somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিনা বিচারে আটক ৭ হাজার আসামির কারাবাস। কোথায় মানবাধিকার সংস্থা? কোথায় সরকারের দায়বদ্ধতা?

১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এ খবরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হবে, সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে সবাইকে।
দেশ থেকে বিনা বিচারে কারাবাস, রিমান্ডের নামে পৈশাচিক অত্যাচারসহ সব অনাচার দূর করতে হবে অবিলম্বে। শুধু বিদ্যুতেরই ঝলমলে দ্যুতি আর ঝিকিমিকি! আলোকসজ্জা! কারুকার্যখচিত অবকাঠামোগত উন্নতি! রাস্তার মোড়ে পানির ফোয়ারা! রাজধানীর অবকাঠামোগত শ্রীবৃদ্ধিসহ সবার জন্য নাগরিক সুবিধার গগন বিদারী শ্লোগান!
আর তার বিপরীতে আপাত অর্জনের আত্মতৃপ্তির ঢেকুর! নগরীর একটা অবয়ব থাকবে তা ঠিক! এই অবয়বটা সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে তাও বাঞ্ছিত। কিন্তু নগরীর যে প্রাণ- নাগরিক। তাদের মধ্যে নাগরিক চেতনা, মহানুভবতা, কর্তব্যপরায়ণতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে তাও কী অনিবার্য কাঙ্খিত নয়?
দুঃখজনক হলেও সত্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন নাগরিকেরও হয়েছে। প্রশাসনেরও হয়েছে। কিন্তু তার বিপরীতে যেনো পাল্লা দিয়েই আশঙ্কাজনক হারে কমছে নাগরিক অনুভূতি। সেই সাথে প্রশাসনিক; এমনকি বিচারিক দায়িত্বানুভূতিও! সব মিলিয়ে সবারই মানবিক অনুভূতিও। কারণ, মানবিক অনুভূতি যদি প্রশাসনে, সরকারে অথবা কার্যত সুশীল সমাজে বিন্দুমাত্রও থাকতো, তদপ্রেক্ষিতে এমন খবর হতো না যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ৮ হাজার বন্দির মধ্যে ৭ হাজারই বিনাবিচারে আটক হাজতি আসামি। অথচ সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের তুলনায় হাজতি আসামিদেরই বেশি কষ্টে থাকতে হয়। আর অপরাধ প্রমাণের আগেই হাজতি বন্দিদের কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। মনিহার, মেঘনা, পদ্মা ও সুরমার ওয়ার্ডে অবস্থানকারী হাজতি আসামিদের কষ্ট না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ঘুম, খাবার, গোসল, টয়লেট ব্যবহার থেকে শুরু করে সবকিছুতে পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে হাজার হাজার হাজতি বন্দিদের। হাজতি হিসেবে যারা জীবনে প্রথম কারাগারে প্রবেশ করেন, তারা নানা হয়রানির শিকার হন। বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাদের এই কষ্টের দায় কে নেবে এই প্রশ্ন দীর্ঘকাল ধরে উচ্চারিত হলেও আজো কোনো সরকার তার জবাব দেয়নি। অথচ হাজতিদের প্রায় ৪০ শতাংশই নির্দোষ কিন্তু আইনগত নানা জটিলতার কারণে তাদের কারাগারে অবস্থান করতে হয়।
ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় বা কারও রোষানলে পড়ে যারা কারাগারে যান এবং বিনাবিচারে আটক থাকেন তাদের জীবনের এই দিনগুলোর মূল্য দেবে কে? কারাগারে অনেকের ক্ষেত্রে যা হয়েছে, তাদের কোনো নিকট আত্মীয় বা বন্ধু একটি অপরাধ করেছে। সেই অপরাধ সম্পর্কে কিছু জানা না থাকার পরও শুধু সম্পর্কের কারণে তাদের জেলে আসতে হয়েছে। বিচারেও একদিন হয়তো তারা নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। বিচারের আগেই এ রকম লোককেও কারাগারে কঠিন কষ্টের বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে। রাজধানীর জুরাইনে একটি হত্যা মামলার আসামি শহিদ নামের এক তরুণ। গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতো। একদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পরে সে জানতে পারে হত্যা মামলায় তাকে আটক করা হয়েছে। থানা পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেয়। সেখান থেকে নেয়া হয় ডিবিতে। থানা ও ডিবিতে তার ওপর নির্যাতনের কাহিনী শুনে গা শিউরে উঠছিলো। চোখ বেঁধে ঝুলিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে পুলিশের শিখিয়ে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়। রিমান্ডে শিখিয়ে দেয়া জবানবন্দি অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি দেয়ার পর পাঠানো হয় কারাগারে। এক বছর ধরে আছে। যারা অপরাধটির সঙ্গে জড়িত ছিলো সেই আসামিরা জামিনে বের হয়ে গেছে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও যথাযথ তদবিরের অভাবে তার জামিন হচ্ছে না। কারাজীবনে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। এরকম অনেকে কারাগারে রয়েছেন যারা অপরাধ না করেও বিনাবিচারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। অতিকষ্টে রাত কাটছে ইলিশ ফাইলে, কেচি ফাইলে।
নতুন হাজতি আসামিদের কারাগারে প্রবেশ গেটে আনুষ্ঠানিকতা শেষে নেয়া হয় আমদানি ওয়ার্ডে। গেট থেকেই শুরু হয় নানা হয়রানি। আমদানি ওয়ার্ডে রাত কাটাতে হয় কষ্টের মধ্যে। তুলনামূলক একটু ভালো জায়গায় থাকার জন্য আমদানি ওয়ার্ডেই দফারফা করে নিতে হয়। অন্যথায় কারাগারের নিকৃষ্টতম স্থানে জায়গা হয়। এতে মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন জীবনে প্রথমবার কারাগারে প্রবেশ করা হাজতি আসামিরা। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
রাস্তাঘাট থেকে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারায় কাউকে ধরে নিলে ম্যাজিস্ট্রেট অনেক সময় ২ দিন ৫ দিন বা ১০ দিনের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠান। প্রতিদিনই এ রকম সাজাপ্রাপ্ত কিছু আসামি কারাগারে প্রবেশ করেন। তাদেরও কোনো অপরাধ থাকে না। এসব আসামিকে কারাগারের ভাষায় পাচানি বলা হয়।
বিনাবিচারে বছরের পর বছর কারাগারে আটকে থাকা বন্দির প্রতি অবিচারের শামিল। এই সর্বস্বীকৃত সত্যটি প্রশাসন, বিচারবিভাগসহ সকল বিভাগের নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের জানা থাকা সত্ত্বেও বিচারের নামে এই অবিচার বাধাহীনভাবে বছরের পর বছর চলে আসছে। অতীতে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসকদের আমলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতো। কিন্তু স্বাধীন দেশেও নির্বিবাদে বিচারের নামে অবিচার কিংবা বিচারের নামে প্রহসনের ঘটনা ঘটতে থাকলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
হয়তো এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, এখানে বিচারবিভাগ বা আদালতের দায়িত্ব বা দোষ কোথায়? পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট দফতর তদন্ত রিপোর্ট তথা চার্জশিট আদালতে দাখিল করার পর তো বিচারক বিচার করবেন। এ বক্তব্য নাকচ করার মত নয়। কিন্তু পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট দফতর কেনো চার্জশিট দিতে বিলম্ব করছে এবং কোর্টে কেনো ১০/১৫ বছর ধরে এক একটি ফৌজদারি মামলা বিচার না হয়ে পড়ে থাকছে সেটা দেখার দায়িত্বও কোর্ট তথা বিচারকের আছে কিনা তা বলার ভাষা আমাদের জানা নেই।
প্রায়শ দেখা যায়, বিনা বিচারে আটক বন্দীদের হয়ে কেউ কোর্টে আবেদন করলে মামলাটি কোর্টে উঠে। নতুবা শুধু ১০ বছর বা ২০ বছর নয় বিনা বিচারে কারাগারের মধ্যে থেকে বৃদ্ধ হয়ে মারা গেলেও কিছু করার থাকে না। এমনতর অমানবিক ঘটনার ২/১টা নজির যে আমাদের দেশে নেই এমন নয়। তরুণ বয়সে জেলে ঢুকে বিনা বিচারে আটকে থাকতে থাকতে বৃদ্ধ হয়েছে এমন ঘটনাও অতীতে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিনা বিচারে কাউকে জেলে আটক রাখা জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের বিরোধী। অথচ জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য দেশ-বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিপন্তুী এ ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন পর্যন্ত কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন এমন নিরপরাধী কারাবাসকারীদের সংখ্যাও অনেক। সাধারণত নিরীহ ও নিরক্ষর মানুষই এমন প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, এ ধরনের ভুক্তভোগীরা নিম্ন আদালতের রায়ে শাস্তি পাওয়ার পর আর আপিল করতে পারেন না। এটা মোটামুটি প্রায় সবার বেলায়ই হয়ে থাকে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে- জেলখানা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং ভুক্তভোগীদের আইন ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা। সাধারণত পেনালকোডের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল করতে হলে ৬০ দিনের সময়সীমা মেনে নিতে হয়। ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে ৩০ দিন সময় পাওয়া যায়। কিন্তু কারাগার কর্তৃপক্ষ সেই সময়সীমা মেনে নিয়ে আপিলের সুযোগ দেয় না। ফলে আপিলের সময়সীমা না মানার কারণে আপিল আর কার্যকর হয় না।
কারাগার কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা আছে কি না তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এমন পরিস্থিতি দেখার পর। আর জবাব তারা যেভাবেই দিক না কেনো, নিরপরাধ মানুষ এভাবে জেলের অভ্যন্তরে জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করবেন এটা হতে পারে না। যারা এভাবে কারো জীবন থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে এমন অপরাধ আর কেউ করতে সাহস না পায়। কিছু বেসরকারি সংস্থা আইনি সহায়তা প্রদান করে এমন ভুক্তভোগীদের মুক্ত করে আনার কাজ করছে। কিন্তু তা অপ্রতুল। তাই সরকারের উচিত আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল করা।
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×