সূর্যোদয়ের দেশে দুবছরের বেশি কাটিয়ে দিলাম। প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটানোর পর এদেশের হাসিখুশি, নির্লোভ, পরোপকারী মানুষগুলোকে আরো বেশি করে জানার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, জাতীয় ঐতিহ্য কিংবা মৌলিক শিক্ষার অন্তরালে কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে, যা জাপানকে স্বমহিমায় ভাস্বর করে রেখেছে!
পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছে এদেশের শিশুমহল এবং বিদ্যালয়ের খানিকটা সান্নিধ্য পাবার। অনুসন্ধিৎসু চোখ আর কৌতূহলী মন নিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি মানুষগুলোর মনস্তত্ব পড়ে নেবার। সবচেয়ে অবাক হয়েছি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক দেখে। কঞ্চি হাতে রক্তচক্ষু হেডমাস্টার, বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো অথবা সর্বশক্তি দিয়ে কচি পিঠের উপর দু'ঘা বসিয়ে দেয়া-এসব দৃশ্য এদের কাছে রূপকথার গল্পই মনে হবে। শিক্ষকরা প্রকৃত অর্থেই ছাত্রের বন্ধু। পরিবারের সদস্যদের পরই শিক্ষকরা জাপানিজ শিশুদের সবচে' আপনজন। একসাথে ঠাট্টা, খেলায় মেতে ওঠা শিক্ষকদের দেখে মনেই হয়না ছাত্রের সাথে ওদের বয়সের ব্যবধান পঞ্চাশ, ষাট বছর।
একেকটি স্কুল যেন শিশুদের স্বপ্নপুরী। ক্লাসরুমগুলো খেলার মাঠ। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত রয়েছে তিনটি ধাপ। ১ম থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী প্রাথমিক, ৭ম থেকে ৯ম নিম্নমাধ্যমিক আর দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়। প্রতিটি পর্যায়ের স্কুল আলাদা। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক। উচ্চমাধ্যমিক বাধ্যতামূলক না হলেও ৯০% ভাগ মানুষ এ গণ্ডি পেরোয়।
জাপানিজ প্রথামত স্কুলগুলো বাচ্চাদের শেখায় সমাজকে শ্রদ্ধা করতে। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে একটি দলের ভালোমন্দ বিবেচনা করতে শিখে যায় বাচ্চারা, একেবারে ছোটবয়স থেকেই। বিদ্যালয়ে জোর দেয়া হয় পরিশ্রম, আত্মসমালোচনা এবং সুশৃংখল পাঠ্যাভাসের উপর। সাধারণভাবে প্রত্যেক জাপানিজের মর্ম্মূলে প্রোথিত হয়ে আছে যে, কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় বয়ে আনে সাফল্য। বিদ্যালয় জীবনের অধিকাংশ সময়েই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সদাচরণ, নৈতিক মূল্যবোধ এবং চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শিক্ষা মানে কিছু সনদপত্র নয়, বরং দেশীয় সংস্কৃতি ও সমাজের মৌলিক বোধগুলোকে অনুধাবন করা- একথা প্রতিটি জাপানিজ স্কুল মেনে চলে।
প্রতিটি স্কুলের সামনেই আবশ্যিকভাবে থাকবে বিশাল খেলার মাঠ। সকল ছাত্র এ মাঠে কিছুক্ষণ সময় খেলবেই। এটা রোজনামচার অংশ। শরীরচর্চা, খেলাধূলাও পড়াশুনোর মত বাধ্যতামূলক। ৯০% ভাগ স্কুলে রয়েছে জিম। সুইমিংপুল আছে ৭৫% ভাগ স্কুলে। প্রায় সব শ্রেণীকক্ষেই আছে টিভি, ভিডিও ও ক্যাসেট প্লেয়ার। যেকোন শিক্ষক চাইলেই ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর ব্যবহার করতে পারেন। বিভিন্ন ধরণের টিমওয়ার্ক শিক্ষাসূচীর অন্তর্ভূক্ত। স্কুলের প্রধান ফটকে ঢোকার পরই দেখা যাবে সারি সারি জুতার শেলফ। সবাইকে ঢোকার সময় জুতোজুড়া খুলে স্লিপার পরে নিতে হয়। সরকারি স্কুলে সবার দুপুরের খাবার স্কুল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে। এজন্য নামমাত্র মূল্য পরিশোধ করতে হয়। পড়ার খরচ বলতে এটুকুই। লাঞ্চটাইম হলেই দু'তিনজন শিক্ষক একটা ট্রলিতে করে প্লেট, বাটি এবং খাবার প্রতিটি ক্লাসে নিয়ে যান। ছাত্রপ্রতিনিধি আর শিক্ষকরা মিলে সবার জন্য খাবার বেড়ে দিতে থাকেন আর ছাত্ররা একটা ট্রেতে করে নিজের খাবার নিয়ে আসে। প্রতিদিনের এ ভোজনপর্বে ছোট ছোট বাচ্চাদের টিমওয়ার্ক শেখানো হচ্ছে। নিজের কাজ নিজে করার শিক্ষাটুকু পেয়ে যাচ্ছে হাতেকলমে। খাবার পর ক্লাসরুম এবং বারান্দা পরিষ্কারের দায়িত্বও ছাত্রদের। আট নয় বছরের বাচ্চাদের ঝাড়ুহাতে যখন পরম আনন্দের সাথে বারান্দা ঝাড়ু দিতে দেখি, সত্যি বিস্ময় সামলাতে পারিনা!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্লানি এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে অনেক প্রতিবন্ধী শিশু। সমগ্র জাপানেই প্রতিবন্ধীদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া হয়, যাতে কোনরকম অসুবিধা ছাড়াই একজন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে। স্কুলগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। ক্লাসে কোন প্রতিবন্ধী শিশু থাকলে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিশেষ যত্ন নিয়ে থাকেন। সহপাঠীদের ব্যবহার অভিভাবকসুলভ। অস্বাভাবিকত্ব নিয়ে ব্যঙ্গ করতে দেখিনি নিতান্ত অল্পবয়সী বাচ্চাদেরকেও। আমার সুযোগ হয়েছিল প্রতিবন্ধী শিশুদের একটি ক্লাস নেয়ার এবং তাদের সাথে লাঞ্চ করার। শিক্ষকদের সাহচর্য, বন্ধুত্ব আমাকে সত্যি বিস্মিত করেছে। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হয়েও একটি শিশু শৃংখলা, সদাচরণ যেভাবে রপ্ত করেছে, তা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।
প্রতিটি স্কুলের দেয়ালে ঝুলতে দেখেছি শিশুদের আঁকা নানান রঙের সব ছবি। মনকাড়া অসংখ্য হস্তশিল্প সাজিয়ে রাখা কাঁচের বাক্সে। প্রতিটি ছাত্রই কোন না কোন ক্লাবের সদস্য। ছবি আঁকা, রান্না, পিয়ানো, টেনিস, ফুটবল, সাঁতার, সংগীত এমনি হরেক রকমের ক্লাব। আর্ট এন্ড ক্রাফট ক্লাবে শেখানো হয় মজার যত হস্তশিল্প। ছোটবেলা থেকেই একটি শিশু নিজের আগ্রহ এবং দক্ষতা যাচাই করতে শেখে, যা পরবর্তীতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের বিত্তের অভাবই শুধু এমন একটা পরিবেশ তৈরিতে বাধা? চিত্তের অভাবও যে দায়ী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

