্ছে আর বল না পেয়ে সবাই মিলে ওকেই মেরে তুলোধুনো করে দিচ্ছে! খুব কষ্ট পেলাম। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতেই নামটা জানলাম ‘ম্যারাডোনা’। সেদিন ম্যারাডোনার দল হেরে যাওয়ায় আরো কষ্ট পেয়েছিলাম।
রাত জেগে সেবার ঐ খেলাটা আর যুগোস্লাভিয়ার সাথে খেলাটাই লাইভ দেখতে পেরেছিলাম। রাত জাগার অনুমতি প্রতিদিন মিলত না! পরদিন সকাল আটটায় স্কুল ছিল যে! তবে, ব্রাজিলের সাথে খেলাটার জন্য রাত জাগতে হয় নি। খেলাটা সন্ধ্যের পরপরই হয়েছিল বলে মনে পড়ে। বয়সটা তখন এমনই যে, অল্পতেই মানুষকে ভাল লেগে যায়। ফলে, দিনে দিনে ঐ মার খাওয়া লোকটাকে যে ভাল লাগতে শুরু করেছি, টেরটি পাই নি। আর তাই তো, ব্রাজিলের হারের পর ফুফাত ভাইয়ের কালো মুখের তাকিয়ে সে কী গা জ্বালা হাসিটাই না দিয়েছিলাম!
তখন ১ টাকায় একটা ভিউকার্ড পাওয়া যেত। প্রতিদিন স্কুলে যেতে আমাকে দেয়া হোত ৩ টাকা। ২ টাকা গাড়িভাড়া আর ১ টাকা ইন কেইস অভ ইমার্জেন্সী। ঐ সবেধন নীলমনি ১ টাকার সাথে কখনো কখনো গাড়িভাড়া বাঁচিয়ে কতগুলো কার্ড কিনেছিলাম সে সময়! সবই ম্যারাডোনা নয়তো অন্য কোন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের! এর মধ্যে একটা কার্ড আজো চোখে ভাসে। বিপক্ষে দুই খেলোয়াড় তার দুই পাশ থেকে হার্ড ট্যাকল করে ফেলে দিচ্ছে। নীচে লেখা “ওরা আমাকে এত মারে কেন?” ঐ বয়সে নির্যাতিতের প্রতি নায়কসুলভ একটা ভালবাসা কাজ করেই!
সেমিফাইনাল-ফাইনাল দেখেছি পরের দিনে বিকেলে বিটিভির পুনঃপ্রচার! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলা লোকটার সেই মুখটি আজো ভুলতে পারি নি!
পরের বছরই ড্রাগ নিয়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা। খেলাই ছেড়ে হচ্ছে টাইপ অবস্থা। এরমাঝেও কেমন করে ’৯৪ তে ঠিকই আবার আর্জেন্টাইন দলে। ক্লাস সিক্সে উঠে গিয়েছি ততদিনে। খেলা কিছু কিছু বুঝতে শিখেছি। গ্রীস আর নাইজেরিয়ার সাথে খেলা দেখে পাগল হয়ে গেলাম! এরপরই এক সকালে শুনি ‘নিষিদ্ধ’!! ড্রাগ কেলেংকারী!!! বিশ্বাসই হচ্ছিলো না! নির্ঘাত ষড়যন্ত্র! ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জকে কত গালিগালাজই না করেছিলাম! ম্যারাডোনাহীন আর্জেন্টিনা পরের দুই খেলায় গো-হারা হেরে বাদ। সাথে সাথে বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা অধ্যায়ও শেষ!
এরপর একে একে ’৯৮, ’০২, ‘০৬। আর্জেন্টাইন ফুটবল দল অনেক আশা জাগিয়ে বিশ্বকাপে আসে আর মন খারাপ করিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যায়! মনে পড়ে ২০০২ বিশ্বকাপের প্রথম পর্বেই বাদ পড়ার পর সারাটাদিন আমার অন্যরকম মন খারাপ ছিল। সমস্যা হচ্ছে, ‘ডাই হার্ড’ ফ্যান বলতে যেটি বোঝায়, আমি আসলে সেরকম না! জার্সি কিনি না, পতাকা ওড়াই না! অ্যান্টি-আর্জেন্টাইনদের সাথে মাথা ফাটাফাটি করি না। ব্রাজিলের খেলাও মুগ্ধ হয়ে দেখি। এডমন্ড ওরান্তোস দ্য নাসিমান্তো, পেলের খেলা ভালবাসি। ফুটবল খেলা যে এমন করে খেলা যায় তা পেলের আগে কে জানত! তারপরেও, এমন মন খারাপের একটাই কারন! ওটা যে ম্যারাডোনার দল!
দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা- দরিদ্র আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সের নোংরা গলি থেকে যার উত্থান, যার প্রতিভা নিয়ে কারো কোন সংশয় নেই। বস্তির ছেলেদের মতই মাথাটা খুব গরম। প্রথম খেলা বিশ্বকাপে(’৮২) লাত্থালাথি করেই তো লাল কার্ড নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলো! বার্সায় খেলার সময়ও সে অভ্যস যায় নি! দু’বেলা খাবার যোগাড়ে হিমশিম খাওয়া পরিবারের সন্তান বলে খাইখাইটা একটু বেশিই। নেপলসে যখন খেলতে গেল, তখন বোধহয় নাপোলির এমন কোন শুঁড়িখানা ছিল না, যেখানে তার পদধূলি পড়ে নি! নিন্দুকেরা বলে, তার পক্ষে সম্ভব হলে নাপোলীর একটা মেয়েও ভার্জিন থাকত না! মাত্রাতিরিক্ত কোকেন সেবন তার জীবনীশক্তি, খেলোয়াড়ী প্রতিভা- দু’টোরই বারোটা বাজিয়েছে।
এ সব জানলে ম্যারাডোনাকে ভাল লাগার কোন কারন নেই। এ দেশে জন্মালে একটা ‘হেরোইঞ্চি’ ছাড়া আর কীবা বলা যেত তাকে?
তারপরেও এত ভাল লাগে কেন লোকটাকে? কারন একটাই। আবেগ আর ভালবাসার মিশেলে এমন আপার্থিব খেলা খেলে যে মানুষটা, তাকে ভাল না বেসে উপায় নেই। ও তো পাড়ার সেই বখে যাওয়া ছেলেটা, এটা-সেটা করে যার অনেক দূর্নাম; অথচ নিজের মানুষের জন্য জান হাজির!
ব্রিটেনের কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের হার, চরম অর্থনৈতিক দুরাবস্থা- সবকিছু মিলিয়ে নিরাশ গোটা একটি জাতিকে এমন করে জাগাতে কয়জন পেরেছেন! প্রথমেই জোচ্চুরি করে হ্যান্ড অভ গডের সেই কুখ্যাত(!) গোল। ফকল্যান্ডের অন্যায়ের প্রতিশোধ এমন করে তুলতে পেরেছিল বলেই তো আজো ইংল্যান্ডবাসী ঐ বেদনায় কাতর। কিন্তু, নিজের জাত চেনাতে তার মিনিট তিনেকের বেশী লাগে নি! ঈশ্বর নিজের হাত দিয়ে গোলটি করার তিন মিনিটের মাথায়ই যেন, লোকটার দু’পায়ে এসে ভর করলেন! শতাব্দীর সেরা গোলটা হতে দেরী হলো না! ’৮৬ এর বিশ্বকাপ ছাড়া আর কোন বিশ্বকাপের সবকিছুই কেবল একজনের কৃতিত্বের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছে!!
সত্যি কি তার ভেতরে ঈশ্বর ভর করেছিলেন সে সময়? হতেই পারে! নয়তো, নাপোলীর মত দল কেমন করে স্কুডেটো জিতে নেয়? এরপর, আবার ’৯০ তে। মাঝারী মানের আর্জেন্টিনা দলটি কেমন করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে গেল ফাইনালে! ইতিহাস গড়ার পূর্ব মূহুর্তেই, তা হাতছাড়া হবার বেদনায় সেবার শুধু ম্যারাডোনাই পুড়ে নি, বিশ্বের শতকোটি মানুষও পুড়েছে! ঐ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার দৃশ্য আরো কতজনকে হাউমাউ করে কাঁদিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
’৯৪ এ তার ডোপ পাপের জন্য কোন ধরনের সাফাই আসলে বিশ্বাসযোগ্যই নয়। কিন্তু, তারপরেও, কেন যেন আজো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে, ওখানে ষড়যন্ত্র ছিল! ঐ একটাই কারন, ভালবাসা!
’৯০ এর বিশ্বকাপের পরে শুনেছিলাম যে, বাংলাদেশ নামের কোন দেশের সাথেই পরিচিত নয় এই ভদ্রলোক। এছাড়া দিনে দিনে তার আরো অনেক কূকীর্তির কথা একে একে জানা গেল।
এত কিছুর পরেও একটি ব্যাপারে ম্যারাডোনা অতুলনীয়। চরম আবেগী লোকটা নিজের আবেগ চেপে রাখে না। মুখের উপর বলে দিতে অভ্যস্ত। জর্জ বুশকে খুনী বলতে বাঁধে না তার! যুবরাজ চার্লসের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের বিরল সুযোগ পা ঠেলে দেয়! ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে অসমবয়সী বন্ধুত্ব তাকে যেন আরো সাহসী করেছে। চিরিদিনের বেহিসেবী-বিলাসী লোকের মুখে মেহনতী মানুষের মুক্তির স্লোগান হয়তো ততটা ভাল লাগে না! কিন্তু, ম্যারাডোনার জন্য যেন সে অপরাধও মাফ! তার ডান বাহুতে তাই শোভা পান চে গুয়েভারা আর জাদুকরি বাঁ পায়ে ফিদেল! ইভো মোরালেস আর হুগো শ্যাভেজ তার কাছের মানুষ।
কোন কোন মানুষের জন্মই হয় বোধহয় মানুষের ভালবাসা পাবার জন্য। বিদায়বেলায় এক স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষকে অঝোরে কাঁদিয়ে যখন কেউ বলে, “যখন কেউ ভুল করে, তার মূল্য ফুটবল চুকাবে কেন? আমি ভুল করেছিলাম আর তার মুল্য চুকিয়েছি। কিন্তু, বল নোংরা হতে দিই নি!”(If someone makes a mistake, football shouldn't pay for it. I made a mistake and I paid. But the ball doesn't get dirty.), তখন বক্তার দু’চোখে বন্যার ঢল!
’৭০ দশকের বিস্ময় বালক ছোট্ট ম্যারাডোনা তাঁর ফুটবল খেলে মায়ের জন্য বাড়ি কিনতে চেয়েছিল। আর্জেন্টাইন জাতীয় দলের হয়ে খেলে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন ছিল তার। এ সবই পুরন হয়েছিল ছেলেটার। কিন্তু, মাঝপথে এসেই পথ হারালো সে। খ্যাতির চুড়োয় পৌঁছার সাথ সাথে মাদক আর তার দুই দশকের বন্ধুত্বের সূত্রপাতও হল। শেষবার যখন মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি গিয়ে ম্যারাডোনা ফিরে এল তখন থেকেই একটা কেমন যেন পরিবর্তন তার ভেতরে। এতদিন ধরে লাখো মানুষের ভালবাসা, স্ত্রী ক্লডিয়া আর দুই মেয়ে জিওভান্নি এবং ডালমার জন্য টান- সবকিছুকে পায়ে দলে যে মানুষটি মাদকের নেশায় বুঁদ হয়েছিল, সে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এই প্রথম ভালবাসার মূল্য বুঝতে শিখলো! সে এখন পরিবারকে সময় দেয়। অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়!
তাই বলে, ভেতরের আগুন নিভে যায় নি তার। এখনো প্রিয় দল বোকা জুনিয়র্স আর আর্জেন্টিনার খেলায় সুশীল হয়ে বসে থাকে না সে। হাত তালি দিয়ে সমর্থন জানায় না! গ্যালারীতে বসে চিৎকার দেয়, বাধভাঙা উল্লাসে গা খালি করে জার্সি ওড়ায়!
সবশেষে, ম্যারাডোনা এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ’১০ বিশ্বকাপে নিজ দেশের দলটকে পরিচালনার দায়িত্ব যে তার হাতে! শ’খানেকের উপর খেলোয়াড় ব্যবহার করেও ধুঁকতে ধুঁকতে বৈতরনী পার হওয়া, মিডিয়ার সাথে সাপে-নেউলে সম্পর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে দেখা গেল, খামখেয়ালী পাগলাটে ম্যারাডোনার ভেতরটা খুব বেশী বদলায় নি। পারলে আলফ্রেড ডি স্টেফানোকেও নামিয়ে দিত মনে হয়! আবগের আরশ এখনো তার আলগা হয়ে যায়। উরুগুয়েকে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকেট জয়ের পর তাই কোচ তার গুরু বিলার্দোর দিকে ছুটে যায় চিৎকার দিতে দিতে। ‘লো হাইস ইয়ো মিসমো’—‘আমি পেরেছি, পেরেছি’!!
এত কিছু পরেও, দিনে দিনে তার দল এখন অনেক পরিণত। অবশ্য, কে না জানে, বিশ্বকাপ জেতা সহজ কাজ নয়। কেবল ভাল দল, এমনকি সেরা দল হলেই যে বিশ্বকাপ জেতা যায় না তার উজ্জ্বল প্রমান অতীতের হাঙ্গেরী, চেকোশ্লোভাকিয়া, হল্যান্ড। কেমন যেন একটা জাদুকরি স্পর্শ(Magical Touch) ছাড়া এ আরাধ্য কাপের দেখা পাওয়া মুশকিল। ম্যারাডোনা আর তার দল সে স্পর্শের ঝলক দেখাতে পারবে কীনা জানা নেই; শুধু জানা আছে যে, ভালবাসার পরিবর্তন নেই।
ম্যারাডোনার জন্যই আর্জেন্টিনাকে ভালবাসি, সাপোর্ট করি। মৃত্যু পর্যন্ত করে যেতে চাই। তবে, জীবদ্দশায় কোন দিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে গেলে ভিন্ন কথা।
কোম্পানিয়েরো দিয়েগো!!
(Comrade Diego)
ভিভা মারাদোনা!!
(Long Live Maradona)
/*ব্লগে অনেক লেখা এসেছে ম্যারাডোনা আর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। ভাল লাগা তিনটি শেয়ার করলাম।
দুনিয়ার আর্জেন্টিনার সমর্থক, এক হও .....
আর্জেন্টিনা রুপকথার মহানায়কদের দল। পুরোনো স্মৃতি এখনো মনেপড়ে।ভালো থেকো টিম আর্জেন্টিনা, ভালো থেকো ম্যারাডোনা
পৃথিবীতে ফুটবল ভক্ত দুই শ্রেনীর: একদল আর্জেন্টিনার সমর্থক, অন্যদল ফুটবল খেলা বোঝেনা...
এছাড়া, আরেকটি অবশ্য পঠিতব্য লেখা।
বিয়েনভেনিদো কোম্পানিয়েরো দিয়েগো
*/

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

