আমাদের দেশ কৃষি প্রধান। কৃষি অর্থনীতি এদেশের চালিকা শক্তি। খুব সামান্য হলেও সরকার কৃষিতে যে ভর্তুকি দিয়েছে তা সুফল গোটা জাতি পেতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু কৃষিতে উন্নতি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলা হলেও আগামী উন্নয়ন বাজেট থেকে কৃষিখাতে বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে সরকার। আগামী অর্থবছরের (২০১১-১২) জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার (এডিপি) প্রস্তাবিত খসড়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে এ (আরএডিপি) খাতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। নতুন অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ২ কোটি ২০ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ এ সময়ে এডিপির আকার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা।
কৃষিখাতকে উপেক্ষা করে আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও লেজিসলেটিভ এবং সংসদ বিষয়ক বিভাগে সাত গুণ পর্যন্ত বরাদ্দ বাড়ানোর চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কৃষিখাতে প্রত্যাশিত বরাদ্দ না বাড়ায় দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন। এতে করে দেশের খাদ্য আমদানি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। ফলে ফাঁকা বুলিতে পরিণত হবে খাদ্যে
স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি। পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীর উত্তম জানান, আগামী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপির) মোট আকার হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে ২৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। বাকি ১৮ হাজার ৬৮৫ কোটি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে নেয়া হবে।
মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর (এমটিবিএফ) আওতায় সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৫৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে বরাদ্দ প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ হাজার ৫৫৫ কোটি বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। মোট এডিপির আকার প্রায় ৩১ শতাংশ বাড়লেও বরাদ্দ প্রস্তাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ দিকে কৃষিখাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় গোটা কৃষি ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। বলাবাহুল্য, দেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী রাখতে খাদ্য উৎপাদনের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষিখাতে উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ব্যবহার করতে হবে উন্নত প্রযুক্তি। মাটির উৎপাদনশীলতা রক্ষা করার জন্যও প্রয়োজন বিশেষ ব্যবস্থা। আর এসবের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক উৎপাদন প্রকল্প ও বরাদ্দ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মার্চ মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৪৯। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ১৪ ভাগেরও বেশি। বিশ্ব বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় এ মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব ব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা। এ অবস্থায় দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে না পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
উল্লেখ্য, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য কমানোর জন্য খরচ সীমিত রেখে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য অধিক ফলনশীল উন্নতজাতের ফসল চাষ, হাইব্রিড বীজ ব্যবহার, পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আর এজন্য প্রয়োজন কৃষিখাতে ব্যাপক বরাদ্দ।
এদিকে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে মর্মে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কিছু দিন ধরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে সম্প্রতি বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করায় এ প্রচারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোনোরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রেকর্ড ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৭৩ মেট্রিক টন খাদ্য আমদানি করা হয়েছে। অর্থবছরের বাকি ৩ মাসে আরও ১০ লাখ টন চাল-গম আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
খাদ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়েছে। প্রচুর খাদ্য আমদানি সত্ত্বেও চালের দাম ৫ বছরের ব্যবধানে প্রায় আড়াইগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব মতে, গত এক বছরে মোটা চালের দাম ২৬ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৌশলগত কারণে বিপুল পরিমাণ চাল কেনা হয়েছে এবং আরও কেনা হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জনান, প্রতিটি বিভাগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তেমন কিছু করার থাকে না।
চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ৩৮ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। তবে বিদেশি সাহায্যের ছাড় প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়া ও সময়মত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় ফেব্রুয়ারি মাসে কাটছাঁট করে সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) ৩৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। চলতি বছরের এডিপি থেকে আগামী বছরের এডিপির আকার বাড়বে ১০ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এ কথা এখন ওপেন সিক্রেট যে, উন্নয়ন বাজেটের নামে যেসব প্রকল্প নেয়া হয় তা মূলত একদিকে অপ্রয়োজনীয় অপরদিকে হয় লুটপাটের আখড়া।
বলাবাহুল্য, এ কথা আজ মুখে মুখে উচ্চারিত। কিন্তু প্রতিবাদী কণ্ঠ নেই। আমরা মনে করে এটা এখন খুবই জরুরী সময় যখন কেবল প্রতিবাদী কণ্ঠই নয় দরকার প্রতিহতকারী জনতা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


