শিরোনামটা খুব জলো হয়ে গেল, তবে সরাসরিও বটে। ব্লগজীবনে অকালপ্রয়াত একজন ব্লগার বিষয়টা নিয়ে লিখতে বলেছিলেন, যদি কোনদিন বই লিখার মত বিখ্যাত হয়ে যাই। আজ অবধি সে সম্ভাবনা ঈদের চাঁদের মত স্লিম ফিগারেও ধরা দিচ্ছেনা। তাই ব্লগবাড়িতে প্রসবের একটা জীবন্ত টান অনুভব করলাম। আসলে হয়ে ওঠা বলার চেয়ে হওয়ার চেষ্টায় থাকা বলাটা কম অনিরাপদ হত। মেয়েমানুষ থেকে মানুষ, সাধারণ মেয়ে থেকে অপ্রচলিত ভাবনার মেয়ে নাকি সাধারণের পর্যায়ে থেকে একটা অসাধারণত্বের অলীক অবস্থানকে ভালোবেসে যাওয়া মেয়েমানুষ - ঠিক কোন ফ্রেমে বাঁধলে লেখা ডিরেইল্ড না হয়ে মাপমত গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, এখনো নিঃসন্দেহ নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শিরোনামেই ইতি টানতে হবে। আপাতত শিরোনামের ভাবনাটাই প্রাণ পাক, বাকিগুলো পরে নাড়া যাবে।
আমরা চার বোন। ভাই নেই? নাহ, নেই। মা-বাবা মানবিক উৎকর্ষে স্ব স্ব সার্টিফিকেটের মানরক্ষা করেছেন, অন্তত আমার কাছে। চারটি কন্যাসন্তান প্রসবের পরম্পরা নিয়ে আলাপের মত যথেষ্ট বয়েসী মনে না হওয়াতে মা হয়ত তার গর্ভধারণের প্রাক এবং পরবর্তী মনস্তত্ত্ব আমার সাথে ভাগাভাগি করতে পারেননি। আমিও একটা বিশ্লেষণের সুযোগ হারালাম। অনুমাননির্ভর এবং সম্ভবত সত্যের কাছাকাছি ব্যাখ্যা হল, ছেলেসন্তান প্রত্যাশী ছিলেন। না, এ নিয়ে অনুযোগ নেই। বরং, চার কন্যাসন্তানের পরিবারে সচেতন একটা মানসে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সামাজিক কিছু মিথস্ক্রিয়া ধরা দেয়। আমার সৌভাগ্য যে, আমি সে ভাবনার জায়গাটা একেবারে আটপৌরে দিনলিপিতে চর্চা করতে পেরেছিলাম। ভাইবোনের অনুপাতে আর খানিকটা তারতম্য হলেই আমি আজ এ লেখার খোরাক পেতাম কিনা, আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতে পারছিনা। জয়তু আমার মা-বাবা।
ঠিক কবে, কোন প্রেক্ষাপটে আমার মানুষ হয়ে ওঠার বোধের জন্ম, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হতে পারছিনা। কিছু টুকরো কথা, দৃশ্য, স্থান-কাল-পাত্রের কিছু কোলাজ এ মুহূর্তে ধরা দিচ্ছে। দাদী আমার পরম প্রিয়জন, শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নাতনীদের সঙ্গলাভে নিখাদ আরাম পেয়েছেন। নানী কি? জানা নেই। কোন একজন আত্মীয়া মা-কে মানসিক কিছু্টা টানাপোড়েনে রাখার সাফল্য লাভ করেছিলেন। নাকি তিনি কেউ একজন নন? হয়ত একিরকম ভাবনার অনেকজন অথবা আসলে তারা কেউই ছিলেননা। তবে মাকে পুত্রসন্তান জন্ম না দিতে দেখে বিচলিত হতে দেখেছি যদ্দুর মনে পড়ে। সেটা তো উনি কখনোই প্রকাশ করেননি। নাহ, আলবত করেননি। তাহলে আমি জানলাম কীভাবে? আমি তবে আড়ালে আড়ালে তার ভাবনাগুলো নিজের করে ভেবে নিতে সচেষ্ট ছিলাম, তাই হবে হয়ত। সব ছোটবোন আমার চে' এগার বছরের ছোট। ওর জন্মের পরেই আমার চোখে নানান বিচ্ছিন্ন দৃশ্য এক সুরে ধরা দিতে শুরু করলো। মা যথেষ্ট শক্ত মহিলা, আমার দেখা সবচেয়ে অনড় ব্যক্তিত্বের নারী। মায়ের বিষন্নতা ঢাকার একটা ইচ্ছা ছিলো হয়ত, কিন্তু সে প্রচেষ্টা আমার চোখে পড়ার আগে করেননি নিশ্চিত। আমি দেখলাম, এতগুলো মেয়ে, আহারে ছেলে নেই, বংশের কী হবে, এধরণের বাক্যগুলো আমার চলার পথের সামনে কীভাবে জানি এসে আছড়ে পড়ছে। তবে, এগারোর আগেও, সাত, আট কিংবা নয় থেকে শুনছিলাম। কখনো সখনো ভাবিয়েছেও।
ইস একটা ছেলে থাকলে ভাইকে যখন তখন থলে হাতে বাজারে দৌড়ুতে হতোনা; একি আপা! গ্যাস বিল দিতে আপনি এসেছেন কেন? ওহ, ছেলে নেই তো আপনার; মেয়েগুলির বিয়ে দিলে আর কী থাকবে কিছু আপনাদের?; কী রে মেয়ে তোর একটা ভাই নেই, সন্ধ্যার পর প্রাইভেট পড়তে যাবি একা একা?; তোরা তিনজন মিলে একা একা চলে গেলি? মেয়ে হয়ে এত সাহস দেখাবিনা বললাম; এত কষ্ট করে চাকরি করছেন আপা, বয়েস হলে তো মুখে পানি দেয়ারও কেউ থাকবেনা। মেয়েরাতো শ্বশুরবাড়ী নিয়েই ব্যস্ত থাকবে তখন.........এগুলো ছেলে মেয়ের অনুপাত সম্পর্কিত কিছু উচ্চকিত ধারণা। আমরা লালন করি, করতে শেখাই। আমি জানতে শিখছিলাম ভাই না থাকাটা একধরণের বৈকল্য, অবলম্বনহীনতা। বুঝতে শিখছিলাম ছেলে না থাকাটা এক ধরণের অঙ্গহীনতা। একজোড়া দম্পতির সামাজিক অবস্থানের কোথাও না কোথাও ছেলে সন্তানের একটা ভূমিকা আছে। আমার সে জানতে শেখাগুলো খুব স্বাভাবিক ভাবেই হচ্ছিল। কোন বই পড়ে নয়, নারীবাদী কারো বক্তব্য কিংবা জীবনকাহিনী পড়ে নয়। মোদ্দা কথা, নারীবাদ, পুরুষবাদ এ শব্দগুলোর অস্তিত্ব জানার আগে থেকেও।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

