আসুন রাজাকারদের ব্যাপারে নিয়মিত ষ্টাডী করি।
রাজাকার থেকে যুদ্ধাপরাধী-
বিচারের প্রহর গুণছে সবাই
আল ইহসান ডেস্ক:ডা.আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কাছে এক করুণ সাক্ষাতকারে বলেছেন, ১৫ ডিসেম্বর আমার স্বামী ডা.আলীম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে হত্যা করে ঘাতক রাজাকার বাহিনী। করুণ বর্ণনা দিয়ে তিনি আরো বলেন, একাত্তর সালের দুর্দিনে আমরা মাওলানা মান্নানকে (ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা) আমাদের বাসার নিচতলায় আশ্রয় দিয়েছিলাম। তখন আমরা পুরানা পল্টনে থাকি। বাসার নিচের তলার ক্লিনিক উঠিয়ে মাওলানা মান্নানকে সপরিবারে আশ্রয় দিয়েছিলাম। সাত আট দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া, কাপড়চোপড় সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছিলাম। আর এ মান্নানই কি-না বিশ্বাসঘাতকতা করে আমার স্বামী ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরীকে আল-বাদর ঘাতদের হাতে তুলে দিয়ে হত্যা করিয়েছে। ঘাতকরা যখন আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় আমি তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। মাওলানা মান্নানের পায়ে পড়ে কাঁদতে থাকলে সে বলে যে, আপনি ঘাবড়াবেন না। ওরা আমার ছাত্র। ওরাই নিজেদের চোখের চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কাজ শেষ হলে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। এ কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে খুব আশায় ছিলাম আমার স্বামী ফিরে আসবে। কিন' তিনি আর ফিরে আসেননি। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অন্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে আমার স্বামীর লাশ পেয়েছিলাম। সে লাশে খুব অত্যাচারের চিহ্ন ছিল। মনে হয়েছে, সে মৃত্যু নির্মম অত্যাচারের। হাত বেঁধে, চোখ বেঁধে, বেয়নেট দিয়ে সারাশরীর খুঁচিয়ে অসংখ্য গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে মাওলানা আব্দুল মান্নানের গণহত্যা ও নির্যাতনের আরেক প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমিনুল হক মাস্টার।
পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন এবং মিজানুর রহমান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত মাওলানা সাঈদী পিরোজপুরের পাড়েরহাট বন্দরে ফুটপাতে তাবিজ বিক্রি করত। অধ্যাপক জাফর ইকবাল এবং লেখক হুমায়ুন আহমেদের পিতা পিরোজপুরের পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে(!) দেইল্যা রাজাকার সাঈদীর নেতৃত্বে হত্যা করা হয়। পিরোজপুরের শহীদ আব্দুল মজিদের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম জানিয়েছেন তার স্বামীকে নিজের চোখের সামনে নির্মমভাবে ঘাতক সাঈদী বাহিনীর হত্যার ঘটনা।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর তন্ময়। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, আমার বাবা মুনীর চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। আমার বাবাকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন না। ২৫ মার্চের পরে তিনি নিজের বাবার বাড়ি হাতিরপুলে সেন্ট্রাল রোডে ছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর দুপুর বেলায় তাকে খাবার বৈঠক থেকে ঘাতক রাজাকারের দল ডেকে নিয়ে যায়। সবচেয়ে দুঃখজনক, যারা বাবাকে নিয়ে যেতে এসেছিল সবাই নিজেদের বাবার ছাত্র বলে পরিচয় দিয়েছিল। ছাত্র পরিচয় পাওয়ার পর ভাত খাওয়া ছেড়ে বাবা সরল মনে উঠে যান। এরপর আর বাবা ফিরে আসেননি। এমনকি তার মৃতদেহ আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের পুত্র তৌহিদ রেজা নূর এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, দেশের লাখো পরিবারের মতো আমারও দাবি, যারা আমার মতো অসংখ্য সন্তানের পিতাদের হত্যা করেছে তাদের বিচার চাই। আমরা তাদের ক্ষমা করিনি।
দেশবাসী শীর্ষ পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। বর্তমান সরকারের এটি নির্বাচনী অঙ্গীকার। দেশ-বিদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের এত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, নির্যাতিত, ধর্ষিত, নিহতদের স্বজনদের কাছে এখনা অনেক তথ্য-প্রমাণ রয়েছে যাতে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ করাটা খুব কঠিন কাজ হবে না। তাই যুদ্ধাপরাধীরা সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে বলে দেশবাসীর মধ্যে আশাবাদ সঞ্চারিত হয়েছে। দেশের একটি চিহ্নিত মহল বাদে সকলের দাবি, অন্তত শীর্ষ পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। এতে বাংলাদেশ সমৃদ্ধভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের রাস্তাও বন্ধ হবে। দেশের সি'তিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থেই শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবে। এতে এ দেশে আর কোনদিন কেউ রাজাকারের পথে পা বাড়াবে না। শীর্ষ পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে আমাদের এটিই নিশ্চিত হবে।
একাত্তরের শীর্ষ পর্যায়ের ঘাতকরা এবার বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। দেশের সার্বিক পরিসি'তি সি'তিশীল রাখা এবং অনাকাঙ্খিত পরিসি'তি এড়িয়ে চলতেই কম্বোডিয়ার মতো শীর্ষ পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের সম্মুখীন হচ্ছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব দলীয় ইশতেহারে মহাজোট সরকারের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করেছিল। ফলে স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর দেশে যুদ্ধাপরাধীরা বিচারের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারই স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পর দেশে প্রচলিত সাধারণ আইনে বিচার করে খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে। সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে; যাতে দেশ ঘাতক রাজাকার মুক্ত হবে বলে আশা করা যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

