প্রতি বছর গড়ে ২০ বর্গকিলোমিটার করে বাড়ছে বাংলাদেশের আয়তন। প্রধানত দেশের দক্ষিণ উপকূলের নদী মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরের বুকে বাড়ছে এ জমি। গত ৫৩ বছরে বৃদ্ধির মোট পরিমাণ প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার। অর্ধশতকের পুরনো ম্যাপ আর বিভিন্ন সময়ে উপগ্রহ থেকে তোলা চিত্র বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এ তথ্য। চলমান ভূ-সৃজনের হিসেবে ৫০ বছরে আরও অন্তত ১ হাজার বর্গকিলোমিটার বাড়তি জমি যোগ হবে বাংলাদেশের ম্যাপে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলকে যখন বলা হচ্ছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৫০ বছরের মধ্যে দেশের ১৭ শতাংশ জমি সাগরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা ঠিক সেই মুহূর্তে আয়তন বৃদ্ধির এ তথ্য নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তোলপাড়। অদূর ভবিষ্যতে দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা আদৌ তলিয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসি) দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ২ যুগ ধরে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে তলিয়ে যাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি। প্রাকৃতিক উদ্বাস্থতে পরিণত হবে প্রায় ২ কোটি মানুষ।’
নাসার গোডার্ড ইন্সটিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক হানসেন আরেকটু এগিয়ে বলেছে, ‘চলতি শতাব্দীতেই সমুদ্রে বিলীন হয়ে যেতে পারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ ৫৫ হাজার ৫৯৮ বর্গমাইলের বাংলাদেশ।’ এরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়া গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি এবং প্রচার-প্রচারণার কারণে ইতিমধ্যে আতংকগ্রস্ত দক্ষিণ উপকূল। তবে এতকিছুর মধ্যে আশা জাগানিয়া তথ্য দিয়েছে ঢাকার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইসি)। ভূমি সৃজনের মাধ্যমে দেশের আয়তন বৃদ্ধির তথ্য দেয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা আদৌ তলিয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে তারা। নতুন এ তথ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে উপকূলীয় এলাকায়। সেই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আরও ব্যাপক ভিত্তিক গবেষণা এবং জনসম্মুখে তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অনেকে। বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণার পর ভূমি সৃজনের এ তথ্য প্রকাশ করেছে সিইজিআইসি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেছেন, হিমালয় থেকে নেমে আসা নদ-নদীগুলোর বয়ে আনা পলির এক-তৃতীয়াংশ মিশছে সাগরের পানিতে। বাকি অংশ বাড়াচ্ছে জমির আয়তন। ৪০’র দশকে নোয়াখালী, হাতিয়া এলাকায় জেগে ওঠা ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিঝুম দ্বীপ থেকে শুরু করে সমপ্রতি সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটার সামনে যে বিশাল ডুবোচর জেগেছে তা এরই প্রমাণ। ১৯৭৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উপগ্রহ থেকে তোলা বাংলাদেশের ছবি এবং এ সময়ে নতুন প্রকাশিত এলাকা ম্যাপ অনুযায়ী ৫০ বছরে দেশের আয়তন বেড়েছে প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার। হিমালয় থেকে আসা নদীগুলো প্রতি বছর বয়ে আনছে গড়ে ১ বিলিয়ন টনেরও বেশি পলি। আর এ পলি জমেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন চর ডুবোচর। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই যা ব্যবহার করতে পারছে মানুষ। সেই সঙ্গে মানচিত্রে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। অবশ্য এসব চরের সবগুলোই যে টিকে থাকছে তা নয়। আলোচিত তালপট্টি দ্বীপের মতো অনেক জমিই আবার হারিয়ে যাচ্ছে সাগরে। তবে এই পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়। এলাকাভিত্তিক হিসেবে সর্বাধিক ভূমি সৃজন হচ্ছে দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায়। পটুয়াখালী, ভোলা এবং বরগুনার নদী মোহনা ও সাগরে জাগছে অসংখ্য চর। প্রতি বছরই বাড়ছে এসব চরের আয়তন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূলীয় গবেষণা ও জরিপ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে বলেই চুপচাপ বসে আছে জাতিসংঘের আইপিসি। তাদের উচিত ভূমি সৃজনের এ তথ্য নিয়ে নতুনভাবে গবেষণা করা। দেশ তলাবে নাকি টিকে থাকবে তা দেখা উচিত তাদের। সেক্ষেত্রে হয়তো বড় ধরনের আতংক থেকে রেহাই পাবে মানুষ। তাছাড়া শত শত বছর ধরে প্রাকৃতিক নিয়মে চলছে নতুন ভূমি গঠন। ৫০ ও ৬০’র দশকে উপকূলীয় এলাকায় নির্মিত বাঁধগুলোও ভূমিকা রাখছে এক্ষেত্রে। দেশের অভ্যন্তরভাগসহ উপকূলীয় এলাকায় নদী এবং সাগরভাঙনে জমি বিলীন হওয়ার কিছু ইতিহাস থাকলেও ভূমি সৃজনের তুলনায় তা খুব একটা বেশি নয়। তাছাড়া ভেঙে যাওয়া তীর আবার জাগছে চর হয়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূমি বৃদ্ধির এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা উচিত। সেক্ষেত্রে দেশের আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাকৃতিক এবং পরিবেশগত অনেক দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাব আমরা।
বরিশাল নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিন্টু বসু বলেছেন, ‘সম্ভাব্য প্রাকৃতিক শরণার্থী আর প্লাবনের আশংকায় দিন গুনছে মানুষ। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা করা উচিত। নিরাপত্তার ভালো খবর শুনতে চায় উপকূলের মানুষ। বসতি হারানোর আতংক থেকেও মুক্তি চায় তারা। সরকারের উচিত এ মুহূর্তে সেরকমই ব্যবস্থা নেয়া।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



