পেসিমিজম আর আত্মসমালোচনা-কে যারা এক করে দেখেন আমি তাদের দলে নই। বিদেশের মাটিতে নিজেদের ভুলগুলোকে জামদানি পাড়ে ঢেকে, সিল্কের পাঞ্জাবীর স্বর্ণ বোতামে লটকে ফোল্ডিং চেয়ারের সাথে ভাঁজ করে রেখে দিলেই খালাস হয়না আত্মগ্লানি। সেটা সামনে এনে ভাবতে হয়। এসে যায় আপনা থেকেই, উকুন পরিবারের কুট্টুর কুট্টুর কামড়ের মত ডালপালা ছড়ায় গ্রে-ম্যাটারে। সাম্প্রতিক বোধোদয় হল বিগত এক রোববার। মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি, জাপান এর অভিষেক আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলুম। খাসা কিছু বাংগালীপনা ভরে এনেছি ট্র্যাশ ব্যাগে করে।
দু'টো সাইটে শুরুর সময় ছিলো দু'রকম। দু'টা আর তিনটা। আয়োজকদের ফোন দিয়ে, দু'টায় শুরু হওয়া নিশ্চিত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছি একটায়। পাশের বাসার ভাইয়া আটকে দিলেন আমাদের বোকামির প্রশংসা করে। উনার অনুমান, ৪ টার আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরুর প্রশ্নই আসেনা। সাময়িক বিরতি দিয়ে আবার শুভাগমণ করলাম এমনভাবে যাতে ৩.৪৫ এর দিকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছা যায়। অতিথি হয়ে এসেছেন ইমদাদুল হক মিলন। মঞ্চে উপবিষ্টদের ক্রম এবং বক্তব্যরতের খালি চেয়ারের অংক মিলিয়ে যা বোঝার বুঝে নিলাম মিলনায়তনে ঢুকেই। আত্মপ্রশংসা, চাটুকারিতা, বহুবার শোনা কথাগুলোর জাবরসমেত চুড়ান্তমাত্রার বিরক্তিকর বক্তব্য দিয়ে অতিথিরা ক্ষান্ত দিলেন ৫.১০ এর দিকে। মিলন-এর বক্তব্য অবশ্য অপেক্ষাকৃত কম যন্ত্রণাদায়ক হয়েছিলো। এরপর শুরু হলো কমিটির সবাইকে মঞ্চে ডাকা। গুনতে পারিনি, ৩০/৩৫ জনের মত হবেন। অডিয়েন্স থেকে মন্তব্য আসছিলো, "ভাই, সবাইরে নিয়েননা স্টেজে, হাততালি দেয়ার মত কিছু লোক রাখেন।"
উনারা সবাই উঠলেন এবং নামলেন। হলভর্তি দর্শক ক্লোজ-আপ রাজীব, সোনিয়ার গান এবং ফারাহ রুমা সহ আরো কিছু নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনা দেখার জন্য নির্ধারিত সময়ের তিন ঘন্টা পর পর্যন্ত অসীম আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সবাইকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে ৫.৩০ টায় শিল্পীরা মুখ প্রদর্শনের অপার্থিব আনন্দভোগের সুযোগ পেলেন। রাজীবের গানের সাথে অডিয়েন্সের একপাশে উল্লম্ফ নৃত্য শুরু হলো। তার অব্যবহিত পরেই......হুমম যা ভেবেছেন তাই। পেশী প্রদর্শনী, খিস্তি খেউর, জুতাপেটা, শার্ট ছিঁড়ে ফেলা......ইত্যাদি ইত্যাদি। ওপাশে বসা নারী-শিশুরা ভয়ে দৌড় শুরু করলেন। জাপানি অভ্যাগতরা প্রাণভয়ে দিকবিদিক ছুটতে লাগলেন। অন্য জাতীয়তার লোকেরাও ছিলেন। বাংলা গান, নাচ দেখতে এসে সবল, কর্মঠ বাংগালীর শক্তির খানিকটা আঁচ পেয়ে গেলেন। আয়োজকদের ঐকান্তিক চেষ্টায় এক পর্যায়ে হাতাহাতি বন্ধ হলো। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানেও এরকম শো হচ্ছে ইদানিং। গান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই নাচ এবং নাচের সাথে পাল্লা দিয়ে হাতাহাতি চলতেই থাকে।
রাজীব, সোনিয়া, ফারাহ রুমা, আনিকা, জোসনা সবটুকু আন্তরিকতা ঢেলে সঙ্গীত এবং নৃত্যসুধা বিলিয়ে দিলেন। কিন্তু শো-ডাউনের তখনো বাকি। বীরেরা একটু পরপর দলবল নিয়ে পুরো অডিটরিয়াম চক্কর দেন, আর আমরা মুখকে চালকুমড়া বানিয়ে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকি। বিজ্ঞাপন বিরতি শেষ করে কুস্তিগীরেরা আরেকবার ঝটিকা হাতাহাতি কিলাকিলি-র নৈপুণ্য প্রদর্শনে ব্রতী হলেন। মঞ্চে নাচেন সোনিয়া, অডিয়েন্সে নাচে বাংগালীর ইজ্জত।
নির্ধারিত সময়ের থেকে এক সেকেন্ডও বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আলোচনা অনুষ্ঠানের পর নির্ধারিত যেটুকু সময় পাওয়া গেলো তাতে না সন্তুষ্ট শিল্পীরা, না দর্শকরা। নাহ, কষ্ট নেই। আমরা দেখেছি বাকপটুতা, কুস্তিনৈপুণ্য, ধ্রুপদী ভাষাচর্চা। বাংগালী হিসেবে আর কীই বা আশা করতে পারি!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

