বাংলাদেশে রাবার চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। ষাটের দশকের শুরুর দিকে কক্সবাজারের রামু এবং তার আশেপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো বিশেষজ্ঞরা জরিপ করে রাবার চাষের উপযোগী বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৬০-৬১ সালে সরকারি উদ্যোগে কক্সবাজার জেলার রামুতে প্রথম পরীক্ষামূলক রাবার চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে সরকারি পর্যায়ে আরও রাবার বাগান গড়ে ওঠে। এরপর ব্যক্তিমালিকানায় রাবার চাষ শুরু হয়। ১৯৮০-৮১ সাল হতে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রতিটি ২৫.০০ একর করে প্রায় ১৩০০টি বাগান বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতি হেক্টর রাবার বাগান (যেখানে ৪১৫টি উৎপাদনশীল রাবার গাছ রয়েছে) বায়ুমণ্ডল থেকে বার্ষিক ৩৯.০২ টন কার্বন শোষণ করে যা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে ও পরিবেশ রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। পক্ষান্তরে প্রতি কেজি রাবার উৎপাদনে খরচ মাত্র ৭০ টাকা কিন্তু প্রতি কেজি রাবারের বিক্রয়মূল্য ২৫০ টাকা। সরকার সারাদেশের মোট ৭ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমিকে সামাজিক বনায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং এতে রাবার বাগানও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাংলাদেশে মাত্র ৯৩ হাজার একর জমিতে রাবার চাষ হয় এবং বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে যে পরিমাণ রাবার উৎপাদন হয় মালয়শিয়ায় তার তিনগুণ বেশি রাবার উৎপাদিত হয়। এক্ষেত্রে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পুরনো রাবার বাগানে উচ্চ ফলনশীল রাবার গাছ বপন করলে তাতে আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আমাদের একই জমিতে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ রাবার উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে বার্ষিক রাবার উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১২-১৫ হাজার টন পক্ষান্তরে থাইল্যান্ডে ৩০ লাখ টন, ভিয়েতনামে আট লাখ টন এবং ভারতে ছয় লাখ টন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশে কাঁচা রাবার উৎপাদন বৃদ্ধি ও রাবারজাত দ্রব্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে রাবার শিল্প স্থাপনে আগ্রহীদের সর্বাত্মক সহায়তা করবে সরকার। রাবার চাষের লক্ষ্যমাত্রা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায়ও এগিয়ে আসবে সরকার। নতুন নীতিতে রাবার ভিত্তিক শিল্প স্থাপনের বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেশের চাহিদা অনুযায়ী যে সব রাবারজাত সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে, ওই সব সামগ্রী দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র্র, মাঝারি ও ভারি শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করা হয়েছে নতুন নীতিতে। এর ফলে রাবার শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অতি সমপ্রতি এই নীতিমালা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নীতি অনুযায়ী আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশে রাবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে কমপক্ষে ১ লাখ টন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। চাষ উপযোগী ভূমিতে ব্যাপকভাবে রাবার চাষ সমপ্রসারণের জন্য নতুন নীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন নীতিতে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, বি-বাড়িয়া, কুমিল্লা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়াকে রাবার চাষযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। সূত্র জানায়, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ১৩ হাজার একর ও বিভিন্ন চা বাগান ও প্রান্তিক চাষের আওতায় ২০ হাজার ৮শ একর জমিতে রাবার চাষ হচ্ছে। সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৪শ ছোট বড় রাবারভিত্তিক শিল্প কারখানা রয়েছে। স্বাধীনতার আগে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫টি। এসব শিল্প কারখানায় হাওয়াই চপ্পল, টায়ার, টিউব, রাবার শিট, ডোর, ম্যাট্রেস, বেল্ট, হোসপাইপ, গামবুট, বেলুনসহ নানা প্রকার রাবারজাত দ্রব্যাদি তৈরি করা হয়। নতুন নীতিতে বেসরকারি খাতে যে জমি রাবার চাষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে, ওই জমিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রাবার বাগান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৫ বছরের মধ্যে বরাদ্দপ্রাপ্ত জমিতে রাবার বাগান না করলে জমির বরাদ্দ বাতিল করা হবে। সূত্র জানায়, জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) বিশেষজ্ঞ সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে ২০২০ সাল নাগাদ ১ লাখ টন কাঁচা রাবার প্রয়োজন। এ জন্য ১ লাখ ৮৫ হাজার একর জমি রাবার চাষের আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অলাভজনক পরিণত হলেও বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের রাবার বাগান একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বছর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। উল্লেখ্য, রাবার শিল্পটি আরো লাভজনক হতে পারতো। নানা সমস্যা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তা এগোতে পারছে না। এ প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। রাবার প্রসেসিং করার জন্য কোষাগুলেটিং ট্যাংক না থাকায় রাবারের গুণগতমান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রাবার শিট রোলিং কাজে ব্যবহারের রোলার মেশিনগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। উৎপাদিত রাবার মজুদ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গুদামঘর না থাকায় রাবার মজুদ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ কারখানায় সীমানা প্রাচীর না থাকায় ধুমঘর অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে রাবার চোরদের দৌরাত্ম বন্ধ হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ স্থানীয় পিসমিল টেপাররাই এ চুরি সঙ্গে জড়িত। ভোরে সূর্য ওঠার আগেই পিসমিল টেপাররা রাবার গাছ কেটে কষ সংগ্রহ করে বাগানের ব্যবস্থাপকের কাছে জমা দেয়। জমা দেয়া কষের উপর নির্দিষ্ট হারে এরা কমিশন পায়। আবার বেশি লাভের জন্য এদের কেউ-কেউ কিছু অংশ বাইরে বিক্রি করে দেয়। এছাড়াও সারাদিন ঝরেপরা রাবার কষ গাছ থেকে এরাই সন্ধ্যার পর সংগ্রহ করে চোরাচালানিদের কাছে বিক্রি করে। রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ এসব চোরকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জানা গেছে, উৎপাদিত রাবারের প্রায় ৩০ শতাংশ চুরি হয়ে যায়। মধুপুর, ফুলবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, ভুজপুর, ফটিকছড়ি, বাহুবল সব জায়গা থেকেই লাখ লাখ টাকার রাবার পাচার হচ্ছে। এসব অঞ্চলে রাবার পাচারের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। এরা রাতের বেলা ট্রাক ভরে চোরাই রাবার পাচার করে থাকে। সংরক্ষিত বাগান থেকে কিভাবে টন টন রাবার ট্রাকে পাচার হয় বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থার স্থানীয় কর্মকর্তারা পুলিশকে কোন জবাব দিতে পারেনা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাবার বাগান কর্মকর্তারাও কোন প্রকার বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন। অথচ এ চুরি বন্ধ হলে প্রচুর অর্থ রাজকোষে জমা হতো। উল্লেখ্য যে, রাবার গাছকে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যবান আসবাবপত্র তৈরির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। রাবার শিল্পের সাথে সাথে রাবার গাছের কাঠও দেশের জন্য বিশাল সম্ভবনা নিয়ে আসতে পারবে। পাশাপাশি এতে করে আগামী দশ বছরে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান হবে।
সবুজ বাংলায় রাবার চাষেও রয়েছে সোনালী সম্ভাবনা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা হলে হাজার হাজার কোটি টাকার আয়ই শুধু হবে না- লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানও হবে অনায়াসে। বাংলায় রাবার চাষেও রয়েছে সোনালী সম্ভাবনা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা হলে হাজার হাজার কোটি টাকার আয়ই শুধু হবে না- লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানও হবে অনায়াসে।
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।